শরতের আকাশে মায়ের আগমন
আদিত্য ভৌমিক
তারিখ: ২৬/৯/২০২৬
শরতের আকাশটা যেন সেদিন একটু বেশিই নীল ছিল। সাদা মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছিল আপন মনে। মাঠের ধারে কাশফুল দুলছিল মৃদু বাতাসে। ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস আর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শিউলির গন্ধে প্রকৃতি যেন আপন মনে বলে উঠেছিল, মা আসছেন।
কয়েকদিন ধরেই পাড়ার পূজামণ্ডপে ব্যস্ততা। কোথাও আলপনা আঁকা হচ্ছে, কোথাও ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে মণ্ডপ। রঙিন আলোয় ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে চারপাশের দৃশ্য। সন্ধ্যা নামলেই ঢাকের মৃদু শব্দ আর শঙ্খধ্বনিতে বাতাস ভরে উঠছে।
অবশেষে এল মহাসপ্তমী।
প্রতিমার সামনে ধূপ জ্বলল, প্রদীপ জ্বলে উঠল। শঙ্খের ধ্বনি আর ঢাকের তালে চারপাশ যেন এক মুহূর্তে পবিত্র হয়ে উঠল। দেবীর মুখের শান্ত, মমতাময় দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, কত অপেক্ষার পর আবারও তিনি ফিরে এসেছেন আপন মানুষের মাঝে।
পূজার দিনগুলো যত এগিয়ে যেতে লাগল, ততই বদলে গেল চারপাশ। সন্ধ্যার আলোয় মণ্ডপ হয়ে উঠল আনন্দের মিলনস্থল। পরিচিত আর অপরিচিত মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে মায়ের আরাধনায় মেতে উঠল। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে প্রদীপ, কারও কণ্ঠে প্রার্থনা।
সেই কয়েকটি দিনে যেন ভুলে যাওয়া হলো সব অভিমান, দূরত্ব আর ব্যস্ততা।
মায়ের আগমনে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, পৃথিবীটা আবারও একটু সুন্দর হয়ে উঠেছে।
কিন্তু উৎসব তো চিরদিন থাকে না।
বিজয়ার দিন এসে গেল।
ঢাকের তালে তালে বিদায়ের সুর বাজতে লাগল। প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে সবার চোখে তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা। যে মাকে ঘিরে এত আনন্দ, এত আয়োজন, এত ভালোবাসা, তাঁকেই আবার বিদায় দিতে হবে।
নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের সময় আকাশটা যেন নীরব হয়ে গেল।
মনে হলো, মা চলে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আশীর্বাদ রেখে যাচ্ছেন মানুষের হৃদয়ে।
শরতের কাশফুল আবার দুলবে, শিউলি আবার ঝরবে, আকাশে আবার সাদা মেঘ ভাসবে। সময়ের স্রোতে আরও একটি পূজা স্মৃতির পাতায় চলে যাবে।
তবু অপেক্ষা থেকে যাবে।
আবার শরৎ আসবে।
আবার শিউলির গন্ধে ভরে উঠবে ভোর।
আবার ঢাক বাজবে, শঙ্খধ্বনি উঠবে, প্রদীপ জ্বলবে।
আর সবাই মিলে আবার বলবে,
“মা, এসো।
আবার এসো।
ভালোবাসা, শান্তি আর আশীর্বাদ নিয়ে প্রতি শরতে ফিরে এসো।”