ঢাকার আকাশটা সকাল থেকেই অদ্ভুত রকমের গম্ভীর হয়ে ছিল। শ্রাবণের মেঘগুলো যেন পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে বুড়িগঙ্গার ওপর ঝুঁকে পড়েছে। কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গলিগুলোতে স্যাঁতসেঁতে সোঁদা গন্ধ, আর ইলেক্ট্রিক তারে তারে জমে থাকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মুক্তোর দানার মতো কাঁপছিল। নীলাদ্রি দাঁড়িয়ে ছিল জগন্নাথের উল্টো দিকের একটা পুরোনো বইয়ের দোকানের ছাদখোলা বারান্দার নিচে। পরনে সাধারণ সুতির কুর্তা, কাঁধে ঝোলানো খাকি রঙের শান্তিনিকেতনি ব্যাগ। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ভাঁড়ের চা। এই শহরটাকে নীলাদ্রি ভালোবাসে তার ধীরগতির জন্য, তার পুরোনো গন্ধ আর বইয়ের পাতার খসখস শব্দের জন্য। কিন্তু আজকের বিকেলটা অন্যরকম। বাতাস বইছে একটু এলোমেলো, আর বুকটা কেমন যেন অচেনা এক অস্থিরতায় দুলছে।
ঠিক তখনই বৃষ্টিটা নামল। কোনো পূর্বাভাস ছাড়া, একেবারে বাঁধভাঙা জলপ্রপাতের মতো। রাস্তার পথচারীরা যে যার মতো এদিক-ওদিক আশ্রয়ের খোঁজে ছুটল। সেই হুড়োহুড়ির ভিড় ঠেলে এক তরুণী এসে ঢুকল সেই একই বইয়ের ছাউনির নিচে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে মাথার ওড়নাটা দিয়ে ভেজা কপালটা মুছে নিল। পরনে হালকা নীলাভ জামদানি, কানে রুপোর ঝুমকো। বৃষ্টির ঝাপটায় তার শাড়ির আঁচল আধভেজা, আর ভেজা চুলের কিছু অবাধ্য গোছা এসে লেপ্টে আছে ফর্সা কপালে। মেয়েটির হাত থেকে তখন একটা বই ফসকে পাথুরে ফুটপাতে পড়ে যেতে নিচ্ছিল। নীলাদ্রি এক ঝটকায় হাত বাড়িয়ে বইটা ধরে ফেলল।
"সাবধানে! বইয়ের পাতা ভিজে গেলে কিন্তু মন খারাপ হয়ে যাবে।" নীলাদ্রির গলায় ছিল সতর্ক কিন্তু উষ্ণ এক স্বর। মেয়েটি চমকে উঠে তাকাল। গভীর, টানা একজোড়া চোখ। সেই চোখে বৃষ্টির চেয়েও বেশি স্নিগ্ধতা, আবার এক চিলতে কৌতুকও। -"ধন্যবাদ! জীবনানন্দের কবিতার বই, ভিজলে সত্যিই পাপ হতো," মেয়েটি মিষ্টি হেসে বলল। হাসির সঙ্গে তার গালের একপাশে ছোট্ট একটা টোল পড়ল। নীলাদ্রি যেন কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। হাজার হাজার বইয়ের মাঝে, শত শত মানুষের ভিড়ে এই মুখটা যেন এক নিমেষে পুরো পৃথিবীর কোলাহলকে মুছে দিল।
"আমি মেঘলা," মেয়েটি নিজেই হাত বাড়িয়ে দিল, বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শোনাল।
নীলাদ্রি বইটা তার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, "আমি নীলাদ্রি। এখানে মাঝে মাঝে পুরোনো ইতিহাসের খোঁজে আসি।"
"আর আমি আসি কবিতার শব্দ খুঁজতে," মেঘলা হাসল। সেই শুরু। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছিল, ট্রামের ঘণ্টা বাজছিল টুং-টাং শব্দে, আর একটা ভাঙা বইয়ের দোকানের ছাউনির নিচে দুটি অচেনা হৃদয়ের মধ্যে নিঃশব্দে বোনা হচ্ছিল এক রূপকথার প্রথম সুতো।
