Story

জেলি

October 3, 2026

66 views

জেলি


আশ্চর্য চেহারা বুড়োটার। আজব তার চুল, মনে হয় মাকড়সা বাসা বেঁধেছে। চোখটাও কেমন যেন তার। দোমড়ানো দু’টি পা এক বিশেষ কায়দায় বাঁকিয়ে সে প্রতিদিন একই স্থানে বসে। এমনভাবে বাঁকানো তার পা দু'টো যে মনে হয় তাতে হাড় নেই। বিকলাঙ্গ! এর জন্য যে কারও মায়া হতে পারে আবার কারো চোখে তাকে মনে হয় অপরাধী, সৌন্দর্য বিনষ্টকারীও মনে হতে পারে। 

সবচেয়ে আশ্চর্য যে সে প্রতিদিন একই জায়গাতে বসে, মনে হয় যেন জায়গাটি তার কেনা। প্রচণ্ড শীত কিংবা বৃষ্টি কোনো কিছুই তাকে এ জায়গা থেকে সরাতে পারে না। সামনে একটা বাটি নিয়ে নিঃশব্দে বসে থাকে। তাকে বোধহয় কেউই কখনো কথা বলতে দেখেনি৷ 

জহিন বিপরীত দিকের একটা টং দোকানে বসে চা খায়। ভোরে হল থেকে বের হয়ে এখানে এসে এক কাপ গরম গরম লাল চা আর একটা সিগারেট তার শৌখিনতা। প্রতিদিন সে অসংখ্য ভিখারি দেখে, ক্যাম্পাসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যেখানে বসে সেখানেই কেউ না কেউ এসে হাজির হয়। কিন্তু এই বুড়ো লোকটাকে দেখেই দিন শুরু হয় তার। এই শহরে সে হাজারো ভিখারি দেখেছে, কারও হাত নেই, কারও পেট ফুড়ে তুলো বেরোচ্ছে। কারও কারও হাঁটার সক্ষমতাটাও নেই, গড়িয়ে গড়িয়ে ভিক্ষা করছে। এসব এখন আর আগের মতো প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় না জহিনের ভেতরে। 

ডিসেম্বরের শেষ দিক, বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়া শুরু করেছে। আজও জহিন এসে বসেছে সেই টং টাতে। যদিও পকেটে টাকা নেই তবুও জানে লিটন ভাই তাকে চা সিগারেট খায়িয়েই দেবে, যখন হাতে টাকা আসবে তখন দিয়ে দিলেই হবে। 

ভোরের শহরে নির্জনতা থাকে, মনে হয় আকাশ থেকে সারা রাত ধরে পবিত্রতা বর্ষণ হয়। শীতকালে আরও প্রকট হয়ে ধরা পড়ে বিষয়টি। 

কুয়াশার ভেতর কাঁপতে কাঁপতে জহিন আজও লিটন ভাইয়ের টং দোকানে চলে এসেছে। চা হাতে নিয়ে চোখ চলে যায় রাস্তার ওপারে, চোখ পড়ে বুড়োর চোখে। বুড়োর চোখে আজ দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। হয়তো এতদিনে নিজের কেনা জায়গার মতো হয়ে যাওয়া স্থানটি ছেড়ে দিতে হবে বলে৷ কয়েকদিন ধরেই ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকা ছিন্নমূল মানুষদের শাসানো হচ্ছে এই জায়গা ছেড়ে যাওয়ার জন্য। তারা নাকি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য নষ্ট করছে। বুড়োটার হয়তো আজই শেষদিন, কাল থেকে আর বসতে পারবে না তার এত বছর ধরে বসার মাটিতে। লিটন ভাইদের কপালেও দেখা যাচ্ছে চিন্তার রেখা। কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে ধীরে ধীরে উঠিয়ে দেয়া হবে এই টং দোকানগুলোকেও, এদের জায়গায় বসবে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, কফিশপ; যাদের ব্রাঞ্চ ছড়িয়ে আছে সারা দেশজুড়ে। 

