অনেকদিন ভেবেছি কবিতা কিভাবে লিখি মানে কি সব ভেবে বা দেখে এক একটি লাইন লিখি তা বিস্তারিত লিখবো। প্রতিটা কবিতা লিখার সময়ই এমন নানাবিধ উৎস থেকে নির্যাস নিয়ে একটি কবিতা লিখি। আমার কবিতার শিরোনাম হয়না কখনোই। এই কবিতাটি লিখেছি ২০২৬ সালের প্রথম দিন প্রথম সকালে। কোন নির্দিষ্ট প্ল্যান থাকেনা কবিতা লিখার সময় কখনোই। হঠাৎ কোন শব্দ থেকে শুরু হয়, আজ শব্দটি ছিলো 'কালচে ধূলো'। বার্কিং ট্রেন স্টেশন থেকে বেরিয়ে বাস স্টপের দিকে যাচ্ছি, শীতের তীব্রতায় স্টেশনের সামনের রাস্তাটির তাকাতেই 'কালচে ধূলো' মনে আসলো কেন জানিনা- কালচে ধূলো শব্দ হিসেবে মনে ধরছিলোনা- এসময় মনে পরে সেই কবে কিশোর বয়সে চিনারদীর একটি মাটির রাস্তা ধরে নয়ানগর ফিরছিলাম দাদার মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে দিয়ে, গিয়েছিলাম জ্যাঠাতো ভাই বিপ্লবের নানীর বাড়ি শোক সংবাদ নিয়ে। ঐ সময় তো মোবাইল ছিলোনা তাই কারও মৃত্যু হলে স্থানীয় মসজিদে মাইকিং করা হতো, পাশাপাশি আশেপাশের কয়েক গ্রামের মসজিদ থেকেও শোক সংবাদ প্রচার করা হইতো। কিছু দূরে যারা থাকে তারা আত্মীয়দের কাছে ব্যক্তিগতভাবে সংবাদ নিয়ে যাইতো। দাদার মৃত্যু নিয়ে আরও অনেক কথা আছে সে আলোচনা অন্য। এই কবিতায় শুধু এসেছে - আমি, জ্যাঠাতো ভাই বিপ্লব ও শওকত গিয়েছিলাম মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে দিতে। আসার পথে চিনারদি গ্রামের একটি মোড় পার হতে আসে মরা ঘাসের রাস্তাটি, ঘাসগুলো কিছুটা বড় ছিলো তাই হয়তো চোখে লেগে ছিলো, আর মাটি ও শুকনো ঘাসের রং কাছাকাছি বাদামী ও হলুদের মিশেলে। সময়টি ছিলো নিথর মাগরিবের আগ মুহূর্ত। আমরা খুব দ্রুত হাঁটছিলাম। লিখার সময় অনেক শব্দ দিয়ে লিখলাম, সিনেমার দৃশ্য হলে হয়তো কয়েক সেকেন্ডের কিছু শটে ফুটিয়ে তোলা যায়। আর স্টেশনের বাইরে বাসস্টপে ঠান্ডায় বাসের অপেক্ষায় এক মুহূর্তে অনেক কিছু দেখলাম। দুই লাইন লিখার পর খেয়াল করলাম আমার জাম্পারের রং কমলা, তাই বসিয়ে দিলাম কবিতায়। দাঁড়িগুলো ইদানীং বড্ড বেশি সাদা হয়ে গেছে, বয়সও বেড়ে ভালো একটা অংকে পৌঁছাইলো। কিন্তু আমি মনে প্রাণে সজীব প্রাণের প্রতিটা ক্ষণ।
"এই পথের ধূলো বাদামী কতক আবার শুকিয়ে যাওয়া হলুদ ঘাসের মিশ্রণ-
সেই কবে এসেছিলাম দুরন্ত কৈশোরে মাটির গ্রামে।
আজ পাকা কমলা রঙের সোয়েটার গায়ে চড়িয়েছি, আমাকে নিয়ে ছুটছি,
এমন সব শীতের দিনগুলোতে আমি আবিষ্কার করি আমার বয়স হয়ে গেলো!