প্রথম দিনের সেই বৃষ্টিভেজা সাক্ষাতের পর কীভাবে যেন দিনগুলো বদলে গেল। তাদের দেখা হওয়ার কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ ছিল না, অথচ নিয়ম করে দেখা হতে লাগল। কখনও কফি হাউসের দোতলার রেলিং ঘেঁষা টেবিলে, যেখানে টেবিল ফ্যানের একটানা ঘড়ঘড় আওয়াজ আর বুদ্ধিজীবীদের তর্কের ভিড়ে তাদের দুজনের জন্য তৈরি হতো এক নিভৃত জগৎ। কখনও বা প্রিন্সেপ ঘাটের গঙ্গার পাড়ে, যেখানে নৌকার দাঁড়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে শেষ বিকেলের আলো মিলিয়ে যেত ওপারে। মেঘলা আর্ট কলেজের ছাত্রী। ক্যানভাসে রঙের খেলা খেলতে ভালোবাসে। আর নীলাদ্রি ইতিহাসের গবেষক, পুরোনো স্থাপত্য আর মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির পেছনে ছুটে বেড়ায়। দুজন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ, অথচ কোথায় যেন এক অদ্ভুত সমান্তরাল সুর।
একদিন বিকেলে কফি হাউসে কোল্ড কফির গ্লাসে স্ট্র নাড়তে নাড়তে মেঘলা বলল, "আচ্ছা নীলাদ্রিদা, তুমি তো সারাদিন পুরোনো দিনের কথা নিয়ে থাকো। অত পুরোনো ভাঙা পাথর, পুরনো দলিল, এসবের মধ্যে প্রাণ পাও কোথায়?"
নীলাদ্রি মেঘলার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। বলল, "কারণ আমি জানি, ওই পাথরের নিচে একসময় কারও তীব্র ভালোবাসা ছিল, কারও অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস ছিল। মানুষ মরে যায় মেঘলা, কিন্তু তার ভালোবাসার স্মৃতিগুলো স্থাপত্যের গায়ে দাগ কেটে থেকে যায়।" মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, "আর তুমি? তোমার স্মৃতি কার গায়ে দাগ কাটবে?"
নীলাদ্রির বুকটা কেঁপে উঠল। সে কোনো উত্তর দিতে পারল না। উত্তর দেওয়ার সাহস তার ছিল না। নীলাদ্রি সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা যার নিত্যসঙ্গী। অন্যদিকে মেঘলা শহরের নামকরা পরিবারের আদুরে মেয়ে। তাদের মাঝে যে এক অলিখিত সামাজিক ব্যবধান আছে, সেটা নীলাদ্রি প্রতিনিয়ত অনুভব করত।
তবু মন কি শাসন মানে?
একদিন সন্ধ্যায় লেকের ঘাটে বসেছিল দুজন। পানি ঘাটের সিঁড়িতে এসে ধাক্কা খাচ্ছিল। মেঘলা হঠাৎ নীলাদ্রির কাঁধে মাথা রাখল। কোনো কথা নেই, কোনো ঘোষণা নেই শুধু পরম নির্ভরতায় একটি মাথা এলিয়ে পড়া। নীলাদ্রির শরীরটা শক্ত হয়ে গেল মুহূর্তের জন্য, তারপর এক অচেনা শিহরণে নরম হয়ে এল। সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল, যেন সামান্য নড়াচড়াতেও এই স্বর্গীয় মুহূর্তটা ভেঙে না যায়।
"জানো নীলাদ্রি," মেঘলা আকাশের প্রথম তারার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমার এই রঙ, এই ক্যানভাস সবকিছু কেমন অর্থহীন লাগত। কিন্তু যেদিন থেকে তোর সাথে পরিচয় হলো, আমার ক্যানভাসে এখন শুধু একটা রঙেরই খেলা থাকে। তোর উপস্থিতির রঙ।"
নীলাদ্রি হাত বাড়িয়ে মেঘলার ভেজা আঙুলগুলো নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল। বলল, "আমি তো খুব সাধারণ এক পথিক মেঘলা। তোমাকে দেওয়ার মতো কোনো রাজপ্রাসাদ আমার নেই।"
মেঘলা মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে তখন চাঁদের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। "রাজপ্রাসাদ কে চেয়েছে? আমি চেয়েছি এমন একটা মন, যেখানে আমি সম্পূর্ণ নিরাপদ। তুমি কি তা হতে পারবে না?"
