Story

চা খেতে খেতে জমবে আড্ডা

October 1, 2026

9 views

শরতের শেষ বিকেলের নরম রোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সবুজ ঘাসের ওপর গলে পড়ছে। আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ, যেন তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। বাতাসের গায়ে তখন হালকা এক চিলতে শীতলতা, যা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। টিএসসি চত্বর মুখরিত তরুণ-তরুণীদের কলকাকলিতে কোথাও গিটারের তারে সুর উঠছে, কোথাও বা দেশের রাজনীতি নিয়ে গলা ফাটানো তর্ক। কিন্তু এই হাজারো চেনা শব্দের মাঝেও এক অদ্ভুত নীরবতা বয়ে নিয়ে আসছিল সোহেলের মন।সোহেল বসে ছিল মিলন চত্বরের পাশের সেই পুরোনো কড়ই গাছটার নিচে। সামনে কাঠের টুলে রাখা কাচের গ্লাস, তাতে ধোঁয়া উঠছে গরম অপরাজিতা চায়ের। নীলচে লিকারের ওপরে লেবুর রস পড়তেই তা বদলে গেছে হালকা বেগুনি রঙে। সোহেল পেশায় ফ্রিল্যান্স সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট। কোডের জটিল জালে আটকে থাকা জীবনটাতে তার ছুটির দিন মানেই এই এক কাপ চা আর মানুষের কোলাহল দূর থেকে দেখা।

“এখানে কি বসা যাবে? বাকি সব টুল দখল হয়ে গেছে।”

একটি শান্ত, অথচ স্পষ্ট কণ্ঠস্বর সোহেলের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে দিল। মুখ তুলে তাকাতেই সোহেলের চোখের পলক যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে এক তরুণী। পরনে সুতির ঘিয়ে রঙের কুর্তি, কাঁধে ঝুলছে শান্তিনিকেতনি চামড়ার ঝোলা ব্যাগ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চোখের তারায় অদ্ভুত এক মায়া আর ক্লান্তি মিলেমিশে আছে। বাতাসে তার কানের পাশের অবাধ্য এক গোছা চুল বারবার গালে এসে পড়ছে।

সোহেল ধাতস্থ হয়ে একটু সরে বসল। কাঠের টুলটা সামান্য এগিয়ে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। বসুন।”

মেয়েটি ধন্যবাদ জানিয়ে বসল। তারপর পাশেই ব্যস্ত চা-ওয়ালা মামাকে ডেকে বলল, “মামা, আদা আর এলাচ দিয়ে কড়া করে এক কাপ রঙ চা দিন তো, চিনি একদম কম।”

সোহেল নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল। মেয়েটি চশমার ওপর দিয়ে ভুরু কুঁচকে তাকাল, “হাসলেন যে?”

“না, মানে... সাধারণত মেয়েরা এখানে এসে চকলেট চা বা মালাই চায়ের অর্ডার দেয়। আদা-এলাচের কড়া রঙ চা একটু অন্যরকম শোনাল,” সোহেল একটু ইতস্তত করে বলল।

মেয়েটি হালকা হাসল। সেই হাসিতে যেন বিকেলের শেষ আলো এসে পড়ল। “আসলে সারাদিন জাদুঘরের আর্কাইভে পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে মাথাটা পুরো জ্যাম হয়ে আছে। মিষ্টি চা খেলে ঘুম পাবে, আর কড়া লিকারের চা মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে।”

“আপনি কি গবেষক?”

“বলা যায়। আমি অবন্তিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এমফিলের ছাত্রী। আর আপনি?”

