Critic

নভেরা- শিল্পে রহস্যময়ী মলাটবদ্ধ এক মানবী

September 28, 2026

20 views

প্রচলিত জীবনীভিত্তিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে প্রকাশিত হাসনাত আবদুল হাই এর “নভেরা” উপন্যাসটি। লেখক আত্মপক্ষ সমর্থন করে তার নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, “এটা উপন্যাস, জীবনী বা ইতিহাস নয়”। কথাসাহিত্যিকের স্বাধীনতা থেকেই মূলত তিনি এটি বলেছেন।

তাইতো মলাটের শেষ লেখা থেকে ধার করে বলতেই হয়, “হারিয়ে যাওয়া অসাধারণ এক শিল্পীকে, জেদী সংবেদী তরুণীকে বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে আনা শুধু নয়, তাকে আজকের দিনের পটভূমিকায় প্রাসঙ্গিক ও সজীব চরিত্রে রূপান্তর করেছেন হাসনাত আবদুল হাই”।

নভেরা আহমেদ এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ঔজ্জ্বল্যতার বাইরে ব্যক্তিগত জীবনের বৈশিষ্ট্যগত বর্ণনায় যতটুকু আসে তা এরকম- তিনি বোহেমিয়ান ছিলেন, সময়ের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন, নারী স্বাধীনতার পথিকৃৎ ছিলেন, প্রথম বাঙালি ভাস্কর ছিলেন। এবং অবশ্য উল্লেখ্য যে, তিনি আমাদের জাতীয় শহীদ মিনারের একজন উল্লেখযোগ্য নকশাকারও ছিলেন।

১৯৫৬ সালে নভেরা ও হামিদুর রহমান দলীয়ভাবে বায়ান্নর ভাষা শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে শহীদ মিনার কমপ্লেক্সের নকশা করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই নকশায় তৈরি হয় আমাদের জাতীয় শহীদ মিনার। ইতিহাসের পাতায় এখানে নভেরা আহমেদ বিশেষভাবে উপেক্ষিত। কি কারণে?- তা হাসনাত আবদুল হাই আমাদেরকে এই উপন্যাসে জানাননি। একজন পাঠক হিসেবে এই কৌতূহল আমাদের মধ্যে চিরকাল থাকবে।

নভেরা ছিলেন সর্বদা কন্ট্রোলের বাইরে। অল্প বয়সে বিয়ের পরে স্বামী কন্ট্রোল করতে চাইলে স্বামী ত্যাগ করেছেন। প্রেমিকের কাছে মন বেঁধে গেলে মুক্ত হবার জন্য প্রেমিক বাদ দিয়েছেন। একটি ঘোরতর বাঙালি পরিবারে জন্ম হলেও মনমানসিকতা পেয়েছিলেন পশ্চিমাদের মতো উড়নচণ্ডী। সেটা তার স্বাধীনতায়, স্বভাবে, চরিত্রে ও সম্পর্কে বারংবার বিশেষায়িত হয়েছে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাঙালি নারীদের রক্ষণশীলতার পর্দা ছিঁড়ে অবাধ চলাফেরা, আধুনিক পোশাক-পরিচ্ছদ, শিল্পের জন্য সংগ্রামী জীবনযাপন তাকে দেশজুড়ে তুমুল আলোচনায় ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু এর মাঝেও যেটা আশাজাগানিয়া ছিল সেটা হলো- শিল্পকর্মে তার অভূতপূর্ব আবির্ভাব; এবং সেটার যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৮ সালে শিল্পী হামিদুর রহমানের সাথে তার যৌথ আর্ট প্রদর্শনীর মাধ্যমে।

সাংস্কৃতিকভাবে নভেরা আহমেদ ফরাসি দর্শনে প্রভাবিত হয়েছিলেন। সার্ত্রে আর সিমনের কাছে অস্তিত্ববাদের আদর্শ ধার দেনা করে অবশেষে ফ্রান্সেই কাটান দেনা পরিশোধের জন্য। আর তাই লেখক বলেছেন, প্যারিস চিরদিন-ই বোহেমিয়ানদের স্বর্গ। নভেরার জন্য তা নির্বাসন হলেও হয়ত ভুল ছিল না। নির্বাসিত হলেও তার জীবন কেটেছে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে। এর প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬০ সালে নভেরা আহমেদের একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী ‘অন্তদৃষ্টি’ দিয়ে। দেশ বরেণ্য তৎকালীন শিল্পীবর্গ বৃত্তের বাইরে গিয়ে এমন কাজে জড়িত হবার জন্য নভেরা আহমেদ এর ভূয়সী প্রশংসা করেন।

হাসনাত আবদুল হাই শুধু চারিত্রিক ও ব্যবহারিক বর্ণনেই থেমে যাননি। তিনি ভেবে দেখেছেন, শিল্পী হিসেবে নভেরা আহমেদ কেমন ছিলেন, তার শিল্প কর্মের উৎকর্ষের বিচার কিভাবে করা হয়েছে! এতে নভেরার নানান এক্সিবিশনের চিত্র, শিল্পের দাবি ও শিল্পের জন্য ত্যাগ, পরিশ্রম, সামাজিক প্রতিকূলতা সকল কিছু তুলে ধরা হয়েছে।

অনেকে বলে থাকেন, ভাস্কর হেনরি মুর আর বারবারা হেপওয়ার্থের শিল্পকর্মের প্রভাব ছিল নভেরার কাজে। এটা তিনিও জানতেন; তাই শুধু অনুকরনে লিপ্ত হয়ে ক্ষান্ত হননি, এর সাথে নিজস্ব আত্মার সম্মীলন ঘটিয়েছিলেন বেশ বোঝাপড়া করেই।

