Story

প্রেম এবং পায়েল

September 29, 2026

15 views

সকালের এগারোটা। কারওয়ান বাজারের চৌদ্দতলা কর্পোরেট টাওয়ারের দশম তলার ওপেন-স্পেস ফ্লোরে এয়ার কন্ডিশনারের একটানা গুঞ্জন ছাপিয়ে কিবোর্ডের খটখট শব্দ চলছিল। কিন্তু সেই যান্ত্রিক শান্ত পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে উঠল মারুফের একটি অসাবধানী মন্তব্যে। প্যান্ট্রির কফি মেশিন থেকে ধোঁয়া ওঠা মগ হাতে নিয়ে মারুফ ফিরছিল। পাশে কলিগ রাশেদ আক্ষেপ করে বলছিল, তার স্ত্রীর নতুন চাকরির কারণে ঘরে কাজের লোক সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। জবাবে মারুফ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, নিজের সিটে বসার সময় বলে বসল-

“আসলে ভাই, দিনশেষে নারীদের ঘরের কাজে বা রান্নাবান্নাতেই বেশি মানায়। কর্পোরেটের এই অহেতুক ইঁদুরদৌড়ে ওদের প্রকৃতিগত ভারসাম্যটাই তো নষ্ট হয়ে যায়।”

কথাটা বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বিপরীতের কিউবিকল থেকে একটা ফাইল টেবিলে আছড়ে পড়ার শব্দ হলো। ফাইলের আড়াল থেকে যে মুখটি বেরিয়ে এল, তার নাম পায়েল হক। সিনিয়র ক্লায়েন্ট সার্ভিসিং ম্যানেজার। চোখের তীব্র দৃষ্টিতে যেন বারুদ ছিটকে পড়ছে। পরনে ধূসর ফর্মাল কুর্তি, কপালে ভাঁজ, আর হাতে ধরা বলপেনটা শক্ত করে চেপে ধরা। পায়েল সোজা দাঁড়িয়ে গেল। পুরো ফ্লোরের আট-দশ জোড়া চোখ মুহূর্তে তাদের দিকে ঘুরে তাকাল।

“এক্সকিউজ মি, মারুফ সাহেব!” পায়েলের কণ্ঠস্বর ঠান্ডা অথচ ধারালো। “কী বললেন আপনি? মেয়েদের ঘরেই মানায়? আপনি কোন শতাব্দীতে বাস করছেন শুনি?”

মারুফ থমকে গেল। সে আশা করেনি কিউবিকলের ওপার থেকে কেউ ওত পেতে থাকবে। তবে নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে সে পিছু হটল না। কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল, “আমি তো বায়োলজিক্যাল ফ্যাক্ট আর আমাদের সমাজের অভিজ্ঞতার কথাই বলেছি, পায়েল। অতিরিক্ত উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই।”

“বায়োলজিক্যাল ফ্যাক্ট?” পায়েল টেবিলে দুই হাত রেখে সামনের দিকে ঝুঁকল। “মেয়েরা আজ কোথায় আপনাদের থেকে পিছিয়ে আছে বলুন তো? নাসার মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমানের ককপিট-কোন ক্ষেত্রটায় মেয়েরা নেই? এমনকি এই ফ্লোরে, গত কোয়ার্টারে আপনার চেয়ে আমার টিম পঁচিশ শতাংশ বেশি রেভিনিউ এনেছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আপনি এমন একটা মধ্যযুগীয় মন্তব্য করার সাহস পান কী করে?”

মারুফের ইগোতে তীব্র চোট লাগল। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা পায়েলের মুখোমুখি হলো। “গত কোয়ার্টারে বেশি রেভিনিউ পাওয়াটা যোগ্যতার চেয়ে সুযোগ আর ক্লায়েন্টের মেজাজের ওপর বেশি নির্ভর করেছিল, পায়েল! বাস্তবটা মেনে নিন, যখন প্রেশার আর দীর্ঘ কাজের চাপ সামলানোর প্রশ্ন আসে, তখন আবেগ বাদ দিয়ে যুক্তি আর শক্ত মানসিকতাই দিনশেষে কাজ করে। সেখানে মেয়েদের স্বভাবসুলভ আবেগী মনোভাব প্রায়ই কাজের গতি কমিয়ে দেয়।”

“আবেগ?” পায়েলের চোখ দুটো জ্বলে উঠল। “আবেগ দুর্বলতা নয়, মারুফ! কিন্তু আপনাদের মতো সংকীর্ণমনা কিছু পুরুষ যখন অযোগ্যতার ভয়ে কাঁপে, তখনই মেয়েদের ‘ঘরে মানায়’ বলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে চায়। সাহস থাকলে কাজে প্রমাণ করুন, এমন সস্তা ডায়লগ না দিয়ে!”

