Story

ঘড়ি

September 26, 2026

46 views

কদমতলি গ্রামটা অদ্ভুত। এরকম গ্রাম বারেক হুজুর বাংলাদেশে আর কোন জেলাতে দেখেননি। এখানে আসার আগে আরো তিন জায়গায় চাকুরী করেছিলেন তিনি। এ গ্রামের মসজিদে বারেক হুজুর মুয়াজ্জিনের কাজ করছেন প্রায় বারো বছর হয়ে গেল। এ গ্রামটাকে অদ্ভুত বলার পেছনে একটা কারণ আছে। এ গ্রামের কারো বিয়েই অন্য গ্রামে হয় না। এ ব্যপারতা অদ্ভুত লেগেছে তার কাছে। এখানে মসজিদে চাকুরী নেয়ার আগে তিনি ছিলেন মেলান্দহে। সেখানে মসজিদের চেয়ারম্যান ইউনিয়ন পরিষদেরও চেয়ারম্যান ছিলো। লোকটা ছিলো আপাদমস্তক চোর। ইউনিয়নের জন্য যা বরাদ্দ আসতো, প্রায় শতভাগ তিনি কীভাবে যেন নিজের করে ফেলতেন। তার দুই ছেলে ছিলো। ঘটনাক্রমে দুজনেই পুলিশে চাকুরী করতো সে দুজন। কোনমতে সেখানে মাস ছয়েক কাজ করে চাকুরীটা ছেড়ে এসে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলেন তিনি। এ গ্রামের পাশেই একটা নদী। গ্রামের আবহাওয়াই অন্যরকম। বেশ আরামদায়ক।এত বেশী আরামদায়ক যে ঘুমের কারণে সকালে উঠতে তিনি নিয়মিত দেরী করতেন। পরিস্থিতি দেখে ইমাম সাহেব তাকে একটা দেয়াল ঘড়ি দিয়েছিলেন। ঘড়িটা নাকি ইমাম সাহেবের কক্ষে ছিলো। সকালের এলার্মটাই বেশী দরকার ছিলো। ঘড়িটার দিকে বারেক হুজুর সম্ভবত বছর খানেক তাকিয়ে দেখেননি। শুধু ভোরে এলার্ম বাজার মধ্য দিয়েই ঘড়িটার সাথে তার যোগাযোগ, আর কিছুই নয়। শুরুর দিকে এলার্ম শুনেই ঘুম থেকে উঠে ফজরের আজানের জন্য প্রস্তুত হতেন। কদিন পর সেই এলার্মটাও শোনার প্রয়োজন হতো না। শরীরটাই যেন সময় ধরে রাখে। ফজরের সময় হলে ঘুম ভাঙে, মাগরিবের আগে বুকের ভেতর একটা অস্থিরতা আসে। লোকজন বলে, অভ্যাস। তিনি জানেন, শুধু অভ্যাস না, দায়িত্বও।
ইদানীং একটা সমস্যা শুরু হয়েছে। পুরোনো ঘড়িটা এখনো ঠিক সময়ই দেখায়, কিন্তু বারেক হুজুরের কেন যেন সেটা আর ভালো লাগছে না। কথায় কথায় ইমাম সাহেবকে বলতেই তিনি হেসে বলেছিলেন,
ওটাতো নষ্ট না, তুমি এটিকে নিয়ে বেশি ভাবো।
কথাটা বারেক হুজুর ভুলতে পারেননি, কারণ ভাবাটা যে তার দোষ না, সেটা তিনি নিজেও জানেন।আজান দেওয়ার আগে কয়েক মিনিট তিনি প্রায়ই চুপ করে বসে থাকেন। এই চুপ করাটাই তার কাছে সবচেয়ে কঠিন সময়। কারণ তখন মনের মধ্যে নানান প্রশ্ন আসে। আগে আসত না। এখন আসে।
এই আজানটা আমি দিচ্ছি কেন? কারণ আল্লাহ বলেছেন? না কি কারণ আমি এতদিন দিয়ে আসছি?
প্রশ্নটা প্রথম দিন তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। মানুষ নামাজ পড়ার আগে যেমন নিয়ত করে, তেমনি তিনি আজান দেওয়ার আগে ভেতরে একটা নিয়ত খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, নিয়ত খুঁজতে গিয়ে তিনি ক্বদরের কথা ভাবতে শুরু করলেন।
যদি আল্লাহ আগেই ঠিক করে রেখেছেন, আমি আজান দেব, তাহলে এই চাওয়াটা কীভাবে আমার হয়? আর যদি আমি না চাই, তবু যদি আজান হয়ে যায়, তাহলে দায়িত্বটা কার?
