Story

শেষ পাণ্ডুলিপি

September 26, 2026

23 views

বৃদ্ধ লোকটির নাম মোরশেদ আলী। বয়স পঁচাত্তর। শহরের পূর্ব প্রান্তে, পুরোনো একটা একতলা বাড়িতে একা থাকেন তিনি। একসময় লিখতেন। তার গল্প ছাপা হতো বিভিন্ন পত্রিকায়, পাঠকেরা চিঠি লিখে জানাতো, তার লেখার প্রশংসা করতো।
এখন অবশ্য সেসব দিন স্রেফ স্মৃতি। তার টেবিলে লেখার খসড়ার স্তুপ হারিয়ে গেছে দুই যুগ আগে। তিনি জামালপুর শহরে এসে বাস করা শুরু করেছেন লেখা ছেড়ে দেয়ার পরপরই। এখন তার টেবিলে পড়ে থাকে শুধু ওষুধের খাম, পুরাতন সংবাদপত্র আর একপাশে ধুলোয় ঢাকা একটা টাইপরাইটার, তার একমাত্র বন্ধু, যদিও টাইপরাইটারের পাশে বসা হয় না বহুদিন।
তিনি লেখা ছেড়ে দেয়ার পর কেউ তাকে কোনদিন জিজ্ঞেসও করেনি। এটি নিয়ে মোরশেদ আলী কখনোই কিছু মনে করেননি, যেন তিনি জানতেন এমনটাই স্বাভাবিক। তার লেখা বন্ধ করার কারণও কেউ জানে না। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলো। তাদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছিলেন। বাকীদের সম্পর্কে এখন কিছুই জানেন না।
এখানে তার কাজই হলো সারাদিন জানালার পাশে বসে আকাশ এবং রাস্তা দেখা। মাসে একদিন এক পিয়ন আসে, বিদ্যুৎ বিলের চিঠি নিয়ে আসে সে। সেও কোন কথা জিজ্ঞেস করে না। চুপচাপ বিলের চিঠি দিয়ে চলে যায়। নিঃসংগতারও কোলাহল হয়। সেটিই শোনেন তিনি।
একদিন বিকেলে দরজায় কড়া পড়ল।দরজা খুলতেই দেখলেন এক তরুণী, হাতে নোটবুক, মুখে হাসি। তরুণী তাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো,
আপনিই লেখক মোরশেদ আলী?
হ্যাঁ, কিন্তু এখন সবাই আমাকে শুধু মোরশেদ বলে ডাকে। লেখক শব্দটা অনেক আগেই অবসরে গেছে।তিনি জবাব দিলেন।
আমি রাহেলা, মেয়েটি বলল। স্থানীয় পত্রিকায় কাজ করি। আপনাকে নিয়ে একটা লেখা করতে চাই।বৃদ্ধ একটু হেসে বললেন,
আমাকে নিয়ে? এখনকার পাঠকরা তো মৃত লেখকদেরও পড়ে না, জীবিতদের সম্পর্কে পড়বে কেন?
রাহেলা শান্ত গলায় বলল,
আমি ভুলে যাওয়া মানুষদের নিয়ে লিখি। মনে হয়, তারাই সময়ের সবচেয়ে সত্য সাক্ষী।
বৃদ্ধ একটু থেমে বললেন,
ভালো কথা বললে তুমি। কিন্তু ভুলে যাওয়া মানুষদের নিয়ে লেখা মানে তো সময়ের মাটি খুঁড়ে হাড় তোলা।
রাহেলা মৃদু হেসে বলল,
হয়তো তাই। কিন্তু সেগুলোতে গল্প থাকে, সত্য থাকে, তারাই আসল ইতিহাস।
রাহেলা ঘরে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল। দেয়ালে এক ফ্রেমবন্দী সাদাকালো ছবি, এক তরুণীর মুখ। চুলে আলগা খোঁপা, চোখে অদ্ভুত কোমল হাসি।
রাহেলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
তিনি কে? আপনার স্ত্রী?
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন,
না। আমি কোনোদিন বিয়ে করিনি।
তাহলে?
মোরশেদ চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ছবিটার দিকে। তারপর শান্ত কন্ঠে বললেন,
তার নাম ছিল নায়লা। একজন পাঠিকা। বহু বছর আগে, আমার গল্প পড়ে আমাকে চিঠি লিখেছিল। অদ্ভুত চিঠি, শব্দে যেন নিঃশব্দের গন্ধ ছিল। আমি উত্তর দিইনি। জানি না কেন, হয়তো ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, জবাব না দিলেই আরো চিঠি আসবে। সত্যিই চিঠি লিখতো সে। অনেক চিঠি লিখেছে। কয়েকবছর ধরে লিখেছে। একবার এও লিখেছে, সে আমাকে ঢাকাতে এক অনুষ্ঠানে দেখেছে।
রাহেলা নরম গলায় বলল,
আপনারা কখনো দেখা করেননি?