জানিনা আমার উল্লাসে ভরা হাসিতে পাক ধরেছে- কিন্তু আমি সজীব সবুজ ছবি।"
এই পর্যন্ত লিখে বাসের সময় চেক করলাম, ইএল১ বাস এখনো নয় মিনিট দেখাচ্ছে। আর ভাবছি সবুজ ছবির সাথে কি লাইন লিখা যায়। যেহেতু ঠান্ডা পরছে আজ বেশ তাই শৈশবের শীতকালটাই চোখে আসলো। আমার নানা নিজ হাতে নানাবিধ ক্ষেত করতেন। বিশেষ করে শীতের সময় আলুটা কমন ছিলো। নানা বাড়ির উত্তর ও দক্ষিণে দুটো বড় ক্ষেত সব সময়ই মনে থাকার মতো ছিলো। সে বছট সরিষা, গম মটরশুঁটি ও আলু করেছিলেন নানা উত্তর ও দক্ষিণের ক্ষেতে। আমার ভালো লাগতো ক্ষেতের আইল ধরে ধরে হাঁটতে, মাঝে মাঝে ফসলগুলো ছু্ঁয়ে দেখতাম, ক্ষেতে কোনায় মাটি খুঁড়ে আলু কত বড় হয়েছে তা বেশি দেখতাম। আমাদের গ্রাম আর নানার বাড়ির গ্রামের নাম একটাই - নয়ানগর। মাঝখানে একটা ভাগ থাকাতে পশ্চিম আর পূর্ব হয়ে যায় নামের আগে। আমরা পরেছি পশ্চিমে। নয়ানগরে আমার শৈশবের শুরুটা হয়েছিলো, আমরা চলে যাই বন্দরে, কিন্তু মোটামুটি রেগুলার যাতায়াত ছিলো। জন্মস্থানের টানের সাথে সাথে আত্মীয়স্বজনদের মায়ার টান তো ছিলোই, পাশাপাশি নয়ানগরের প্রকৃতি, গাছপালা, গ্রামের দুপাশে ফসলি মাঠ আজীবন আমার সাথী হয়ে যায়- এটা উপলব্ধি করি যখন থেকে লিখালিখি শুরু করি। যেকোন টপিকেই নয়ানগরের ছবি প্রথমে আসে, মিলুক চাই না মিলুক নয়ানগরকে আঁকার চেষ্টা থাকে বিষয়ের সাথে অথবা প্রেরণা নিয়ে অন্য কিছু লিখি। এভাবে ভাবতে ও লিখতে ভালো লাগে বিষয়টি এমন নয়, এটা আমার চর্চা ছিলো লিখালিখির।
"সরিষা গম মটরশুঁটির ক্ষেতের আল ধরে আমি চলেছি নানা'র আলুর জমিতে-
উপায়ন্তর না দেখে নয়ানগর গায়ে মাখি আমার শব্দের পরতে পরতে,"
বাস এসে গেছে, বাসে উঠার সময় হাঁটুতে ব্যাথা অনুভব করলাম। সিটে বসতে বসতে বয়সের চিন্তাটা আরেকবার মনে হইলো। এই ঠান্ডায় ভিটামিন ডি এর অভাব দেখা দেয় আর পায়ের গোড়ালি, হাঁটুতে বা শরীরের অন্য জয়েন্টগুলোতে ব্যাথা অনুভব করি। লন্ডন আসার পর প্রথম দুই তিন বছর ভিটামিন ডি ট্যাবলেট নিতাম রেগুলার, এখন আর নিইনা, শরীর তার নিজ নিয়মে শক্তি সঞ্চয় করুক এটা চাই। বাসে বসতে বসতে লিখলাম সেটা।
"হাঁটু-পায়ের গোড়ালিতে ব্যাথা এসেছে বার্ধক্যের- অথচ নবীন কিশোর এক;"