একদিন ফজরের আজানের সময় কেন যেন গলা হঠাৎ ভারী হয়ে এলো। আজান থামেনি, কিন্তু শব্দটা ঠিক আগের মতো ছিল না। নিজেই শুনে নিজের কণ্ঠ চিনতে পারলেন না। নামাজ শেষে ইমামকে বললেন। ইমাম বললেন,
এ বয়সে এমন হয়, চিন্তা কোরো না।
তিনি মাথা নেড়ে চুপ করে গেলেন।
চুপ থাকাই এখন তার বড় অভ্যাস। ঘরে ফিরলে স্ত্রী জানতে চায়,
আজকাল চুপচাপ থাকো কেন? তিনি বলেন, এমনিই।
ছেলেটা পড়া থামিয়ে তার দিকে তাকায়। তার চোখে চোখ পড়লেই আমার মাথা দুলিয়ে পড়তে থাকে। তার সংসার খুব সাধারণ, কোনো নাটক নেই। কিন্তু ভেতরে যে নাটক চলছে, সেটা তিনি কাউকে দেখাতে পারেন না।
এক রাতে তিনি কোরআন খুলে ক্বদরের আয়াতগুলো পড়লেন। পড়তে পড়তে মনে হলো, আয়াতগুলো উত্তর দিচ্ছে না, বরং আরো প্রশ্ন তৈরি করছে। ইখতিয়ার শব্দটা কোথাও সরাসরি নেই, কিন্তু মানুষের দায়িত্বের কথা আছে। এই দুটোকে একসাথে ধরে রাখা কঠিন।
পরদিন বিকেলে তিনি আসরের আজান দেওয়ার আগে ইচ্ছা করে কয়েক মিনিট দেরি করলেন। কিছু হলো না। মানুষ অপেক্ষা করল। আজান হলো। আকাশ ভেঙে পড়েনি। কিন্তু তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ রয়ে গেল।
তিনি বুঝতে পারলেন, ভয়টা আজান না দেওয়ার না। ভয়টা এই ভাবনার, যদি তিনি নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাহলে এতদিন কী করছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর ক্বদর দেয় না। পরিষ্কার একটা ধারণা দরকার। নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বকে বুকে চেপে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন মুয়াজ্জিন, যে শুধু মানুষকে নামাজের ডাক দেয়, কিন্তু নিজের বিশ্বাসের হিসাব মিলাতে পারে না।
একদিন আজান দিতে দিতে তার মনে হলো, তিনি কাউকে ডাকছেন না, বরং নিজেই ডাক পাচ্ছেন। কার কাছ থেকে, সেটা পরিষ্কার না। শুধু এটুকু পরিষ্কার যে, এই ডাক এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মাঝে মাঝে ভোরে আজান শেষ হলে তিনি বসে থাকেন একটু। মসজিদের ভেতর তখন নীরবতা থাকে। তখন অবশ্য কোনো অলৌকিক কিছু ঘটে না। কিন্তু এই নীরবতার ভেতরেই তার আজকাল খুব ভয় লাগে। কারণ এখানে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নেই। এখানে তাকে নিজেকেই ঠিক করতে হবে, তিনি বিশ্বাস করছেন, না শুধু পালন করছেন।
এই দ্বিধা নিয়েই তিনি প্রতিদিন মিনারে ওঠেন। আজান দেন। আবার নেমে আসেন। ক্বদর আর ইখতিয়ারের মাঝে কোনো সমাধান পান না।
শুধু এটুকু বোঝেন, যে প্রশ্নটা তাকে কাঁপায়, সেটাই হয়তো তার ঈমানের অংশ। তার নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বটা কদিন ইমাম সাহেবকে বললেন বারেক হুজুর। ইমাম সাহেব চুপচাপ শুনে বললেন,
বারেক, তোমার ঘরের দেয়ালে ঘড়িটা এখনো আছে?
জি হুজুর, এখনো আছে।
সেটা কি কাজ করছে সেখানে?