এসব ভাবতে মুখটা যেন কেমন বিশ্রীরকম তিতকুটে হয়ে এলো জহিনের, চোখের সামনেও ভর করলো এক বিরাট শূন্যতা। সামনের কিছুই যেন সে দেখতে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তার চোখের সামনে ঘন কুয়াশার একটা আস্তরণ নেমে এলো। উঠে হাঁটতে শুরু করলো সে। আজ ক্লাস করারও ইচ্ছে হচ্ছে না তার, ক্লাসে গেলেই সেই এক ঘন্টার বিরক্তিকর লেকচার শুনতে হবে। অন্য শিক্ষকদের ক্লাস করার আগ্রহ থাকলেও আজকে যার ক্লাস তার ক্লাস করার কোনো আগ্রহই পায় না জহিন। তবুও যেতে হবে, কারণ এখানে চালু আছে এক জঘন্য ‘উপস্থিতির হার’ প্রথা। ক্লাসে বসেও তার চোখের সামনে থাকা শূন্য ভাবটা কাটলো না, বারবার ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছিলো সামনে। 

ক্লাস শেষ করে বের হয়ে আজ আর কোথাও বসলো না জহিন, সে হাঁটতে শুরু করলো। কোথায় যাচ্ছে সে জানে না কিন্তু হাঁটছে। অনেকক্ষণ ধরে হাঁটার পরে সে নিজেকে একটা ময়লার ভাগাড়ের পাশে আবিষ্কার করলো। ময়লার ভাগাড় তো ঠিক না, রাস্তাকেই ময়লার ভাগাড় বানিয়ে নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। রাস্তায় এসে ময়লা রেখে যায় সিটি কর্পোরেশনের গাড়ি। ভাগাড়ের দিকে তাকিয়ে সে দেখলো রাস্তার পাশ দিয়েই একদল মানুষ মুখ-নাকে কাপড় চাপা দিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে যাতে দুর্গন্ধ তাদের নাকে কোনোভাবেই প্রবেশ করতে না পারে। অন্যদিকে একজন মহিলে ময়লার ভাগাড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট খাবার কুড়িয়ে হাতে দিচ্ছে তার হাড়জিরজিরে শিশু সন্তানের। শিশুটি সেই খাবার খেয়ে নিচ্ছে অবলীলায়।

আবারও হাঁটতে শুরু করলো জহিন, আজ যেন তার মাথাতে কী ভর করেছে, সাথে পেটেও। সকাল থেকে শুধু ওই এক কাপ চা ছাড়া আর কিছুই খায়নি, যদিও এটা মাঝেমধ্যেই করে। কিন্তু এভাবে উদ্দেশ্য ছাড়া কখনো হাঁটা হয়নি তার। এবার হাঁটতে হাঁটতে সে নিজেকে এমন এক জায়গায় পেলো যেখানে বসে তার মনে হলো সে কোনোভাবে অন্য কোনো দেশে চলে এসেছে কিনা। তার প্রতিদিনকার দেখা পরিবেশের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না এখানে, মনে হচ্ছে উন্নত কোনো দেশে চলে এসেছে। 

কিন্তু এখানেও সে স্বস্তি পাচ্ছে না, তাই হাঁটতে লাগলো। যেতে যেতে অনেকদূর চলে যাওয়ার পর, এই এলাকাটা ছেড়ে বের হওয়ার পর তার মনে হলো সে তার চেনা পরিবেশে ফিরেছে। হাঁটতে হাঁটতে সে চলে এলো শহরের অনেকটাই দূরে একটা খোলা মাঠের পাশে, যেখানে জনমানুষ সেভাবে থাকেনা বললেই চলে। কিন্তু  তার চোখে পড়লো কয়েকজন মানুষ মিলে একটা মানুষকে ধরে রেখেছ, সামনে একটা মানুষ পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। জহিনের মাথার ভেতর কেমন যেন ভোঁতা একটা শব্দ হওয়া শুরু করেছে। হঠাৎ করে এই শব্দটিকে পরাজিত করে তার কানে ঢুকলো আরও জোরালো কোনো শব্দ, সম্ভবত ওই পিস্তলটারই গুলির শব্দ। সারাদিনের ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং হাঁটার পরিশ্রমেই বোধহয় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল জহিন। যখন তার জ্ঞান ফিরলো ততক্ষণে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। উঠে একটু ধাতস্ত হয়ে সেই জায়গাটার দিকে আগাতে লাগলো জহিন, যেখানে একটা লোককে কয়েকজন মিলে ধরে আছে। সেখানে গিয়ে সে দেখতে পেলো জেলির মতো কিছু পড়ে আছে মাটিতে, সে হাতে তুলে নিয়ে দেখতে লাগলো সেই থকথকে জেলি।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login