বইঃ সাতকাহন
লেখকঃ সমরেশ মজুমদার
প্রকাশকঃ আনন্দ প্রকাশনী
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ৭২৮
কাহিনি সংক্ষেপঃ
দীপাবলি৷ছটফটে একটা মেয়ে৷ খোকা, বিশু এদের সঙ্গেই তার খেলাধুলা৷ বারো বছর বয়স হয়ে গেছে যার, তার ছেলেপেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা মানায় না৷ এ নিয়ে অঞ্জলির বা মনোরমার অভিযোগের শেষ নেই৷ অভিযোগ নেই কেবল অমর নাথের৷
সেই বারো বছর বয়সের মেয়ের হঠাৎ করে বিয়ে৷ ফুলশয্যার পরের দিনই বিধবা৷ অসুস্থ অতুল বিয়ের আগেই ছিল৷ তড়িঘড়ি করে বিয়ে দেয়ার একটাই কারণ প্রতুল ব্যানার্জির বংশরক্ষা করতে হবে৷ কিন্তু কী আর করার যেখানে প্রকৃতিই চায়নি সেখানে প্রতুলের কি সাধ্য তা ঠেকানোর! মাঝখান থেকে অকাল বৈধব্যের শিকার শুধু নাজুক দীপাবলি৷ বৈধব্য যতটা না তাকে নাড়া দিয়েছে তার থেকে বেশি নাড়া দিয়েছে এটা জানতে পেরে যে যাদেরকে নিজের বাবা মা বলে জেনে এসেছে তারা আসলে তার বাবা মা নয়৷ অমরনাথ, অঞ্জলি তার মাসি মেসো৷ তার মা তাকে জন্ম দিয়েই নিজের কর্তব্য শেষ বলে মনে করে পাড়ি জমান ঈশ্বরের কাছে৷ আর তার বাবা নিরুদ্দেশ৷ হতভাগী দীপাবলির ঠায় তখন অমরনাথেরই কোলে৷
বৈধব্যের রেশ কাটিয়ে উঠতে, তাকে তার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে তাকে তার ফেলে রাখা পড়াশোনা শেষ করতে আবার তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়৷ স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে লেটার নিয়ে পাশ করার পর তার স্বপ্ন বড় হতে থাকে৷ আর এ স্বপ্নের গোড়ায় পানি ঢেলে তাকে বিশাল বৃক্ষে রুপ দিতে যিনি অত্যান্ত প্রখরতার পরিচয় দেন তিনি তার গৃহশিক্ষক সত্যসাধন বাবু৷ যিনি দীপাকে শিখিয়েছেন কি করে স্বপ্ন দেখতে হয়৷ কি করে বড় হতে হয়৷ কলেজে ভর্তি হন জলপাইগুড়িতে সেখানে পড়া শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান কলকাতায়৷ এত বড় শহর, এত নতুন মানুষ, নিজেকে তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে কি পারবে কোয়াটার্সে থাকা গ্রাম্য মেয়ে দীপাবলি? পারবে, এটিই বিশ্বাস করিয়েছে দীপা নিজেকে৷ ঘর ছেড়ে, নিজের গ্রাম ছেড়ে, চা বাগান ছেড়ে এই প্রথম এতদূরে দীপাবলি৷ হোস্টেলে নিজেকে মানিয়ে নেয়া৷ নতুন বন্ধু হওয়া৷ তাদের সঙ্গে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেয়া৷ তার সবই সম্ভব করেছিল দীপা৷ জীবনের দুয়ারে প্রেম এসে ডাক দিয়েছিল অসীম নামের এক ছেলে৷ কিন্তু যেখানে স্বপ্নের কাছে যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সে কি করে তার ডাকে সাড়া দেয়!