“আমি সোহেল। কোড আর অ্যালগরিদমের জগতে বাস করি। যাকে সহজ ভাষায় বলে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।”

চা-ওয়ালা মামা ততক্ষণে ধোঁয়া ওঠা এক গ্লাস চা অবন্তিকার সামনে রেখে গেল। গরম কাচের গ্লাসের ওপর কাগজের পাতলা টুকরো পেঁচিয়ে অবন্তিকা তাতে প্রথম চুমুক দিল। এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ বন্ধ করল, যেন প্রতিটি উষ্ণ চুমুকে সে দিনের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে ফেলছে।

“আহ! চা খেতে খেতে আড্ডা না জমলে কি এই শহরের ক্লান্তি কমে?” অবন্তিকা চোখ মেলে তাকিয়ে হাসল।

সোহেলের মনে হলো, ঢাকার এই ধুলোবালি আর যানজটের ভিড়ে এমন এক কাপ চায়ের আড্ডা হয়তো সে বহু বছর ধরে খুঁজে ফিরছিল।

সেই প্রথম দিনের চায়ের আড্ডাটা ছিল মাত্র পনেরো মিনিটের। কিন্তু সেই পনেরো মিনিট যেন একটা গোটা উপন্যাসের সূচিপত্র লিখে দিয়ে গিয়েছিল। তারা একে অপরের ফোন নম্বর নেয়নি, কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার ঠিকানাও আদান-প্রদান করেনি। শুধু অবন্তিকা যাওয়ার সময় মৃদু হেসে বলেছিল, “যদি চা আপনাকে আবার টানে, তবে কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে আবার দেখা হতে পারে।” তারপর থেকে সোহেলের রুটিন বদলে গেল। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা বাজলেই তার পা দুটো স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিএসসির দিকে চলে যেত। প্রথম তিন দিন দেখা মেলেনি। সোহেল বসে একা একাই চা খেত, আশপাশের আড্ডার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। তার মনে হতো, ঢাকার মতো এত বড় শহরে একটা মানুষের সাথে দ্বিতীয়বার দেখা হওয়া বোধহয় কাকতালীয় ছাড়া সম্ভব নয়।

কিন্তু চতুর্থ দিন ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা। বৃষ্টি নেমেছিল হঠাৎ করেই। কার্তিক মাসের এই অসময়ের বৃষ্টিতে সবাই যখন এদিক-ওদিক ছুটছে, সোহেল তখন একটা চায়ের দোকানের প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে। ঠিক তখনই ভেজা চুলে, শাড়ির আঁচল বাঁচাতে বাঁচাতে সেখানে এসে ঢুকল অবন্তিকা। দুজনের চোখাচোখি হতেই অবন্তিকা হেসে ফেলল। বৃষ্টিভেজা মুখে সেই হাসি দেখে সোহেলের মনে হলো, আকাশে মেঘ নয়, যেন রঙের হোলি খেলা চলছে।

“আপনি তাহলে নিয়মিত আসেন এখানে?” অবন্তিকা কানের পেছনের চুল সরিয়ে বলল।

“আমি আসি চায়ের টানে... আর হয়তো একটু আড্ডার লোভে,” সোহেল অকপটে স্বীকার করল।

দোকানি মামা তাদের দিকে দুটো মাটির ভাঁড় এগিয়ে দিল। বৃষ্টির দিনে বিশেষ মসলা চা দারুচিনি, লবঙ্গ আর তেজপাতার সুবাসে বাতাস ভরে গেল।

মাটির ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে অবন্তিকা বলল, “বৃষ্টির দিনে গরম চায়ের চেয়ে বড় রোমান্টিক জিনিস পৃথিবীতে আর কিছু নেই, তাই না?”

“আমার কাছে বৃষ্টির চেয়ে এই চায়ের ধোঁয়া আর সামনের মানুষটার গল্প বেশি রোমান্টিক মনে হচ্ছে,” সোহেল বলেই ফেলল।

অবন্তিকা এক মুহূর্ত থমকে গেল। গালের কোণে হালকা রক্তিম আভা ফুটে উঠল, যা সে বৃষ্টির ঠান্ডার অজুহাতে আড়াল করার চেষ্টা করল। সে চায়ের ভাঁড়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল, “মানুষের গল্প তো সব সময় সুন্দর হয় না সোহেল সাহেব। কিছু গল্পে অনেক অপ্রাপ্তি থাকে।”

“সব গল্পে পরিণতি থাকতে হবে এমন তো কোনো নিয়ম নেই অবন্তিকা। কিছু গল্প শুধু পথের ধারের এক কাপ চায়ের মতোই সুন্দর যতক্ষণ থাকে, প্রাণ জুড়িয়ে দেয়।”

