Story

যে তুমি আমার ছিলে না

September 27, 2026

8 views

টেবিলের ওপর রাখা নীল রঙের খামটার দিকে তাকিয়ে অর্ঘ্যের মনে হলো, মানুষের পুরো জীবনটা আসলে কিছু মিথ্যে বিশ্বাসের সমষ্টি। বাইরে তখন আশ্বিনের শেষ বিকেলের বিষণ্ণ রোদ গলে পড়ছে। আকাশে হালকা মেঘের আনাগোনা, বাতাসের স্পর্শে একটা অদ্ভুত ভেজা গন্ধ। অর্ঘ্যের আঙুলের ডগায় কাঁপন। খামের ভেতরের কাগজটা সে এখনও স্পর্শ করেনি, কিন্তু সে জানে ভেতরে কী আছে। সোনার জলে ছাপা অক্ষরে দুটো নাম পাশাপাশি লেখা অদিতি সেনগুপ্ত এবং সৌম্যদীপ বোস। নাম দুটো পাশাপাশি দেখতে কেমন লাগে? অর্ঘ্য চোখ বন্ধ করল। বুকের বাঁ দিকে ঠিক যেখানটায় হৃদপিণ্ড স্পন্দিত হয়, সেখানে একটা ভোঁতা, নীরব ব্যথা ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ বলে, অতিরিক্ত আঘাতে মানুষ চিৎকার করে কাঁদে। কিন্তু অর্ঘ্যের মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষতগুলো কোনো শব্দ করে না; তারা কেবল নিস্তব্ধতায় নিঃশ্বাস চেপে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।

অদিতি। নামটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত হাহাকার জেগে ওঠে। যে মেয়েটি গত সাতটি বছর ধরে অর্ঘ্যের প্রতিটি সকাল, প্রতিটি নির্ঘুম রাত আর কবিতার প্রতিটি ছত্রে জড়িয়ে ছিল, সে আজ অন্যের নামে নিজের পরিচয় বাঁধতে চলেছে। আর সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্যটি হলো, অদিতি কোনোদিন জোর করে অর্ঘ্যের জীবনে আসেনি, অর্ঘ্যই তাকে নিজের সবটুকু দিয়ে সাজিয়েছিল এমন এক কল্পনার ক্যানভাসে, যার কোনো ভিত্তি ছিল না। অদিতি কোনোদিনই অর্ঘ্যের ছিল না। অথচ অর্ঘ্য তাকে নিজের চেয়েও বেশি করে নিজের ভেবেছিল।
সাত বছর আগের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের চত্বর তখন লাল কৃষ্ণচূড়ায় ছেয়ে থাকত। অর্ঘ্য ছিল রসায়ন বিভাগের শান্ত, আত্মভোলা ছাত্র। ক্লাস শেষে লাইব্রেরির কোণে বসে পুরোনো বইয়ের গন্ধ শোঁকা আর ডায়রির পাতায় এলোমেলো পঙ্‌ক্তি লেখা ছাড়া তার আর কোনো জগৎ ছিল না। বন্ধুত্ব ছিল হাতে গোনা কয়েকজনের সঙ্গে। অর্ঘ্য ভিড় এড়িয়ে চলত, শব্দ এড়িয়ে চলত। সেই নির্জন জীবনে অদিতি এসেছিল এক পশলা আকস্মিক বৃষ্টির মতো। রসায়ন বিভাগের চঞ্চল, হাসিখুশি মেয়ে। চোখে একরাশ আলো আর ঠোঁটের কোণে সবসময় লেপ্টে থাকা অকারণ হাসি।

প্রথম দেখা হওয়ার দিনটির কথা অর্ঘ্য এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারে না। লাইব্রেরির করিডোরে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে গিয়ে অদিতি এসে দাঁড়িয়েছিল অর্ঘ্যের ঠিক পাশে। বাতাসে ওর ভেজা এলোমেলো চুল এসে ছুঁয়েছিল অর্ঘ্যের কাঁধ। অদিতি পেছন ফিরে হেসে বলেছিল, "স্যরি! আপনার নিশ্চয়ই ভিজতে ভালো লাগে না? মুখ দেখে মনে হচ্ছে খুব গম্ভীর মানুষ।" অর্ঘ্য কথা হারিয়ে ফেলেছিল। কেবল মাথা নেড়ে বলেছিল, "না, ঠিক তা নয়।"

