Story

টিউডর গোলাপ এবং টেমস নদী

September 29, 2026

13 views

লন্ডনের শীতের বিকেলগুলো বড় দ্রুত ফুরিয়ে যায়। কুয়াশা আর হালকা বৃষ্টির আবছা চাদরে মোড়া টেমস নদীর জল তখন নিস্তরঙ্গ, শীতল। ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজের রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল তানভীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ চুকিয়ে কিংস কলেজ লন্ডনে ইতিহাস নিয়ে মাস্টার্স করতে আসা এক তরুণ। চোখে তার একরাশ স্বপ্ন আর বুকের গভীরে ফেলে আসা রোদঝলমলে বুড়িগঙ্গা ও পলাশ ফুলের দেশের মায়া। লন্ডনের কনকনে বাতাসে তানভীরের হাতে থাকা পেপার কাপের ব্ল্যাক কফিটা প্রায় জুড়িয়ে এসেছিল। ব্রিজের ওপারে বিগ বেনের বিশাল ঘড়িটা তখন ঘণ্টার ধ্বনি তুলল ঢং, ঢং, ঢং। চারটা বেজে গেছে। ঠিক তখনই বাতাসটা এক অদ্ভুত মোড় নিল। নদীর দিক থেকে ছুটে আসা এক ঝাপটা হিমেল হাওয়া রেলিং ঘেঁষে হেঁটে যাওয়া এক তরুণীর হাতের ভারী স্কেচবুকটা উড়িয়ে নিয়ে ফেলল তানভীরের ঠিক পায়ের কাছে।

বাতাসের তোড়ে খাতাটির পাতাগুলো দ্রুত উল্টে যাচ্ছিল। তানভীর নিচু হয়ে বইটি তুলে নিল। প্রথম পাতায় জলরঙে আঁকা এক অদ্ভুত প্রতীক একটি লাল গোলাপের ঠিক কেন্দ্রে ফুটে রয়েছে একটি ছোট্ট সাদা গোলাপ। ঐতিহাসিক চোখের দৃষ্টিতে তানভীরের তা চিনতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না। বিখ্যাত ‘টিউডর গোলাপ’ (Tudor Rose) ল্যাঙ্কাস্টারের লাল আর ইয়র্কের সাদা গোলাপের মিলনচিহ্ন, যা পঞ্চদশ শতকে ইংল্যান্ডের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের ইতি টেনে ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

"ওহ, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ! বাতাসটা আজ বড্ড অবাধ্য," একটি মিষ্টি, মার্জিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।

তানভীর চোখ তুলে তাকাল। স্কার্ফে মুখ কিছুটা ঢাকা, খোলা সোনালী চুলের কিছু অবাধ্য অংশ বাতাসে উড়ছে, আর সেই মুখের মাঝে জ্বলজ্বল করছে দুটি নীলাভ চোখ ঠিক যেন ইংল্যান্ডের হেমন্তের নীল আকাশ। তরুণীর নাম এলেনর। পুরো নাম এলেনর হাওয়ার্ড। ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ পরিবারের মেয়ে, কিংস কলেজেই ফাইন আর্টস নিয়ে পড়ছে। "ওয়েলকাম," তানভীর স্কেচবুকটা বাড়িয়ে দিয়ে স্মিত হেসে বলল, "তবে অঙ্কনটি চমৎকার। বিশেষ করে টিউডর গোলাপের এই ডাবল-লেয়ার পাপড়িগুলো। সপ্তম হেনরি এই ছবি দেখলে নিশ্চয়ই আর্ট কমিশনের জন্য আপনার কাছেই আসতেন।" এলেনর কিছুটা বিস্মিত চোখে তাকাল। তারপর তার মুখে ফুটে উঠল এক অপূর্ব হাসি। "লন্ডনের পথেঘাটে দাঁড়িয়ে একজন এশিয়ান তরুণের মুখে টিউডর ইতিহাসের প্রশংসা শোনা সত্যিই বিরল! আপনি কি ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন?"

