সকালে বাতাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আমার মনে হলো, শীত আসছে। পৃথিবী তার পুরোনো জামাকাপড় খুলে ফেলতে শুরু করেছে বুঝি। গাছের নিচে দু-একটা পাতা পড়ে আছে, যেন কতকাল ধরে বুকে চেপে রাখা কোনো গোপন কথা শেষমেশ মাটিকে বলে দিয়েছে। আমি পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। এমন সামান্য একটা নজর যে মানুষের বুকের ভেতর আনন্দ এসে বসতে পারে, তা পৃথিবীর অনেক জ্ঞানী মানুষ জানেন না।
আমার মনে হলো, তোমাকে কথাটা বলা দরকার।লেকিন কিছু কিছু আনন্দ আছে, যাদের জন্য মানুষের
জাবান বানানো হয়নি। কাউকে বলার আগেই তারা বুকের মধ্যে পাখির মতো ডানা ঝাপটাতে থাকে। আমি ভাবি, এই যে শীত আসছে, এই যে বাতাসে পেনহান একটা কোমলতা, এই যে ঝরে পড়া পাতার ভেতরেও বেঁচে থাকার এমন আয়োজন-আমার এই ভালো লাগাটুকু আমি কার হাতে তুলে দেব?
কেউ কি আছে, যে দুই হাতে আমার মনখারাপহীন সকালটাকে ধরে বাড়ি পৌঁছে দেবে? এমন কেউ কি আছে, যে বুঝবে, সব সুখের কোনো কারণ থাকে না। কিছু সুখ কেবল পৃথিবীতে বেঁচে থাকার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়?
আমারও যে কত সাধ জমে আছে-
জমে আছে কথার মতো, শীতের রাতের পাঞ্জেরে জমে থাকা কুয়াশার মতো। ইউটিউবে কত কী দেখি। পৃথিবীর কত পুরোনো শহর, কত ভাঙা বাড়ি, কত আস্তানার ওপাশে মানুষের তানহায়ি। পর্দার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকি, আর মনে হয়, আহা, একদিন যদি নিজের চোখে দেখা যেত!
ভাবি, এই যে জীবনের এত টানাটানি, মাসের শেষে হিসাব মেলানোর এত আয়োজন, প্রয়োজনের কাছে ইচ্ছেগুলোকে প্রতিদিন একটু একটু করে সরিয়ে রাখা-এসবেরও কি একদিন অবসান হবে? একদিন কি আমার হাতে এমন কিছু অবসর জমবে, যা দিয়ে নিজের জন্য একটা বিকেল কিনতে পারব?
কোনো পুরোনো দালানের সামনে দাঁড়িয়ে তার দেয়ালের ক্ষয়ে যাওয়া রং দেখব। ভাবব, এই দেয়াল কত মানুষের হাসি শুনেছে, কত বিচ্ছেদের সুখান নিজের গায়ে মেখে রেখেছে। যে শুব্বাকে এখন ধুলো, সেখানে কোনো একদিন কেউ হয়তো অপেক্ষা করত। যে সিঁড়িতে আজ আগাছা, সেই সিঁড়ি বেয়ে একদিন কেউ ভালোবাসার মানুষের কাছে ছুটে গিয়েছিল।
তারপর কোন একদিন যাব পুরোনো গোরস্থানে-
সেখানে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর গল্প শুনতে খুউব ইচ্ছে করে আমার। তাদের ঘিরে জন্ম নেওয়া মিথ, তাদের অসমাপ্ত প্রেম, তাদের হারিয়ে যাওয়া শোহরাত। ভাবতে ইচ্ছে করে, মৃত্যু কি সত্যিই সব গল্পের শেষ, নাকি কিছু গল্প কেবল দর জাবানি দিগার জান্দে মেমানাদ?
আমি জানি না, আমার এত দীর্ঘ জীবন হবে কি না। সব স্বপ্ন দেখার মতো আয়ু কি মানুষ পায়? নাকি কিছু স্বপ্ন জন্মায় শুধু আমাদের ভেতরটাকে বড় করে দেওয়ার জন্য, পূরণ হওয়ার জন্য নয়?
