রাষ্ট্র যদি রক্তমাংসের অনুভূতিসম্পন্ন সংবেদনশীল জীব হতো এতক্ষণে তার হৃদয় ফেটে চৌচির হয়ে যেত। ধরণীকে দ্বিধা হও বলে মাটির ভিতর সেঁধিয়ে যাওয়ার কথা তার। আফসোস -রাষ্ট্রের কোনো অনুভূতি নাই। সে বরাবরের মতো নীরব নিস্তব্ধ নির্বিকার।
গতকালের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি মেইনস্ট্রিম মিডিয়া এবং ফেসবুক বোদ্ধাদের টাইমলাইনে জায়গা পেল না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থানার আন্দিদিল গ্রামের ঘটনা। এর আগে মাগুরার শ্রীপুরে ৮ বছরের শিশু আছিয়ার ওপর স্বজনদের মানবতাবিরোধী নিপীড়ন দেখেছি। বিচারের বাণীর নিভৃত কান্না এখনো থামতে দেখিনি।
এবার স্বজনের উদগ্র লালসার শিকার হলো আন্দিদিলের মাত্র ৬ বছরের শিশু মাহিদা। দুঃসম্পর্কের চাচা কুলাঙ্গার জাহিদুল পানি খাওয়ানোর কথা বলে শিশুটির জীবন-সম্ভ্রম সব এক নিমিষেই নিঃশেষ করে দিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্থানীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিবেশিত খবরগুলোতে চোখ রাখা যায় না। মানুষ এতটা পাষণ্ড, নির্মম, অবিবেচক, অসংবেদনশীল হয় কী করে? মাদকাসক্ত অপরাধপ্রবণ তরুণ সমাজ -নিজের পরিণতির কথাও ভাবছে না। আনস্মার্ট ফোনে হরর ভিডিও দেখে যা শিখছে -ইয়াবা গিলে নেশাসক্ত হয়ে ঠিক তাই পরিবার ও সমাজে উগ্রে দিচ্ছে।
মাদ্রাসার নাজেরা বিভাগের শিক্ষার্থী মাহিদা চাচার চাহিদামাফিক পানি এনে দিয়েছিল। এর পরিণামে হারামখোর চাচা পৃথিবীর সমস্ত সভ্যতা, ভব্যতা, মানবীয় সম্পর্ক, শ্রেয়বোধ, বিবেক, মানুষ হিসেবে দায়বদ্ধতা এবং দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শিশু মেয়েটির সাথে যা করেছে -তা ভাষায় অবর্ণনীয়। কোমল হৃদয়ের মানুষ নিতে পারবেন না। দুনিয়াকে বলবেন -আমাকে বিদায় দাও, এই মুখ আর কাউকে দেখাতে চাই না। একবার ভাবুন তো জীবনের শেষ সময়টুকুতে ছোট্ট শিশুটি কী নিদারুণ কষ্ট-যন্ত্রণা সয়ে গেল। ওই কন্যার জায়গায় নিজের সন্তানের মুখটি মিলিয়ে দেখুন। আপনি হাউমাউ করে কাঁদবেন। সেই কান্না কোনোদিন থামবে না। মাহিদার মা কী করে সইছেন পাহাড়ের চেয়ে অনেক বড় এই বেদনা?
প্রাণঘাতী ভাইরাসেরও অধম এই সন্তানের মা-বাবা সমাজে কেমনে মুখ দেখাবেন? কাকে তারা পৃথিবীতে নিয়ে আসছেন? মানুষ হয়ে উঠবার ন্যূনতম পাঠ তারা কেন নিজের সন্তানকে দিতে পারলেন না?
মেয়েটির মা ও স্বজনরা জানাচ্ছেন, মেয়েটির গাল কামড়ে নিয়েছে ওই হায়েনা। দুই বুকের মাংস খাবলে খেয়েছে। যৌনাঙ্গের ওপর নরক নামিয়ে দিয়েও খান্ত হয়নি। তারপর কলাটিপে বালিশচাপা দিয়ে কন্যাটিকে পৃথিবী ছাড়া করেছে।
কেন এমনটা করছে এইদেশের আবাল বৃদ্ধ বণিতারা? এদের মনস্তত্ত্ব কে গিলে খেয়েছে? স্কুলের পাঠ কিংবা ধর্মীয় বয়ান এদের কী শেখাচ্ছে?
