বাতিল মুদ্রার আত্মলিপি
মার্বেলের মসৃণ কাউন্টারে একটি তর্জনী নিঃশব্দে তাকে ঠেলে দিল অন্যদিকে।
স্বীকৃত, চকচকে স্বজনদের স্তূপ থেকে আলাদা হয়ে সে পড়ে রইল কাচের এক শীতল কোণে।
তার ধাতব শরীরে তখনও লেগে আছে পূর্ববর্তী আঙুলের ঘাম,
তার নিজস্ব ওজন বিন্দুমাত্র কমেনি,
তার পরিধি আজও নিখুঁত গোলাকার।
কেবল যে যান্ত্রিক ড্রয়ারটি বাকিদের গিলে নিল সশব্দে, তা তার জন্য আর খুলল না।
অমসৃণ হয়ে আসা কিনারাগুলো আর ক্ষয়িত খোদাইয়ের ভাঁজে জমে থাকা কালচে ছোপ—এরাই তার যাপিত অস্তিত্বের নীরব অক্ষর।
কত শত হাতের ঘর্ষণ, পকেটের অন্ধকার, আর রুক্ষ তালুর উত্তাপ পার হয়ে যে আজ এখানে নিস্তব্ধ, তার গায়ে আঁচড়ের দাগগুলো আসলে এক একটি স্তব্ধ বাক্য।
সে কোনোদিন মুখ খোলেনি, অথচ তার ক্ষয়ে যাওয়া পৃষ্ঠতলে খোদাই হয়ে গেছে একটি পুরো সভ্যতার বদলে যাওয়ার ইতিহাস।
একসময় সে ছিল চলমান।
কোনো এক ক্লান্ত শ্রমিকের ঘর্মাক্ত মুঠি থেকে সে হয়তো নেমে এসেছিল শিশুর নরম তালুতে।
অসংখ্য হাতবদল, অসংখ্য স্পর্শের স্মৃতি।
ধাতুর ভেতরেও যে একটি স্পন্দন তৈরি হয় দীর্ঘদিনের উত্তাপে, তা সে জেনেছিল।
অথচ আজ, এই নিস্তব্ধতায়, তাকে প্রত্যাখ্যান করা হলো কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই।
কেউ তাকে ছুড়ে ফেলল না,
কেউ উপহাস করল না।
কেবল একটি নিঃশব্দ আঙুল বুঝিয়ে দিল, সে এখন বর্তমানের ব্যাকরণে এক অচল শব্দ।
তার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু উপযোগিতা নেই।
ভবিষ্যৎ তার দিকে তাকিয়ে আর কোনো সম্ভাবনা দেখতে পায় না।
তুমি কি কখনো নিজের দিকে তাকিয়ে এই ধাতব শীতলতা অনুভব করেছ?
যখন তোমার অস্তিত্বের সমস্ত প্রমাণ অটুট থাকে—
তোমার স্মৃতি, তোমার ক্ষত, তোমার অর্জিত দাগগুলো—
অথচ চারপাশের দ্রুত বদলাতে থাকা পৃথিবী তোমাকে তার হিসাবের খাতা থেকে নীরবে বাদ দিয়ে দেয়।
আমি এই ক্ষয়ে যাওয়া, প্রত্যাখ্যাত অবয়বের দিকে তাকাই, আর বুঝতে পারি না, এই নীরবতা কার।
বাতিল হয়ে যাওয়া মানেই কি হারিয়ে যাওয়া?
নাকি যার আর কোনো স্বীকৃতি নেই, সে-ই আসলে অর্জন করে সবচেয়ে ভারী ইতিহাস?
মূল্য নেই-এর প্রচ্ছদে ফুটে ওঠা সেই নিঃশব্দ অবয়বের মতোই, এই ধাতব বৃত্তটি
এখন কেবল এক স্থির দর্পণ।