নীলাদ্রি মেঘলার চোখের পাতায় আলতো করে আঙুল ছুঁইয়ে দিল। ফিসফিসিয়ে বলল, "যতদিন এই শরীরে প্রাণ আছে, তোকে আগলে রাখাই আমার একমাত্র প্রার্থনা হবে।" সেদিন বুড়িগঙ্গার হাওয়া সাক্ষ্য ছিল, দুটি মানুষ কেবল প্রেমের বন্ধনে জড়ায়নি, এক আত্মিক আশ্রয়ে নিজেদের সমর্পণ করেছিল।
প্রেমের দিনগুলো যখন বসন্তের বাতাসের মতো সহজ আর মধুর হয়ে বয়ে যাচ্ছিল, তখনই বাস্তবতার কঠিন দেওয়াল এসে দাঁড়াল তাদের সামনে। মেঘলার পরিবারে নীলাদ্রির কথা জানাজানি হতে বেশি সময় লাগল না। মেঘলার বাবা এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যার কাছে সম্পর্কের অর্থ হলো সামাজিক প্রতিপত্তি আর অর্থনৈতিক সামঞ্জস্য। একজন বেকার গবেষকের হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দেওয়ার কথা তিনি ভাবতেই পারেন না। একদিন বিকেলে নীলাদ্রির ফোনে মেঘলার মেসেজ এল "লেকের ধারের পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে এসো। এখনই।"
নীলাদ্রি ছুটে গেল। গিয়ে দেখল, মেঘলা একা দাঁড়িয়ে আছে। তার চুল এলোমেলো, চোখ দুটো লাল আর ফোলা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে অনেকক্ষণ কেঁদেছে।
নীলাদ্রি কাছে গিয়ে তার হাত দুটো চেপে ধরল, "কী হয়েছে মেঘলা? বাড়িতে কিছু বলেছে?"
মেঘলা নিজেকে আর সামলাতে পারল না। নীলাদ্রির বুকে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার শরীরটা থরথর করে কাঁপছিল।
"বাবা সব জেনে গেছেন," রুদ্ধশ্বাসে বলল মেঘলা, "আমার বিয়ে ঠিক করেছেন এক বড় শিল্পপতির ছেলের সাথে। আগামী মাসেই বিয়ে। বাবা বলেছেন, আমি যদি তোমার সাথে যোগাযোগ রাখি, তবে তিনি... তিনি নিজেকে শেষ করে দেবেন!"
নীলাদ্রির পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে এল। সে চেয়েছিল মেঘলাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে 'আমরা কোথাও পালিয়ে যাব, পৃথিবীর শেষ প্রান্তে চলে যাব।' কিন্তু সে জানল, তা সম্ভব নয়। মা-বাবার ভালোবাসা আর পরিবারের দায়িত্বের ওপর পা দিয়ে কোনো মেয়ে প্রকৃত সুখী হতে পারে না।
"তুমি কী চাও মেঘলা?" নীলাদ্রির নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কানেই অচেনা ঠেকল।
মেঘলা মুখ তুলল। তার গালে অশ্রুর নদী। সে নীলাদ্রির দুই গালে হাত রাখল, "আমি শুধু তোমাকেই ভালোবাসি নীলাদ্রি। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা জুড়ে তুমি। কিন্তু আমি বাবার মৃত্যুর কারণ হতে পারব না... আমি পারব না।" নীলাদ্রি মেঘলার চোখের জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। হাসার এক নিদারুণ ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল, "আমি জানি। আমি তোমাকে কোনোদিন এমন কোনো পথে টানব না, যা তোমার পরিবারকে ধ্বংস করে।"
"তাহলে আমাদের কী হবে?" মেঘলার কণ্ঠ আর্তনাদের মতো শোনাল। নীলাদ্রি তার কপালে এক দীর্ঘ, উষ্ণ চুম্বন আঁকল। সেই চুম্বনে কোনো কামনার ছোঁয়া ছিল না, ছিল আজন্মের এক গভীর আর্তি আর বেদনার অঙ্গীকার।
