Article

জসীমউদ্দীন যেভাবে পল্লীকবি হয়ে উঠেছিলেন

October 1, 2026

17 views

ভূমিকা: মাটির গন্ধমাখা এক পথিকের আবির্ভাব

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এক বিশাল সিন্ধু, যেখানে কল্লোলিত হয়েছে বহু ধারার তরঙ্গ। আধুনিক বাংলা কবিতার বাঁকবদলে যখন মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে শুরু করে কাজী নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কিংবা পরবর্তী ত্রিশের দশকের পঞ্চপাণ্ডব বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বিষ্ণু দে ইউরোপীয় আধুনিকতা, নগরের নিঃসঙ্গতা, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব ও নৈরাশ্যকে সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য করে তুলছিলেন, ঠিক তখনই এক তরুণ সম্পূর্ণ বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে বাঁশের বাঁশিতে তুলেছিলেন অন্য এক সুর। তিনি জসীমউদ্দীন।

নগরের ইট-কাঠ-পাথরের কৃত্রিম কোলাহল নয়, নাগরিক মধ্যবিত্তের মনোদৈহিক জটিলতা নয় তিনি তাঁর কাব্যের উপাদান হিসেবে বেছে নিলেন বাংলার মেঠোপথ, আঁকাবাঁকা নদী, সোনালী ধানের শিষ, মটরশুঁটির খেত, ডাহুকের ডাক আর মাটির মানুষগুলোর সুখ-দুঃখের জীবন্ত আখ্যান। বাংলা সাহিত্যে যখন গ্রামকে দেখা হতো দূর থেকে এক রোমান্টিক পর্যটকের দৃষ্টিতে তখন জসীমউদ্দীন গ্রামের ভেতর থেকে, গ্রামের একজন হয়ে গ্রামীণ জীবনের শ্বাস-প্রশ্বাসকে শব্দে ধারণ করলেন। এ কারণেই তিনি কেবল গ্রাম নিয়ে কবিতা লেখা কোনো কবি নন; তিনি বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত ‘পল্লীকবি’।

তাম্বুলখানার শ্যামল পটভূমি: পল্লীপ্রাণের পাঠশালা:

১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন জসীমউদ্দীন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল একই জেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। এই তাম্বুলখানা আর গোবিন্দপুরের মাটি, বাতাস ও মানুষই মূলত তাঁকে গড়ে তুলেছিল। কবির শৈশব কেটেছিল কুমার নদের তীরে, সবুজ শ্যামল প্রকৃতির মায়াবী কোলে।

ছবির মতো শান্ত এক গ্রাম তাম্বুলখানা। সেখানে হেমন্তে মাঠে মাঠে জেগে ওঠে মটরশুঁটির লতা, অঘ্রাণে সোনালী ধান আর কাউনের শিষ রোদে ঝলমল করে। বিলের জলে ফুটে থাকে শাপলা-পদ্ম, আর হিজল বনের গভীর ছায়ায় সারাদিন ডেকে চলে ডাহুক পাখি। পল্লীপ্রকৃতির এই সহজ ও অকৃত্রিম রূপ কবির কিশোর মনে এক গভীর কাব্যিক আবেশ তৈরি করেছিল। প্রকৃতি এখানে কেবল পটভূমি ছিল না, প্রকৃতি ছিল তাঁর খেলার সাথি, তাঁর শিক্ষক।

গ্রামের রাখাল বালকদের সাথে মাঠে গরু চড়ানো, মেঠোপথে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ানো, বর্ষায় কাদার গন্ধ শোঁকা আর রাতের বেলা দূর গ্রাম থেকে ভেসে আসা জারি-সারি আর ভাটিয়ালি গানের সুর এসব কিছুই জসীমউদ্দীনের রক্তে ও চেতনায় মিশে গিয়েছিল। তিনি তাঁর ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায় সেই শ্যামল গ্রামের অনাবিল সৌন্দর্য আর ভালোবাসার আহ্বান জানিয়ে পরবর্তীকালে লিখেছিলেন:

"তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,

গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;

মায়া-মমতায় জড়ায়ে যেখানে মটরশুঁটির লতা,

ধানের শিষেরা বাতাস পাইয়া কহিছে কত-না কথা।"

