বৃষ্টি হবে বোধহয়। আকাশটা কেমন মেঘ করে কালো হয়ে এসেছে। বাতাসটাও ভারী লাগছে। কাছাকাছি কোথাও হয়ত বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কটা বাজে এখন? শার্টের হাতা গুটিয়ে ব্যাগটা কাঁধে ঝুলানোর আগে কব্জিতে বাঁধা ঘড়িটার দিকে তাকালো শফিক একবার। সাড়ে চারটা বেজে গেছে। ঘড়িটার দিকে তাকাতেই মনে পড়ে গেল লতার কথা। এই ঘড়িটা লতা দিয়েছিল। লতার খোঁজেই এখানে এসেছে শফিক। পাশেই একটা হোটেল দেখে সাইনবোর্ডটা পড়ে নিলো, ‘মদিনা হোটেল”, নীচে লেখা আছে লক্ষীপাশা বাস স্ট্যান্ড, লোহাগড়া, নড়াইল। বাংলাদেশে সব বাস স্ট্যান্ডের পাশে যে যে হোটেলগুলো থাকে, সেগুলোর মধ্যে একটা থাকবেই মদিনা হোটেল নামে।
ক্ষুধা লেগেছে খুব। ভাত খেতে হবে। হোটেলে ঢুকেই শফিক বলল, ভাত আর মাছ দেয়ার জন্য।
ভাতের প্রথম লোকমাটা মুখে নিতেই লতার কথা মনে পড়ে গেল। কতদিন লতার সাথে কথায় কথায় ভাত নিয়ে গল্প করেছে। লতা মাঝে মাঝেই জিজ্ঞাসা করতো, প্রেম করতে এসে ভাতের কথা বলো কেন?
শফিক সাদামাটা গলায় জবাব দিতো, সবই তো ভাত নিয়ে। ভাত না থাকলে প্রেম ভালোবাসা কিছুই থাকে না। লতা এ জবাব শুনে কি বুঝতো কে জানে। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কতদিন লতাকে দেখেনা। চোখ ভিজে আসছে তার। ভেজা চোখ নিয়ে ভাত খাবার ঘটনা এটাই প্রথম না। এ ঘটনা তার অনেক ঘটেছে। অন্তত গত চার বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন এ ঘটনা ঘটেছে। আজ তিন দিন হলো, চার বছর জেল খেটে বের হয়েছে। ছাড়া পেয়েই সোজা বাসে উঠে লক্ষীপাশা বাস স্ট্যান্ডে নামলো।
এখান হতেই সব শুরু হয়েছিল।
একটু পরেই লতার সাথে দেখা হবে। কথাটা মনে হতেই তাড়াতাড়ি ভাত খাওয়া শুরু করল শফিক। ভাত খেয়ে বিল দিয়ে হোটেলের সামনে এসেই দেখে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে ছাতা থাকলে ভাল হতো। একটা রিকশা পেলে ভাল হতো। অপেক্ষা করতে লাগলো, যদি এ দিকটায় কোন রিকশা আসে।
হোটেলের দরজায় দাঁড়িয়ে একমনে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে শফিক। পায়ের সামনে হোটেলের টিনের চাল হতে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মাটিতে পড়ে ছিটকে ছিটকে তার পায়ের উপর পড়ছে। একটু পিছিয়ে দাঁড়ালো সে।
চার বছর আগের ভোরবেলাটা এখনো মনে আছে শফিকের। খুব ভোর বেলা, ফজরের আগে আগে সে বেরিয়েছিল বাড়ি হতে। সাথে একটা ছোট ব্যাগ। সেটাতে নিজের অল্প কয়েকটা কাপড় চোপড়। লতা এসে দাঁড়াবে লক্ষীপাশা বাস স্ট্যান্ডে। ওরা দুজনে ঠিক করেছিল, এক সাথে পালিয়ে যাবে। রাস্তায় পুলিশ ওকে থামতে বলে ওর ব্যাগ হাতড়াতে লাগলো, ওর প্যান্টের পকেটগুলো চেক করে একজন বলে উঠলো, স্যার পাইছি। এই যে দেখেন পকেটে কি নিয়ে যাচ্ছে। শফিক তখনো খুব গুরুত্ব দিয়ে তাদের কথা শুনছিল না। ওর মাথায় তখন একটাই চিন্তা; লতা এতক্ষণে এসে গেছে বাস স্ট্যান্ডে। ওর দেরী দেখে এতক্ষণে হয়ত অস্থির হয়ে গেছে। পুলিশগুলো যখন ওকে গাড়িতে তোলার জন্য ধ্বস্তাধ্বস্তি করছিল, তখন সে শুধু বলে যাচ্ছিল, স্যার, আমি তো পকেটে করে কিছুই আনি নাই। এগুলো কি, আমি চিনিও না। একটা পুলিশ তখন ওর কান বরাবর একটা জোরে থাপ্পড় মেরে বলেছিল, ... ... ... বাচ্চা, বেশি কথা বললে তোরে আজ শেষ করে ফেলব।
পুলিশের পিক আপটা লক্ষীপাশা বাস স্ট্যান্ডের সামনে দিয়েই গিয়েছিল। সেই আধো আলোর ভোরবেলা সে স্পষ্ট দেখেছে, লতা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। এক ঝলক ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নামিয়ে ফেলেছিল সে। লতা ওর জন্য অপেক্ষা করছে, এ দৃশ্যটাই চোখে লেগে থাকুক।
একটা রিকশা সামনে এসে বলল, কই যাইবেন?