"আমাদের যা হওয়ার তা হয়ে গেছে মেঘলা," নীলাদ্রি শান্ত স্বরে বলল, "তুমি আমার হৃদয়ের এমন এক জায়গায় আছো, যেখানে কারও বিয়ে দেওয়া যায় না, কারও বিচ্ছেদ ঘটানো যায় না। তুমি আমার ছিলে, আছো এবং থাকবে। শরীর না ছুঁলেও মন দিয়ে ভালোবেসে যাওয়া যায়।" মেঘলা সেই সন্ধ্যায় অনেকক্ষণ কাঁদাল। নীলাদ্রি তাকে শুধু নিজের বাহুডোরে আগলে রাখল, যেন এটাই তাদের পৃথিবীর শেষ সন্ধ্যা।
মেঘলার বিয়ে হয়ে গেল। এক ধুমধামপূর্ণ, জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে অন্য এক পুরুষের হাতে তাকে তুলে দেওয়া হলো। নীলাদ্রি সেই শহরে থাকতে পারেনি। সে তার গবেষণার কাজ নিয়ে চলে গিয়েছিল উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। পাহাড়ের সেই নিস্তব্ধতা ছিল নীলাদ্রির সঙ্গী। কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে যখন ভোরের প্রথম রোদ পড়ত, নীলাদ্রি ডায়েরি খুলে বসত। সে মেঘলাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেনি। মানুষ যাকে সত্যিই ভালোবাসে, তাকে ভুলে যাওয়ার ভণ্ডামি করতে পারে না। বরং নীলাদ্রি মেঘলার স্মৃতিকে তার শক্তির উৎস বানিয়ে নিয়েছিল।
মেঘলা একবার বলেছিল, "তুমি এমন কিছু একটা করো নীলাদ্রি, যাতে গোটা দেশ তোমার কাজের কদর করে। আমি গর্ব করে বলতে পারি, আমি এই মানুষটাকে ভালোবাসি।" সেই কথাটাই নীলাদ্রির ধ্যানের মন্ত্র হয়ে উঠল। রাত জেগে প্রাচীন শিলালিপি উদ্ধার, দুর্গম পাহাড়ি গুহায় ঘুরে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন খোঁজা নীলাদ্রি নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল কাজে। যখনই একাকীত্ব তাকে গ্রাস করতে আসত, যখনই বুকের ভেতরের ক্ষতটা টনটন করে উঠত, সে মেঘলার সেই হাসিটার কথা মনে করত। মনে করত সেই ভাঁড়ের চা, সেই কফি হাউস, আর গঙ্গার ঘাটে কাটানো অলৌকিক সন্ধ্যাগুলো। নীলাদ্রি উপলব্ধি করল, প্রেম মানে কেবল একসঙ্গে থাকা নয়। প্রেম মানে হলো কারও অনুপস্থিতিতেও নিজেকে শ্রেষ্ঠ রূপে গড়ে তোলার এক অনন্ত সাধনা।
বছর পাঁচেক কেটে গেল। নীলাদ্রির গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক স্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করল। বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের ওপর তার লেখা বই জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হলো। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার ডাক এল। সে এখন আর সেই সাধারণ, অবহেলিত বেকার ছেলেটি নয়। সে এখন ড. নীলাদ্রি মুখোপাধ্যায়, এক অনন্য গবেষক ও অধ্যাপক। কিন্তু খ্যাতি, প্রতিপত্তি, সম্মান,কোনো কিছুই নীলাদ্রির বুকের ভেতরের সেই পুরোনো প্রেমকে একবিন্দু ম্লান করতে পারেনি। তার ঘরের পড়ার টেবিলের কোণে আজও যত্ন করে সাজানো আছে একটা শুকনো কৃষ্ণচূড়া ফুল আর জীবনানন্দের সেই কবিতার বইটা, যা সেদিন বৃষ্টির বিকেলে ফুটপাতে পড়ে যেতে নিয়েছিল। জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছিল নীলাদ্রি। সেদিনও আকাশটা মেঘলা ছিল। ঠিক পাঁচ বছর আগের সেই দিনটির মতো। অডিটোরিয়াম ভর্তি অধ্যাপক, ছাত্রছাত্রী আর গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। নীলাদ্রি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে তার বক্তব্য রাখছিল, তার কণ্ঠ ছিল গম্ভীর, প্রজ্ঞায় পূর্ণ। সে বলছিল তার লড়াইয়ের কথা, ইতিহাসের অতল থেকে সত্যকে তুলে আনার যাত্রার কথা।