এই যে মটরশুঁটির লতার মায়ায় জড়িয়ে থাকা এবং ধানের শিষের বাতাসে কথা বলে ওঠা তা কোনো দূরবর্তী কবির কল্পনা নয়; এটি তাম্বুলখানার মাটিতে বড় হওয়া এক কিশোরের নিবিড় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কাব্যরূপ।

লোকসংস্কৃতির পাঠ ও গ্রামীণ জীবনবোধ:

জসীমউদ্দীনের কবি হয়ে ওঠার পেছনে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির অবদান ছিল অপরিসীম। তিনি ছিলেন গ্রামীণ মেলা, পুতুলনাচ, কবিগান, জারীগান, পটুয়াদের পটচিত্র এবং বাউল-ফকিরদের গানের একনিষ্ঠ অনুরাগী। ফরিদপুরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা রূপকথা, লোকগাথা ও বাউলতত্ত্বের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছিল অত্যন্ত অল্প বয়সেই। গ্রামের মায়েরা যখন সন্তানকে ঘুম পাড়াতে গান গাইতেন, নানি-দাদিরা যখন রূপকথার ঝাঁপি খুলে বসতেন, কিশোর জসীমউদ্দীন তন্ময় হয়ে শুনতেন সেইসব আখ্যান। গ্রামীণ জীবনের এই লোকজ সুর তাঁর হৃদয়ে এতটাই গভীর রেখাপাত করেছিল যে, তিনি বুঝে গিয়েছিলেন তাঁর কাব্যের ভাষা হবে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, আর তাঁর বিষয়বস্তু হবে এই পল্লীসমাজ।

তাঁর শিশুতোষ কবিতাতেও সেই গ্রামীণ যৌথ জীবনের নিষ্পাপ আনন্দ ও প্রকৃতির মায়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলার শিশুদের বৈশাখী প্রভাতে ফুল তোলার চিরন্তন দৃশ্য তিনি এঁকেছেন অতি সহজ-সরল ছন্দে:

"আয় ছেলেরা, আয় মেয়েরা

ফুল তুলিতে যাই,

ফুলের মালা গলায় দিয়ে

মামার বাড়ি যাই।

ঝড়ের দিনে মামার দেশে

আম কুড়াতে সুখ,

পাকা জামের মধুর রসে

রঙিন করি মুখ।"

এই সারল্যই ছিল তাঁর আজীবন অর্জিত শক্তি। তিনি কোনো জটিল ছন্দ বা দুর্বোধ্য রূপকের আশ্রয় নেননি; বরং লোকগীতির দোলা ও মেঠো সুরকে তিনি কবিতার শরীরে অবলীলায় প্রতিস্থাপন করেছিলেন।

ছাত্রজীবন ও ‘কবর’ কবিতার ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ:

ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে পড়ার সময় থেকেই জসীমউদ্দীনের সাহিত্যপ্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। তবে তাঁর কবিজীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক অধ্যায়টি রচিত হয় যখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি.এ. ক্লাসের ছাত্র। তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ-তেইশ বছর। ১৯২৫ সালে তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘কবর’। কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর সাহিত্যসমাজে কবিতাটি তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে কেবল প্রথিতযশা ও প্রয়াত লেখকদের সাহিত্যকর্ম স্থান পেত। কিন্তু দীনেশচন্দ্র সেনের ঐকান্তিক আগ্রহে এবং আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বিচক্ষণতায় জসীমউদ্দীন ছাত্রাবস্থাতেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার পাঠ্যতালিকায় স্থান লাভ করেন। এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও নজিরবিহীন ঘটনা। ‘কবর’ কবিতার সূচনাতেই গ্রামীণ এক বৃদ্ধ কৃষকের নিঃশব্দ হাহাকার পুরো বাংলা সাহিত্যকে এক নিমিষে স্তব্ধ করে দেয়:

"এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা!"

