Article

ব্রোথেল, দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং গুজবের গজব

October 13, 2026

112 views

বৈশ্বিক ইতিহাস এবং নিজের পরগণার খবর না রেখেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরের কথিত ব্রোথেল নিয়ে খুব কথা হচ্ছে। যদিও তথ্যটির দালিলিক ভিত্তি নাই -তবু সব দায় বহন করতে হচ্ছে রবিঠাকুরকে। যদিও এর সাথে রবিঠাকুরের দূরতম সম্পর্কও নাই।

ব্রোথেল ও পানশালা কোনো নির্দিষ্ট আধুনিক সমাজের আবিষ্কার নয়। এদের শিকড় প্রাচীন নগরসভ্যতায়। ব্রোথেল (Brothel) বা সংগঠিত যৌনসেবাকেন্দ্র এবং মদের বার (Bar) -দুটির ইতিহাসই প্রাচীন নগরসভ্যতা, বাণিজ্য, মানুষের সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। তবে যৌনসেবা ও মদ্যপানের ইতিহাস আরও প্রাচীন; আধুনিক অর্থে ‘ব্রোথেল’ ও ‘বার’ প্রতিষ্ঠান দুটি ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, গ্রিস ও রোমে অর্থের বিনিময়ে যৌনসেবার নানা রূপের প্রমাণ পাওয়া যায়। ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন শহরে যৌনসেবার স্থান কখনো নিয়ন্ত্রিত, কখনো নিষিদ্ধ ছিল। বাণিজ্যিক নগরায়ণ, সৈন্যদের চলাচল, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের বিস্তারের সঙ্গে অনেক স্থানে যৌনসেবাকেন্দ্রের বিকাশ ঘটে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে কলকাতা ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য শহরে যৌনকর্মকে ঘিরে পুলিশি নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতার বিতর্ক গড়ে ওঠে।

মেসোপটেমিয়ায় বিয়ার তৈরি, বিক্রি ও পান করার প্রমাণ বহু প্রাচীন। পানশালা ছিল খাদ্য, পানীয়, সামাজিকতা ও অর্থনৈতিক জীবনের অংশ।

ইসলামের আবির্ভাবের আগের আরবে দাসপ্রথা, বাণিজ্যিক যৌনসম্পর্ক এবং যৌনসেবার বিভিন্ন রূপের উল্লেখ ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক সূত্রে পাওয়া যায়।

সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামি শাসন বিস্তারের পরও যৌনবাণিজ্য ও দাসপ্রথার ইতিহাস একেবারে বিলীন হয়ে যায়নি। পবিত্র কুরআনে দাসীদের জোর করে যৌনবৃত্তিতে নিয়োজিত করার বিরোধিতা করা হয়েছে; কিন্তু ঐতিহাসিক সূত্রে প্রাথমিক ইসলামি সমাজে দাসত্বে আবদ্ধ নারীদের যৌনশোষণের বিবরণও রয়েছে।

বাংলাদেশে The Suppression of Immoral Traffic Act, 1933-এর ৪ ধারা অনুযায়ী পতিতালয় পরিচালনা বা পরিচালনায় সহায়তার বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে। ৬ ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পতিতালয় হিসেবে ব্যবহৃত স্থান বন্ধের ব্যবস্থাও রয়েছে। তারপরও বাংলাদেশে এখনো সংখ্যায় অল্প ব্রোথেল রয়েছে।

২০২৪ সালের ২৩ মার্চ দ্য ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদনে একটি বেসরকারি সংস্থার উপস্থাপনার বরাতে বলা হয়, দেশের ১০টি পতিতালয়ে প্রায় ৩,৬৪১ জন যৌনকর্মী কাজ করেন।

সরকারের পরিকল্পনা বিভাগের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা–সংক্রান্ত নথিতে ২০১৮ সালের একটি জরিপের বরাতে আটটি জেলার ১১টি পতিতালয়ে ৩,৭২১ জন নারী যৌনকর্মীর তথ্য দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া সারা বাংলাদেশে যতগুলো হোটেল রেস্টুরেন্ট রয়েছে সেগুলোর অনেকেরই প্রধানতম অলিখিত ব্যবসা পতিতাবৃত্তি।

এবার আসি পানশালা প্রসঙ্গে।

বাংলাদেশের কতগুলো মদের বার লাইসেন্স দেয়া আছে?