"তাহলে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বৃষ্টি তো দেখবার জিনিস নয়, ছোঁয়ার জিনিস!" বলেই অদিতি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল কার্নিশ চুইয়ে পড়া বৃষ্টির জলের দিকে। সেই থেকে শুরু। তারপর কত বিকেল কেটেছে ক্যাম্পাসের ঘাসে বসে। অর্ঘ্য মুগ্ধ হয়ে শুনত অদিতির ছেলেমানুষি গল্প ওর ছোটবেলার কথা, হোস্টেলের খাবারের অনুযোগ, ভবিষ্যতে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন। অদিতি যখন কথা বলত, অর্ঘ্যের মনে হতো পৃথিবীর সব সুর যেন ওর কণ্ঠেই বাঁধা।

অদিতি প্রায়ই বলত, "জানিস অর্ঘ্য, তোর সঙ্গে কথা বললে না সব ক্লান্তি মুছে যায়। তুই খুব ভালো একজন শ্রোতা। পৃথিবীর সবাই বলতে চায়, কেউ শোনে না। শুধু তুই শুনতে জানিস।" অর্ঘ্য হাসত। সে বলতে পারত না যে, সে পৃথিবীর সবার কথা শোনে না; সে শুধু অদিতির কথা শোনে। কারণ অদিতির প্রতিটি শব্দ তার কাছে ছিল এক একটি প্রার্থনার মতো। বন্ধুত্ব যত গভীর হচ্ছিল, অর্ঘ্যের বুকের ভেতরের ভালোবাসা ততটাই নিঃশব্দে ডালপালা মেলছিল। কিন্তু অর্ঘ্য কোনোদিন মুখ ফুটে কিছু বলেনি। তার একটা ভয় ছিল, যদি বলে ফেলে এই সুন্দর বন্ধুত্বটুকুও হারিয়ে যায়? যদি অদিতি দূরে সরে যায়?

অদিতি অর্ঘ্যের ওপর অধিকার ফলাত ভীষণ। অর্ঘ্যের জ্বর হলে হোস্টেলে গিয়ে বকাঝকা করে ওষুধ খাইয়ে দিত, অর্ঘ্যের ছেঁড়া শার্টের বোতাম লাগিয়ে দেওয়ার জন্য শাসন করত, আবার অর্ঘ্য কোনোদিন মনমরা হয়ে থাকলে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত টিএসসির চা দোকানে। "এই অর্ঘ্য, তোর কি কোনো প্রেমিকা আছে? কাউকে ভালো লাগে না?" একদিন চা খেতে খেতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল অদিতি। অর্ঘ্য চমকে উঠে অদিতির চোখের দিকে তাকিয়েছিল। সেই চোখে ছিল কেবল নিষ্পাপ কৌতূহল, কোনো অনুভূতির ছায়া ছিল না। অর্ঘ্য ঢোক গিলে বলেছিল, "না। নেই।"

"ধ্যাত! তোর জীবনে কোনো রোমাঞ্চ নেই রে। সারাদিন বই আর কবিতা। দেখিস, কোনোদিন তোকে কেউ পছন্দ করবে না।" অদিতি খিলখিল করে হেসে উঠেছিল। অর্ঘ্য মৃদু হেসে মনে মনে বলেছিল, 'আমার চোখ দুটো যদি পড়তে পারতি অদিতি, দেখতে পেতি সেখানে তোর ছাড়া আর কারও স্থান নেই।'

অদিতি কোনোদিন সেই চোখ পড়েনি। কারণ যে ভালোবাসে, চোখ পড়ার দায়িত্ব তো তারই। যার মনে কেবল বন্ধুত্ব, সে তো সবকিছুকেই সহজভাবে দেখে। অদিতি অর্ঘ্যকে দেখত এক নির্ভরতার আশ্রয় হিসেবে, বন্ধু হিসেবে, তার জীবনের একজন নিরাপদ মানুষ হিসেবে। সেখানে প্রেম ছিল না, তীব্র টান ছিল না, ছিল কেবল অভ্যাস। কিন্তু অর্ঘ্য সেই অভ্যাসের মধ্যেই খুঁজে নিয়েছিল বেঁচে থাকার রসদ। সে ধরে নিয়েছিল, ভালোবাসা মানে তো শুধু দাবি করা নয়; ভালোবেসে যাওয়াও এক ধরণের পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি, সে আসলে তপ্ত মরুভূমিতে এক মরীচিকার পেছনে ছুটছে, যার কোনো শেষ নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে অর্ঘ্য একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিল। জীবনটা তার আগের মতোই সাদামাটা। ছোট একটা ফ্ল্যাট, বইয়ের তাক আর অদিতির একটি মাত্র ছবি, যা সে একবার ক্যাম্পাসের বার্ষিক অনুষ্ঠানে লুকিয়ে তুলেছিল। অদিতি যোগ দিয়েছিল একটি বহুজাতিক সংস্থায়। ওর জগৎটা তখন বড় হতে শুরু করেছে। নতুন পরিবেশ, কর্পোরেট সংস্কৃতি, নতুন মানুষজন। প্রথম দিকে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও আস্তে আস্তে অদিতির ফোন আসার ব্যবধান বাড়তে লাগল। আগে যেখানে প্রতিদিন রাতে অন্তত একবার কথা হতো, সেখানে এখন সপ্তাহে একদিন কথা হওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াল। অর্ঘ্য ফোন করলে অদিতি বলত, "খুব ব্যস্ত রে অর্ঘ্য। প্রেজেন্টেশন আছে, মিটিং আছে। পরে কথা বলছি।"