এই কবিতায় ফুটে উঠেছে গ্রামীণ জীবনের চরম বাস্তবতা, দারিদ্র্য, স্বজন হারানোর নীরব শোক এবং সেই শোকের মাঝেও বেঁচে থাকার এক অবিচল আর্তি। কবিতার প্রতিটি ছত্রে কোনো অলংকারিক আতিশয্য নেই, বরং আছে মাটির বুক চিরে উঠে আসা এক আদিম ও অকৃত্রিম অশ্রুধারা:

"ঐ দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে,

অমনি করিয়া লুটায়িত তার আঁচলখানিকে আগে;

হেথা নয় বাবা, বড় ব্যথা পাবে, ডালিম গাছের ডাল,

ধীরে ধীরে হেথা পড়িবে ঝরিয়া তাহার চোখের জল।"

 ‘কবর’ কবিতা প্রকাশের সাথে সাথেই সুধীমহল উপলব্ধি করতে পারে বাংলা কবিতায় এক নতুন কণ্ঠস্বরের আগমন ঘটেছে, যিনি পল্লীর বুক থেকে সরাসরি সাহিত্যের দরবারে প্রবেশ করেছেন।

লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে অভিজ্ঞতা: শিকড়ের আরও গভীরে:

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জসীমউদ্দীন বিখ্যাত লোকসাহিত্য গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সংস্পর্শে আসেন। দীনেশচন্দ্র সেন তখন ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ সংগ্রহের কাজে নিমগ্ন ছিলেন। তরুণ জসীমউদ্দীনের মেধা ও পল্লীপ্রীতি দেখে তিনি তাঁকে লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হিসেবে নিযুক্ত করেন। এই দায়িত্ব জসীমউদ্দীনের কবিমানস গঠনে এক বিরাট রূপান্তর আনে। তিনি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে হাওর, বাঁওড়, নদীবিধৌত চরাঞ্চল ও দুর্গম পল্লীতে ঘুরে বেড়ান। গ্রামের সাধারণ কৃষক, মাঝি, তাঁতি, বেদে ও লোকশিল্পীদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। তিনি সংগ্রহ করেন লোকগাথা, পালাগান, প্রবাদ-প্রবচন ও গীতিকবিতা।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে পল্লীর আরও নিবিড় সান্নিধ্যে এনে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, বাংলার লোকসাহিত্যের যে সুর ও ভাবসম্পদ, তা কোনো অংশে বিশ্বসাহিত্যের চেয়ে কম নয়। তিনি কেবল সংগ্রাহক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি, বরং সেই লোকায়ত ভাবসম্পদকে আত্মস্থ করে নিজের সৃষ্টিশীলতায় নতুন রূপ দিয়েছেন। এর ফলেই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল পল্লীর জীবনের নিখুঁত আখ্যানকাব্য রচনা করা।

আখ্যানকাব্যের রাজপুত্র: ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’”

জসীমউদ্দীনকে যদি ‘পল্লীকবি’ উপাধির রাজমুকুট পরাতে হয়, তবে তার প্রধান দুটি ভিত্তিপ্রস্তর হলো ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ (১৯২৯) এবং ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ (১৯৩৩)। এই দুটি কাব্যগ্রন্থ তাঁকে কেবল বাংলার নয়, বিশ্বসাহিত্যের দরবারে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

১. নকশী কাঁথার মাঠ: অশ্রুর কারুকাজ

‘নকশী কাঁথার মাঠ’ বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আখ্যানকাব্য। রূপাই ও সাজু নামের দুটি সাধারণ গ্রাম্য তরুণ-তরুণীর প্রেম, বিচ্ছেদ ও বিষাদময় পরিণতি নিয়ে এই কাব্য রচিত। কৃষ্ণবর্ণের রূপাই ছিল গ্রামের সেরা লাঠিয়াল, গায়েন ও চাষী:

"এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথার চুল,

কালো মুখেই কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল!

কাঁচা ধানের পাতার মত কচি-মুখের মায়া,

তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া |

জালি লাউয়ের ডগার মত বাহু দুখান সরু,

গা-খানি তার শাওন মাসের যেমন তমাল তরু ।"

কিন্তু গ্রামীণ সামাজিক সংঘাত (দাঙ্গা) তাদের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। রূপাই ফেরারি হয়, আর বিরহকাতর সাজু একা একা ঘরে বসে এক কাঁথায় সুঁই-সুতো দিয়ে এঁকে যায় তাদের সুখ-দুঃখের স্মৃতি, মিলন ও বিচ্ছেদের ইতিহাস। মৃত্যুর আগে সাজু মায়ের কাছে অনুরোধ করে যায়:

"এই শেষ কথা!" সাজু কহে কেঁদে, "বলিবে না আর কিছু?"
খানিক চলিয়া থামিল রুপাই, কহিল চাহিয়া পিছু,
"মোর কথা যদি মনে পড়ে সখি, যদি কোন ব্যথা লাগে,
দুটি কালো চোখ সাজাইয়া নিও কাল কাজলের রাগে।
সিন্দুরখানি পরিও ললাটে-মোরে যদি পড়ে মনে,
রাঙা শাড়ীখানি পরিয়া সজনি চাহিও আরশী-কোণে।
মোর কথা যদি মনে পড়ে সখি, যতনে বাঁধিও চুল,
আলসে হেলিয়া খোঁপায় বাঁধিও মাঠের কলমী ফুল।"

সাজুর মৃত্যুর পর একদিন সেই কবরের পাশে এসে রূপাইও প্রাণ বিসর্জন দেয়। সাধারণ কাঁথা হয়ে ওঠে এক অমর প্রেমের মহাকাব্য। কবি সমাপনীতে লিখেছেন:

"সকলেই জানে, সেই কোন্‌ কালে রুপা বলে এক চাষী,
ওই গাঁর এক মেয়ের প্রেমেতে গলায় পড়িল ফাঁসি।
বিয়েও তাদের হয়েছিল ভাই, কিন্তু কপাল-লেখা,
খণ্ডাবে কেবা? দারুণ দুঃখ ভালে এঁকে গেল রেখা।
রুপা এক দিন ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে গেল দূর দেশে,
তারি আশা-পথে চাহিয়া বউটি মরিল শেষে
মরিবার কালে বলে গিয়েছিল-তাহার নক্সী-কাঁথা,
কবরের গায় মেলে দেয় যেন বিরহিণী তার মাতা!"

প্রখ্যাত পণ্ডিত ই. এফ. এলভিন (E. F. Elwin) এই কাব্যটি ‘The Field of the Embroidered Quilt’ নামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিপুল সমাদৃত হয়। সাধারণ কৃষক কন্যার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ এমন বিশ্বজনীন ট্র্যাজেডিতে রূপান্তর করা কেবল জসীমউদ্দীনের পক্ষেই সম্ভব ছিল।
২. সোজন বাদিয়ার ঘাট: অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মিলনের আর্তি

জসীমউদ্দীন কেবল প্রেম ও বিরহের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গভীর সমাজসচেতন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যে তিনি হিন্দু কুমার সোজন এবং মুসলিম কন্যা দুলীর প্রেমের পটভূমিতে ফুটিয়ে তুলেছেন তৎকালীন গ্রামীণ সমাজের হিন্দু-মুসলমান বিরোধ, স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্তের শিকার সাধারণ মানুষের ট্র্যাজিক পরিণতি। ধর্মীয় বিভেদ ও সামাজিক হিংসা কীভাবে দুটি নিষ্পাপ হৃদয়কে পিষে ফেলে, তা অত্যন্ত বেদনার সাথে কবি চিত্রিত করেছেন। তবে কবির দৃষ্টি ছিল মিলনের দিকে। তিনি দেখিয়েছেন, মাটির মানুষের কোনো ধর্মীয় বিভেদ নেই; তাদের আনন্দ-বেদনা, কান্না-হাসি একই নদীর স্রোতে বাঁধা:

"এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে মাঝখানে বয় কাজলা নদীর ধারা,

এপারে ওপারে কত আশা নিয়ে জেগে রয় দুটি পাড়া।"

বিরহ ও মানবিক অনুভূতির চিত্রায়ন:

জসীমউদ্দীনের কবিতায় পল্লীর মানুষের দুঃখ-বেদনা কোনো কৃত্রিম বিলাসিতা নয়, তা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী। তিনি নারীর মনস্তত্ত্ব এবং গ্রামীণ মায়ের বাৎসল্য রসকে অত্যন্ত সার্থকভাবে রূপায়িত করেছেন। ‘পল্লী-জননী’ কবিতায় এক দরিদ্র মায়ের রুগ্ন সন্তানের পাশে বসে রাত জাগার যে বাস্তব ও হৃদয়স্পর্শী চিত্র তিনি এঁকেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উদাহরণ:

"রাত থমথম স্তব্ধ নিঝুম, ঘোর-ঘোর-আন্ধার,

নিঃশ্বাস ফেলি তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার।

রুগ্ন ছেলের শিওরে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা,

করুণ আঁখিতে ঘুম নাহি ঝরে, শিয়রে শমন পাতা।"

ছেলের আরোগ্যের জন্য মায়ের নীরব প্রার্থনা, কুপি বাতির মৃদু আলো, পচা পাতার গন্ধ আর দারিদ্র্যের কারণে ওষুধ কিনতে না পারার যে হাহাকার তা পাঠককে অশ্রুসজল না করে পারে না। কবি লিখছেন:

"বাঁশ বনে বসি ডাকে কানা কুয়ো, রাতের আঁধার ঠেলি,

বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপুরির বন হেলি।

চলে বুনো পথে জোনাকী মেয়েরা কুয়াশা কাফন পরি,

দূর ছাই হতে ভেসে আসে কার কান্নার সুর ধরি।"

এখানে গ্রামীণ পরিবেশ এবং মায়ের অন্তর্বেদনা যেন একাকার হয়ে গেছে। কবি পল্লীর প্রকৃতিকে মানুষের হৃদয়ের অনুভূতির সাথে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছেন।

নাগরিক আধুনিকতার যুগে স্বতন্ত্র অবস্থান:

তিরিশের দশকের আধুনিক কবিরা যখন টি. এস. এলিয়ট, এজরা পাউন্ড বা শার্ল বোদলেয়ারের প্রভাব বলয়ে বন্দি হয়ে নাগরিক শূন্যতাবোধ, বিচ্ছিন্নতা ও জটিল ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন, জসীমউদ্দীন তখন সম্পূর্ণ নিজের পথে অটল ছিলেন। তিনি আধুনিকতার স্রোতকে উপেক্ষা করেননি, কিন্তু পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলার মাটির মধ্যেই রয়েছে মহৎ সাহিত্যের বীজ। তাঁর স্বকীয়তা সম্পর্কে সমালোচকরা প্রায়শই বিস্মিত হতেন। বুদ্ধদেব বসুর মতো কট্টর আধুনিক সাহিত্যিকও জসীমউদ্দীনের প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, কল্লোল যুগের তীব্র আধুনিক কোলাহলের মধ্যেও জসীমউদ্দীন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তাঁর সুর নিজস্ব এবং তিনি তাঁর কাব্যে এমন এক জগৎ সৃষ্টি করেছেন যা কৃত্রিমতাহীন ও শাশ্বত। জসীমউদ্দীন প্রমাণ করেছিলেন আধুনিকতা মানে কেবল নাগরিক হতাশা নয়; আধুনিকতা মানে নিজের ঐতিহ্য ও শিকড়ের গভীরতম সত্যকে বিশ্বজনীন রূপ দেওয়া।

ভাষা ও ছন্দ: মেঠো সুরের নান্দনিকতা:

জসীমউদ্দীনের কাব্যের ভাষা ছিল তাঁর কবি হয়ে ওঠার অন্যতম হাতিয়ার। তিনি সংস্কৃতবহুল গুরুগম্ভীর শব্দ পরিহার করে পল্লীবাংলার প্রাত্যহিক জীবনের কথ্য শব্দকে সাহিত্যের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। তাঁর ছন্দের প্রধান ভিত্তি ছিল মাত্রাবৃত্ত এবং লোকছন্দ বা পয়ারের সহজ প্রবাহ।

ভাটিয়ালি, বাউল ও পটের গানের মতো তাঁর কবিতার ছন্দ পাঠককে এক দোলায়িত আবেশ দেয়। পড়তে গিয়ে মনে হয় মেঠোপথ দিয়ে কোনো রাখাল বাঁশি বাজিয়ে চলে যাচ্ছে, কিংবা কুমার নদে বৈঠা বাইতে বাইতে কোনো মাঝি সুর ধরেছে। তাঁর ‘রাখালী’ কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় এই সুরের খেলা স্পষ্ট। ‘রাখাল ছেলে’ কবিতায় তিনি রাখাল জীবনের যে প্রাণবন্ত ও গতিশীল চিত্র এঁকেছেন, তা শিশুর সারল্য ও পল্লীর ঐশ্বর্যকে একাকার করে দেয়:

"রাখাল ছেলে! রাখাল ছেলে! বারেক ফিরে চাও,

বাঁকা বাঁশের বাঁশিতে ভাই কি সুর দিয়ে যাও?"

