(হুমায়ুন আজাদকে)
❑
মনে রেখো, সেই চায়ের কাপ
মনে রেখো, জানালার ধারে চেয়ার
মনে রেখো, বিকেলের রোদ
মনে রেখো, বৃষ্টিভেজা সিঁড়ি
মনে রেখো, হঠাৎ হাসি
মনে রেখো, না-বলা কথা
মনে রেখো, অকারণ অভিমান
মনে রেখো, একলা ঘরের বাতি।
মনে রেখো, গল্পটল্প
মনে রেখো, আড্ডাটাড্ডা
খবরটবরের ভাঁজে রাখা
সেই যে কত কথা।
মনে রেখো, ঠান্ডা চা
মনে রেখো, হাসিঠাট্টা
মনে রেখো, মশকরা
ফাজলামি আর প্যাঁচাল
রাত নামিলে জানালার বাইরে
শহরের ফিসফাস।
মনে রেখো, কানাঘুষা
মনে রেখো, গুঞ্জন
মনে রেখো, বকবক
কিচিরমিচির জনারণ্য
মুখ বন্ধ মানুষের শহর
তবু কত কথা কয়।
মনে রেখো, ঝুটঝামেলা
মনে রেখো, গুলমাল
মনে রেখো, গোলমাল
মনে রেখো, তালগোল
মানুষ কেমন উল্টাপাল্টা
এলোমেলো হয়।
মনে রেখো সেই মুখটি
যে খুব স্বাভাবিক গলায়
বলেছিল-
'এই তো, মোটামুটি ভালো আছি।'
মনে রেখো, মোটামুটি
মনে রেখো, অল্পস্বল্প
মনে রেখো, কমবেশি
মনে রেখো, খানিকটা প্রেম
খানিকটা অভিমান
খানিক মিথ্যা
খানিক সত্য।
মনে রেখো, খোঁজখবর
মনে রেখো, হালচাল
মনে রেখো, হালহকিকত
জিজ্ঞেস করতে করতে
মানুষটির ভিতরটাকে
দেখিনি কখনো।
মনে রেখো, এখানে-সেখানে
মনে রেখো, এদিক-ওদিক
পথেঘাটে, মাঠেঘাটে
পাড়ামহল্লার ভিড়ে
কেউ কেউ দেশ ঘুরে ফিরে
নিজের কাছেই অচেনা।
মনে রেখো, জানা-অজানা
মনে রেখো, চেনা-অচেনা
দেখা-অদেখা, শোনা-অশোনা
বলা-নাবলা কত কথা
ঠোঁটের কাছে এসে
ফিরে গেছে নীরবে।
মনে রেখো, পাওয়া-নাপাওয়া
ঘুমের ভিতর বসে থাকা
কত মানুষের ছায়া
মনে রেখো, হারিয়ে যাওয়া
মনের মতো মায়া।
মনে রেখো, কিছুক্ষণ
মনে রেখো, খানিকক্ষণ
একটু আলো, অল্প উষ্ণতা
তারপর হুটহাট অন্ধকার।
তবু মনে রেখো মানুষ
খেয়ালখুশিতে বাঁচে
মনমর্জিতে হাঁটে
ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখে
মনেরমতো কাউকে খোঁজে
পায়, হারায়
তারপর খুব ধীরে বলে-
যা হোক।
মনে রেখো, যাহোক
মনে রেখো, এই আর কী
মনে রেখো, এমনিই
এই 'এমনিই'-র ভিতরে
কত গভীর কারণ
এই 'যাহোক'-এর নিচে
কত বছরের কান্না।
মনে রেখো, শান্ত মানুষ
মনে রেখো, বন্ধ দরজা
মনে রেখো, নিঃশব্দ ঘর
বাইরে যে মুখটি স্থির
ভিতরে তার কাণ্ডকারখানা
কে জানে কত দূর।
মনে রেখো, কথায়-কথায় হাসি
গল্পে-গল্পে আড়াল
জীবনের ফাঁকে ফাঁকে
জীবনকে এড়িয়ে যাওয়া।
মনে রেখো জানালা
মনে রেখো জানালার বাইরে
হাওয়াবদল, দিনদুপুর
মনে রেখো রাতবিরাত
মনে রেখো নিজের মুখ
কাঁচে হঠাৎ দেখা।
মনে রেখো সেই মানুষটিকে
চেনাজানা ঘরের ভিতর
যে বসে থাকে চুপচাপ
নিজের কাছেই অচেনা।
মনে রেখো টুকরোটাকরা স্মৃতি
মনে রেখো খুচরোখাচরা দিন
কথারকথা, রকমসকম
বাছাবাছি, যতসব
অপ্রয়োজনীয় জিনিস
শেষে এসে প্রয়োজন হয়।
মনে রেখো, এক কাপ চা
মনে রেখো, হঠাৎ হাসি
মনে রেখো, না-বলা একটি কথা
মনে রেখো, বিকেলের হাঁটা
মনে রেখো, ভুল বোঝাবুঝি
মনে রেখো, ছোট্ট ক্ষমা।
এইসব দিয়েই মানুষ বাঁচে।
মনে রেখো ঝালমুড়ি
ঝাল-নোনতা-মিষ্টি-কাঁচা
মিশমাশ করা জীবন
কখনো পথেঘাটে
কখনো ঘাটেমাঠে
কখনো কোথাও না গিয়ে
শুধু হেঁটে যাওয়া।
তবু মনে রেখো-
আমরা পৌঁছাতে চাই।
কোথায়?
কেউ জানে না।
মনেরমতো কোনো জায়গায়?
কোনো মানুষের কাছে?
নাকি বহুদিন পরে
নিজের কাছেই?
মনে রেখো টুকিটাকি
মনে রেখো টুকটাক
খুঁটিনাটি, হাবিজাবি
যা-তা, এটা-সেটা
কথাটথা, গল্পটল্প
ভাবটাব, খবরটবর
হাসিঠাট্টা, কানাঘুষা
ফিসফাস, উল্টাপাল্টা
এলোমেলো, মিশমাশ
হুটহাট, খেয়ালখুশি
মনমর্জি, অল্পস্বল্প
কমবেশি, মোটামুটি।
একদিন সব থেমে যাবে।
থেমে যাবে বকবক
থেমে যাবে প্যাঁচাল
থেমে যাবে গুঞ্জন
আড্ডাটাড্ডা, খোঁজখবর
হালচাল, দুনিয়াদারি।
থেকে যাবে-
একজন মানুষ।
কিছু ছেঁড়াখোঁড়া স্মৃতি
কিছু বলা-নাবলা কথা
কিছু পাওয়া-নাপাওয়া
কিছু দেখা-অদেখা
কিছু জানা-অজানা।
আর পৃথিবী বলবে-
টুকিটাকি এই তো জীবন।