সেদিন বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তাদের আড্ডা চলল সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত আটটা পর্যন্ত। তারা কথা বলল রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প নিয়ে, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা নিয়ে, আবার সোহেলের কোডিংয়ের অদ্ভুত সব লজিক নিয়ে। অবন্তিকা অবাক হয়ে দেখল, এই সাধারণ ছেলেটার ভেতর সাহিত্যের প্রতি কী অদ্ভুত এক ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। আর সোহেল মুগ্ধ হয়ে দেখল, ইতিহাসের ধূসর পাতা নিয়ে কাজ করা এই মেয়েটির ভেতরে কতখানি প্রাণপ্রাচুর্য আর অনুভূতি জমে আছে। চা শেষ হলো, কিন্তু আড্ডার তৃষ্ণা যেন আরও বেড়ে গেল।

এরপর থেকে তাদের দেখা হওয়াটা নিয়মে পরিণত হলো। তারা আবিষ্কার করল, তারা দুজনেই ‘চা-প্রেমিক’। ঢাকাকে তারা নতুন করে চিনতে শুরু করল বিভিন্ন চায়ের দোকানের মানচিত্রে। কখনও তারা চলে যেত পুরান ঢাকার লালবাগের কেল্লার কাছে, যেখানে পাওয়া যায় জাফরান আর কাজুবাদাম দেওয়া নবাবী মালাই চা। মালাইয়ের ঘন স্তর মুখে নিয়ে অবন্তিকা চোখ বড় বড় করে বলত, “উফ সোহেল! এটা চা নাকি অমৃত? মোঘলরা নিশ্চয়ই এই চা খেয়েই তাজমহল বানানোর অনুপ্রেরণা পেয়েছিল।”

সোহেল তার ছেলেমানুষি দেখে হাসত। টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বলত, “মোঘলদের অনুপ্রেরণা ছিল মমতাজ, আর তোমার অনুপ্রেরণা এই মালাই চা!”

“ভালোবাসা তো চায়ের প্রতিও হতে পারে, তাই না?” অবন্তিকা চোখ টিপে বলত।

কখনও বা তারা চলে যেত ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরের লেকের পাড়ে। শীতের কুয়াশা তখন লেকের জলের ওপর চাদর বিছিয়ে দিত। লেকের পাড়ের কাঠের বেঞ্চে বসে কাগজের কাপে লেবু চা আর ঝালমুড়ি। সেখানে সোহেল তার জীবনের কথা বলত।

“জানিস অবন্তিকা,” সোহেল এখন তাকে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’-এর সীমানায় নিয়ে এসেছে, যা দুজনের সম্মতিতেই ঘটেছিল, “ছোটবেলায় যখন মা মারা যান, বাবা খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের বাড়িতে কোনো উৎসব হতো না, কোনো উচ্চবাচ্য হতো না। আমি বড় হয়েছি ভীষণ একা। একটা কম্পিউটার স্ক্রিন ছিল আমার একমাত্র সঙ্গী। মানুষ যে এভাবে মুখোমুখি বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু কথা বলে সময় কাটাতে পারে, এটা তোর সাথে পরিচয় না হলে আমি জানতামই না।”

অবন্তিকা নিঃশব্দে শুনত। লেকের ঠান্ডা বাতাস এসে লাগছিল তাদের গায়ে। সে নিজের উষ্ণ হাতের তালুটি সোহেলের জমে যাওয়া হাতের ওপর রাখল। সেই প্রথম স্পর্শ। কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিমতা। শুধু এক পরম নির্ভরতা।

“তুই আর একা নোস, সোহেল,” অবন্তিকা খুব শান্ত গলায় বলেছিল। “যতদিন এই শহরের চায়ের দোকানগুলো খোলা থাকবে, ততদিন প্রতি বিকেলে তোর এক কাপ চায়ের সঙ্গী হয়ে আমি থাকব।”