বক্তব্যের শেষে সঞ্চালক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "ড. মুখোপাধ্যায়, এত তরুণ বয়সে এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে আপনার অনুপ্রেরণা কী ছিল? আপনার জীবনের এই অনন্য সৃষ্টির পেছনে কার হাত রয়েছে?" পুরো অডিটোরিয়াম নিস্তব্ধ। সবাই গভীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে মঞ্চের মানুষটির দিকে। নীলাদ্রি মাইকের সামনে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বৃষ্টিভেজা কলেজ স্ট্রিট, ভেসে উঠল ভেজা শাড়ির নীল আঁচল আর একজোড়া কান্নার নদী বয়ে যাওয়া চোখ।
নীলাদ্রি মৃদু হাসল। অত্যন্ত শান্ত অথচ আবেগমথিত কণ্ঠে বলল, "মানুষ যখন শূন্যতায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তাকে বাঁচিয়ে রাখে কোনো এক অদৃশ্য হাত। আমার জীবনে এমন একজন মানুষ ছিল, যে আমার হাত ধরে কোনোদিন আমার পাশে চলার সামাজিক অধিকার পায়নি। কিন্তু আমার প্রতিটি ব্যর্থতায়, প্রতিটি নির্ঘুম রাতে সে আমার বিশ্বাসের ক্যানভাস হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার আজকের এই অস্তিত্ব, এই পরিচয় তার সবটুকুই একজনের নীরব প্রার্থনার ফল। আজ যদি আমি নিজেকে একজন সফল মানুষ দাবি করতে পারি, তবে তার একমাত্র কারণ; আমার জীবনে সে এসেছিল।"
একটু থেমে নীলাদ্রি গভীর ভালোবাসায় উচ্চারণ করল, "তুমি ছিলে তাই, আমি আজ আমি হতে পেরেছি।"
পুরো হল ফেটে পড়ল করতালিতে। কিন্তু নীলাদ্রির চোখ তখন কাউকে খুঁজছিল না। সে জানত, যার উদ্দেশ্যে এই কথা, সে হয়তো বহু দূরে তার নিজের সংসারে ব্যস্ত।
অনুষ্ঠান শেষে সংবর্ধনার ভিড় আর শুভেচ্ছার হাত থেকে কোনোমতে নিষ্কৃতি পেয়ে নীলাদ্রি একা একা হেঁটে এল বিশ্ববিদ্যালয়ের লনে। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামছে। ঠিক আগের মতোই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হঠাৎ লনের একপ্রান্তের মেহগনি গাছের নিচে একটা ছাতা বন্ধ হয়ে গেল। নীলাদ্রির পায়ের গতি থমকে গেল। বুকের ভেতর এক প্রবল আলোড়ন। ছাতার আড়াল থেকে যে নারীটি বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে, তার পরনে একখানা ধূসর জামদানি শাড়ি। চোখে চশমা, চুলে পরিপাটি খোঁপা। মুখের সেই চঞ্চলতা আর নেই, কিন্তু সেই চোখের গভীরতা, সেই ঠোঁটের কোণের পরিচিত স্নিগ্ধতা, একবিন্দুও বদলায়নি। মেঘলা।
দুজনে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে। সময়ের চাকা যেন উল্টো ঘুরতে শুরু করল। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো অপ্রাপ্তির হাহাকার নেই, শুধু এক পরম তৃপ্তির নীরব দৃষ্টি বিনিময়। মেঘলা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার হাতে ধরা একটা ছোট ক্যানভাস।
"তুমি আসবে, আমি জানতাম," নীলাদ্রির গলা সামান্য কেঁপে উঠল।
মেঘলা তার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে জল টলটল করছে, কিন্তু ঠোঁটে এক অপূর্ব হাসি।
"আমি আসব না, তা কি হতে পারে?" মেঘলা খুব শান্ত গলায় বলল, "যার প্রতিটি শব্দে আমি বেঁচে থাকি, তাকে দেখার জন্য কি কোনো নিমন্ত্রণের প্রয়োজন হয়?"