আজ যেহেতু কৈশোরে আছি লিখায় তাই আবারও স্মৃতি খুঁজি নয়ানগরেই। আমাদের বাড়িটি পূর্ব নয়ানগর যেখানে শেষ হয় কাজী বাড়ির পরে একটি ফাঁকা জায়গা, কাজীদেরই জায়গা, তারপর পশ্চিম নয়ানগরের শুরুতে প্রথম বাড়িটি আমাদের, মানে দাদার বাড়ি। আমাদের বাড়ির উত্তরে হাজী বাড়ি যাওয়ার আগে কিছুটা জমি, জমি পার হয়ে খাল, তারপর হাজী বাড়ি। সেই কিছুটা জমিতে কখনো কখনো কে বা কারা ধানের বীজতলা বানায় তা এখন মনে নাই, বাট মনে আছে সেই বীজতলায় পৌষ মাঘের শীতে সকালে শিশির জমে, সেই শিশিরে কাজী বাড়ির গাছপালা ভেদ করে পূর্ব আকাশ থেকে যখন সূর্যের আলো পরে প্রতিটা শিশিরবিন্দু এক একটি হীরার ন্যায় যেনো জ্বলজ্বল করে, উফফ কি অদ্ভুত সুন্দর সেসব সকাল। সকাল পার হয়ে একটু বেলা গড়ায় যখন তখন হাজী বাড়ি যাওয়ার আগে খালে কবীর ভাইয়ের মাছ ধরার কথা মনে পড়লো আজ। আমার জ্যাঠাতো ভাই। শীতের এই সময় খালে তেমন পানি থাকেনা, বড় বড় কচুরি থাকে। সকাল থেকে সেসব পরিস্কার করে, তারপর দেখা যায় থকথকে কাদাজল। কবীর ভাই সেই কাঁদায় নেমে খালি হাতেই শিং কই ধরে, এভাবে মাছ ধরাটা একটা আর্ট লাগে আমার কাছে। কখনো কখনো শিং মাছ কাটা ফুটে দেয় কবীর ভাইয়ের হাতে। ইসস কি ব্যাথা। সেই ব্যাথা উপশমের ঔষধ ছিলো খালের পাশেই ছোট করে আগুন জ্বেলে আঙুল ছ্যাক (বানানটা আঞ্চলিক) দেয়া। ব্যাথা কমতে কমতে দেখা যায় ভেজা কাঁদা শুকিয়ে শরীরে ধূসর রঙের হয়ে গেছে। গামছা মাথায় কবীর ভাই আমার কাছে গ্রামবাংলার চিরায়ত এক চরিত্র।
"নবীন কিশোর চোখে চকচক করছে সূর্য সকালের শিশিরবিন্দুগলো ধানের রোপা জমিতে!
শুকিয়ে যাওয়া পুকুরে এসময় মাছ ধরার উৎসব হয়, কি নিদারুণ দৃশ্য-
থকথকে হিমশীতল কাদাজলে কই শিং'র গড়াগড়ি দেখে আগুন পোহাতে বসি।"
যেহেতু প্রথমে দাদার মৃত্যুর স্মৃতিঘেরা একটা সময় মনে হয়েছিল তাই দাদার বেঁচে থাকার একটা স্মৃতি চলে আসলো লিখতে লিখতে। আমাদের ঘর আর দাদা-দাদীর ঘর উঠানের এপাশ ওপাশ। দাদার ঘর আমার খুব প্রিয়, দাদার পাঞ্জাবীর ঘ্রাণ, বিছানার ঘ্রাণে কি পরিমাণ মায়া অনুভব করি তা আজও এক অজানা রহস্য। প্রায় সময়ই দুপুরে পর হাজী বাড়ির পুকুরে দলবেঁধে গোসল করতাম চাচাতো ভাই, ফুফাতো ভাই ও গায়ের অন্যদের সাথে। বাড়িতে ধরা পরলে হয়তো বকা খাবো সেই ভয়ে গোসল করে এক দৌড়ে দাদা-দাদীর ঘরে চলে যেতাম। সেখানে গিয়ে নারকেল তেল গায়ে মাখতাম যত তাড়াতাড়ি পারা যায় যেনো কেউ না দেখে। কতদিন এমন করেছি খুব একটা মনে পড়েনা, ঐ বিশেষ একদিনের কথা চোখে ভাসলো আজ, আমি গায়ে তেল মাখছি, দাদী বাইরের রান্নাঘরে বইত্যা শাক রান্না করছিলো আর দাদা উঠোনে মোড়ায় বসে আছেন। আছরের আজান হচ্ছিল তখন। আজান শেষ হতেই দাদা উঠে মসজিদের দিকে চলে যান। আমিও দৌড়ে দাদার সাথে যাই মসজিদে। দাদার