উন্মাদ আশ্রম উপন্যাসটি কয়েকটি জনরার মধ্যে অন্তর্ভুক্তি দাবি করে। এখানে থ্রিলার আছে, সামাজিকতার পরিপূর্ণ ছোঁয়া পাওয়া যায়, জাদুবাস্তবতার আংশিক আভাসও নিবিষ্ট হয়েছে অতিযত্নে। উন্মাদ আশ্রমে স্বপ্ন ও বাস্তবতার এক অদৃশ্য সুতো পাকানো শক্ত টান উপলব্ধি করা যায়। উপন্যাসের মূল চরিত্র জহির এই উপন্যাসে নায়ক রূপে অধিষ্টিত হয়েছে নাকি ভিলেন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরবে উৎসুক পাঠক। আত্ম-দ্বান্দিকতার চূড়ান্ত বিবরণ রয়েছে এতে। একটা জীবন বঞ্ছিত মানুষ যখন জীবনের বোধকে উল্টো পথে নিয়ে গিয়ে পরিচালন করে, সেটার পক্ষেই যুক্তি খণ্ডন করে বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করে তখন চলে আসে স্বপ্ন-বাস্তবতা-সত্য-মিথ্যার বহুমিশ্র জঞ্জাল। লেখক ওবায়েদ হোক প্রতিটি লেখায় তার সর্বোচ্চ ঢেলে দেন। অতি সাধারণ একটা গল্প নিয়ে কাজ করতে করতে দর্শন, উপমা সবকিছু এমনভাবে যুক্ত করেন যেন ওই মুহূর্তে লেখকের বক্তব্যটি না হলে অপূর্ণ থেকে যেত। ঔপন্যাসিক ওবায়েদ যতটা একজন লেখকের মস্তিস্কে লিখেন তার চেয়ে তিনি পাঠকের চিন্তাগুলো বেশি ক্যাপচার করতে পারেন, তিনি জানেন কোন মুহূর্তে উপমা দিলে একটি পূর্ণাঙ্গ এবস্ট্রাক্ট দাঁড়াবে, সাহিত্য শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছাবে; তিনি ভালো ভাবেই বোঝেন কোন দৃশ্যপটে দর্শন ঢোকালে কথোপকথনগুলো বোরিং হবে না, বরং পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাটাকে আকর্ষণ করে ফেলবে। এর মাঝেও আরও কিছু ব্যাপার থাকে যেগুলো সবসময় মনে গেঁথে যায়, কিছু কথা, কিছু শব্দ, কিছু বাক্য। সাধারণ একটি ঘটনার বিবরণে অসাধারণ তরিকায় বলতে পারার ক্ষমতাই মূলত ওবায়েদ হকের বিশেষত্ব। একারণেই ওবায়েদ হক এতটা নিশ্চুপ, তিনি জানেন তার লেখনীর শক্তি কতটুকু; সূর্যকে তার তাপের বর্ণনা দিতে হয় না। তিনি নীরবতার ভাষায় কিছু বার্তা দিচ্ছেন, আমার গল্পের শব্দগুলো আপনাকে আমার দিকে টানতে বাধ্য করবে। যদিও এত বিশাল এই অভিনবত্বের মনিব হয়েও তিনি একজন নিরহঙ্কারী লেখক। এক্ষেত্রে গল্পের একটি লাইন বলতে ইচ্ছে করে, “অহংকার করার ক্ষমতা যাদের আছে কেবল তারাই এমন নিরহংকার হতে পারে।” সমাজ-অর্থনীতি-দারিদ্রতা-অসঙ্গতিগুলোর সম্মিলিত দৃষ্টিকোণ কখনও এই গ্রন্থে সিরিয়াসভাবে কখনও হাস্য-রস মিলিয়ে পরিহাসের ভাষায় বর্ণনা করেছেন। উপন্যাসের মূল চরিত্রটিই এমন যেখানে মানুষ ঠকানোর জন্য সকল পেশার মানুষের ব্যাপারে রীতিমতো গবেষণা চালাতে হয়, লেখক একটু বাড়িয়ে বলেছেন, এত গবেষণা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা করতে পারে না। কাজেই, এত বিশ্লেষণধর্মী একটা পেশার মানুষকে নিয়ে এত সুন্দর, মেদহীন, ঝরঝরে ভঙ্গিমায় বলে দিতে পারলেন যে আমার মতো ওবায়েদ ভক্তদের পছন্দ না হয়ে উপায় থাকেনি। অন্যতম প্রিয় একটি বইয়ের তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি বই। এর আগেও জলেশ্বরী, নীল পাহাড় উভয়ই আমার ভীষণ প্রিয় ছিল। হয়ত দিন অতিক্রান্ত হবার সমানুপাতে হক সাহেব আমার পছন্দের মাত্রা বাড়িয়েই তুলবেন। গল্পের বিষয়বস্তুর সাথে প্রচ্ছদ অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বই বিষয়ক তথ্যগুলোঃ
বইয়ের নাম- উন্মাদ আশ্রম
লেখক- ওবায়েদ হক
প্রকাশকাল- অমর একুশে গ্রন্থমালা’ ২০২৫
প্রচ্ছদ শিল্পী- অনন্যা চক্রবর্তী
আলোচকঃ হাবিব রহমান
#habib_rahman #হাবিব_রহমান