অর্ঘ্য রাগ করত না। সে অদিতির ব্যস্ততাকে সম্মান করত। সে জানত, অদিতির স্বপ্ন অনেক বড়। একদিন রাতে হঠাৎ অদিতির ফোন এল। প্রায় এক মাস পর। অর্ঘ্যের বুকের ভেতরটা আনন্দের দোলা দিয়ে উঠল। ফোন তুলেই সে বলল, "অদিতি! কেমন আছিস?" ওপার থেকে অদিতির উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এল, "অর্ঘ্য! তুই কাল সন্ধ্যায় ফ্রি আছিস? তোকে খুব জরুরি একটা কথা বলার আছে। ধানমন্ডির সেই ক্যাফেটায় আসবি, প্লিজ!"

"কী কথা? ফোনে বলা যাবে না?"

"না রে বোকা, সামনাসামনি বলব। একটা বিরাট সারপ্রাইজ!"

সেই রাতে অর্ঘ্য ঘুমোতে পারল না। তার মনের অবচেতন কোণে একটা বোকা আশা উঁকি দিচ্ছিল। অদিতি কি তবে কিছু বুঝতে পেরেছে? এই এতদিন দূরে থেকে ও কি অনুভব করতে পেরেছে অর্ঘ্যের শূন্যতা? অর্ঘ্য কি কাল নিজের মনের সব কথা খুলে বলবে? সে ড্রয়ার খুলে বহু বছর ধরে লিখে রাখা ডায়েরিটা বের করল। সেখানে প্রতিটি পাতায় শুধু অদিতির নাম লেখা। সে ঠিক করল, কাল সে এই ডায়েরিটা অদিতির হাতে তুলে দেবে। বলবে, "এই দেখ অদিতি, আমার এই সামান্য জীবনের সবটুকু আলো তুই।"
পরদিন সন্ধ্যায় ক্যাফেতে যখন অর্ঘ্য পৌঁছাল, অদিতি তখন আগেই এসে বসে ছিল। ওর পরনে ছিল একটি উজ্জ্বল হলুদ কুর্তি, মুখে অদ্ভুত এক দীপ্তি। অর্ঘ্য গিয়ে ওর সামনের চেয়ারে বসল। টেবিলে রাখা কাচের ফুলদানির গোলাপগুলো যেন অদিতির হাসির সামনে ম্লান দেখাচ্ছিল। "অর্ঘ্য! তুই একদম বদলালি না রে। সেই পুরোনো ঢিলেঢালা পাঞ্জাবি আর কাঁধের ব্যাগ!" অদিতি হেসে বলল। অর্ঘ্য হাসল, "সবাইকে বদলাতে নেই অদিতি। কেউ কেউ পুরোনো হয়েই ভালো থাকে।"

"আচ্ছা শোন, বেশি কথা বলব না। তোকে একটা বিশেষ মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব। ও একটু পরেই আসবে, পার্কিংয়ে গাড়ি রাখছে।"

অর্ঘ্যের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে এল। "বিশেষ মানুষ?" অদিতির গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে চোখ নামিয়ে বলল, "হ্যাঁ রে। ওর নাম সৌম্যদীপ। আমাদের অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার। আমরা গত আট মাস ধরে একে অপরকে দেখছি। আই মিন... উই আর ইন আ রিলেশনশিপ। আজ তোকে সবার আগে জানাতে চাইলাম, কারণ তুই আমার সবচেয়ে বেস্ট ফ্রেন্ড।"