তবু আমি স্বপ্ন দেখি-
মূল হেতু আমার মনে হয়, বেঁচে থাকা মানে শুধু দিন পার করা নয়। বেঁচে থাকা মানে নিজের জন্য পৃথিবীর কাছে কয়েকটা অসম্ভব সুন্দর বিকেল চেয়ে রাখা। আর তুমি থাকলে, এই চাওয়াগুলো আরও সহজ হয়ে যায়।
তুমি পাশে থাকলে দিনগুলোকে আর আলাদা করে সুন্দর করতে হয় না। তারা নিজেরাই কেমন সুন্দর হয়ে ওঠে। যেমন শীতের প্রথম দিকের টাটকা সবজি-মাটির গন্ধ গায়ে মেখে, রংটুকু সতেজ রেখে, কোনো আয়োজন ছাড়াই বাজারের ঝুড়িতে শুয়ে থাকে। তোমার কাছে এলে আমারও তেমন লাগে। মনে হয়, জীবনের এতদিনের ক্লান্তি ধুয়ে গিয়ে আমি আবার নতুন হয়ে উঠছি হয়তো।
তোমার সঙ্গে রোদে দাঁড়ালে রোদকে অন্য রকম লাগে।একই সূর্য, একই পৃথিবী, একই পরিচিত রাস্তা। অথচ তোমার পাশে দাঁড়ালে মনে হয়, আলো বুঝি কেবল আমাদের জন্যই একটু নরম হয়েছে। পৃথিবীর সব কঠিন জিনিসের ভেতরেও কোথাও একটা কোমল জায়গা আছে জানো, যেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে নিজের মাথাটা রাখতে পারে। আমি সেই জায়গাটার নাম জানি।
—তার নাম তুমি।
আর শোনো, তোমার সঙ্গে কাঁচাবাজারে যেতে আমার যে বেশ ভালো লাগে! এই কথাটা শুনে হয়তো পৃথিবীর প্রেমিকেরা হাসবে। তারা প্রেম বলতে চাঁদ দেখাকে বোঝে, সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে হাত ধরে থাকাকে বোঝে, দূর দেশে একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়াকে বোঝে। অথচ আমার প্রেমের একটা বড় অংশ পড়ে আছে চৌমাথার বাজারের সরু গলিতে-যেখানে শীতের নতুন সবজি সাজানো থাকে, বিক্রেতারা হাঁক দেন, মানুষ দরদাম করে, আর তুমি হয়তো এক হাতে ব্যাগ ধরে অন্য হাতে বেছে বেছে দেখো কোন ফুলকপিটা ভালো।
আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি-
তোমার এই সামান্য মনোযোগের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়, পৃথিবীতে এর চেয়ে জরুরি তাইয়্যিব, দিগে চি মিমুনে? যে মানুষ তোমার সঙ্গে সবজির দাম নিয়ে কথা বলে, সে-ই তো তোমার সঙ্গে সংসারের জবান শিখছে। যে মানুষ তোমার পছন্দের শাকটা মনে রাখে, সে হয়তো তোমার বহুদিনের না-বলা দুঃখটাও একদিন মনে রাখবে। যে মানুষ তোমার সঙ্গে বাজারের ভিড় পেরিয়ে বাড়ি ফেরে, সে তোমার সঙ্গে জীবনের আরও কত ভিড় পার হয়ে যেতে পারে এ তুমি জানো।
আচ্ছা প্রেম কি তবে সবসময় হৃদয়ের মধ্যে ঘটে?আমার তো মনে হয়, প্রেম ঘটে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে, শীতের রোদে কাপড় শুকাতে দিতে দিতে, রান্নাঘর থেকে কারও নিশান ধরে ডাকতে ডাকতে। প্রেম ঘটে যখন দুজন মানুষ পৃথিবীর বিশালতা নিয়ে কথা বলতে বলতে হঠাৎ মনে করে, আজ ফেরার পথে আলু আর কাঁচামরিচ কিনতে হবে।
