বিভূতিভূষণ, ‘পথের পাঁচালী’, ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের লেখক বিভূতিভূষণ কি আদৌ বাস্তববাদী ধারার লেখক? আমাদের উত্তর হলো হ্যাঁ, কিন্তু শুধু ‘হ্যাঁ’ বললেই তো হবে না, আমাদের দেখাতে হবে বিচার বিশ্লেষণ করে। ‘পথের পাঁচালী’ থেকে শুরু করে ‘অশনি সংকেত’ -এর মাঝে বিভূতিবাবু লিখেছেন অজস্র উপন্যাস-গল্প, লিখেছেন দিনলিপি, চিঠিপত্র। মানের দিকে নিশ্চয়ই সবগুলো সমান নয়। তবে যেসব জায়গাতে বিভূতিবাবুু সবথেকে উজ্জ্বল, ছুঁয়ে গেছেন অন্তরকে সেখানে তিনি নিখাদ বাস্তববাদী।
কিন্তু ‘প্রকৃতির কবি’ -ই যেন হয়ে গেছে তাঁর এক এবং একমাত্র পরিচয়। প্রকৃতির শোভাতে তিনি এমনভাবে ডুবে থাকেন যে যাপিত জীবনের এই কঠোর-কঠিন বাস্তবতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না, এটাই যেন হয়ে গেছে তাঁর সবথেকে বড় পরিচয়।
বিভূতিভূষণ বাস্তববাদী নাকি প্রকৃতির রোমান্টিসিজমে ডুবে থাকা একজন মানুষ কিংবা তিনি আদৌও বাস্তববাদী কিনা সে বিষয়ে আলোচনার পূর্বে আমাদের ‘বাস্তববাদ’ নিয়ে একটু আলাপ করা দরকার।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি ফ্রান্স এ শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে realisme শব্দটি চালু হতে থাকে। মূলত উপন্যাসের-ই নাড়ির যোগ বাস্তববাদের সঙ্গে। বাস্তববাদিতাই তো মূলত রোমান্সের সাথে পার্থক্য গড়ে দিলো উপন্যাসের। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, অতিপ্রাকৃত কিছু থাকবে না মানেই কি প্রকৃতি ব্যাপারটাই উপন্যাস থেকে বাদ পড়ে যাবে? মূলত মানবসমাজ, প্রকৃতি দুই-ই আসবে বাস্তববাদের আওতায়। তবে অকারণ প্রকৃতিবিলাস বাস্তববাদের ক্ষেত্রে অচল।
‘পথের পাঁচালী’-র দিকে তাকালে আমরা দেখি এটা শুধু অপু-দুর্গার গল্প নয়(পথের পাঁচালীর প্রথম খসড়ায় দুর্গা ছিলই না), এই গল্প হরিহরের, ইন্দিরা ঠাকুরণের, তাদের পূর্বপুরুষদের, তাদের পরিবারের, অভাবের, তাদের যাপিত জীবনের। হরিহর রায় এর বংশকথা দিয়েই শুরু উপন্যাসের। দেখতে পাই তার পূর্বপুরুষদের জীবনধারা, পাশা খেলে কাটানো অলস-মন্থর জীবন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত নির্লিপ্তি। এরপরেই আমরা আঁচ পেতে থাকি তৎকালীন বাস্তবতার। হরিহরের জীবন দিয়েই আসে তার পূর্বপুরুষদের যাপিত জীবনে একটা বিরাট ছেদ। নিশ্চিন্দিপুরে আটকে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হলো না, যেখানে তার বাবা নিশ্চিন্ত ছিলেন ‘ধানের মারাই-এ তলা কুড়িয়ে’ও কয়েক পুরুষ চলে যাওয়ার কথা ভেবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়ে