সাথে কথপোকথন খুব একটা মনে নাই, ক্লাস ফোরে পড়ি যখন দাদা মারা গেলেন, মারা যাওয়ার আগে ৬/৭ মাস প্যারালাইজড ছিলেন, সে হিসেবে ক্লাস থ্রি পর্যন্তই দাদার কথোপকথন ছিলো আমার সাথে। কতটুকুই আর মনে থাকে ঐ বয়সের। আর তখন যদি জানতাম আমি কবি হবো তাহলে তো প্রতিদিনের ডায়েরি মেইনটেইন করতাম শিশুকাল থেকেই হিঃ হিঃ। কি এক আদুরে আমি।
"আদতে আমাকে খুঁজি চাদরে মোড়ানো রোদের উঠোনে দাদা বসে থাকতো যেখানে-
হয়তো আছরের অপেক্ষা করছে বুড়ো, আমিও তড়িঘড়ি গায়ে তেল মাখছি।
অবাধ্য স্মৃতি কাগজের পৃষ্ঠায় আলতো আদরে ভরা আমার পুরনো আমি।"
বাস থেকে নামছিলাম- এ সময় আহনাফ মেসেঞ্জারে মেসেজ দিলো- ভাই ঘি দিয়ে দুধ খাইছেন? আমি রিপ্লে দিলাম- কবিতা লিখি। আহনাফ লিখল- লিখেন। কবিতায় আমার নাম রাইখেন, বাট ততক্ষণে আব্বাকে নিয়ে লিখে ফেলেছি। আব্বার সাথে ছোটকাল থেকেই আমার যে খুব আলাপচারিতার সম্পর্ক তা নয়, আব্বাকে দূর থেকে দেখেছি এমনটাই মনে হয় আমার, বাবা হিসেবে তার যা যা করার সবই করেছেন কোন কমতি নেই, আলহামদুলিল্লাহ। সকালে কাজে বের হয়ে রাতে ফিরতেন, ঘুম থেকে উঠে কখনো কখনো দেখতাম কখনো দেখতামনা, আবার রাতেও সমান, কখনো ঘুমিয়ে পরেছি তারপর আব্বা আসতেন। কিছু প্রয়োজনে মাকে মেসেঞ্জার বানাতে হইতো। ভয় ডর এমন কিছুনা, সময় আমাদেরকে দূরে রেখেছে অদৃশ্য মায়ার বন্ধনে। আজ যখন মোবাইলের যুগে যখন তখন কথা বলার সুযোগ আছে- মনের কতো জিজ্ঞাসাই জিজ্ঞেস করতে মন চায়, কিন্তু করিনা। লিখতে লিখতে অনুভব করি এখন। সেই পুরনো সময়ের মতো আব্বা আর আমি দূরে আবার একই সময়ে খুব কাছাকাছি। এই কবিতাটা লিখতে লিখতে হিসেব করলাম চার পাঁচদিন দিন মনে হয় হয়ে গেলো কল করা হয়নাই আব্বাকে। আগে আব্বা সময় দিতে পারতোনা, এখন আমি দূরদেশে ও সময়ের পার্থক্য বাংলাদেশের সাথে এটা কি কোন আসল কারণ হইতে পারে? পারেনা। আচ্ছা আব্বারও তো জন্ম নয়নগর গ্রামে, আমার দেখা নয়ানগর আর আব্বার নয়ানগর কি দেখতে একই? এসবের একটা জিজ্ঞাসা কবিতায় রেখে দেয়ার বাসনায় লিখা শেষ করলাম।
"ধোয়াশে বাংলার স্মৃতিতে বাবা-ও থাকে আমার আশেপাশে, তাঁকে রাখি বাক্যে-
ভাবি কলম হাতে কখনো জিজ্ঞেস করবো- আব্বা, আপনি নয়ানগর দেখেছেন!
আপন মনেই হাসি- আমি কি বোকা, আমার বয়স হয়ে গেছে, বাদামী ধূলো আমার চোখে!"
বার্কিং
০১.০১.২০২৬
Comments
-
-
Habib Rahman
3 weeks ago
লেখাটি ভালো লেগেছে। লেখালেখির জীবন চলতে থাকুক। আমরা তা নিয়েই লিখি যা আমাদের ভাবায়, আবেগী করে তোলে।