বাংলাদেশে সরকারিভাবে ২৪৩টি মদের বারের লাইসেন্স দেওয়া আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (DNC) প্রকাশিত ২০২৫ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই সংখ্যা পাওয়া যায়। এরমধ্যে হোটেলবার ১২৭, রেস্টুরেন্ট বার ৬৪, ক্লাববার ৪৮ এবং রিজোর্টবার ৪টি।

পতিতালয় থেকে সরাসরি বিশেষ কোনো কর আদায়ের হিসাব না থাকলেও, যৌনকর্মীদের ব্যাংকিং লেনদেন ও কেনাকাটার মাধ্যমে সরকার পরোক্ষভাবে রাজস্ব পায়। মদের বারগুলো থেকে সরকার সরাসরি ট্যাক্স নেয়। অলিখিত হোটেল পতিতালয় থেকে পরোক্ষভাবে সরকার নিবন্ধন ফি গ্রহণ করে থাকে।

রাষ্ট্রীয় মদ কারখানা কেরু অ্যান্ড কোম্পানি চলতি বছর প্রায় আড়াই শ কোটি টাকা সরকারকে ট্যাক্স দিয়েছে।

তাহলে এটা প্রমাণিত হলো যে, আমাদের সরকার ব্রোথেল ও মদেরবার থেকে অর্থ গ্রহণ করে। ওই অর্থ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো মসজিদ-মাদ্রাসায় যায় এবং সেখানকার এমপ্লয়ীদের বেতন-ভাতাও হয়। আপনি যদি নৈতিকতা ও তাকওয়ার প্রশ্ন তোলেন -এক কোটি অন্যায্য অর্থ গ্রহণের যা পাপ এক পয়সা গ্রহণের পাপও তাইই।

তাহলে আপনি নিজের ব্রোথেলের খবর না রেখে কোথাকার কোন প্রাগৈতিহাসিক দ্বারকানাথের পরিবারের একজনের ব্রোথেল নিয়ে কেন পড়ে আছেন?

১৮০৬ সালের কলকাতার জনগণনা-সংক্রান্ত তথ্য উদ্ধৃত করে একটি নিম্নমানের গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দ্বারকানাথ ঠাকুরের পরিবারের এক সদস্যের বউবাজারে ৪৩ কক্ষবিশিষ্ট একটি বেশ্যালয় ছিল। তবে সেটির মালিক স্বয়ং দ্বারকানাথ ছিলেন, কিংবা তাঁর ৪৩টি পতিতালয় ছিল -এমন দাবি ডাহা মিথ্যাচার।

তার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কালগত বিষয় আছে। ১৮০৬ সালে দ্বারকানাথের বয়স ছিল মাত্র ১১–১২ বছর। তাই ওই তথ্যকে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যুক্তিসংগত নয়। পরিবারের কোনো সদস্যের মালিকানা আর দ্বারকানাথের ব্যক্তিগত মালিকানা এক বিষয় নয়।

আপনি রবিঠাকুরের সাহিত্যসাধনার বিশ্বস্বীকৃত অর্জন এবং পূর্বপুরুষের ট্র্যাকের বাইরে এসে জমিদারি পরিচালনার গুড গভর্ন্যান্সকে খাটো করবার কোনো রসদ পাচ্ছেন না -তাই আপনার অবলম্বন রবিঠাকুরের পূর্বপুরুষের কোন এক ব্যক্তির কথিত ব্রোথেল! অথচ এই আধুনিক যুগে এসে ব্রোথেলের চেয়ে বহু বড় পাপে নিজেরাই নিমজ্জিত হয়ে আছেন। ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলেশিশু ধ'র্ষণের চেয়ে জঘন্য পাপ পৃথিবীর তাবৎ ইতিহাসে আর একটাও নাই। নিজেরে আগে শোধরান -দেখবেন পৃথিবী সুন্দর।

▪️

লেখক: সাংবাদিক

১৩ অক্টোবর ২০২৬

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login