না। কিন্তু একদিন পোস্ট অফিস থেকে পিয়ন এসে একটা খাম দিয়েছিলো, সে খামে সে তার এ ছবিটা পাঠয়েছিল। এ ছবির সূত্রেই তাকে দেখা। মানুষটিকে দেখিনি। কিন্তু এর পরদিনই এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। পরেরদিন পত্রিকায় সে মেয়ের সে ছবিই ছাপা হয়েছিল, নিচে লেখা ছিল, সড়ক দূর্ঘটনার তরুণীর মৃত্যু। পত্রিকায় সংবাদটি দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। হয়ত সেই হতভম্ব অবস্থা থেকেই আজও বেরোতে পারিনি।
রাহেলা স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি পড়ছে, জানালার কাঁচে জলের ফোঁটা বয়ে যাচ্ছে ধীরে।
বৃদ্ধ বললেন,
তারপরই আমি কেন যেন লেখা বন্ধ করে দিলাম। কারণ হয়ত কিছুই না, কিংবা অনেক কিছু। যাকে না দেখেও চিনেছিলাম তার স্থায়ী অনুপস্থিতিটাই যেন একটা পূর্ণ গল্প হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইলো।
রাহেলা কিছুক্ষণ নীরব রইল কথাটি শুনে। তারপর বলল,
আপনি আবার লিখতে পারেন। এই নায়লাকে নিয়েই লিখুন।
বৃদ্ধ হাসলেন।
না, লিখলে সেটা সত্য থাকবে না, সেটি তখন গল্প হয়ে যাবে। আমরা লেখকেরা যা লিখি, সবই পাঠকের ভাবনায় আমাদের কল্পনা। কিন্তু আমরা সত্যও লিখি। যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, তাকে নিয়ে না লিখেই হয়তো তাকে বাঁচিয়ে রেখেছি।
আপনি কখন বুঝেছেন, আপনি তাকে ভালোবাসেন?
তার মৃত্যুর পর। শান্ত কন্ঠে মোরশেদ বললেন। কথাটা বলেই মোরশেদ দেয়ালে নায়লার ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রাহেলা উঠে দাঁড়াল।
তবুও লিখে ফেলুন একদিন। হয়তো নায়লার জন্য নয়, নিজের জন্য।
বলেই সে চলে গেল।
রাত নামল। বৃষ্টি থেমে গেছে। মোরশেদ টেবিলের পাশে বসলেন। টাইপরাইটারটা মুছে কাগজ ঢুকালেন।
টাইপরাইটারের খট খট শব্দ ঘর ভরিয়ে তুলল, যেন মৃত সময় শ্বাস ফিরে পেয়েছে। লিখতে লিখতে নায়লার ছবির দিকে তাকালেন কয়েকবার। একবার মনে হলো, নায়লার ছবিটা আজ খুব উজ্জ্বল এবং পরিস্কার দেখাচ্ছে।
তিনি লিখলেন,
একজন মানুষ একসময় ভালোবাসত শব্দকে। তারপর বুঝল, শব্দের ভেতর যে মানুষটাকে খুঁজে ফিরেছে, সে কোনো শব্দে নেই।
তারপর খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তারপর লিখলেন,
তুমি লিখেছিলে তুমি একবার আমায় দেখেছিলে। কাছে এসে কথা বলোনি কেন? আমাকে ভয় পেতে, তুমি?
এ বাক্যটি লিখে কেন যেন হাসলেন মোরশেদ। তারপর শেষ লাইন লিখলেন,
শেষ গল্পটা আমি লিখে ফেলেছি। এবার আমি চরিত্র হয়ে যাচ্ছি।
পরদিন দুপুরে রাহেলা আবার এল। দরজা খোলা। ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
মোরশেদ আলী টেবিলের পাশে বসে আছেন, চোখ বন্ধ, মুখে শান্ত হাসি। টাইপরাইটারের ওপর কাগজটাতে অল্প কয়েকটি বাক্য। পাশের দেয়ালে ছবিটার ফ্রেমে সূর্যের আলো এসে পড়েছে।রাহেলা কাগজটা তুলে নিল। তখনই বাতাসে জানালার পর্দা নড়ে উঠল। যেন কেউ নিঃশব্দে বিদায় জানালো। মোরশেদ আলির নিথর দেহটাতে অদ্ভুত একতা প্রশান্তির ছায়া।
সেই সপ্তাহেই পত্রিকায় মোরশেদ সম্পর্কে একটা লেখা ছাপা হলো,
ভুলে যাওয়া লেখক, যিনি নিজের শেষ গল্পে নিজেই এক চরিত্র হয়েছিলেন।

বোরহান মাহমুদ

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • robin ahmed 2 hours ago

    গ্রেট ওয়ার্ক।

  • probash khobor 6 hours ago

    গল্পটা দারুণ হয়েছে৷