নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে নিজের মুখ:

September 27, 2026

7 views

চারিত্রিক সনদ সংগ্রহের জন্য স্থানীয় থানার পেছনের অপেক্ষাগারে বসে থাকার সময়টুকু এক অদ্ভুত স্থবিরতা তৈরি করে। চুনকাম খসে পড়া দেওয়াল, মরচে ধরা লোহার বেঞ্চ আর ফিনাইলের তীব্র গন্ধের ভেতর সময় যেন একটা আঠালো রূপ ধারণ করে। আমার ঠিক উল্টোদিকের দেওয়ালে একটা পুরোনো, কাঠের ফ্রেম বাঁধানো নোটিশ বোর্ড। বছরের পর বছর ধরে আঠা দিয়ে লাগানো অসংখ্য সরকারি নির্দেশিকা, বিজ্ঞপ্তির কাগজ, আর রাজনৈতিক পোস্টারের ভারে বোর্ডের মূল কাঠামোটা আর দেখা যায় না। নতুন কাগজগুলো পুরোনো কাগজের ওপর এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেন একটার পর একটা চামড়া গজিয়েছে দেওয়ালটার গায়ে। ওপরের দিকের একটা পুরোনো পোস্টারের একপাশ আঠা শুকিয়ে আলগা হয়ে ঝুলে ছিল। ফ্যানের বাতাসে সেটা ক্রমাগত উড়ছিল বলে আমি বিরক্তি নিয়ে উঠে গিয়ে কাগজটা চেপে বসিয়ে দিতে গেলাম। আর ঠিক তখনই, সেই আলগা হয়ে যাওয়া কাগজের ঠিক নিচে ঢাকা পড়ে থাকা একটা হলদেটে, জীর্ণ পৃষ্ঠার ওপর আমার চোখ আটকে গেল।

কাগজটার ওপর গাঢ় কালো, একটু ছড়িয়ে যাওয়া কালিতে লেখা: ‘নিখোঁজ সংবাদ’।

তার ঠিক নিচে একটা সাদাকালো ছবি। আমি প্রথম কয়েক সেকেন্ড ছবিটার দিকে সম্পূর্ণ ভাবলেশহীনভাবে তাকিয়ে থাকলাম। মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত কোনো দৃশ্যকে প্রথমে অস্বীকার করতে চায়। আমি ভাবলাম, মানুষের চেহারার সাথে মানুষের চেহারার তো মিল থাকতেই পারে। কিন্তু চোখের কোণের ওই অতি পরিচিত ভাঁজ, থুতনির কাছের সামান্য বাঁকা দাগটা, আর সবচেয়ে বড় কথা—ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে থাকা ওই অসম্ভব উদ্ধত, সরাসরি দৃষ্টিটা পৃথিবীর আর কারও হতে পারে না।

ছবিটা আমার।

আজ থেকে প্রায় বারো বছর আগের আমি। আমার বুকের ভেতর কোনো অতিপ্রাকৃত শিহরণ তৈরি হলো না, কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি এই বিজ্ঞপ্তির পেছনের ইতিহাসটা কী। বাইশ বছর বয়সে, পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া এক দমবন্ধ করা ভবিষ্যতের মানচিত্র মেনে নিতে না পেরে আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। তিনদিন নিখোঁজ ছিলাম। সেই তিনদিন আমার বাবা শহরের সমস্ত দেওয়ালে, স্টেশনে, থানায় এই পোস্টার লাগিয়েছিলেন। চতুর্থ দিন আমি ফিরে এসেছিলাম। তীব্র অপরাধবোধ আর পরিবারের অর্থনৈতিক ধসের বাস্তবতার কাছে আমার সেই বিদ্রোহ ছিল নিতান্তই শিশুসুলভ। আমি ফিরে এসেছিলাম, বাবার কিনে দেওয়া শার্ট গায়ে চড়িয়েছিলাম, আর একটা নিরাপদ, সম্মানজনক জীবনের ছকে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলাম। এই পুরোনো থানাভবনের নোটিশ বোর্ডে হয়তো সেই বারো বছর আগের পোস্টারটাই কোনোভাবে অন্য পোস্টারের নিচে চাপা পড়ে অবিকৃত থেকে গেছে।

কিন্তু আজ, বারো বছর পর, এই অত্যন্ত বাস্তব, স্পর্শযোগ্য কাগজটার সামনে দাঁড়িয়ে আমার ভেতরে এক তীব্র, হিমশীতল শূন্যতাবোধ তৈরি হলো না, বরং এক ধরনের দার্শনিক বিভ্রান্তি আমাকে গ্রাস করল। আমি নিজের দুই হাত নেড়ে দেখলাম। আমার পরনে নিখুঁত ইস্ত্রি করা দামি পোশাক, হাতের কবজিতে চামড়ার বেল্টের ঘড়ি। আমি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে অফিসে যাই, উর্ধ্বতনদের সাথে অত্যন্ত পরিশীলিত ভাষায় কথা বলি, মাসের শেষে পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব নির্ভুল অঙ্কে পালন করি। সমাজ আমাকে চেনে একজন দায়িত্বশীল, সফল এবং নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবে। আমি তো হারিয়ে যাইনি। আমি তো পুরোপুরি উপস্থিত।