ওই এলাকার এক মাঝবয়সী স্বজন এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি যেসব নেতা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের ওপর সবটুকু খেদ ঢেলে দিয়ে বলছেন, ১৮ বছর বয়সের ওই যুবকটির একলা দায় না। দোষ এই সমাজের সবার, দোষ আমাদের, দোষ সেইসব নেতাদের যারা যুবশ্রেণির মধ্যে মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। এরপর স্বজনটি তুলে ধরেন চরম বাস্তবতা। আমাদের কাছে ছেলেটিকে দেন -ওর বিচার আমরাই করব। তাও একটা মানুষ প্রাপ্য শাস্তি পাক -অপরাধীরা বুঝুক। পুলিশের কাছে দিয়া কী হবে? দুইদিন পর জামিন নিয়া বাইরে এসে একই অপরাধ পুনর্বার করবে।
লোকটির কথা তো অসত্য নয়। নারী অথবা ছেলেশিশু নিপীড়নের কয়টা বিচার হতে আপনারা দেখেছেন। অথচ অপরাধ বেড়ে চলেছে জ্যামিতিক হারে।
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি–মে) দেশে ২৫০ জন নারী ও কন্যাশিশু এককভাবে ধর্ষণের শিকার এবং ৬৫ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে। এছাড়া ১৮ জন ধর্ষণের পর হত্যা এবং ৫৩ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হন। কেবল আগস্ট মাসেই ৫৪ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৬ জনই কন্যাশিশু।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সামাজিক লজ্জা, ভয় ও নানা কারণে অনেক ঘটনার তথ্য গণমাধ্যম বা আইনি পর্যন্ত পৌঁছায় না, ফলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষকরে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলেশিশু ধর্ষণের বিষয়গুলো কোনোপক্ষই বাইরে প্রকাশ হতে দিতে চান না।
আন্দিদিলের ওই মেয়েটির মা বলছিল, অপরাধীকে আমার কাছে দেন -যেই চোখ দিয়ে আমার মেয়েকে দেখছে ওই চোখ উপ্রে ফেলতে চাই। যেই দাঁত আমার মেয়েকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে ওই বিষদাঁত ভেঙে ফেলতে চাই।
বেশ কয়েকটি ভিডিও দেখলাম যেই ঘরটিতে ওই বদমাশটা মানবতাকে কলঙ্কিত করেছে -স্থানীয়রা ওই ঘরের দিকে পাথর ছুঁড়ে মারছে। তারা অপরাধীর বিচার নিজ হাতে করতে চাইছে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিজেদের কব্জায় নিয়েছে। সংক্ষুব্ধ এই গণমানুষকে আপনি দোষ দেবেন কোন মুখে?
আমারও কন্যা সন্তান আছে। এইদেশে তাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বসবাস নিয়ে ভীষণভাবে শঙ্কিত আমরা। কন্যাদেরকে প্রতিটি মিনিটে তো নজরদারি করতে পারি না। সকল মায়ের কাছে অনুরোধ -প্লিজ আপনার অবুঝ সন্তানকে চোখহারা করবেন না। ছেলে হোক কিংবা মেয়ে -হোস্টেলে রেখে পড়তে দেবেন না। এমনকি বাবার সাথেও কন্যাশিশুকে একা ছাড়বেন না। এই সমাজ এখন হায়েনার কাছে বর্গা চলে গেছে। মনে রাখবেন আপনার সন্তানের প্রতি হামলে পড়বার জন্য চারিধারে ওঁৎ পেতে আছে শয়তানের সহচরেরা। এদের মগজ এখন পুরোদস্তুর ইয়াবার বশ।
হে মা'বুদ! আমি হাজার কষ্ট পাই -আমার কোমলমতি সন্তান কেন পৃথিবীতেই এমনতর নরকযন্ত্রণা ভোগ করবে। তুমি তলিয়ে যাওয়া আমার দেশকে রক্ষা কর প্রভু। তুমি এখানকার সর্বমানুষের সুমতি ফেরাও দয়াল।
হে রাষ্ট্র -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলির এই ভার্সটি শুনতে কি পাও তুমি:
‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,/ অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!/...দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়িয়েছে দ্বারে/ অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে।’
লেখক: সাংবাদিক
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