“আমি আমার কাজে কী পারি না পারি, সেটা আমাকে এমডি স্যারের কাছে প্রমাণ করতে হয়, আপনার মতো কাউকে নয়,” মারুফ ক্ষুরধার স্বরে বলল।

ততক্ষণে ফ্লোরের পরিবেশ পুরো বরফ হয়ে গেছে। কলিগরা শ্বাস আটকে দেখছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই কেবিন থেকে বের হয়ে এলেন ম্যানেজিং ডিরেক্টর আশরাফ সাহেব। তিনি চশমা নাকের ডগায় নামিয়ে গম্ভীর গলায় ডাকলেন, “মারুফ, পায়েল! আমার রুমে আসুন। এক্ষুনি।”

এমডির কাঁচের ঘরের ভেতর মারুফ আর পায়েল দাঁড়িয়ে রইল পরস্পরের থেকে দুই হাত দূরত্বে, যেন একে অপরের গায়ের বাতাসও বিষাক্ত। আশরাফ সাহেব ফাইল থেকে মুখ তুলে তাকালেন। “তোমাদের এই বাচ্চাদের মতো রেষারেষি পুরো অফিসের কর্মপরিবেশ নষ্ট করছে, তোমরা কি সেটা বুঝতে পারছ?”

পায়েল কিছু বলতে গেল, কিন্তু আশরাফ সাহেব হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। “কোনো ব্যাখ্যা শুনতে চাই না। তবে একটা চমৎকার সুযোগ এসেছে তোমাদের দুজনের জন্যই নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের। বহুজাতিক ফুড ব্র্যান্ড ‘নেক্সজেন’-এর তিনশো কোটি টাকার বার্ষিক ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং ও পিআর ক্যাম্পেইনের পিচ আগামী মাসে। ক্লায়েন্ট চায় ইউনিক কিছু। আমি তোমাদের দুজনকে এই প্রজেক্টের কো-লিড করছি।”

“হোয়াট?” দুজনেই একসাথে আঁতকে উঠল।

মারুফ দ্রুত বলল, “স্যার, ওর কাজের ধরন আর আমার চিন্তাধারা সম্পূর্ণ বিপরীত। একসঙ্গে কাজ করলে প্রজেক্ট মাঠে মারা যাবে।”

“আর আমি কোনো কূপমণ্ডূক মানুষের সাথে টিমওয়ার্ক করতে পারব না, স্যার,” পায়েল সাফ জানিয়ে দিল।

আশরাফ সাহেব শান্ত কিন্তু দৃঢ়ভাবে বললেন, “যদি তোমরা একসঙ্গে এই ক্যাম্পেইন ডিজাইন করে অ্যাকাউন্টটা আনতে পারো, তবে বছরের শেষে কান্ট্রি হেড অব অপারেশন্সের খালি পোস্টটা তোমাদের দুজনের একজন পাবে। আর যদি ব্যর্থ হও, তবে কোম্পানি তোমাদের দুজনের বিষয়েই নতুন করে ভাববে। ইউ মে গো নাও।”

কেবিন থেকে বের হয়ে এসে মারুফ দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “চমৎকার! এখন নিজের কাজের সাথে সাথে একজন নারীবাদী বক্তার লেকচারও সহ্য করতে হবে।” পায়েল তার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় চোখের চশমাটা ঠিক করে বলল, “ভুল ভাবছেন। লেকচার নয়, এবার শুধু নিজের পরাজয় দেখতে প্রস্তুত থাকুন।”

পরবর্তী দুই সপ্তাহ অফিসের তিন নম্বর কনফারেন্স রুমটা পরিণত হলো এক নিরবচ্ছিন্ন রণক্ষেত্রে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সেখানে কাচের বোর্ডে মার্কার ঘষার খচখচ শব্দ, কফির কাপের স্তূপ আর দুজনের তপ্ত তর্কাতর্কি। মারুফ সব কিছুকে দেখতে চায় নিখুঁত পরিসংখ্যান, ডাটা অ্যানালিটিক্স আর যুক্তির দাঁড়িপাল্লায়। আর পায়েল জোর দেয় হিউম্যান ইমোশন, গল্প বলা আর পারিবারিক অনুভূতির ওপর।