অর্ঘ্যের মনে হলো, ক্যাফের চারপাশের বাতাস হঠাৎ বিষাক্ত হয়ে গেছে। তার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। কানের ভেতর এক অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে, যেন হাজারটা কাচ একসাথে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। "রিলেশনশিপ...?" অর্ঘ্যের গলা দিয়ে কোনোমতে শব্দটা বের হলো। "হ্যাঁ! সৌম্য মানুষটা যে কী দারুণ, তোকে কী বলব অর্ঘ্য! একদম পারফেক্ট। বাবা-মাও মেনে নিয়েছেন। সামনের অগ্রহায়ণে আমাদের বিয়ে।" অদিতির চোখের তারায় তখন ভালোবাসার অগাধ আলো। ঠিক তখনই পেছনে ভারি পায়ের শব্দ হলো। একজন সুপুরুষ, দীর্ঘকায় যুবক এসে দাঁড়াল টেবিলের পাশে। মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি।

"হাই হানি, সরি একটু লেট হয়ে গেল," যুবকটি অদিতির কাঁধে হাত রাখল খুব স্বাভাবিক অধিকারে।

অদিতি উঠে দাঁড়িয়ে পরিচয় করিয়ে দিল, "সৌম্য, এ হলো অর্ঘ্য। আমার ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আর অর্ঘ্য, এ সৌম্য।"

সৌম্যদীপ হাত বাড়িয়ে দিল, "হ্যালো অর্ঘ্যবাবু। অদিতির মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনি নাকি খুব ভালো কবিতা লেখেন?" অর্ঘ্য হাত মেলাল। সৌম্যদীপের হাতের তালু উষ্ণ আর শক্ত। সেই স্পর্শে অর্ঘ্য নিজের ক্ষুদ্রতা আর পরাজয়কে স্পষ্ট অনুভব করল। তার ব্যাগের ভেতর লুকানো ডায়েরিটা তখন একখণ্ড ভারী পাথরের মতো চেপে বসেছিল। যে ডায়েরিতে লেখা ছিল তার সাত বছরের প্রেম, তা এক মুহূর্তেই মূল্যহীন আবর্জনায় পরিণত হলো। পুরোটা সময় অর্ঘ্য কীভাবে বসে ছিল, কী কথা বলেছিল, সে জানে না। সে শুধু দেখছিল অদিতির চোখের ভাষা। সৌম্যদীপের প্রতিটি কথার দিকে অদিতি যেভাবে তাকাচ্ছিল, যে মুগ্ধতা ছড়িয়ে ছিল ওর সারা মুখে অর্ঘ্য বুঝে গেল, এই দৃষ্টি কোনোদিন তার জন্য ছিল না।

অদিতি কোনোদিনই অর্ঘ্যের প্রেমে পড়েনি। অর্ঘ্য ছিল কেবল এক বিশ্বস্ত ছায়া। আর ছায়াকে মানুষ ভালোবাসে না, ছায়ার শীতলতাটুকু শুধু প্রয়োজনমতো ব্যবহার করে। ক্যাফে থেকে বের হয়ে অর্ঘ্য একা একা হাঁটতে লাগল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামছিল। রাস্তার নিয়ন বাতিগুলো অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল জলের ঝাপসায়। অর্ঘ্য ডায়েরিটা ব্যাগ থেকে বের করল। রাস্তার পাশের একটা আবর্জনার স্তূপের কাছে দাঁড়িয়ে সে ডায়েরির পাতাগুলো একে একে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল। বৃষ্টির জলে ভিজে নীল কালির অক্ষরগুলো মুছে যাচ্ছিল। কিন্তু বুকের ভেতরে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, তা মোছার কোনো উপায় ছিল না। তারপর কেটে গেছে আরও কয়েকটা মাস। অদিতি বিয়ের কার্ড দিতে এসেছিল স্বশরীরে। অর্ঘ্য স্বাভাবিক থাকার সবটুকু অভিনয় করেছিল। সে হাসিমুখে কার্ড নিয়েছে, অদিতিকে মিষ্টি খাইয়েছে, আশীর্বাদ করেছে। অদিতি যাওয়ার সময় বলেছিল, "তুই কিন্তু তিন দিন আগেই আসবি অর্ঘ্য। তোকে ছাড়া আমার বিয়েটা একদম অসম্পূর্ণ লাগবে। তুই আমার ভাই নেই বলে সেই অভাব কোনোদিন বুঝতে দিসনি।"