এমনকি প্রেম তো ঘটে সুকূতের মধ্যেও-
যখন বলার মতো বিশেষ কিছু থাকে না, তবু পাশাপাশি রিক্সায় ঘুরতে ইচ্ছে করে । যখন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো নিশ্চয়তা নেই, তবু আগামী শীতের জন্য মনে মনে কিছু পরিকল্পনা করে রাখা যায়।
জানো সুকাই, তোমার সঙ্গে আমার ঠিক তেমনই হয়-
আমি জানি না, কতদিন বাঁচব। জানি না, পৃথিবীর সব পুরোনো দালান দেখা হবে কি না, কতগুলো গোরস্থানের গল্প জানা হবে, কিংবা জীবনের টানাটানি কোনোদিন সত্যিই শেষ হবে কি না।
বা ইন ভুজুদ শীত তো আবার আসবে-
গাছে গাছে পাতা ঝরবে। সকালের বাতাসে সেই চেনা শীতলতা এসে লাগবে। বাজারে নতুন সবজি উঠবে। বিকেলের রোদ একটু একটু করে আমাদের ঘরের মেঝেতে গড়িয়ে পড়বে। আমি চাই, সেইসব সাধারণ দিনের মধ্যে তুমি থেকো।
আমি হঠাৎ কোনো সকালে বাতাসে দাঁড়িয়ে আনন্দিত হয়ে উঠলে তোমাকে বলতে পারি, দেখো, শীত আসছে।
আমি কোনো পুরোনো দালানের ছবি দেখলে তোমাকে দেখিয়ে বলতে পারি, একদিন এখানে যাব আমরা কেমন। আমি দীর্ঘজীবন নিয়ে ভয় পেলে তোমার পাশে বসে চুপ করে থাকতে পারি।
আর কোনো এক শীতের সকালে, বাজার থেকে ফেরার পথে, তোমার হাতে সবজির ব্যাগ আর আমার হাতে অকারণ সুখ নিয়ে যখন বাড়ি ফিরব, তখন যেন মনে হয়-পৃথিবী আমাকে আমার সব স্বপ্ন দেয়নি ঠিকই, তা সত্ত্বেও স্বপ্ন দেখার জন্য যে জীবনটুকু দরকার, তার মধ্যে তুমি আছ।
-হয়তো মানুষের সব চাওয়া পূরণ হয় না।
-হয়তো কিছু আনন্দ কাউকে বলা যায় না।
-হয়তো সব সুন্দর জায়গায় পৌঁছানোও হয় না।
তবুও পৃথিবীকে ভালোবাসার জন্য আমার আর খুউব বেশি কিছু লাগে না।
একটু শীতের বাতাস-
গাছ থেকে ঝরে পড়া দু-একটা পাতা।
বিকেলের মিঠে রোদ। আর তুমি-আমার পাশে, কাঁচাবাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে। যেন পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাস, রীতি-রেওয়াজ আর বুলি - সমস্ত হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা, সমস্ত প্রাচীন প্রেমের শেষ কথা এসে থেমেছে আমাদের এই ছোট্ট, সাধারণ, অথচ অসম্ভব মায়াময় জীবনে।
ম্যায়ঁ চাহতা হুঁ, আমার জীবন দীর্ঘ হোক কি না, তা নিয়ে একদিন আর যেনো ভাবতে না হয়। শুধু শীত এলে তোমাকে পাশে নিয়ে শীতটুকু দেখতে চাই। এই নিমিত্তে কিছু মানুষের কাছে প্রেম মানে অনন্তকাল। বিলকুল ইসি তারাহ আমার কাছে প্রেম মানে-আগামী শীতেও তোমার সঙ্গে রাসত যাওয়ার একটা একটুকনা নিশ্চয়তা।
—বিবির পুকুরপাড়, সদর রোড, বরিশাল।