“তুমি কি পাগল পায়েল?” মারুফ হোয়াইটবোর্ডে মার্কার দিয়ে একটা ক্রস এঁকে বলল। “খাবারের ব্র্যান্ডিংয়ে মানুষ এত আবেগ খোঁজে না! তারা দেখতে চায় স্বাস্থ্যকর উপাদান, দাম আর ইনস্ট্যান্ট সুবিধার হিসাব।”

পায়েল চেয়ার ঠেলে দাঁড়িয়ে বলল, “মানুষ রোবট নয় মারুফ! একজন মা বা কর্মজীবী নারী যখন ঘরে খাবার টেবিলে কিছু পরিবেশন করে, সে শুধু পুষ্টির হিসাব করে না, সে পরিবারের হাসি আর ভালোবাসার তৃপ্তি খোঁজে। যে বিজ্ঞাপনে মন ছোঁবে না, সে বিজ্ঞাপন দিয়ে তুমি কেবল ডাটা বানাতে পারবে, বিক্রি বাড়াতে পারবে না।”

“তোমার এই ইমোশনাল মেলোড্রামা কোনো কর্পোরেট পিচে টেকে না,” মারুফ কটাক্ষ করল।

“তাহলে তুমি তোমার ড্রাই চার্ট নিয়ে আলাদা প্রেজেন্টেশন দাও, আমি ক্লায়েন্টকে আসল গল্পটা বলি!” পায়েল চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল। তর্ক করতে করতে রাত দশটা বেজে গেল। ফ্লোরের অন্য সবাই ততক্ষণে চলে গেছে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। কাঁচের জানালায় বৃষ্টির জলের ধারা এসে আছড়ে পড়ছিল। পায়েল ল্যাপটপে কাজ করতে করতে ক্লান্তিতে চোখ মুছল। গত তিন রাত ধরে তার ঠিকমতো ঘুম নেই। হঠাৎ করেই সে খেয়াল করল, তার সামনে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ ক্যাপুচিনো রাখা হলো। পায়েল মাথা তুলে দেখল, মারুফ কফির কাপটা রেখে নিজের সিটে ফিরে যাচ্ছে।

পায়েল ভুরু কুঁচকে বলল, “এটা কিসের জন্য? বিষ মেশানো নেই তো?”

মারুফ চেয়ার ঘোরানোর সময় একটা ক্লান্তিভরা হাসি দিল। এই প্রথম তার মুখে সেই অহংকারী ভাবটা ছিল না। “বিষ দিলে তো প্রজেক্টের পুরো খাটনিটাই আমার একা করতে হবে। আর সত্যি বলতে, ব্ল্যাক কফির চেয়ে বেশি তিতকুটে তর্ক তো তুমি নিজেই করতে পারো, কফিতে বিষ লাগবে কেন?” পায়েল চমকে উঠল। লোকটার রসবোধ যে এমন মার্জিত হতে পারে, সে কখনো ভাবেনি। কফির কাপে চুমুক দিতেই অদ্ভুত এক উষ্ণতা তার ক্লান্ত শরীরটাকে ছুঁয়ে গেল। কফিটা নিখুঁত হয়েছে-ঠিক যেমনটা সে পছন্দ করে, চিনি ছাড়া, হালকা দারুচিনির গুঁড়ো ছিটানো।

পায়েল মৃদু গলায় বলল, “থ্যাংকস।”

মারুফ নিজের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই বলল, “তোমার ক্যাম্পেইনের ‘মায়ের স্মৃতি’ অংশটার আইডিয়াটা আসলে খারাপ নয়। তবে ওটার সাথে আমাদের ডিজিটাল রিচ অ্যানালাইসিসটা জুড়ে দিলে ক্যাম্পেইনটা অপ্রতিরোধ্য হবে।” পায়েল তাকাল মারুফের দিকে। স্ক্রিনের নীল আলোয় মারুফের তীক্ষ্ণ চোয়াল, কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুল আর নিবিষ্ট চোখ দুটো কেমন যেন মায়াবী দেখাচ্ছিল। পায়েল দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিল। নিজের মনের ভেতরে এই অপ্রত্যাশিত দোলাচল তাকে কিছুটা অপ্রস্তুত করে তুলল।