অন্যান্য সৃষ্টিকর্মে পল্লীচেতনা:

জসীমউদ্দীন কেবল কবিতায় নয়, সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও পল্লীর জীবনকেই রূপায়িত করেছেন। নাটক: ‘বেদের মেয়ে’ নাটকে তিনি প্রান্তিক যাযাবর বেদে সম্প্রদায়ের প্রেম, সমাজ ও জীবনসংগ্রামকে জীবন্ত করে তুলেছেন।

স্মৃতিকথা: ‘যাদের দেখেছি’ ও ‘জীবনকথা’ গ্রন্থে তিনি তাঁর সমকালীন গ্রামীণ মানুষ, লোকশিল্পী ও সাধকদের জীবনগাথা পরম শ্রদ্ধার সাথে লিপিবদ্ধ করেছেন।

উপন্যাস: ‘বোবা কাহিনী’ উপন্যাসে গ্রামীণ কৃষকদের ঋণগ্রস্ততা, মহাজনের শোষণ ও জমি হারানোর ট্র্যাজেডি ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে।

গান: জসীমউদ্দীন ছিলেন একাধারে অসামান্য গীতিকার। ‘আমার হার কালা করলাম রে’, ‘নিশীথে যাইও ফুলবনে’, ‘ও বাজান চল যাই চল মাঠে লাঙ্গল বাইতে’ এই গানগুলো আজও বাংলার মানুষের মুখে মুখে ফেরে। সুরকার আব্বাসউদ্দীনের সাথে মিলে তিনি পল্লীগীতিকে গ্রাম থেকে তুলে এনে রেডিও ও আধুনিক সংগীতের মঞ্চে এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

উপসংহার: অমর পল্লীপ্রাণের চিরন্তন কবি:

জসীমউদ্দীন কেবল একটি নাম নয়, তিনি আবহমান বাংলার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাম্বুলখানার ধুলোমাটি মেখে যে কিশোরের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তিনি একসময় বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন কেবল নিজের মাটি ও মানুষের প্রতি অবিচল বিশ্বস্ততার কারণে। তিনি যখন লেখেন:

"আমার এ গাঁয়ের যত ফুল আর যত পাখি যত গান,

এই নিয়ে আমি গাঁথিয়া রেখেছি আমার ক্ষুদ্র প্রাণ।"

তখন বোঝা যায়, তিনি পল্লীর থেকে নিজেকে আলাদা কোনো সত্তা ভাবেননি। পল্লী এবং জসীমউদ্দীন ছিলেন এক ও অভিন্ন। ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ এই মহান কবি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় তাঁর সেই প্রিয় ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে, ডালিম গাছের তলে ঠিক যেমনটি তিনি তাঁর ‘কবর’ কবিতায় লিখেছিলেন।

আজও যখন হেমন্তের বাতাসে সোনালী ধানের শিষ দোলে, যখন হিজল বন থেকে ডাহুকের ডাক ভেসে আসে, কিংবা কোনো পল্লীবধূ নকশী কাঁথায় নিজের নীরব বিরহের ফোঁড় তোলে তখনই জসীমউদ্দীন নতুন করে জেগে ওঠেন। নাগরিক জীবনের ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি বাঙালি যখনই নিজের শিকড়ের সন্ধান করে, তখনই তাকে ফিরে যেতে হয় জসীমউদ্দীনের কবিতার শ্যামল আশ্রয়ে। এভাবেই তাম্বুলখানার মেঠোপথ থেকে বিশ্বসাহিত্যের রাজপথে উঠে এসে জসীমউদ্দীন হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির হৃদয়ের চিরকালের ‘পল্লীকবি’।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • ভালো লিখেছেন। অনেক অনেক শুভকামনা।

  • অনেক ভালো একটি লেখা। শুভকামনা।

    • Kabir Al Mamun 8 hours ago

      অনেক ধন্যবাদ।