প্রাইজট্যাগহীন আকাশ
শহরের সবচেয়ে দামি বাণিজ্যিক এলাকার এক কাঁচঘেরা কফিশপে বসে আমি তখন স্কোয়ার-ফুটের হিসাব কষছিলাম। সদ্য কেনা একটা অ্যাপার্টমেন্টের দলিল আমার সামনের টেবিলে রাখা। বারোশো বর্গফুটের এই শূন্যস্থানটুকুর জন্য আমাকে আগামী কুড়ি বছর প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের ঋণ শোধ করতে হবে। আমার ডানপাশের বড় জানালা দিয়ে তাকালে উল্টোদিকের এক বিশাল শপিং মলের দেওয়ালে ঝুলন্ত বিলবোর্ড চোখে পড়ে। সেখানে ঘড়ি থেকে শুরু করে হাসি, পারফিউম থেকে শুরু করে নিঃশ্বাস—সবকিছুর গায়েই একটা চকচকে বারকোড সেঁটে দেওয়া হয়েছে। আমি কফির কাপে চুমুক দিই আর ভাবি, এই পৃথিবীতে আমাদের টিকে থাকার প্রতিটি মুহূর্ত আসলে একটা চলমান লেনদেন।
যখন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট আমাকে ওই ফ্ল্যাটটা দেখাচ্ছিল, সে খুব গর্ব করে বলেছিল, “স্যার, এটা স্কাই-ফেসিং। আকাশ দেখার জন্য আপনাকে এক্সট্রা প্রিমিয়াম দিতে হবে।” আমি সেদিন অতিরিক্ত টাকা দিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু আজ ওই দলিলের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারছি, আমি কেবল জানালার কাঁচের দাম দিয়েছি, চোখের কোণের একটা নির্দিষ্ট ভিউয়ের দাম দিয়েছি—আকাশের নয়।
হঠাৎ কাঁচের দেয়ালের ওপারে, বিলবোর্ডের ঠিক মাথার ওপর দিয়ে আমার চোখ চলে যায় ওপরে। আজ বিকেলের আকাশটা কেমন যেন অচেনা রকমের বিশাল আর উদাসীন। একটা গাঢ় ছাইরঙা মেঘ খুব ধীরগতিতে ভেসে যাচ্ছে পশ্চিম দিকে। আমি অভ্যাসবশত একবার ভাবার চেষ্টা করি, এই মেঘটার মালিকানা কার? এই যে অফুরন্ত নীল বিস্তার, যা শহরের সমস্ত আকাশচুম্বী ইমারতকে তুচ্ছ করে দিয়ে ওপর থেকে আমাদের দেখছে, এর বাজারদর কত?
আমরা এমন এক সভ্যতা তৈরি করেছি, যেখানে মানুষের অস্তিত্ব মাপা হয় তার ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে। আমরা মাটিকে প্লটে ভাগ করে বিক্রি করি। নদীর জল বোতলে ভরে তার গায়ে এক্সপায়ারি ডেট আর দাম লিখে দিই। আমরা অন্যের সময় কিনে নিই মজুরির বিনিময়ে, আর নিজেদের আয়ু বিক্রি করে দিই ব্যাংকের কিস্তিতে। এমনকি আমরা যে বাতাসটুকু টানি, তার বিশুদ্ধতার জন্যও এখন আমাদের এয়ার-পিউরিফায়ার কিনতে হয়। কিন্তু ওই যে মাথার ওপর একটা আস্ত আকাশ প্রতিদিন নিঃশর্তভাবে বিস্তৃত হয়ে থাকে—ওর গায়ে আমরা আজ পর্যন্ত কোনো প্রাইজট্যাগ ঝোলাতে পারিনি।
আকাশ আমাদের এই কাগুজে অহংকারকে কোনোদিন পাত্তা দেয়নি। ও বড় নির্মম, বড় নীরব। আমি জানি, এই একই আকাশের নিচে আজ রাতে কেউ পেন্টহাউসের সিল্কের বিছানায় ঘুমোবে, আর কেউ ঘুমোবে ফ্লাইওভারের নিচে কংক্রিটের স্ল্যাবে। আমরা আমাদের তৈরি করা পৃথিবীতে ওদের মাঝখানে শত যোজনের অর্থনৈতিক সীমানা টেনে দিয়েছি, কিন্তু আকাশ ওদের দুজনের জন্যই ঠিক সমান দূরত্বে স্থির হয়ে আছে। কোনো বিলিয়নেয়ার আজ পর্যন্ত আকাশের এক টুকরো নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নিতে পারেনি। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কোনো দলিলে আজ পর্যন্ত আকাশের কোনো সীমানা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কত সম্রাট, কত ভূস্বামী, কত বণিক এই পৃথিবীর মালিকানা দাবি করেছে; আকাশ ওপর থেকে কেবল তাদের ধুলোয় মিশে যাওয়া দেখেছে।
আমি দলিলের স্ট্যাম্প-পেপারের দিকে তাকাই। আমার মনে হয়, আমরা আসলে সারা জীবন ধরে কেবল কিছু সাময়িক বন্দোবস্তের দাম চুকিয়ে যাই। আমরা ভাবি আমরা মালিক হচ্ছি, অথচ আমরা কেবল পাহারাদার হচ্ছি মাত্র। আকাশের এই অনন্ত বিস্তারের সামনে আমার ব্যাংক-অ্যাকাউন্টের ডিজিটগুলো হঠাৎ খুব হাস্যকর, খুব ক্ষুদ্র আর অর্থহীন মনে হতে থাকে। একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসে। আমার অহংকার ভেঙে পড়ে ঠিকই, কিন্তু সেই চূর্ণ হওয়ার ভেতরে কোনো অপমান নেই; বরং আছে এক বিশাল মুক্তির স্বাদ। আমার হঠাৎ মনে হয়, যে জিনিসটা আমরা কখনোই কিনতে পারব না, সেটাই আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
আমার কফি জুড়িয়ে গেছে। ওয়েটার এসে বিলের ফোল্ডারটা নিঃশব্দে নামিয়ে রেখে গেল টেবিলের একপাশে। আমি মানিব্যাগ থেকে একটা ক্রেডিট কার্ড বের করে ফোল্ডারের ভেতর ঢুকিয়ে দিই। আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে আমার হিসাব, প্রয়োজন আর দাম-কষাকষির পৃথিবীতে। কিন্তু আমি জানি, কাঁচের দরজার বাইরে পা রাখলেই আমার মাথার ওপর এমন একটা অনন্ত আচ্ছাদন অপেক্ষা করে থাকবে—যাকে ভোগ করার জন্য পৃথিবীর কোনো মুদ্রার প্রয়োজন হয় না। যার নিচে দাঁড়িয়ে একজন সর্বস্বান্ত মানুষও সম্পূর্ণ বিনা খরচে একমুহূর্তের জন্য চোখ বুজে শ্বাস নিতে
পারে।