পিচিংয়ের ঠিক তিন দিন আগের ঘটনা। রাত প্রায় এগারোটা। কনফারেন্স রুমে শুধু মারুফ আর পায়েল। পুরো ডেক প্রায় প্রস্তুত, শুধু ফাইনাল স্লাইডগুলোর রিহার্সাল বাকি। হঠাৎ করেই পুরো বিল্ডিংয়ের বিদ্যুৎ চলে গেল। জেনারেটর চালু হতে কয়েক মুহূর্ত সময় নেওয়ার কথা, কিন্তু কোনো এক যান্ত্রিক ত্রুটিতে পুরো টাওয়ারই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে রইল। বাইরে তখন প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া বইছে। কাঁচের জানালায় বাতাসের ধাক্কা লাগার বিকট শব্দ।

“মারুফ?” পায়েল অন্ধকারের মাঝে কিছুটা কেঁপে উঠল।

“ভয় পেয়ো না, আমি এখানে,” মারুফের শান্ত কণ্ঠস্বর শোনা গেল। সে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাল।

আলোর বৃত্তে দেখা গেল পায়েল চেয়ারে শক্ত হয়ে বসে আছে। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

মারুফ কাছে এগিয়ে এসে বলল, “তুমি কি অন্ধকার ভয় পাও?”

পায়েল কোনো লুকোচুরি করল না। ঢোক গিলে বলল, “ছোটবেলায় একবার তিন ঘণ্টা লিফটে আটকে ছিলাম। সেই থেকে দমবন্ধ অন্ধকার দেখলে কেমন যেন প্যানিক অ্যাটাক হয়।”

মারুফ কোনো কথা না বলে নিজের মোবাইলটা টেবিলের ওপর উল্টো করে রাখল, যাতে আলোটা ঘরের সিলিংয়ে প্রতিফলিত হয়ে নরম এক আভা তৈরি করে। তারপর সে পায়েলের পাশের চেয়ারটা টেনে এনে বসল।

“তাহলে এক কাজ করা যাক,” মারুফ মৃদু হেসে বলল, “কথা বলা যাক। কথা বললে মনোযোগ সরে যাবে।”

পায়েল হালকা শ্বাস নিয়ে বলল, “কী নিয়ে কথা বলব? নারীবাদ বনাম পুরুষতান্ত্রিক সমাজ?”

মারুফ শব্দ করে হেসে উঠল। সেই প্রথম তার প্রাণখোলা হাসি শুনল পায়েল। “আজ আর কোনো বিতর্ক নয়। আচ্ছা বলো তো, তুমি এত রাগ নিয়ে চলো কেন? মনে হয় যেন সারা পৃথিবীর সাথে তোমার কোনো অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে।”

পায়েল অন্ধকারের ছায়ার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কারণ এই সমাজে একজন মেয়েকে নিজের জায়গা তৈরি করতে প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিতে হয়, মারুফ। বাবা মারা যাওয়ার পর যখন আমি পরিবারের দায়িত্ব নিলাম, আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে সবাই বলেছিল-‘মেয়ে মানুষ, কয়দিন টানবে? বিয়ে দিয়ে দাও।’ আমি প্রতিটি পদে লড়াই করে আজ এখানে এসেছি। তাই যখন কেউ হাসতে হাসতে বলে ‘মেয়েদের রান্নাঘরেই মানায়’, তখন মনে হয় আমার এই দশ বছরের রক্তজল করা সাধনা এক নিমেষে কেউ অস্বীকার করে দিল।”

কনফারেন্স রুমে কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা নেমে এল। মারুফ তাকিয়ে রইল পায়েলের দিকে। আত্মবিশ্বাসী, উদ্ধত যে মেয়েটাকে সে অফিসে দেখত, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই সংবেদনশীল, একাকী যোদ্ধাকে সে কখনো কল্পনা করেনি। মারুফ খুব ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “আমি সত্যিই দুঃখিত, পায়েল। সেদিন রাশেদের সাথে কথা বলার সময় আমি হয়তো সমাজ থেকে পাওয়া একটা ক্লিশে চিন্তা কোনো ভাবনাচিন্তা ছাড়াই বলে ফেলেছিলাম। কিন্তু তোমার সাথে এই দুই সপ্তাহ কাজ করার পর আমি বুঝেছি-কাজের প্রতি তোমার যে প্যাশন আর গভীরতা, তা প্রশংসনীয়। তুমি কোনো অংশেই কারও চেয়ে কম নও।”

পায়েল চোখ তুলে তাকাল। অন্ধকারের আবছা আলোয় মারুফের চোখের সততা তার বুক ছুঁয়ে গেল। যে মানুষটাকে সে উদ্ধত আর অহংকারী ভাবত, সে এত সহজে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে?