"তুমি কেমন আছো মেঘলা?"
"আমি খুব ভালো আছি নীলাদ্রি," মেঘলা বলল, "বাইরে থেকে দেখলে হয়তো আমার একটা খুব সাজানো, নিখুঁত সংসার আছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি সেই তোমার কাঁধে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে থাকি।"
মেঘলা তার হাতের ক্যানভাসটি নীলাদ্রির দিকে বাড়িয়ে দিল। নীলাদ্রি অবাক হয়ে মোড়কটা খুলল।
ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে এক অপূর্ব চিত্রকর্ম। এক বৃষ্টিভেজা বাসলাইন, একটা পুরোনো বইয়ের দোকানের ছাদ, আর ছাতার নিচে দুটি ছায়া মানুষঁ একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে অনন্তকালের এক আলো আঁধারিতে। ছবির নিচে ছোট করে মেঘলার তুলিতে লেখা: ‘তুমি ছিলে তাই’।
"আমার বিয়েটা শেষ পর্যন্ত টেকেনি নীলাদ্রি," মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, তার গলায় কোনো তিক্ততা ছিল না, ছিল কেবল এক পরম মুক্তি। "বাবা যখন চলে গেলেন, আমি বুঝতে পারলাম জোর করে কোনো খাঁচায় আটকে থাকা যায় না। যে সম্পর্কে আত্মা নেই, সেখানে অভিনয় করে জীবন কাটানো পাপ। আমি গত দুই বছর ধরে সাভারে থাকি। বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখাই।"
নীলাদ্রি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না তার কানকে।
"তুমি... তুমি একা?"
মেঘলা মৃদু হাসল। সেই হাসিতে তার গালে আবার সেই পাঁচ বছর আগের পরিচিত টোল পড়ল। সে এগিয়ে এসে নীলাদ্রির কুর্তার বোতামে হাত ছোঁয়াল। ঠিক যেমনটা সে আগে করত। "আমি কোনোদিন একা ছিলাম না নীলাদ্রি। আমার সমস্ত একাকীত্ব জুড়ে তো তুমি ছিলে। আমি শুধু অপেক্ষায় ছিলাম, যেদিন তুমি নিজের সব দায়িত্ব শেষ করে, নিজের যোগ্য সম্মান নিয়ে এই শহরের বুকে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবে, সেদিন আমি এসে তোমার হাতটা ধরব।" বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখন পাতা বেয়ে তাদের দুজনের গায়ে ঝরে পড়ছিল। কিন্তু এবার আর কোনো ছাউনির নিচে আশ্রয়ের প্রয়োজন ছিল না। নীলাদ্রি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে মেঘলার দুহাত নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় টেনে নিল। "আর কোনোদিন হারিয়ে যাবে না তো?" নীলাদ্রির চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। মেঘলা নীলাদ্রির বুকে তার কপালটা রাখল। পাঁচ বছর আগে যেখানে সে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল, আজ সেখানে নেমে এল এক অনন্ত, গভীর শান্তি।
"কোথায় যাব আমি?" মেঘলা ফিসফিস করে বলল, "আমার সমস্ত পথের শেষ তো তোমার এই বুকের ভেতর। তুমি ছিলে তাই আমি আজও বেঁচে আছি নীলাদ্রি, তুমি ছিলে তাই আমি আবার ভালোবাসতে পেরেছি।"
সন্ধ্যার অন্ধকার তখন প্রকৃতিকে ঢেকে দিয়েছে। রাস্তায় নিয়ন বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে একের পর এক। বৃষ্টিভেজা রাজপথ দিয়ে একটা গাড়ী চলে গেল ঘণ্টার মিষ্টি আওয়াজ তুলে। আর সেই বৃষ্টিধোয়া লনে দাঁড়িয়ে রইল দুটি আত্মা, যারা সমাজ, দূরত্ব আর সময়ের সমস্ত কঠিন সীমানা পেরিয়ে প্রমাণ করে দিল, যে ভালোবাসায় ত্যাগ আর সাধনা থাকে, তা কোনোদিন পরাজিত হয় না। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। দুটি হৃদয়ের সেই নীরব স্বীকারোক্তি যেন বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল…
"তুমি ছিলে তাই, এই জীবন এত সুন্দর হলো।"