Story

থাপ্পড়

September 27, 2026

77 views

১ 
মোজাম্মেল কিছু না বলে ডান গালে হাত বুলালো। চড়টা বেশ জোরেই ছিল। কিছু না বলে চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। এরকম চড় থাপড় খাওয়াটা এখন তার রোজকার ব্যাপার হয়ে গেছে। কিন্তু অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকের ব্যাপারটা অন্যরকম। আজ এক গাদা লোকের সামনে চড়টা খেল। 
কিরে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যাহ্‌, চোখের সামনে থেকে। মাহবুব সাহেব ধমকে উঠলেন। 
মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়, ইচ্ছে করে এ বাড়ি থেকে চলে যাই। আজও সেরকম মনে হচ্ছে। কথায় কথায় চড় থাপড় খেতে আর ভাল লাগে না। 
২ 
এ বাড়িতে এসেছে আট/নয় বছর হয়েছে। গৃহকর্তা মাহবুব সাহেব তাকে সদরঘাটে পেয়েছিলেন। কার না কার সাথে সেখানে এসেছিল, সে নিজেও মনে করতে পারে না। শুধু মনে আছে লঞ্চে করে এসেছিল সে। এ বাড়িতে আসার পর আর কোথাও যাওয়া হয়নি। ফুট ফরমায়েশ খাটার জীবন। তবে সব মিলিয়ে খারাপ থাকেনি এতদিন। মাহবুব সাহেবের মেজাজটা খুব কড়া। এটা ছাড়া আর সব কিছু ঠিক আছে। কাজকর্মে ভুল হয়ে যায়, সেটা সত্যি। আজ অব্দি বিনা কারণে চড় থাপড় খায়নি, এটাও সত্যি। কিন্তু কি করবে? ভুল হয়েই যায়। 
৩
বাজারে গিয়েছিল মোজাম্মেল সকাল বেলাতেই। বাড়ি ফিরতেই দেখে সেখানে এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে কান্নাকাটি। হাতের বাজার মাটিতে ফেলে দৌড়ে ভেতরে গিয়ে দেখে মাহবুব সাহেব অজ্ঞান হয়ে আছে, সাড়া শব্দ নাই। ধরাধরি করে এম্বুলেন্সে নেয়া হলো মাহবুব সাহেবকে। সবাই বলাবলি করছিল, স্ট্রোক না কি যেন করেছে। 
৪
মন খারাপ মোজাম্মেলের। আজ তিনদিন হলো, মাহবুব সাহেবকে বাসায় আনা হয়েছে। চলতে ফিরতে পারছেন না। মোটামুটি পুরো শরীর অবশ, কথাও বলতে পারেন না। কেমন একটা টেনে টেনে কি কি যেন বলেন। কেউ বুঝতে পারে না, কি বলছেন। মোজাম্মেলই মনে হয় শুধু কিছুটা বুঝতে পারছে। বাড়ির সবাই মোজাম্মেলকেই জিজ্ঞেস করছে, উনি এখন কি বললেন। কি মানুষ, কি হয়ে গেল। আহারে দুনিয়া। মোজাম্মেল পাশে বসে চোখ মুছে। 
৫
আজ কোথায় যেন একটা দাওয়াত আছে। বাসার সবাই দাওয়াতে যাচ্ছে। মাহবুব সাহেবের তো যাওয়া হবে না, আর সবাই চলে গেল। সবাই খুব খুব করে উনার দিকে খেয়াল রাখার জন্যে বলে গেল। মোজাম্মেল বিছানার পাশে বসে আছে। মাহবুব সাহেব অ্যাঁ অ্যাঁ করে কি কি যেন বললেন। 
- না খালু। আফনে চিন্তা কইরেন না। ঠিক হইয়া যাইবেন। মোজাম্মেল বলল। 
- অ্যাঁ, অ্যাঁ , মাহবুব সাহেব বললেন। 
- আরে না, আমি নিজের কানে হুনছি, এইসব অসুখ বেশী অইলে তিন/চাইর মাসের মইধ্যে ঠিক হইয়া যায়। মোজাম্মেল বেশ একটা আত্মবিশ্বাসের সুরে বলল। 
- অ্যাঁ, অ্যাঁ। 
- আফনে চিন্তা কইরেন না। আমি আফনেরে ছাইড়া যামুনা। চিন্তা কইরেন না খালু। 
- অ্যাঁ, অ্যাঁ। 
- আমি ঠিক আছি। তয় মাঝে মইদ্যে একটা জিনিস মনে কইরা কান্দন আহে। 
- অ্যাঁ, অ্যাঁ। মাহবুব সাহেব এবার বললেন। 
- খালু, আইজ দুই সপ্তাহ ধইরা আফনে আমারে থাপ্পড় মারেন না। আমি দিন রাইত আল্লারে কই, খালু যেন আমারে আবার থাপ্পড় দেয়। দুনিয়ার সব ঠিক আছে, খালি আমার দুনিয়াটাই কি রকম অইয়া গেল। মোজাম্মেলের চোখ ছলছল করছে। 
- অ্যাঁ, অ্যাঁ। 
- আফনে তাড়াতাড়ি ভালো হইয়া যান খালু। আমারে থাপ্পড় মারতে অইলেও ঠিক হইয়া যান। মোজাম্মেল বলেই মাহবুব সাহেবের দিকে তাকাল। 
- অ্যাঁ, অ্যাঁ। মাহবুব সাহেব কি যেন বললেন। 
- মোজাম্মেল খুব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মাহবুব সাহেবের দিকে। উনি বলেই যাচ্ছেন, 
- অ্যাঁ, অ্যাঁ, অ্যাঁ, অ্যাঁ। মাহবুব সাহেবের দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। 
এ দৃশ্য দেখে মোজাম্মেলও কান্না শুরু করে দিলো।

গল্পটি আমার ছায়া গল্পগ্রন্থ থেকে নিয়েছি।

Picked up where you left off

Comments

mamun abdulla was this story’s first reader

+40 XP

    Please login to post comment. Login

  • mamun abdulla 2 weeks ago First reader

    দারুণ লাগল গল্পটি। ছোট মোজাম্মেলের ওই কথাটা- আমারে থাপ্পড় মারতে অইলেও ঠিক হইয়া যান; দারুণ। ছোট মোজাম্মেলের কণ্ঠে দারুণ আবেগ দেখালেন। ভালো লেগেছে গল্পটি।

  • ছায়া গল্পগ্রন্থে মোট কতটা গল্প আছে? 🤔

  • robin ahmed 3 weeks ago

    মোজাম্মেলের অংশটা দারুণ লিখেছেন। গল্পটা ভালো লেগেছে।

  • probash khobor 3 weeks ago

    ছোট, খুবই ছোট। কিন্তু যেভাবে বাস্তবতাকে এনেছেন, সেটা খুবই রিয়েলিস্টিক হয়েছে। গ্রেট রাইটিং।