মনটা খারাপ হয়ে আছে শফিকের। বাড়ি থেকে মা ফোন করেছেন, বাবার শরীরটা খুব খারাপ। বাবা অসুস্থ ছিলেন, গত তিন মাস ধরেই বিছানায়। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বড় কোন ঘটনা ঘটে যায়নি তো? দ্বিতীয়বার বাড়িতে ফোন করতে সাহস করলো না। অফিস হতে বেরিয়ে সোজা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে হাজির হলো।
শফিকের অফিসের বস ভালো মানুষ। ছয় মাস হলো এখানে জয়েন করেছে। এটাই শফিকের প্রথম চাকুরী। বস ভদ্রলোক তাকে হাতে কলমে কাজ শেখাচ্ছেন এখনো। শফিক খুব দ্রুতই শিখে নিচ্ছে কাজ। জয়েন করার পর হতে আজ অবধি কোন ছুটি নেয়নি শফিক।
দুপুর পেরিয়ে গেছে। বেলা তিনটা বেজে গেছে। এখন বাসে উঠলে ঘণ্টা চারেকের মাথায় বাড়ি পৌছা যাবে। বাসে উঠে শফিকের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। বাবার কথা মনে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাড়ি গেলেই জিজ্ঞেস করতেন, কবে লেখাপড়া শেষ হবে, সংসারের হাল ধরতে হবে, ছোট বন্যতার দায়িত্ব নিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। মাঝে মাঝে এসব কথা শুনে অস্বস্তি লাগতো। কিন্তু বাবা মুরুব্বী মানুষ, নিজে থেকেই এসব কথা বলতেন বলে চুপ করে শুনে যেতো। এ চাকুরীটা হবার পর বাবা খুব খুশী হয়েছিলেন। চাকুরীর সংবাদ জানার পর বাজার হতে মিষ্টি আনিয়ে পাড়াপড়শিকে খাইয়েছেন। সারাটা জীবন নিজে একা একা সামলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের শেষ দিকে বাবা নিয়মিত টাকা দিতে পারতেন না। অবশ্য ততদিনে শফিক টিউশনি শুরু করেছে। টিউশনির টাকা হতে সে’ই বাড়িতে নিয়মিত টাকা পাঠাতো। শফিক জানে, প্রতিবার বাড়িতে টাকা পৌঁছালে সেদীনতা বাড়িতে একটা অন্যরকম আনন্দের দিন হতো। ঐ দিন বাবা এবং মা দুজনেই কয়েকবার ফোন করতেন। সংসারের বড় সন্তানের বিবেচনাবোধ থাকুক বা না থাকুক, দায়িত্ববোধ এমনিতেই চলে আসে। টিউশনির টাকায় ঢাকায় কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন কাটানো হয়তো যেতো, কিন্তু এ টাকাটা বাড়ি পাঠালে সবাই মিলে ভালো থাকার একটা অন্যরকম তৃপ্তিতে বুক ভোরে যেতো। বাবার বয়েস হয়েছে। বিশুদ্ধ কৃষকের সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুয়ার পর্যন্ত আনতে তাঁকে কম পরিশ্রম করতে হয়নি। ছোটবোনটা আগামীবছর এইচ এস সি পরীক্ষা দেবে। তাকে নিয়েও শফিক ভেবেছে। ভালো রেজাল্ট করলে সেও যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, সেজন্য মাঝে মাঝেই ছোটবোনকে ফোনে বলে শফিক।
বাবার শরীরটা আসলে গত দুই তিন বছর ধরেই ভালো না। কিডনিতে সমস্যা। ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছিলো সপ্তাহে একবার করে গত ছয় মাস ধরে। ভালো চিকিৎসা বা ভালো ডাক্তারের ভাগ্য সবার সংগতিতে কুলায়না। বাবার চিকিৎসার ব্যপারটা নিয়ে ভাবলেই শফিকের শুধু মনে হতো, আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে বড় কিছু আর পৃথিবীতে হতে পারে না। এজন্যেই চাকুরীটা পাবার পর থেকেই মন দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছে সে। এবং সে এখন পর্যন্ত খুব ভালো করেই আসছে।
ভাবতে ভাবতে ঘড়ির দিকে তাকালো শফিক। আর বেশী সময় লাগবে না বাড়ি পৌঁছাতে। তবে শীতকাল বলে তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা হয়ে যায়। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মিঁয়াবাজারে বাস থেকে যখন নামলো, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। এখান হতে তার বাড়ি মাইল তিনেক। রিকশায় যাওয়া যায়। রিকশা হতে নামার পর পাকা রাস্তা হতে নেমে কাঁচা রাস্তায় আধ মাইলের মতো যেতে হয় বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত।