“আর তুমি?” পায়েল প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইল। “তুমি এত কাজের পাগল কেন? কখনো হাসতে দেখিনি তোমায়।”

মারুফ ম্লান হাসল। “মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে। বাবার ঋণের বোঝা, ছোট বোনের পড়াশোনা, সব আমার কাঁধে। ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ আমার নেই। ভয় পাই, একটু আবেগ দেখাতে গেলেই যদি ভেঙে পড়ি। তাই কাজের চার্ট আর টার্গেটের শক্ত খোলসে নিজেকে আটকে রেখেছি।”

দুজনেই নিঃশব্দে চেয়ে রইল একে অপরের দিকে। যে দেওয়ালগুলো এতদিন তাদের আলাদা করে রেখেছিল, এক ঝড়ের রাতের অন্ধকারে সেই দেওয়ালগুলো নিঃশব্দে ধসে পড়তে শুরু করল।

পায়েল খেয়াল করল, তার ভয়ের কাঁপুনিটা কখন যেন থেমে গেছে। মারুফের উপস্থিতি ঘরের অন্ধকারটাকে ভয়ংকর নয়, অদ্ভুত এক শান্ত আশ্রয়ে পরিণত করেছে।

পিচিংয়ের দিন। নেক্সজেনের বোর্ডরুমে ক্লায়েন্টের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা বসে আছেন। মারুফ আর পায়েল যখন মঞ্চে দাঁড়াল, পুরো ফ্লোরে এক অদ্ভুত রসায়ন ছড়িয়ে পড়ল। মারুফ যখন নির্ভুল ডাটা আর স্ট্র্যাটেজি তুলে ধরছিল, পায়েল তখন তার স্বভাবসুলভ মাধুর্য আর গল্পের বাঁধনে ক্লায়েন্টদের আবেগ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। যুক্তি আর আবেগের এক নিখুঁত মেলবন্ধন। ক্লায়েন্টরা মুগ্ধ হয়ে শুনল। প্রেজেন্টেশন শেষে ক্লায়েন্টের গ্লোবাল সিইও নিজে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলেন। “ফ্যান্টাস্টিক! ডাটা আর ইমোশনের এমন ব্যালেন্সড কাজ আমরা বহুদিন দেখিনি। দিস অ্যাকাউন্ট ইজ ইওরস, টিম!” অফিসে ফেরার পর পুরো ফ্লোর করতালিতে ফেটে পড়ল। আশরাফ সাহেব নিজে এসে দুজনের পিঠ চাপড়ে দিলেন। “আই অ্যাম সো প্রাউড অব ইউ বোথ!”

উচ্ছ্বাসের মাঝে পায়েল হঠাৎ মারুফের চোখের দিকে তাকাল। মারুফও তার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। এক অপূর্ব বিজয়ের আনন্দ, কিন্তু সেই চোখের ভাষায় যেন বিজয়ের চেয়েও বেশি কিছু লেখা ছিল-এক গভীর মুগ্ধতা। সন্ধ্যায় অফিসের সবাই পার্টি করতে ক্লাবে গেল। কিন্তু পায়েল পার্টির ভিড় এড়িয়ে কিছুটা আগেই নিজের ডেস্কে ফিরে এল। কেন যেন কোলাহল তার ভালো লাগছিল না। তার মন পড়ে ছিল অন্য কোথাও।

ডেস্কে বসে সে যখন ল্যাপটপ ব্যাগে ভরছিল, মারুফ এসে তার কিউবিকলের পাশে দাঁড়াল। পরনে গাঢ় নীল ব্লেজার, চুলগুলো পরিপাটি।

“পার্টি ছেড়ে এখানে কী করছ, কো-পার্টনার?” মারুফ জিজ্ঞেস করল।

“পার্টি ভালো লাগছিল না। বাড়ি ফিরব,” পায়েল ব্যাগ কাঁধে নিল।

মারুফ একটু ইতস্তত করে বলল, “তোমাকে কি একটু ড্রপ করতে পারি? কথা ছিল।”

পায়েল কোনো আপত্তি করল না। নিঃশব্দে তার পাশে এসে দাঁড়াল।

মারুফের গাড়ির ভেতর এসি চলছে, এফএম রেডিওতে খুব মৃদু সুরে বাজছে পুরোনো এক রোমান্টিক গান। বাইরে ঢাকার রাতের সোডিয়াম বাতিগুলো কাঁচের ওপর হলুদ আলোর আঁকিবুঁকি কাটছে। দুজনেই চুপচাপ। কিন্তু এই নীরবতা অস্বস্তিকর নয়, এক ভারী, নিবিড় আবেগে মোড়া। হাতিরঝিলের এক্সপ্রেসওয়েতে এসে মারুফ হঠাৎ গাড়িটা একপাশে থামাল।

পায়েল অবাক হয়ে তাকাল, “এখানে থামলে কেন?”