তাহলে এই ছবিটার দিকে তাকিয়ে আমার কেন মনে হচ্ছে, যে ছেলেটা আজ থেকে বারো বছর আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, সে আসলে আর কোনোদিনই ফিরে আসেনি?

আমি ছবিটার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছবির ছেলেটার চুল উসকোখুসকো, শার্টের কলারটা অবিন্যস্ত। কিন্তু ওর চোখের ভেতরে এমন একটা কিছু আছে, যা আমার বর্তমান চেহারায় আর অবশিষ্ট নেই। ওই চোখে একটা জেদ ছিল, একটা প্রশ্ন করার সাহস ছিল, আর ছিল পৃথিবীর সমস্ত আরোপিত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এক বন্য স্পর্ধা। আমি খুব সন্তর্পণে আমার বর্তমান মুখের ওপর হাত বোলালাম। আমার বর্তমান মুখমণ্ডল অত্যন্ত মসৃণ, শান্ত এবং নিরাপদ। এই মুখে আমি গত এক দশকে তিল তিল করে একটা নিখুঁত মুখোশ তৈরি করেছি। কখন হাসতে হবে, কখন বিনয়ের সাথে মাথা নাড়তে হবে, আর ঠিক কোন কথাটা বললে মানুষ সন্তুষ্ট হবে—সেই জ্যামিতি আমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।

আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, আমার সেই ফেরাটা ছিল কেবল একটা শারীরিক প্রত্যাবর্তন। ছেলেটা যখন ফিরে এসে তার নিজের স্বপ্নগুলোকে গলা টিপে হত্যা করে একটা আটপৌরে, নিরাপদ চাকরির ফর্মে সই করেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সে আসলে চিরকালের মতো নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।

পরিচয় মুছে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা কখনো একদিনে ঘটে না। এটা একটা দীর্ঘ, ধারাবাহিক আপসের গল্প। প্রথম যেদিন আমি অফিসের একটা অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়েও নিজেকে আটকে নিয়েছিলাম, সেদিন ওই ছবির ছেলেটার একটা অংশ মরে গিয়েছিল। যেদিন আমি নিজের সবচেয়ে প্রিয় শখটাকে ‘অবাস্তব’ বলে বাতিল করে দিয়ে ছুটির দিনেও ল্যাপটপ খুলে বসেছিলাম, সেদিন আরেকটা অংশ মুছে গিয়েছিল। আমি প্রতিটি পদোন্নতির সাথে সাথে, প্রতিটি সামাজিক স্বীকৃতির সাথে সাথে আমার ভেতরের সেই আদিম, অকৃত্রিম মানুষটিকে একটু একটু করে নির্বাসনে পাঠিয়েছি।

সবচেয়ে ভয়াবহ সত্যটা হলো—এই নিখোঁজ হওয়ার পেছনে সমাজের যতটা দায়, তার চেয়ে অনেক বেশি দায় আমার নিজের। আমি তো কোনো অসহায় শিকার ছিলাম না। আমি খুব সচেতনভাবেই এই নতুন পরিচয়টা বেছে নিয়েছিলাম। কারণ আমি দেখেছিলাম, অকৃত্রিম হওয়ার চেয়ে গ্রহণযোগ্য হওয়াটা অনেক বেশি লাভজনক। ছবির ওই ছেলেটার স্পর্ধার কোনো সামাজিক উপযোগিতা ছিল না। তার রাগ, তার স্বপ্ন, তার অবিন্যস্ত জীবনযাপন দিয়ে বাজারের কোনো চাহিদা মেটানো যেত না। তার কোনো ব্যবহারিক মাপকাঠি ছিল না। তাই সে যখন হারিয়ে গেল, সমাজ তাকে খুঁজতেও যায়নি। বরং সমাজ অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিল, কারণ ওই অগোছালো, অপ্রয়োজনীয় ছেলেটার জায়গায় তারা পেয়েছিল আমার মতো একজন সুশৃঙ্খল, উৎপাদনশীল যন্ত্র।