ভাস্কর্য ও শিল্পের ব্যাপারে নভেরা আহমেদ ছিলেন অতি সচেতন। নিজের চোখে কোনো দৃশ্যের অনুধাবন না নিয়ে সেই কাজে হাত দিতেন না। তিনি মনে করতেন, “তা প্রাণহীন হয়ে যায়”। নভেরা স্বাধীনতার পাশাপাশি স্বকীয়তাতেও বিশ্বাসী ছিলেন। নিজের তীক্ষ্ণ কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে অন্তিমে এসে নিজের স্টাইল বের করে এনেছেন।

অবশেষে ১৯৭০ সালের থাইল্যান্ডে নভেরার দ্বিতীয় ভাস্কর্য প্রদর্শনীতে নিজস্ব শিল্পভাবনার উন্মোচন ঘটে। পাশাপাশি হেনরি মুর বা বারবারা হেপওয়ার্থ এর থেকে নিজের আলাদা অবস্থানটা বিশ্বের কাছে প্রকাশ করেন নভেরা আহমেদ। শিল্পবোদ্ধারা এটাকেই নভেরার সবেচয়ে বড় সাফল্য মনে করেন। এরপরে নভেরা হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক ভাস্কর, প্রবাসেই তার জীবন অতিবাহিত হয়।

নভেরার একটা আনপপ্যুলার আন্দোলন ছিল সমাজের সাথে; সেটি হলো- নারী-শিশুর জীবনের মধ্যে অন্তর্নিহিত অর্থ সম্বন্ধে কৌতূহল জাগানোর উদ্দেশ্যেই মূলত শিল্পকে নিত্যদিনের সঙ্গী করা আবশ্যক। এতে শিল্পী ও সমাজ সংস্কারী নভেরা আহমেদ কতটুকু সাফল্য পেয়েছে তা আজকের সামাজিক চিত্র থেকে আমরা অবলোকন করতে পারি।

তার বিল্পবী কিছু চিন্তা ও সংস্কার পদক্ষেপ আজও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। বোধ করি, এই কারণেই তার মৃত্যুর তিন বছর পরেও ফ্রান্সে ২০১৮ সালে ‘নভেরা আহমেদ মিউজিয়াম’ নামে জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়।

তথাকথিত সাহিত্যের মতো উপমার বর্ণনাও কম ছিল না উপন্যাসজুড়ে। উপন্যাসের প্রথম অংশটায় নভেরার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে বলা হলেও তার রুদ্রাক্ষের মালার মতো লেখক এঁটে-সেটে বলেছেন শিল্প জীবনের চড়াই উতরাই নিয়ে।

উপন্যাস হিসেবে হাসনাত আবদুল হাই এর উপস্থাপন একটু ব্যতিক্রম। আসলে লেখক ব্যতিক্রমী হতে বাধ্য হয়েছেন কারণ নভেরার জীবনের প্রতিটি ধাপকে এখানে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। নভেরা মনে করতেন, “শিল্পীদের মাঝে মাঝে উধাও হয়ে যেতে হয়”। একজন স্বেচ্ছায় হারানো ব্যক্তির ব্যাপারে তথ্য পাওয়া কোনো সহজ কাজ নয় নিশ্চয়ই।

পাঠক হিসেবে আমরা ঔপন্যাসিক হাসনাত সাহেবের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞ যে, জটিলতম একটি বিষয়ে হাত দিয়ে তিনি এই রহস্যমানবীকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন, যা তার সময়ে কেউ করে দেখানোর সাহস জোগায়নি। যদিও পরবর্তীতে শিল্পী নভেরা আহমেদ এর জীবনীভিত্তিক আরও বেশ কিছু পুস্তক প্রকাশ পেয়েছে কখনও নভেরার রূপ, কখনও তাকে রহস্যমানবী চিহ্নিত করে, কখনও নভেরার বিভুঁই-স্বভূম নিয়ে।

যেটাই হোক- নভেরাকে জানার সুযোগ হয়েছে, দেখার সুযোগ হয়েছে, বোঝার সুযোগ হয়েছে এটাই কম কিসে! বর্তমান প্রজন্মে হয়ত কেউ নভেরাকে ধারণ করছে, তার কাজে প্রভাব ফেলছে নভেরার শিল্প, সে চেষ্টা করে যাচ্ছে নভেরাকে ছাপিয়ে নিজের ফর্ম বের করে আনার। এইতো, নভেরা এখনও প্রসঙ্গগতভাবেই প্রবাহিত হয়ে চলেছে বেশ।
-------------
গ্রন্থ বিবরণীঃ
গ্রন্থের নামঃ নভেরা
লেখকঃ হাসনাত আবদুল হাই
প্রকাশকালঃ ১৯৯৫ খ্রি.
প্রচ্ছদঃ অশোক কর্মকার
প্রচ্ছদ মূল্যঃ ১২৬/-
পৃষ্ঠা পরিধিঃ ২০০
প্রকাশকঃ সাহিত্য প্রকাশ

(এই লেখাটি #মাসিক_নাগরিক পত্রিকা, মার্চ ২০২৬ সংখ্যায় ছেপেছে।)

#হাবিব_রহমান #সাহিত্য #বাংলা_সাহিত্য #বই_পর্যালোচনা #সাহিত্য #শিল্প #নভেরা

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login