"হ্যাঁ, কিংস কলেজে। আমি তানভীর, বাংলাদেশ থেকে এসেছি।"

"আমি এলেনর। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে শীতে জমে যাওয়ার চেয়ে সাউথব্যাঙ্কের কোনো ক্যাফেতে বসে এই ইতিহাসবিদকে এক কাপ কফি খাওয়ানো আমার দায়িত্ব বলেই মনে হচ্ছে।"

টেমস নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সেদিন এভাবেই রোপিত হয়েছিল এক নতুন পরিচয়ের বীজ। পরবর্তী দিনগুলো যেন অদ্ভুত এক ভালোলাগার স্রোতে ভেসে যেতে লাগল। তানভীর ও এলেনরের দেখা হওয়াটা আর কাকতালীয় রইল না, তা অভ্যাসে পরিণত হলো। ক্লাসের ফাঁকে কখনও স্ট্র্যান্ড ক্যাম্পাসের লাইব্রেরির কোণে, কখনও সাউথব্যাঙ্কের কাঠের বেঞ্চে বসে বই পড়া। তানভীর এলেনরকে শোনাত মোঘল ইতিহাসের জটিল সমীকরণ, বাংলার বারো ভুঁইয়াদের লড়াই, লালন আর রবীন্দ্রনাথের গান। আর এলেনর তানভীরকে চেনাত লন্ডনের প্রতিটি প্রাচীন ইটের পেছনের গল্প রোমান দেয়াল থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় রাজপরিবারের রহস্য।

একদিন তারা গেল হ্যাম্পটন কোর্ট প্যালেসে। অষ্টম হেনরির সেই সুবিশাল প্রাসাদের সুসজ্জিত বাগানে হাঁটতে হাঁটতে এলেনর তানভীরের হাতটা হঠাৎ টেনে ধরল।-"এই দেখো তানভীর, আসল টিউডর গার্ডেন," এলেনর একটি লাল-সাদা মিশ্রিত গোলাপ গাছের সামনে দাঁড়িয়ে বলল। "তুমি তো জানো, এই গোলাপের পেছনে কত রক্তপাত, কত বিচ্ছেদ লুকিয়ে আছে? লাল আর সাদার যুদ্ধ কত পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা আর সমঝোতাই শান্তি এনেছিল।"

তানভীর এলেনরের গভীর চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে তখন এক অচেনা আর্তি। তানভীর শান্ত গলায় বলল, "ইতিহাস আমাদের শেখায়, রক্তপাত সাময়িক, কিন্তু যা হৃদয়ের বন্ধনে জুড়ে যায়, তা চিরন্তন। যেমন এই গোলাপ দুটি ভিন্ন ঘরানার মিলন ঘটিয়ে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য পরিচয়।" এলেনর নিঃশব্দে এক চিলতে হাসল। তার হাতটা তানভীরের ওভারকোটের উষ্ণ পকেটের ভেতর ঢুকে গেল। টেমসের ঠান্ডা হাওয়া তাদের স্পর্শ করতে পারল না।

তবে প্রেমের পথ কোনোদিনই মসৃণ হয় না না পঞ্চদশ শতকের রাজপরিবারে, না একুশ শতকের আধুনিক লন্ডনে। এলেনরের পরিবার প্রাচীন আভিজাত্যের অন্ধ অহংকারে বিশ্বাসী। তার বাবা, স্যার রিচার্ড হাওয়ার্ড, লন্ডনের এক প্রভাবশালী আইনজীবী ও সাবেক কূটনীতিক। যখন তিনি জানতে পারলেন তাঁর একমাত্র কন্যা এক সাধারণ বিদেশী, বাদামী বর্ণের বাংলাদেশী ছাত্রের প্রেমে পড়েছে, তখন তাঁদের সারে-র সুপ্রাচীন ম্যানরে ঝড় উঠল।