হুজুর সময় দেখায়, আরতো কিছু করে না।
ভুল পথে চলে গেছ, বারেক। ইমাম সাহেব বললেন। ঘড়িতে সময় দেখার লোকতো তোমার হবার কথা নয়। সে তোমাকে সময় নয়, হিসাবের কথা বলে। ওটা ঘড়ি নয়, হিসাব। ওটার দিকে তাকিয়ে সময় মাপতে নেই।
কথাটা শোনার পরপরই বারেক হুজুর নিজ রুমে ঢুকে ঘড়িটির দিকে তাকালেন। ঘড়িটার দিকে তাকিয়েই তার মনে হলো, সম্ভবত গত এক যুগে এই প্রথম তিনি ঘড়িটার দিকে তাকিয়েছেন।
ঘড়িতে কাঁটাগুলো ছিল না। ঘড়ির কেন্দ্রে একটা ছোট বৃত্ত, যেন কিছু ঘুরছে, কিন্তু সেটি কোথাও পৌঁছাচ্ছে না। বারেক হুজুর অবাক হয়ে ঘড়িটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। গত বারো বছরে একদিনের জন্যেও জানতে পারেননি, তার বিছানার পাশের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটিতে কোন কাঁটাই নেই। সেদিকে তাকিয়ে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।
পরদিন ভোরে, আজান দেওয়ার আগে, বারেক হুজুর স্পষ্ট শুনলেন, ঘড়ির ভেতর কেউ যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। মানুষের মতো নয়। কিছু একটা আটকে থাকা শ্বাস। তিনি আজান দিতে গেলেন। কিন্তু শব্দ তার গলা থেকে বের হয়ে মসজিদের মিনার ছাড়িয়ে কোথাও গেলো না। আজানটা যেন ভেতরেই ফিরে এলো, তার বুকের খাঁচায় আটকে গেল।
তিন নিজের রুমে ফিরে এলেন। সেসময় দেয়ালের ঘড়িটি যেন তখন কথা বলে উঠল। কণ্ঠটা ছিল তার নিজের মতোই।
তুমি কি আজান দাও, না তুমি আজান দিতে বাধ্য?
বারেক হুজুর প্রশ্নটা শুনে কেঁপে উঠলেন। তিনি জানতেন, প্রশ্নটা ধর্মীয় নয়, অস্তিত্বের।
তিনি ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি দায়িত্ব পালন করি।
ঘড়ির ভেতর থেকে চাপা হাসির আওয়াজ বেরিয়ে এলো। হাসিটা কোনো আনন্দের ছিল না, বরং সেটিতে তাচ্ছিল্যই বেশী মনে হলো বারেক হুজুরের।
দায়িত্ব যদি আগেই লেখা থাকে, তাহলে তোমার ইচ্ছা কোথায়? ঘড়ির ভেতর থেকে আওয়াজ এলো।
সেদিন তিনি আজান শেষ করতে পারেননি, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য কাউকে তিনি বললেন। তিনি এও বললেন, আজানে হাই আলাস সালাহ পর্যন্ত বলতে পেরেছিলেন। তার গলা কেন যেন তখন বুঁজে এসেছিলো। ঘড়ির ভেতর থেকে এর জবাবে কোন বাক্য আসলো না। শুধু সেই চাপা নিশ্বাসটাই এলো।
সে রাতে বারেক হুজুর স্বপ্নে দেখলেন, একটি কবর। কিন্তু সেখানে কেউ শুয়ে নেই। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধভাবে, চোখ খোলা, মুখ নীরব।
একজন জ্যোতির্ময় চেহারার একজনকে দেখা গেল তাদের মধ্যে। তিনি কোন প্রশ্ন করছেন না, শুধু তাকিয়ে আছেন। সেই জ্যোতির্ময় ব্যাক্তি কেন যেন কিছুক্ষণ পরেই বিড়বিড় করে ক্বদর, ক্বদর বলতে লাগলেন। পরদিন তিনি ইমাম সাহেবকে সব বললেন। ইমাম সাহেব শুধু বললেন,
সবই তাকদির। তুমি বেশি ভাবছ। এত ভেবো না।
এই কথাটাই তাকে ভাঙল। কারণ যদি সবই তাকদির হয়, তাহলে পাপের ভার কিসের?