কলেজে নানা রকমের নানা মতের বন্ধুবান্ধবের মাঝে নিজেকে নিয়ে গিয়ে ঠাঁই দিয়েছিল নাটক রাজনীতি করা মেয়ে মায়ার কাছে৷ যত ওঠাবসা যেন তার সঙ্গেই৷ সেই সুবাদেই যেন ঘটনাক্রমে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও নাটকের মঞ্চ তাকে তুলে নিয়েছিল৷ নাটকে জড়িয়ে ছিল নিজেকে৷ সেখানেও সে তার দক্ষতার পরিচয় দেয় এবং সুযোগ পায় বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সুবিনয় সেনের চলচ্চিত্রে অভিনয় করার৷ কিন্তু তার লক্ষ্য তো একটাই নিজেকে বড় হতে হবে৷ চাকরি পেতে হবে৷ আইএসসি অফিসার হতে হবে৷
যার ফলে সে নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়৷
কিন্তু ঘটনাচক্রে মাঝপথে তার স্বপ্ন কিছুটা গতিহীন হয়ে পড়ে৷ চাকরি নেয় জলপাইগুড়িতে৷ সেখানে নিজের স্বাধীনতার চর্চা করতে না পারা, নিজের আদর্শে দাগ লাগা৷ নীতির আশায় জল ঢেলে দেয় তার সহকর্মীরা তাই সে নেখানে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পেরে সেটিও ছেড়ে দেয় ছেড়ে দিয়ে সে আবার কলকাতায় ফিরে আসে৷ এসে এবার সে নিজেকে তৈরি করে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য৷ যার স্বপ্ন সে দেখেছে,নিজেকে গড়ে তুলতে চেয়েছে৷ রাতদিন লেগে থেকে নিজেকে তৈরি করে আইএসসির যোগ্য একজন প্রার্থী হিসেবে৷ ভাগ্য তার সহায় হয়৷
সে নিয়োগ পেয়ে যায়৷ সেই সঙ্গে পেয়ে যায় তার জীবনসঙ্গীকেও৷ সেই পরীক্ষারই ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে পরিচয় হয় তার দিল্লীর এক বাঙালি পরিবারের সঙ্গে৷ পরিবারপতি পরেশ মুখোপাধ্যায় দীপাবলির ব্যাক্তিত্ব তাকে যেমন মুগ্ধ করে তেমনি মুগ্ধের কিছু ছিটেফোঁটা গিয়ে লাগে তার ছোট ছেলে অলকের গায়ে৷ সেখান থেকেই মুগ্ধতা প্রেম হয়ে গজিয়ে ওঠে৷ ফলে পরিণাম বিয়ে, জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয় তাকে৷ কিন্তু ভাগ্য যেন চায়নি দীপা সংসারে নিযুক্ত থাকুক৷দেখা দেয় তাদের মাঝে মতবিরোধ৷ মতবিরোধ থেকে দূরত্ব৷ দূরত্ব থেকে অভিমান৷ আর সে অভিমান ক্রমশই ভালোবাসার পারদ নিচে নামিয়ে দেয়৷ পরে অবশ্য অলোক নিজেকে শেষ আশ্রয়ের জন্য দীপাকে আশা করলেও দীপা তাকে ফিরিয়ে দেয়৷ প্রচন্ড ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষেরা বোধহয় এমনই৷ একবার যাকে মন থেকে বিদায় দেয় তাকে বোধহয় আর জায়গা দিতে পারে না তারা৷ বৃদ্ধ ঠাকুমাকে কথা দেয়া মনোরমাকে নিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে সে৷
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
প্রচন্ড দোর্দন্ডপ্রতাপ ব্যক্তিত্বের অধিকারীণী দীপা৷ যাকে সমরেশ অত্যন্ত নিপুণ হাতে গড়ে তুলেছেন৷ যাকে টলানো যায় না৷ যে তার স্বপ্নে অবিচল৷ সকল বাঁধা বিপত্তি প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের স্বপ্নের জাহাজকে ভাসিয়েছে অগাধ জলে৷ যেই এসেছে সেই জল নষ্ট করতে এক সেকেন্ডও সময় নেয়নি নিজেকে শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে৷ কামার যেমন লোহাকে গরম আগুনে দিয়ে পরে পানিতে ফেলে পিটিয়ে একটা গড়ন দেয় দীপাবলি যেন নিজেকে তেমন করেই গড়ে তুলেছে৷ নিজের আত্মসম্মান বোধ, নিজের আদর্শ, নিজের ব্যক্তিত্বকে আঘাত করে এমন কিছু থেকে নিজেকে সবসময় দূরে রেখেছে৷ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি নারীর মাঝে একটি করে দীপাবলি স্থাপন করতে চেয়েছেন সমরেশ মজুমদার৷ কিন্তু অবস্থান, পরিবেশ, আবহাওয়া কতটুকুই বা অনুকূলে থাকে এমন দীপাবলি নির্মাণে?