গেছে একটা ফাঁপা কল্পনামাত্র। কৈশরের পর থেকেই ওই সহজ পাশা খেলে বেড়ানো জীবন থেকে বঞ্চিত হরিহর। এরপর গিয়েছেন কাশীতে, শ্বশুরবাড়ির লোকের ধারণা সে ফিরেছে বিদ্যের জাহাজ হয়ে। সর্বজয়া তো ভেবেই নিয়েছিলো কেউ এসে একটা বড় চাকরির জন্য নিয়ে যাবে হরিহরকে। কিন্তু পর মূহর্তেই ধাক্কা দেয় জীবনের কঠিন বাস্তবতা, অর্থাভাবেই দিন কাটে হরিহরের। এবং শেষ সময়ে এসে দেখা যায় সারা জীবন ধরে লড়াই করেও তাকে শেকড় তুলে নিতে হয় গ্রাম থেকে। গ্রামের অর্থনীতি বিশ শতকের গোড়ায় এসে তাকে আর বাঁচতে দিল না।
বাঙলার যে অঞ্চলের কথা ‘পথের পাঁচালী'-তে আছে, সেই বারাকপুর গ্রামে বিভূতিভূষণ পেয়েছিলেন প্রায় না পাল্টানো পুরোনো গ্রাম সমাজের মডেল। সাহেবরা এসেছে, কুঠি বসেছে, ইছামতীর দুই তীর জুড়ে বিদ্রোহ হয়েছে। কিন্তু কোন দাগ না রেখেই সব মুছে গেছে কালের সাথে। একমাত্র জরিপ ছাড়া নতুন আমলাতন্ত্রের কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তবু ব্রিটিশ রাজত্বে বন্ধ হয়নি গ্রাম সমাজের ভাঙন, দিন দিন তা হয়েছে আরও প্রকট। অপুরাও গ্রামের পাত্তাড়ি গুটিয়ে, পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে বসবাস শুরু করেছে শহরে। আর অপু যেন বেড়ে উঠতে থাকে বাস্তবতার চাপে পিষ্ট হয়ে হরিহরের না হয়ে উঠতে পারার অংশটার মতো করেই। এভাবেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ দস্যু-জমিদার বীরু রায় থেকে উঠতি লেখক অপূর্বকুমার রায় পর্যন্ত কয়েক পুরুষের জীবন ও সমাজ পরিবর্তনের যে চালচিত্র তাই পাওয়া যায় ‘পথের পাঁচালী’, ‘ অপরাজিত’ -তে। প্রতিটা পুরুষ ধরে কীভাবে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে সমাজবাস্তবতা তা খুব স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে।
এই উপন্যাসের বল্লালী বালাই পর্ব পুরোটাই ইতিহাসের ব্যাপক পরিপ্রেক্ষায় নিশ্চিন্দিপুরকে দেখানোর জন্যই লেখা। এখানে প্রকৃতি নেই, শিশুমনস্তত্ত্বও নেই। আছে শুধু এক নিষ্করুণ জীবনযাত্রার ছবি। তারই পটভূমিতে আসে অপু-দুর্গার গল্প। সেখানে শুধুই অভাব, অপমান আর গ্লানি। এরই পরিণামে সপরিবারে হরিহরের ভিটে ত্যাগ। যশড়া-বিষ্ণুপুরের রায় পরিবার মাত্র দু’পুরুষ নিশ্চিন্দিপুরে থাকতে পারল। অবস্থার চাপে হরিহর বাধ্য হলেন গ্রাম ছাড়তে। তার জ্ঞাতি ভ্রাতা আগেই চলে গিয়েছিলেন গ্রামের পাট চুকিয়ে। নতুন অর্থনীতি যে গ্রামের মানুষকে ভিটে ছাড়তে বাধ্য করে সেই বাস্তবতার ইঙ্গিত এখানে স্পষ্ট।