দোয়ার অর্থ কী? তওবার প্রয়োজনই বা কেন?
রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে এই প্রশ্নগুলো নিয়েই ভাবতে লাগলেন বারেক মাওলানা। ঠিক তখন আবার অদ্ভুত ঘটনাটি ঘটলো। ঘড়ির ভেতরের কণ্ঠটা আবার ফিরে এলো,
তুমি কি কখনো আজান না দেওয়ার কথা ভেবেছ?
এই প্রশ্নে তার শরীর কেঁপে উঠল। কারণ, না দেওয়ার চিন্তাটাই তো ইখতিয়ার। কোন কারণ ছাড়াই তার মধ্যে এজন্য একটা অনুতাপ শুরু হয়ে গেলো।
পরের ভোরে তিনি মিনারে উঠলেন। শহর নিঃশব্দ। কুকুর ডাকছে না, পাখি নেই। তিনি আজান দিলেন না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেন যেন তখনই মসজিদসহ পুরো শহর কেঁপে উঠল। ঘড়িটা দেয়াল থেকে পড়ে গেলো।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো আরেকজন মুয়াজ্জিন, তারই মতো দেখতে।
তার চোখের ভেতর ঘুরছে চেনা আয়াত, কিন্তু ঠোঁট নড়ছে না।
সেই মানুষটি বলল,
তুমি আজ ইখতিয়ার বেছে নিয়েছ। এখন ক্বদর তোমাকে মনে রাখবে।
শহরের মানুষ বলাবলি করতে লাগলো,
আজ কেন আজান হয়নি?কেউ জানে না, সেদিন থেকেই মসজিদের মুয়াজ্জিনের কক্ষে কোন সচল দেয়ালঘড়ি ছিলো না।
নিখুঁত সময়ে এলার্ম বাজা বন্ধ হয়ে গেল।
সেদিন থেকেই বারেক হুজুর আর কোনোদিন নিজের কণ্ঠ চিনতে পারেননি। কেন যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। মসজিদের এক কোণেই তিনি বসবাস করতে লাগলেন। মসজিদে নতুন মুয়াজ্জিন এসেছেন, প্রতিদিন তিনি সময়মত আজান হয়। বারেক হুজুর সেই আজান শোনেন। নিঃস্পৃহ চেহারা নিয়ে আজানের সময় মসজিদের ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার মধ্যে তখন আরেকটা ভাবনা খেলা করে।
এই আজান কি আল্লাহর ডাক, নাকি ক্বদরের প্রতিধ্বনি? তার মাথায় অনেক কথা আসে, বলতে না পারার আক্ষেপে তার দুচোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে।
তাকে কাঁদতে দেখে ইমাম সাহেব একদিন কাছে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
সারাজীবন আল্লাহকে এমন ভয় পেলি যে, তুই নিজের ক্বদর আর ইখতিয়ারের দ্বন্দ্বে পড়ে গেলি, তোর মত শক্ত বিশ্বাস আমার নিজেরও হয়ত হয়নি এখনো। কথাগুলো বলতে বলতে ইমাম সাহেবের গলা কান্নায় বুজে আসে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে তিনি বলেন,
বালা-মান আওফা-বিআহদিহী ওয়াত্তাকা-ফাইন্নাল্লা-হা ইউহিব্বুল মুত্তাকীন।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login

  • robin ahmed 1 month ago

    এক্সিলেন্ট লেখা।

    • Borhan Mahmud 10 minutes ago

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ, ভাই। শুভেচ্ছা জানবেন।

  • probash khobor 1 month ago

    গল্পটি ভালো হয়েছে।

    • Borhan Mahmud 9 minutes ago

      মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ, ভাই। শুভেচ্ছা জানবেন।