সোহেল অবন্তিকার হাতের দিকে তাকাল। সেই স্পর্শের উষ্ণতা তার বুকের ভেতর এক অচেনা কম্পন সৃষ্টি করল। সে বুঝল, এটা শুধু বন্ধুত্ব নয়, এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এই অনুভূতির নাম ভালোবাসা, যা প্রতিদিন এক কাপ চায়ের ধোঁয়ার সাথে একটু একটু করে মিশে গেছে তার রক্তে।
বসন্তের শুরুতেই অবন্তিকার পরিবারে একটা বিয়ের আলোচনা শুরু হলো। পাত্র কানাডাপ্রবাসী এক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, পারিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। অবন্তিকার মধ্যবিত্ত পরিবার এই সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না। বাবার শরীরটাও বেশ কিছুদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না, তিনি চান মেয়েকে একটা নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে যেতে।

খবরটা যেদিন অবন্তিকা সোহেলকে দিল, সেদিন চৈত্র মাসের এক তপ্ত বিকেল। তারা বসেছিল কার্জন হলের পেছনের একটা নিরিবিলি ঘাসের চত্বরে। চা-ওয়ালা মামা দিয়ে গেছে কাঁচা মরিচ আর পুদিনা পাতার স্পেশাল রঙ চা। কিন্তু সেই চায়ের কাপে আজ কেউ চুমুক দিচ্ছিল না। চা ঠান্ডা হয়ে কালচে রূপ নিচ্ছে।

“পাত্রপক্ষ আগামী শুক্রবার আমাকে দেখতে আসবে,” অবন্তিকার গলা কাঁপছিল। তার চোখ দুটো ছিল রক্তাভ, বোঝা যাচ্ছিল সারা রাত কেঁদেছে।

সোহেল মাটির দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বুকের ভেতরটা যেন খাঁ খাঁ মরুভূমি হয়ে গেছে। সে তো কেবল নিজের ক্যারিয়ার গড়তে শুরু করেছে। তার কোনো পৈতৃক বাড়ি নেই, ব্যাংকে জমানো বিপুল অর্থ নেই। অবন্তিকার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো সামাজিক প্রতিপত্তি তার কোথায়?

“তুই... তুই কী চাস, অবন্তিকা?” সোহেলের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।

অবন্তিকা হঠাৎ রেগে গিয়ে সোহেলের কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে দিল, “আমি কী চাই সেটা তুই জানিস না সোহেল? এই গত ছয়টা মাস ধরে যে মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজের পৃথিবীটা নতুন করে সাজিয়েছি, সে আজ আমাকে জিজ্ঞেস করছে আমি কী চাই? তুই এত অন্ধ কেন?”

অবন্তিকার চোখের বাঁধ ভেঙে জল গড়িয়ে পড়ল গালে। সোহেল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে অবন্তিকার চোখের জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছে দিল। বলল, “আমি অন্ধ নই রে। কিন্তু আমি তোকে একটা অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দিতে পারি না। তোর বাবার স্বপ্ন, পরিবারের প্রত্যাশা...”

“পরিবারের প্রত্যাশা দিয়ে কি মন বাঁচে সোহেল?” অবন্তিকা আর্তনাদ করে উঠল। “কানাডার কোনো দামি কফিশপে বসে আমি হয়তো সবচেয়ে দামি ভ্যানিলা ল্যাটে খাব, কিন্তু সেই কফির প্রতিটা চুমুকে আমার মনে পড়বে টিএসসির দশ টাকার সেই অপরাজিতা চা! আমি যে তোকে ছাড়া আর কারও সাথে কোনোদিন আড্ডা দিতে পারব না, সেটা তুই বুঝিস না?” সোহেল স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। বাতাস ভারী হয়ে উঠল। সেই প্রথমবার তারা চা শেষ না করেই উঠে দাঁড়াল। বিদায়ের সময় অবন্তিকা কোনো কথা বলল না, শুধু ছলছল চোখে একবার তাকিয়ে রিকশায় উঠে চলে গেল।

