★ পঁচাশি টাকা ★
জালাল সাত বছর বয়সী একটি শিশুর শরীরে বন্দী এক নিঃস্ব মন। তার জীবনের দিনগুলো কেবল কাগজ কুড়ানো, প্যাকেট ফেলে দেওয়া, বোতল খুঁজে বের করার মধ্যে কাটে। তার পৃথিবী ছোট—একটি লোহার রেলপথ, রাস্তার ধারের ময়লা, এক কোণার কোনো ফেলে রাখা সিগারেটের খালি প্যাকেট—এগুলোই তার সম্বল। সে জানে না তার জন্ম কোথায়, কে তার বাবা-মা, জীবন কেন তাকে এইভাবে ছেড়ে দিয়েছে।
আজকে সে ভীষণ খুশি। কারণ, আজ সে দুই কেজিরও বেশি কাগজ কুড়িয়েছে। রোজকারের মতো কাগজ কুড়নোর পর ওর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা৷ হঠাৎ করে সিগারেটের প্যাকেটের ভেতর তার চোখ পড়ে৷ পঁচাশি টাকা। ওর চোখে একটা আনন্দের রেখা ভেসে উঠল৷ ছোট্ট হাতে টাকা, এমন যেন কেউ ইচ্ছে করেই রেখেছিল তার জন্য। সে সেই টাকা হাতে নিয়ে রয়ে রয়ে হাঁটছিল, মনে এক অসীম আনন্দ। ভাবছিল, আজকে যদি ভাতের সঙ্গে মাছের ঝোল, রুটি আর একটু ডাল-মাছ পাওয়া যায়, তবে তো সত্যিই স্বর্গে পৌঁছে যাব!
এমন সময়েই আকাশে বাজ পড়ার মতো তার স্বপ্নের দরজায় একটা কন্ঠ এসে উপস্থিত হলো৷
মোত্তালেব, বস্তির এক হেরোইনখোর৷ হঠাৎ করে জালালের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চেহারা এমন যেন কোনো মসৃণ চাতালে খোদাই করা সিমেন্টের আস্তরণ—মুখে বাজে হাসি, চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে অধিকারবোধ। সে এক মুহূর্তে জালালের হাত থেকে টাকা ছিনিয়ে নিল।
“এল্ল্যা কর্যা তালি দিন পার করিচ্চু তুই, অ্যা?” মোত্তালেবের কণ্ঠে ছিল তাচ্ছিল্য, কটাক্ষ, এমন যেন পৃথিবী তার জন্য শুধুই একটি হাস্যকর খেলা। মোত্তালেব জালালের হাত থেকে টাকাটা কেঁড়ে নিল৷
জালাল থমকে দাঁড়াল। তার চোখে কিছু ক্ষণের জন্য সেই টাকা হারানোর শূন্যতা তৈরি হলো, তারপর গভীর এক যন্ত্রণা ভর করল। সে বুঝতে পারছিল না, কেন তার কাছে একটি ছোট সুখও এত কঠিন ছিল! চোখে পানি আসছিল, তবে সে চোখের জলও বুঝতে পারছিল না, কেন তা পড়ছে। তার পঁচাশি টাকার স্বপ্ন, তার ক্ষুদ্র আশা—সেই ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তগুলো মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল। তার সমস্ত কল্পনা, আশা, নিরীহ আনন্দ—সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল।
মোত্তালেব চলে যাওয়ার পর জালাল দাঁড়িয়ে রইল, তার চারপাশ যেন শূন্য হয়ে গেছে। সে ভাবছিল, এটাই কি জীবন? যেখানে একটি ছোট আনন্দও এমন নিঃস্ব হয়ে যায়, এবং মানুষ তার জন্য কতটুকু অমানবিক হতে পারে। সে কেন এই পৃথিবীতে এসেছে, কেন তাকে এইভাবেই বেড়ে উঠতে হবে, সে জানত না। তবে সে বুঝতে পারল, যে পৃথিবী তাকে ঘৃণা করে, সেই পৃথিবী থেকেও কখনো কিছু পেতে আশা করা কতটা নিষ্ফল।
মোত্তালেব চলে যাওয়ার পরও, জালালের চোখ থেকে পানি পড়তেই থাকল। সে অনুভব করছিল, তার হাতের টাকা কেবল একটি মিথ্যে স্বপ্ন ছিল৷ চোখে জলের চাদর থাকায় মোত্তালেবের যাওয়ার দৃশ্য ক্রমশ অস্পষ্ট হতে লাগল৷