মারুফ গাড়ি থেকে নামল। “একটু নামো না।”

লেকের ব্রিজ ঘেঁষে দুজন দাঁড়াল। রাতের ঠান্ডা বাতাস লেকের জলে কাঁপন তুলে তাদের গায়ে এসে লাগছিল। দূরে শহরের আলোকোজ্জ্বল স্কাইলাইন। মারুফ পকেট থেকে ছোট্ট একটা ভেলভেটের বাক্স বের করল। পায়েল চমকে উঠল। তার বুকটা কেঁপে উঠল এক অজানা স্পন্দনে। “মারুফ, এটা কী?”

মারুফ বাক্সটা খুলল। ভেতরে কোনো হিরের আংটি ছিল না। কালো মখমলের ওপর জ্বলজ্বল করছিল একজোড়া রূপার নূপুর যাকে বাংলায় বলে ‘পায়েল’। ঝিনুকের মতো সূক্ষ্ম কারুকাজ, আর ছোট ছোট রূপার ঘুঙুর।

পায়েল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। মারুফ খুব ধীরস্থির, আন্তরিক কণ্ঠে বলল, “অফিসে সবাই তোমাকে চেনে তোমার তেজস্বী, কঠোর রূপ দিয়ে। কিন্তু আমি সেই ঝড়ের রাতে দেখেছি তোমার ভেতরের সেই নিষ্পাপ, অনুভূতিপ্রবণ মানুষটাকে। প্রথম দিন তুমি বলেছিলে, মেয়েরা আমাদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। তুমি ভুল ছিলে পায়েল। তুমি আমার চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই, বরং তুমি আমার চেয়ে অনেক এগিয়ে আছো। তুমি আমার অহংকার ভেঙে আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছ।”

মারুফ এক কদম এগিয়ে এল। তার চোখে তখন শহরের সমস্ত আলো এসে ভিড় করেছে। “আমি এই উপহারটা কোনো বাঁধন হিসেবে দিচ্ছি না। ঝগড়া তুমি সারা জীবন কোরো আমার সাথে, আমি একবিন্দু আপত্তি করব না। তবে আমি চাই, আমার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তোমার এই উপস্থিতি বাজুক। তুমি কি আমার জীবনের সেই সুর হবে, পায়েল?”

পায়েলের চোখ ভিজে উঠল। যে মেয়েটি নিজেকে পাথর বানিয়ে রেখেছিল এই কঠোর কর্পোরেট দুনিয়ায়, যে কখনো কারও কাছে নতি স্বীকার করেনি, সে এক নিমেষে ভেঙে পড়ল একরাশ ভালোবাসায়। সে কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে মারুফের শক্ত হাত দুটো আঁকড়ে ধরল।

“তুমি খুব খারাপ মারুফ,” পায়েল হাসতে হাসতেই চোখ মুছল। “একটা রূপার পায়েল দিয়ে আমাকে পুরো কিনে নিলে?”

মারুফ হেসে ফেলল, সেই মায়াবী হাসি। “আমি তোমাকে কেনার সাহস করব কীভাবে? আমি তো শুধু নিজেকে তোমার কাছে সমর্পণ করার অনুমতি চাইছি।”

পায়েল মারুফের বুকে নিজের কপালটা রাখল। তার সমস্ত ক্লান্তি, দশ বছরের লড়াই আর একাকীত্বের ক্ষতগুলো যেন মারুফের এই এক টুকরো আলিঙ্গনে জুড়িয়ে গেল। মারুফ আলতো করে নিজের হাত দুটো পায়েলের পিঠে জড়িয়ে ধরল। লেকের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস তাদের ভিজিয়ে দিয়ে গেল।

যেখানে শুরু হয়েছিল এক অহংকারের দ্বন্দ্ব, এক তপ্ত ঝগড়া আর মতভেদের ব্যবধান সেখানেই আজ পূর্ণতা পেল এক অকৃত্রিম প্রেম। জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলো হয়তো এভাবেই আসে; ঝড়ের বেশে এসে হৃদয়কে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায়, আর দিনশেষে রেখে যায় শান্ত, অবিচ্ছেদ্য এক ভালোবাসার পায়েল।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login