পরবর্তী এক সপ্তাহ সোহেলের জন্য ছিল নরকবাসের মতো। সে কাজে মন দিতে পারছিল না। কোডের প্রতিটি লাইনে সে অবন্তিকার মুখ দেখত। রাতে ঘুম হতো না। বারবার মনে পড়ত অবন্তিকার সেই কথাগুলো “আমি যে তোকে ছাড়া আর কারও সাথে কোনোদিন আড্ডা দিতে পারব না...” সোহেল বুঝতে পারল, জীবনের নিরাপত্তা কেবল ব্যাংকের টাকায় থাকে না; জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা থাকে সেই মানুষের সাথে থাকা, যে মানুষটা আত্মার খবর রাখে। সে যদি আজ নিজের ভীরুতার কারণে অবন্তিকাকে হারিয়ে ফেলে, তবে সারাজীবন এক কাপ চায়ের দিকে তাকালেই তার নিজের প্রতি ঘৃণা জন্মাবে।

শুক্রবার সকাল। আজই সেই দিন, যেদিন পাত্রপক্ষের আসার কথা। সোহেল ঘুম থেকে উঠে পরিপাটি করে আয়নার সামনে দাঁড়াল। পরনে সাদা সুতির পাঞ্জাবি যেটা একবার অবন্তিকা পছন্দ করে শাহবাগ থেকে কিনে দিয়েছিল। সে সোজা চলে গেল অবন্তিকাদের বাড়ির ঠিক সামনের গলির মোড়ের সেই ছোট চায়ের টং দোকানটায়। দোকানে বসে সে চা দিতে বলল। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। একের পর এক চায়ের কাপ খালি হতে লাগল। সোহেল ওখান থেকে নড়ল না। সে ফোন করেনি অবন্তিকাকে, কোনো মেসেজ দেয়নি। সে শুধু অপেক্ষা করছে। সে জানে, অবন্তিকা যখন বারান্দায় আসবে বা কোনো কারণে নিচে তাকাবে, সে দেখতে পাবে।

দুপুর দুটো নাগাদ অবন্তিকাদের বাড়ির সামনে একটি দামি নোয়াহ গাড়ি এসে থামল। বোঝা গেল, পাত্রপক্ষ এসে গেছে। সোহেলের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার হাত কাঁপছিল। চায়ের গরম কাপটা সে শক্ত করে চেপে ধরল। সে কি ভেতরে যাবে? গিয়ে বলবে, “আপনার মেয়েকে আমি সবচেয়ে সুখী রাখব, হয়তো কানাডার মতো বাড়ি দিতে পারব না, কিন্তু এক বুক ভালোবাসা আর আজীবন পাশে থাকার নিশ্চয়তা দেব?” না, সে কোনো নাটক করতে চায় না। সে শুধু দেখতে চায় অবন্তিকার সিদ্ধান্ত। ভালোবাসা কোনো ছিনতাইয়ের বস্তু নয়, ভালোবাসা হলো সমর্পণ।

বিকেল চারটা। গাড়িটি স্টার্ট নিয়ে চলে গেল। সোহেলের বুকের ধুকপুকানি তখন কান পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে। পাত্রপক্ষ কি পাকা কথা দিয়ে গেল? অবন্তিকা কি রাজি হয়েছে? বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামছে, রাস্তার নিয়ন বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে, তখন সেই পরিচিত বাড়ির গেট খুলে গেল।
ধীর পায়ে গলি পেরিয়ে টং দোকানের দিকে হেঁটে আসছিল এক অবয়ব। গায়ে সেই প্রথম দিনের ঘিয়ে রঙের কুর্তি। চোখে কোনো কাজল নেই, কিন্তু চোখের কোণে কান্নার দাগ তখনও শুকায়নি। তবে তার মুখে এক অদ্ভুত, অচেনা প্রশান্তি। সোহেল টুল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

অবন্তিকা এসে সোজা দাঁড়াল সোহেলের সামনে। কোনো কথা না বলে সে দোকানি মামাকে বলল, “মামা, আদা-এলাচ দিয়ে দুই কাপ কড়া রঙ চা দেন। চিনি ছাড়া।” তারপর সে সোহেলের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই চেনা, মায়াবী হাসি যা দেখার জন্য সোহেল হাজার বছর অপেক্ষা করতে পারে।

“তুই এখানে সকাল থেকে বসে আছিস, তাই না?” অবন্তিকা নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।

“তুই কীভাবে জানলি?”