একদিন লাইব্রেরি থেকে বেরোতেই এলেনর তানভীরকে টেনে নিয়ে গেল ওয়াটারলু ব্রিজের কাছে। এলেনরের মুখ ফ্যাকাসে, চোখের নিচে কান্নার স্পষ্ট দাগ।-"বাবা মেনে নেবেন না, তানভীর," এলেনরের গলা ভেঙে এলো। "তিনি চান আমি লর্ড আর্চিবল্ডের ছেলেকে বিয়ে করি। তাঁর মতে, আমাদের সংস্কৃতি, সমাজ, রক্তের কোনো মিল নেই। বাবা আমাকে কালই এডিনবরায় পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন..." টেমসের বুকে তখন কুয়াশা নামছে। চারপাশ কেমন যেন ধূসর আর নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছে। তানভীরের বুকটা এক গভীর বেদনায় মোচড় দিয়ে উঠল। সত্যিই তো, সে দূর প্রাচ্যের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, যার সম্বল কেবল কিছু বই আর ভালোবাসা। কিন্তু ভালোবাসার কি কোনো সীমানা থাকে?

তানভীর এলেনরের দুটো হাত নিজের শক্ত মুঠোয় তুলে নিল। "এলেনর, তোমার বাবা রক্তের অহংকার দেখেন, কিন্তু হৃদয়ের মিল দেখেন না। তুমি আমাকে শেখাওনি টিউডর গোলাপের গল্প? যেখানে বলা ছিল যদি লাল আর সাদা আলাদা থাকত, তবে শুধুই যুদ্ধ হতো। কিন্তু তারা যখন এক হলো, জন্ম নিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রতীক। আমাদের ভালোবাসা কি সেই গোলাপের চেয়েও দুর্বল?" এলেনর চোখের জল মুছে তানভীরের বুকে মুখ লুকাল। টেমস নদীর জল তখন জোয়ারের টানে দুকূল ছাপিয়ে বয়ে যাচ্ছিল।

স্যার রিচার্ডের সাথে মুখোমুখি দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল তানভীর। এটা ছিল এক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। রিচার্ড যখন লন্ডনের অভিজাত ক্লাবের এক প্রাইভেট লাউঞ্জে তানভীরকে দেখা করার অনুমতি দিলেন, তাঁর চোখেমুখে ছিল স্পষ্ট তাচ্ছিল্য আর শীতল ঔদাসীন্য। -"তরুণ যুবক, তুমি আমার কন্যাকে মোহিত করতে পারো, কিন্তু আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য আর মর্যাদার সাথে তোমার কোনো তুলনাই চলে না। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের এই মিলন কেবল কাব্যে মানায়, বাস্তবে নয়। তুমি নিজের দেশে ফিরে যাও," রিচার্ডের কণ্ঠ ছিল ছুরির মতো ধারালো।

তানভীর মাথা নিচু করল না। সে খুব বিনীতভাবে কোটের ভেতরের পকেট থেকে একটি অ্যান্টিক মেটাল ব্রোচ বের করে টেবিলের ওপর রাখল। এটি এলেনর তাকে হ্যাম্পটন কোর্ট থেকে উপহার দিয়েছিল একটি নিখুঁত ধাতব ‘টিউডর গোলাপ’।

"স্যার," তানভীর শান্ত কিন্তু অটল কণ্ঠে বলল, "এই প্রতীকটি আপনার দেশের সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়। আপনারা বিশ্বকে শিখিয়েছেন কীভাবে শত বছরের রক্তক্ষয়ী বৈরিতা ভুলে এক হওয়া যায়। লাল গোলাপ সাদা গোলাপকে ছোট করেনি, কিংবা সাদা গোলাপ লালকে মুছে দেয়নি। তারা একসঙ্গে ফুটে উঠে ইংল্যান্ডের সিংহাসনকে উজ্জ্বল করেছিল। আমার দেশ বাংলাদেশও রক্ত আর ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে। আমাদের চামড়ার রঙ বা সংস্কৃতির ধরন হয়তো আলাদা, কিন্তু প্রেমের ক্ষেত্রে হৃদয়ের রক্ত তো একই রঙের, স্যার। আপনি যদি আপনার পূর্বপুরুষদের এই প্রতীকের মর্যাদা দিতে না পারেন, তবে আভিজাত্যের দম্ভ শুধুই এক ফাঁকা খোলস।"