আমরা এমন একটা কাঠামোর ভেতরে বাস করি, যা আমাদের শিখিয়ে দেয় যে মানুষের নিজস্বতার কোনো আলাদা দাম নেই, যদি না সেটাকে কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক লেনদেনে ব্যবহার করা যায়। আমি আমার নিজস্বতাকে বিক্রি করে দিয়ে কিনে নিয়েছিলাম নিরাপত্তা আর সম্মান। আজ আমি এমন একজন মানুষ, যাকে সবাই চেনে, যাকে সবাই সম্মান করে, কিন্তু আমি নিজেই আর নিজেকে চিনতে পারি না। আমার বর্তমান অস্তিত্বটা আসলে একটা অত্যন্ত সফল অভিনয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

আমি নোটিশটার ওপর লেখা নামটার দিকে তাকালাম। আমারই নাম। কিন্তু এই নামটা এখন আমার কাছে একটা অপরিচিত মানুষের নাম বলে মনে হলো। যে মানুষটার জন্য এই বিজ্ঞপ্তিটা দেওয়া হয়েছিল, সে এখন কোথায়? সে কি আমারই চামড়ার নিচে কোথাও একটা বদ্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি হয়ে আছে? নাকি সে বহু আগেই দম বন্ধ হয়ে মারা গেছে, আর আমি কেবল তার মৃতদেহটা বহন করে চলেছি একটা চলমান কফিন হয়ে?

চারপাশের পৃথিবী কতটা অদ্ভুত! তারা একটা মানুষকে খুঁজছে, অথচ সেই মানুষটা তাদের চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে একটা ভিন্ন মোড়কে। তারা আমার বর্তমান রূপটাকে দেখে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, আমার ভেতরের নিখোঁজ মানুষটার জন্য তাদের আর কোনো শোক নেই। এমনকি আমার নিজেরও কি শোক করার কোনো অধিকার আছে? যে খুনি নিজেই নিজের সত্তাকে খুন করে লাশ গুম করে ফেলেছে, সে তো আর নিখোঁজ ডায়েরি করতে পারে না।

আমি নোটিশ বোর্ডটার সামনে থেকে এক পা পিছিয়ে এলাম। হলদেটে কাগজটার ওপর ছাপা হওয়া ছবিটা যেন আমাকে তীব্র উপহাস করছিল। ওই স্থির চোখদুটো যেন আমাকে বলছিল, "তুমি তো বেঁচে গেছ। তুমি তো একটা চমৎকার ছাদ পেয়েছ, পরিচিতি পেয়েছ। কিন্তু আমি? আমাকে যে তুমি এই পুরোনো দেওয়ালে চিরকালের জন্য আটকে রেখে গেলে, এর বিচার কে করবে?"

আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত, শীতল নৈর্ব্যক্তিকতা কাজ করতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারলাম, আমি চাইলেও আর ওই ছেলেটাকে ফিরিয়ে আনতে পারব না। ওই অকৃত্রিম, বন্য সত্তাটাকে ধারণ করার মতো কোনো জায়গা আমার এই পরিপাটি, গোছানো জীবনে আর অবশিষ্ট নেই। আমি একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে এমনভাবে ঢালাই করে ফেলেছি যে, এখন পুরোনো আকারে ফিরে যেতে চাইলে আমাকে সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে হবে। আর সেই ভেঙে পড়ার মতো সাহস আমার এই মধ্যবিত্ত, নিরাপদ স্নায়ুমণ্ডলীতে আর নেই।

থানার ভেতরের দিক থেকে একজন পুলিশ অফিসার ভারী গলায় ডাকলেন, "রজত রায়! চারিত্রিক সনদের জন্য কে আছেন? ভেতরে আসুন।"

নামটা আমার। আমার বর্তমান, আইনি এবং সামাজিক নাম। যে নামের পেছনে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো বিদ্রোহ নেই, কেবল একটা শান্ত, অনুগত নাগরিকের পরিচিতি আছে।

আমি আর একবার, শেষবারের মতো সেই পুরোনো, আধো-ছেঁড়া বিজ্ঞপ্তিটার দিকে তাকালাম। আমি কাগজটাকে আর আগের মতো ঢেকে দিলাম না। ওটা ওভাবেই উন্মুক্ত থাকল দেওয়ালের গায়ে। আমি আমার দামি জুতো জোড়ার শব্দ তুলে অফিসারের ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। আমার সম্পূর্ণ শারীরিক এবং সামাজিক অস্তিত্ব নিয়ে আমি পৃথিবীর ডাকে সাড়া দিতে এগিয়ে গেলাম, আর আমার আসল মানুষটা সেই বিবর্ণ কাগজের বুকে চিরকালের মতো নিখোঁজ হয়েই থেকে গেল। কেউ জানল না, প্রতিদিন হাজার মানুষের ভিড়ে যে মানুষটা সবচেয়ে বেশি উপস্থিত, সে আসলে তার নিজের কাছ থেকেই সবচেয়ে

বেশি হারিয়ে গেছে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login