শফিক একটা রিকশা নিয়ে নিলো। তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছানো দরকার। মনটা খারাপ। দুপুরের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাড়ি থেকে কেউ ফোন করেনি। অন্ধকার রাস্তায় রিকশা সাই সাই বেগে চলছে। ইদানীং এ এলাকায় সকল রিকশাই ব্যাটারি রিকশা। এখন মনে হয় কৃষ্ণপক্ষ। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অবশ্য অন্ধকার হলেও শফিকের কোন সমস্যা হচ্ছেনা। রিকশাতে এল ই ডি বাটি লাগানো আছে। সে বাতিতে রাস্তা ভালোই দেখা যাচ্ছে আট দশ হাত পর্যন্ত।
রিকশা হতে নেমে পিঠের ব্যাগটা ভালো করে পিঠে ঝুলিয়ে নিলো। এখন এই মোড় হতে মেঠো পথে এগোতে হবে। পাশেই দুটো চা স্টল আছে। শফিকের একবার মনে হলো, চা দোকানে গিয়ে চা খেয়ে রওনা দেই। আবার কি মনে করে চা খাবার ভাবনাটা মাথা থেকে ঝেরে ফেলল। এ সময় লক্ষ্য করল, পাশের চা স্টলটা হতে একজন মাঝবয়সী লোক এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই শফিক অবাক হয়ে গেলো, বাবা এখানে। শফিকের মনটা ভালো হয়ে গেলো। যাক, বাবা ভালো আছেন। তবে খুব দূর্বল হয়ে গেছে। হাঁটছেন আস্তে আস্তে। পাশে শফিক। শফিকের মনে একটা আশ্চর্য প্রশান্তি। শফিকের বাবাই প্রথম কথা শুরু করলেন।
-তুই আজ হঠাৎ এ সময়ে বাড়ি আসলি যে!
শফিক মূল কারণতা না বলে বলল,
-আজ আপনাদেরদেখতে খুব মন চাইছিল বাবা। তাই হুট করেই চলে এলাম।
-আমার খুব ভালো লাগছে, তুই এসেছিস। আমিও ইদানীং ভাবছিলাম, তুই যদি একবার বাড়ি আসতি, তবে খুব ভালো হতো।
-কেন বাবা? কোন জরুরী কিছু কি ছিলো বলার মতো? আপনিতো আমাকে ফোন করেই বলতে পারতেন।
-নাহ, ততো জরুরী নয়। তবে তোর জানা থাকা ভালো, সেজন্য ভাবছিলাম।
-বলেন বাবা।
-আমাদের জমিগুলো সব তো তুই চিনিসই না। তাই আমার মনে হয়েছিলো, যদি বাড়ি আসতি তবে জমিগুলো চিনিয়ে দিতাম।
-আচ্ছা বাবা, কাল সকালে তোমার সাথে যাবো জমিগুলো দেখে আসার জন্য।
-আমি তোর বড় মামাকে বলে রেখেছি। সেই সব চিনিয়ে দেবে। আমার শরীরটা অতো ভালো না। এতো হাঁটতে পারবোনারে বাবা। আর শোন, তোর ছোট বোনের দায়িত্বটা মাথায় রাখিস।
-বাবা, আপনি ওকে নিয়ে টেনশন করবেন না। আমি ওকে বলে রেখেছি। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা ভালো করলে ওকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে।
-তোর মা, সোজা মানুষ। দুনিয়াদারী বুঝে না। তোর অনেক দায়িত্ব রে, বাবা।
-বাবা, আপনি এভাবে বলবেন না। আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, আমি আপনাদের দেখাশোনা করবোনা।
-না রে বাবা, মাঝে মাঝে মনে হয়, তোকে বলে রাখি। অন্তত মনে রাখিস আমার কথাগুলো।
হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির কাছাকাছি এসে গেছে। শফিক বলল,
-এইতো বাড়ি এসে গেছি আমরা।
-তুই ভেতরে যা। আমি পুকুরে গিয়ে অজু করে আসি। এশার নামাজটা পড়তে হবে।
-জ্বী বাবা। বলে শফিক বাড়ির ভেতরের দিকে এগোলো।
বাড়ির ভেতরে পা দিতেই দেখল উঠানে অনেক লোকজন। শফিক কিছুটা বিস্মিত হয়ে থমকে দাঁড়ালো। অন্ধকারে ভিড়ের মধ্য হতে হারিকেন হাতে নিয়ে মা আর ছোট বোনটা এগিয়ে এলো। শফিককে দেখেই ছোটবোনটা চিৎকার দিয়ে শফিককে জড়িয়ে ধরে বলল,
-ভাইয়া, বাবা আর নাই রে! বলেই আর্তচিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করে দিলো। সেই সাথে উপস্থিত লোকজন সমস্বরে কান্না শুরু করে দিলো।
শফিক অবাক হয়ে উঠোনে বাবার খাটিয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবছে, বাবাতো এইমাত্র তার সাথে কথা বলে পুকুরে অজু করতে গেলেন!
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.