রিচার্ড স্তব্ধ হয়ে টেবিলের ওপর রাখা সেই ছোট্ট ব্রোচটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। বহু বছর কূটনীতিক হিসেবে তিনি কথা বলেছেন, কিন্তু এক তরুণের এমন নির্ভীক, গভীর ঐতিহাসিক যুক্তি আর ভালোবাসার সততা তাঁকে যেন এক মুহূর্তে বাকরুদ্ধ করে দিল। "তোমার সময় শেষ, তানভীর," রিচার্ড শুধু এটুকুই বললেন। কিন্তু তাঁর বরফশীতল কণ্ঠে এবার আর আগের মতো কাঠিন্য রইল না।

বসন্তের আগমন ঘটেছে লন্ডনে। টেমসের তীর ধরে চেরি ব্লসম আর ড্যাফোডিল ফুটতে শুরু করেছে। নদীর জল এখন আর আগের মতো ধূসর নয়, সকালের সোনালী রোদে তা ঝিলমিল করছে। সেদিন ছিল তানভীরের কনভোকেশনের দিন। সাউথব্যাঙ্কের রিভারসাইড ওয়াকওয়ে ধরে সে একা হাঁটছিল। ডিগ্রি শেষ, হয়তো এবার দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিতে হবে। গত এক মাস ধরে এলেনরের কোনো খবর নেই। সে কি তবে বাবার আদেশের কাছে মাথা নত করল? তানভীরের বুকের ভেতর এক অচেনা শূন্যতা।

"ইতিহাসবিদ কি একা একাই নদী দেখবেন, নাকি সাথে কাউকে নেবেন?"

চেনা কণ্ঠস্বর শুনে চমকে পেছনে ফিরল তানভীর।

সামনে দাঁড়িয়ে এলেনর। পরনে সাদা কোট, কিন্তু তার কোটের বাম কলারটিতে জ্বলজ্বল করছে সেই ধাতব ‘টিউডর গোলাপের’ ব্রোচটি। আর তার হাতে একগুচ্ছ তাজা লাল আর সাদা গোলাপ। তার পেছনে কিছুটা দূরে, টেমসের রেলিং ধরে শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছেন এক বয়োবৃদ্ধ ভদ্রলোক স্যার রিচার্ড হাওয়ার্ড। তিনি দূর থেকেই তানভীরের দিকে তাকিয়ে সম্মতির এক মৃদু মাথা নাড়লেন।

"এলেনর!" তানভীরের কণ্ঠ যেন রুদ্ধ হয়ে এলো। এলেনর ছুটে এসে তানভীরকে জড়িয়ে ধরল। বসন্তের মিষ্টি বাতাসে তাদের নিঃশ্বাস এক হয়ে গেল।

"বাবা তোমার ব্রোচটি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, তানভীর," এলেনর ভেজা চোখে হাসল। "বাবা বলেছেন যে মানুষ ভিন্ন দেশের হয়েও আমার দেশের ইতিহাসের আত্মাকে এত গভীরভাবে ভালোবাসতে জানে, সে আমার মেয়ের আত্মাকেও আজীবন আগলে রাখবে।" তানভীর এলেনরের হাত ধরে বুক ভরে টেমসের বাতাস নিল। টেমস নদী হয়তো বহু শতাব্দীর ভাঙাগড়া, উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী। সে দেখেছে টিউডরদের যুদ্ধ, দেখেছে সাম্রাজ্যের পতন। কিন্তু আজ সেই প্রাচীন নদীর পাড়েই রচিত হলো এক অমর অধ্যায় যেখানে সীমানা, বর্ণ আর সংস্কৃতির সমস্ত দেয়াল ভেঙে দিয়ে লাল আর সাদা মিলেমিশে এক হয়ে ফুটল এক অনন্য প্রেমের টিউডর গোলাপ।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login