পাশাপাশি বল্লালী বালাই এর সাথে রয়েছে আরও এক ঐতিহাসিক ঘটনার সুস্পষ্ট যোগ। এই পর্বেই রয়েছেন ওই এলাকার বল্লালী বালাই এর শেষ ভুক্তভোগী ইন্দির ঠাকুরণ। তার চোখে আমরা দেখতে পাই হরিহরের ভিটের, গ্রামের পরিবর্তন।
রাজা বল্লাল সেন (এগারো-বারো শতক) কৌলীন্য প্রথা চালু করেছিলেন। তার ফল হয়েছিল মারাত্মক। দেখা দিল একদল পেশাদার বহুবিবাহজীবী। তাদের জীবিকা একের পর এক কুলীন ঘরের মেয়েকে উদ্ধার করা। বৌ-বাচ্চার দায়িত্ব তাদের শ্বশুরের। ফলে ইন্দির ঠাকুরনের মতো অসংখ্য মেয়ে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঘর করতে পারেননি, বাপের বাড়িতেই কাটাতে হয়েছে পুরো জীবন। প্রথমে বাবা ও পরে ভাই কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়ের গলগ্রহ হয়েই কাটাতে হয়েছে তাদেরকে। এই প্রথারই এক ভুক্তভোগী ইন্দির ঠাকুরণ। ইতিহাসের এই বাস্তব ঘটনার সাথে মিল রেখেই দেয়া হয়েছে এই পর্বের নাম। তার মৃত্যুকে ‘সেকালের অবসান’ বলেই এই পর্ব শেষ করেছেন বিভূতিভূষণ।
সে কালের অবসানের পরে নতুন কালের সূচনার ইঙ্গিতও রয়েছে এই উপন্যাসেই। এই সেকাল আর একাল দিয়ে মূলত সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উত্তরণের কথাটাকেই বোঝানো হয়েছে মূলত।
ইংরেজ আমলে এসে কাঁচা টাকাই হয়ে দাঁড়ালো খাজনা দেয়ার একমাত্র মাধ্যম। পূর্বে মাপে বিভিন্ন কারচুপির মধ্য দিয়ে খাজনা বাড়ানো-কমানো করা হতো। মুকুন্দ চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে দেখা যায় সে ঘটনার উল্লেখ। উনিশ শতকের শেষ দিকে জমি মাপার জন্য এলো লোহার শেকল। শুরু হলো নতুন করে জমির পরিমাপ। উনিশ শতকের শেষ দিকে শুরু হয়ে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলেছে এই পরিমাপ। তখন গ্রামে গ্রামে তাবু খাটিয়ে জমির পরিমাপ করেছে আমিনের দল। সেই ঐতিহাসিক ঘটনারও উল্লেখ পাওয়া যায় ‘পথের পাঁচালী’ তেই।
এছাড়া সুদী কারবারিদের ধরণ কেমন ছিল সে চিত্রও উঠে আসে এই উপন্যাসে। অপু-দুর্গার খাবার, জীবনযাপন দেখে বোধ করা যায় দারিদ্র্যের তীব্রতা। নাম এক হলেও গরিবের আর বড়লোক ঘরের মোহনভোগ যে এক হয় না সেই উপলব্ধিও আমরা দেখতে পাই অপুর থেকে।
বিভূতিভূষণ যখন লিখতে শুরু করেছেন সাহিত্য ব্যাপারটি ততদিনে ধর্ম ও রাজসভার গণ্ডি কাটিয়ে সাধারণ জনতার মাঝে পৌঁছে গেছে। বিভূতিভূষণের লেখায় শুধু নিজ শ্রেণির লোক(দরিদ্র ব্রাহ্মণের) কথাই আসেনি, গ্রামীণ সর্বহারাও এসেছে। এসেছে গ্রামজীবনের ভাঙন। বাস্তবতা প্রকাশের যে বিশিষ্ট ঘরানা– প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বিক্ষোভ, বিস্ফোরণ তার বাহিরে গিয়েই বিভূতিভূষণ ফুটিয়ে তুলেছেন বাস্তবতাকে।