Article

বিষাদের ইলাহি- মহাবিশ্ব জন্ম দিয়েছে, পৃথিবী কি তাকে বাঁচতে দেবে?

November 4, 2026

2 views

বিষাদের ইলাহি-

মহাবিশ্ব জন্ম দিয়েছে, পৃথিবী কি তাকে বাঁচতে দেবে?

•

ধরো, জন্মের আগে তোমাকে পৃথিবীটা দেখানো যেত। তুমি দেখতে, কোথাও একটি শিশু মায়ের আঙুল আঁকড়ে ধরেছে, কোথাও একটি মেয়ে বাড়ি ফেরার পথে মাকে ফোন করে বলছে, আর একটু পরেই পৌঁছে যাব। তুমি কি বুঝতে পারতে, একই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্য নিরাপত্তার অর্থ এত আলাদা কেন?

তোমার মা যখন তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন, তোমার শরীর তখন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছিল। কোষ বিভাজিত হচ্ছিল, স্নায়ুতন্ত্র বিকশিত হচ্ছিল, হৃদ্‌যন্ত্র স্পন্দিত হচ্ছিল। এই দীর্ঘ জৈবিক প্রক্রিয়ার কোথাও লেখা ছিল না, তোমার জন্য কেমন একটি সমাজ অপেক্ষা করছে। প্রকৃতি তোমাকে জন্মের সম্ভাবনা দিয়েছে। জীবন তোমার কতটা নিরাপদ হবে, তার দেয়নি নিশ্চয়তা।

২০২৪ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল পরিচালিত নারী নির্যাতনবিষয়ক জাতীয় জরিপে ২৭,৪৭৬ জন নারীর অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা হয়। জরিপের স্থানীয় সংজ্ঞা অনুযায়ী, ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা সাবেক স্বামীর হাতে কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আগের ১২ মাসে এই হার ছিল ৪৯ শতাংশ। এখানে নির্যাতন বলতে শুধু শারীরিক আঘাত নয়, যৌন ও মানসিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবঙ নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণও বোঝানো হয়েছে।

সংখ্যাগুলো পড়ে আমার একটি মায়ের কথা মনে হয়। তাঁর মেয়ে বাড়ি ফেরেনি। মেয়েটির বয়স কত ছিল, সে কী পড়ত, কোন রঙের জামা তার পছন্দ ছিল-এসবের উত্তর হয়তো সংবাদে পাওয়া যাবে। অথচ বাস্তবে মা রাতে দারভাযের দিকে তাকিয়ে কতবার ভেবেছিলেন, মেয়েটি এখনই ফিরবে, কে তার হিসাব রাখবে? পরিসংখ্যান বহু মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রত্যক্ষ করে। একজন মানুষের অবিদ্যমানতাকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে না।

আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে নিজেদের অতীত খুঁজি। আমাদের শরীরের কার্বন ও অক্সিজেনের মতো মৌলগুলোর উৎপত্তি প্রাচীন নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ যে শরীর নিয়ে একটি মেয়ে নদীর ধারে হাঁটে, বই পড়ে, প্রেমে পড়ে কিংবা মায়ের সঙ্গে অভিমান করে, সেই শরীরের উপাদান বহন করে মহাবিশ্বের সুদীর্ঘ পূর্ববৃত্ত। অথচ সেই শরীরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নক্ষত্রের বৃত্তান্ত জানাই যথেষ্ট নয়। দূরের গ্যালাক্সি সম্পর্কে জ্ঞান বাড়লেও নিজের সমাজে অন্যায় কমানোর দায় আমাদেরই থেকে যায়।

আমরা মৃত্যুর পরে মানুষকে স্মরণ করি। তার ছবি ছড়িয়ে পড়ে, তার জন্য বিচার চাওয়া হয়, তার জীবন নিয়ে কথা বলা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো একটি মেয়েকে অমর করে রাখার জন্য আগে তাকে মরতে হবে কেন? তার স্বাধীনতা, ইচ্ছা ও ভবিষ্যৎ কি বেঁচে থাকতেই মূল্যবান নয়? যে মা মেয়ের ঘরে ঢুকে তার চিরুনি কিংবা বই দেখে থেমে যান, তাঁকে মহাবিশ্বের বিশালতার কথা বলে সান্ত্বনা দেওয়া যায় না। তাঁর কাছে একটি পরিচিত পায়ের সোখান, দারের ওপাশ থেকে ভেসে আসা মেয়ের কণ্ঠ, সমস্ত নক্ষত্রের চেয়ে বাস্তব।

বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, কোনো ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা যায়, তথ্য দিয়ে ধারণা যাচাই করা যায়, ব্যর্থতা শনাক্ত করে প্রতিরোধের পদ্ধতি উন্নত করা যায়। নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রেও গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্য, কার্যকর আইন এবঙ ন্যায়বিচার জরুরি। পক্ষান্তরে তথ্য প্রকাশ করলেই সমাজ বদলে যায় না। সেই তথ্যের অর্থ বুঝে মানুষের আচরণ ও প্রতিষ্ঠানের কাজ বদলাতে হয়।

আমাদের ন্যূনতম প্রাপ্য, একটি মেয়ে বুড়ো হোক। তার চুলে পাক ধরুক, সে নিজের পুরোনো ছবি দেখে হাসুক, ইচ্ছেমতো কোনো শহরে যাক, কাউকে ভালোবাসুক কিংবা একা থাকার সিদ্ধান্ত নিক। তার জীবন যেন কোনো অপরাধের সংবাদে শেষ হয়ে না যায়। তার বেঁচে থাকাকে যেন কেউ অসাধারণ সৌভাগ্য বলে বর্ণনা না করে।

আর কোনো মা যখন সন্তানকে পৃথিবীতে আনার কথা ভাববেন, তাঁকে যেন প্রথমেই ভেবে নিতে না হয়, এই পৃথিবীতে তার মেয়েকে কী কী বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। জন্মের মধ্যে অনিশ্চয়তা আছে। আদতে অন্যায়কে অনিবার্য বলে মেনে নেওয়া মানুষের তৈরি আরেকটি ভুল।

রাত শেষে পৃথিবীতে আবার সকাল হবে। কোথাও নতুন শিশুর কান্না শোনা যাবে, কোথাও কোনো মা তাঁর মৃত মেয়ের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকবেন। মহাবিশ্বের কাছে এই দুই ঘটনার কোনো পৃথক অর্থ নেই। যদিও মানুষের কাছে আছে।

একটি জীবন শুরু হয়েছে। আরেকটি জীবন থেমে গেছে। এই দুই ঘটনার মাঝখানে যে পৃথিবী, তাকে কেমন করে রাখব-সেই সিদ্ধান্ত এখনো আমাদের হাতে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপিএর ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপ। নাসার নক্ষত্রে মৌল সৃষ্টিবিষয়ক গবেষণা।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login