“তোর পাঞ্জাবির সাদা রঙটা এই ধুলোমাখা শহরের মধ্যেও চেনা যায় রে বোকা। বারান্দা থেকে তোকে দেখেই আমি বুঝেছিলাম, আমার লড়াইটা বৃথা যাবে না।”

সোহেলের গলা শুকিয়ে আসছিল। “কী হয়েছে ভেতরে? ওরা... ওরা কী বলল?”

অবন্তিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে তখন শুক্লপক্ষের একফালি চাঁদ উঠেছে।

“আমি বাবাকে সব সত্যি বলেছি সোহেল,” অবন্তিকা শান্ত স্বরে বলল। “আমি বলেছি, যে মানুষটার সাথে আমার মনের কোনো যোগাযোগ নেই, তার সাথে আমি পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও সুখী হতে পারব না। আমি বাবাকে বলেছি, আমার এমন একজন মানুষ আছে, যার সাথে দশ টাকার এক কাপ চা খেয়েও আমি সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারি। বাবা প্রথমে খুব রেগে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমার চোখের জল দেখে তিনি পাত্রপক্ষকে না করে দিয়েছেন।”

সোহেল বিশ্বাস করতে পারছিল না তার কানকে। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ল।

“তোর বাবা মেনে নিয়েছেন?”

“পুরোপুরি মানেননি এখনও। কিন্তু বলেছেন, ‘যে ছেলেটা সকাল থেকে রোদে পুড়ে গলির মোড়ে বসে অপেক্ষা করতে পারে, তার সাথে একবার সামনাসামনি কথা বলা যায়।’ তোকে কাল সকালে আমাদের বাসায় যেতে হবে, সোহেল। বাবার সাথে চা খেতে খেতে আড্ডা দিতে হবে।”

দোকানি মামা ধোঁয়া ওঠা দুটো কাচের গ্লাস তাদের সামনে রাখল। সোহেল অবন্তিকার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। এবার আর কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সমাজের ভয় নেই, কোনো অনিশ্চয়তার দেয়াল নেই। চায়ের ধোঁয়া তাদের দুজনের মুখের মাঝখানে এক উষ্ণ ভালোবাসার কুয়াশা তৈরি করল। অবন্তিকা গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, “চা কিন্তু জুড়িয়ে যাচ্ছে সোহেল!”

সোহেল নিজের গ্লাসটা তুলে অবন্তিকার গ্লাসের সাথে আলতো করে ছুঁইয়ে দিল ঠিক যেমনটা মানুষ উৎসবের রাতে শ্যাম্পেনের গ্লাস ছোঁয়ায়। “চা জুড়োবে না অবন্তিকা,” সোহেল গভীর মায়ায় বলল, “আমাদের এই আড্ডা তো সবে শুরু হলো। যে আড্ডার বয়স হবে আমাদের সারাটা জীবন।”

ঢাকার রাজপথে তখন যান্ত্রিক কোলাহল, গাড়ির তীব্র হর্ন আর মানুষের অবিরাম ছোটাছুটি। কিন্তু সেই ব্যস্ত শহরের এক কোণে, একটি ভাঙা টং দোকানের কাঠের টুলে বসে দুটি হৃদয় এক হয়ে যাচ্ছিল। তারা প্রমাণ করে দিল জীবনটা আসলে খুব বেশি জটিল নয়। একটুখানি বিশ্বাস, এক বুক সাহস, আর এক কাপ চায়ের ধোঁয়ায় জমে ওঠা কিছু সত্যি আড্ডাই পারে দুটো ভিন্ন মানুষকে এক অনন্ত ভালোবাসার সুতোয় বেঁধে দিতে।

চায়ের কাপে ঝড় তোলা সেই প্রেম আজ পূর্ণতা পেল এক চিরন্তন অঙ্গীকারে “চা খেতে খেতে জমবে আড্ডা, আজীবন, একসাথে।”

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login