শফিক খুশী হয়ে গেল। জায়গার নামটা বলেই রিকশায় উঠে বসল। রিকশায় উঠেই একটা অদ্ভুত আশ্চর্য অনুভূতি এসে ভর করলো শফিকের ভেতর। চারটা বছর, চারটা বছর পেরিয়ে গেছে এর মধ্যে। লতা কেমন আছে, কে জানে? কে জানে, কত অভিমান বুকে চেপে আছে ওর ভেতর। কষ্টের কত বড় পাহাড় বয়ে বেড়াচ্ছে লতা! প্রথম দেখাতে কি বলবে ও লতাকে, ভাবছে সে। আচ্ছা, লতা কি জেনেছে পরে, ওকে পুলিশে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং সে জেল খেটেছে! হয়ত জানে না, জানলে তো কোন না কোনদিন নিশ্চয়ই যোগাযোগ করত।
বৃষ্টিতে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। সামনে তিন রাস্তার মোড়টা দেখা যাচ্ছে। এখানেই ওকে পুলিশে ধরেছিল। রিকশাওয়ালার ভালোই কষ্ট হচ্ছে প্যাডেল চাপতে। এই মোড়টা হতেই তার জীবনের পথটা আলাদা হয়ে গিয়েছিল। মোড়টার কাছাকাছি এসেই তাকাল রাস্তার পাশটাতে , যেখানে পুলিশের পিকআপটা দাঁড়িয়েছিল। তিন রাস্তায় মোড়ে আসতেই যেন কয়েকটা মানুষের গলার আওয়াজ কানে এলো, এই, এই এই। সাথে সাথেই কোন গাড়ির জোরে ব্রেক করার শব্দ; কিছু একটা জোরে রিকশাকে ধাক্কা দিল।
ঠিক সে সময় লোহাগড়া থানার কোয়ার্টারে এস আই জাফর চা খাচ্ছিলেন। ওয়ারলেসে একটা মেসেজ আসতেই উঠে দাঁড়ালেন। চা শেষ না করে উঠে দাঁড়াতেই তার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছ এখন? চা টা শেষ করে যাও।
জাফর বললেন, নাহ, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। একটা ট্রাক এক্সিডেন্ট করেছে। রিকশাকে চাপা দিয়েছে। যাত্রীটা স্পট ডেড। রিকশাওয়ালা বাজে রকম ইনজুর্ড। বাঁচে কিনা, কে জানে। আমার দেরী হতে পারে। তুমি ডিনার করে নিয়ো, লতা।
Comments
First reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
Habib Rahman
57 minutes ago
বাহ। চমৎকার গল্প।
-
robin ahmed 8 hours ago
গল্পটা দারুণ লিখেছেন।
-
সমাজের মানুষের ভুলের৷ কারণে শফিকের মতো তরুণদের জীবন মুকুলেই ঝরে যায়।এমন মর্মস্পর্শী গল্প মানুষের চেতনা জাগাতে সাহায্য করবে
-
probash khobor 11 hours ago
এ গল্পটা দারুণ। তবে এন্ডিংটা কেমন যেন সিনেমাটিক হয়ে গেল। আমি মানছি, একটা প্যাথেটিক এন্ডিং এর প্ল্যানেই লিখেছেন। ভালো লেগেছে। @borhan_mahmud