ভাই! শব্দটা অর্ঘ্যের বুকে শেলের মতো বিঁধেছিল। সাত বছর ধরে যে নারীকে সে হৃদয়ের রানী বানিয়ে রেখেছিল, তার চোখে অর্ঘ্যের অবস্থান ছিল কেবলই এক আশ্রয়দাতা ভাইয়ের মতো! ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। পুরুষ যখন কোনো নারীকে ভালোবাসে, তখন সে তার ঈশ্বর হতে চায়, প্রেমিক হতে চায়; কিন্তু কেবল বন্ধু বা ভাই হয়ে থেকে যাওয়ার যন্ত্রণা যে কতটা মারাত্মক, তা কেবল সেই পুরুষই জানে।

আজ সেই বিয়ের রাত। শহরের একটি অভিজাত কমিউনিটি সেন্টারে আলোর রোশনাই। সানাইয়ের সুর বাতাসে ভাসছে। অর্ঘ্য গিয়েছিল। দূর থেকে সে দেখেছে অদিতিকে। বেনারসি শাড়িতে মোড়ানো অদিতি, মাথায় চেলি, কপালে চন্দনের কলকা। এত সুন্দর অদিতিকে অর্ঘ্য আগে কোনোদিন দেখেনি। যখন সৌম্যদীপ ওর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিল, অদিতি তখন চোখ বন্ধ করেছিল এক পরম তৃপ্তিতে। সেই মুহূর্তে অর্ঘ্যের মনে হয়েছিল, তার জীবনের শেষ অধ্যায়টিও লেখা হয়ে গেল। সে অদিতির মুখোমুখি হয়নি। ভিড়ের মাঝে নিজেকে আড়াল করে সে নিঃশব্দে বেরিয়ে এসেছিল। অদিতির সুখের মুহূর্তে তার এই বিষণ্ণ ছায়াটা ফেলে কোনো অমঙ্গল সে ডেকে আনতে চায়নি।
এখন গভীর রাত। শহরের কোলাহল থেমে গেছে। অর্ঘ্য তার ছোট ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। নিকোটিনের ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে রাতের কুয়াশায়। বাতাসে এখনো ভেসে আসছে দূরবর্তী কোনো উৎসবের বাজনার রেশ। হয়তো সেখানে এখন বাসর ঘরের প্রস্তুতি চলছে। হয়তো অদিতি এখন কাঁপছে নতুন এক জীবনের আনন্দে, নতুন এক মানুষের ছোঁয়ায়।

অর্ঘ্যের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গালে। এই জল কষ্টের নয়, এই জল এক চরম সত্যকে মেনে নেওয়ার। সে আকাশের দিকে তাকাল। শুক্লপক্ষের চাঁদটা একা একা ভাসছে মেঘের দেশে। অর্ঘ্য খুব শান্ত গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমি তোমাকে কোনোদিন দোষ দেব না অদিতি। তুমি তো কোনোদিন আমাকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দাওনি। তুমি তো হাত বাড়িয়ে বলোনি,'আমি তোমার হব।' আমিই তোমাকে আমার ভাবার ভুল করেছিলাম। আমি নিজের শূন্যতা ঢাকতে তোমাকে জড়িয়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম।"

ভালোবাসা একতরফা হলে তা কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু তা মানুষকে ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব করে দেয়। অর্ঘ্য আজ পুরোপুরি নিঃস্ব। তার আর হারানোর কিছু নেই, পাওয়ারও কিছু নেই। তবে এই নিঃস্বতার মাঝেও এক অদ্ভুত শান্তি আছে। অন্তত মিথ্যে কোনো আশার আলো আর তাকে পোড়াবে না। সে আর অদিতির ফোনের অপেক্ষায় রাত জাগবে না, অদিতির সামান্য হাসির মাঝে প্রেমের ইঙ্গিত খুঁজবে না।

অর্ঘ্য সিগারেটের শেষ অংশটুকু নিভিয়ে ফেলল। "ভালো থেকো অদিতি। খুব ভালো থেকো তোমার নিজের মানুষের সাথে। আমার গল্পে তুমি চিরকালই এক অপূর্ণ কবিতা হয়ে থাকবে। যে কবিতাটা কেবল আমারই হৃদয়ে লেখা হলো, যার সুর কোনোদিন তোমার কানে পৌঁছাল না। কারণ... যে তুমি কোনোদিন আমার ছিলে না, সেই তোমাকে হারিয়ে ফেলার আফসোস করাও আমার সাজে না।"

রাতের বাতাসটা হঠাৎ একটু ভারী হয়ে উঠল। একটা পাতা খসে পড়ল গাছ থেকে। জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে অর্ঘ্য ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিল। অন্ধকার নেমে এল চারপাশের মতো তার অন্তরেও, এক অনন্ত, শান্ত, ব্যথাতুর অন্ধকার।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim