১
উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে রফিক। সারাটাদিন মুষলধারে বৃষ্টি হতে হতে এতক্ষণে আকাশটাও ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে বোধহয়। এখনো ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। পুরো রাস্তা কাদা কাদা হয়ে গেছে। এক দুবার পা পিছলে যাচ্ছিলো। নিজেকে কোনোরকমে সামলে নিয়েছে। বারীণদের বাড়িটা এখনো বেশ দূরে। হাঁপাচ্ছে সে। কিন্তু এখন এক মূহুর্ত থামার উপায় নেই। যতো তাড়াতাড়ি পারা যায়, বারীণদের বাড়ি পৌঁছাতে হবে। বারীণ তার সাথেই এক ক্লাসে পড়ে। বারীণের কথা ভাবতে গিয়েই কীনা কে জানে, ডান পা’টা কাদায় হড়কে গেলো। নিজেকে সামলাতে পারলো না, পিছলে পড়ে গেলো রফিক। ভাগ্যিস, রাস্তার মাটি কাদা হয়ে আছে, তেমন ব্যাথা পেলো না। মাথার পেছনটা কাদায় খানিকটা থপাস করে বাড়ি খেলো। খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো রফিক। চোখের সামনে শুধুই আকাশ। ছেঁড়া ছেঁড়া কালো মেঘ, তার পেছনে বিকেলের সূর্যের আলো। বিকেলের আলোতে কালো মেঘদের কিনারাগুলো খানিকটা উজ্জ্বল হয়ে আছে। একটা সাদা বক পশ্চিম দিক হতে উড়ে পূর্ব দিকে যাচ্ছে। রফিকের মনে হলো, এই আকাশের ওপারে কী আছে, জানতে হবে তার। ঠিক তখনি তার মনে হলো, সে বারীনদের বাড়ী যাচ্ছিলো। বারীনের বাবা কবিরাজ। সে কবিরাজকে তাড়াতাড়ি নিয়ে আসতে হবে বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলো। বাড়িতে তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আচমকা। ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়েই আবার দৌড় দিলো রফিক। নিজের বুকের ধুকপুক যেন শুনতে পাচ্ছে সে নিজেই।
আর বেশী দূরে নয়, ঐতো দেখা যাচ্ছে। বাড়ির সামনেই বারীন দাঁড়িয়ে আছে। বারীণকে দেখেই কেন যেন শরীরে খুব জোর চলে আসলো, রফিকের। রফিক দৌড়ের গতি বাড়িয়ে দিলো। বারীণের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই আবার পা পিছলে গেলো। ধপাস করে আবার পড়ে গেলো রফিক।
মাটিতে পড়তে পড়তেই রফিক বারীণকে জিজ্ঞেস করলো,
কবিরাজ কাকা বাড়ি আছেন? আমার বাবার শরীর খারাপ করেছে। এখনই কাকাকে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে।
বারীণ নিঃস্পৃহ কণ্ঠে বললো,
বাবা তো বাড়ি নাইরে। বাবা গতকাল গঞ্জে গেলো, আজও এলো না। আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাবার জন্যেই অপেক্ষা করছি।
কথাটা শুনে রফিকের মুখের উপর যেন আকাশের কালো মেঘগুলোর কয়েকটি ঝুপ করে এসে পড়লো। মাটিতে শুয়েই রইলো সে। বারীণের কথা শুনে এখন আর তার মাটি থেকে উঠতে ইচ্ছে করছে না।
তুইতো তার ছেলে। তুই কি কবিরাজি কিছু পারিস? রফিক মাটিতে শুয়ে শুয়েই জিজ্ঞেস করলো।
আমি কীভাবে জানবো? আমাকে কিছুই শেখায়নি বাবা। তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সকাল থেকে না খেয়ে আছি। বাবা এলে রান্না হবে। তারপর খাওয়া পাবো।
বারীনের একপেশে গলায় জবাবটা শুনতে শুনতেই রফিকের মনে পড়লো, বারীণেরতো মা বেঁচে নেই।
তুই এখন আমার সাথে আমাদের বাড়ি চল।
চল। বলেই মাটিতে শুয়ে থাকা রফিকের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো, আমার হাতটা ধর।
২
রফিকের বাবা বিকেলে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন। রফিক আর বারীণ দুজনে এসে পৌঁছেই অবাক হয়ে গেলো। বারীণই বেশি অবাক হয়ে গেলো। তার বাবা রফিকদের বাড়িতেই।
তুমি এখানে কেমন করে এলে বাবা?
আমি বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। পথে একজন জানালো, রফিকের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই এখানে চলে এসেছি। ভালোই হলো, তুই চলে এসেছিস।
রফিকের কেমন যেন আশ্চর্য লাগলো। যে পথে তাদের বাড়ি, সে পথ ধরেইতো সে দৌড়ে গিয়েছে। তাকে অবাক হয়ে তাকাতে দেখেই বারীণের বাবা বললেন,
তুই তো আমার পাশ দিয়েই দৌড়ে গেলি। আমাকে পেরিয়ে কিছুদূর গিয়ে তুই পিছলে পড়েছিলি।
রফিকের মনের আশ্চর্য ভাবটা কাটলোই না। কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে বললো,
মা, আমার ক্ষুধা লেগেছে। বারীণ সকাল থেকে কিছুই খায়নি। কিছু খেতে দাও।
তোর পিঠে মাথায় কাদা লেগে আছে। যা ভালো করে ধুয়ে আয়। তারপর খাবি।
কথাটা শুনেই রফিক আর বারীণ দুজনেই পুকুরঘাটে চলে গেলো।
পুকুর ঘাটে দুজনে একসাথে নেমে হাত মুখ ধুতে ধুতে ঘাটের কাছে মাছের ঘাই দেখেই দুজনে সতর্ক হয়ে গেলো। রফিক প্রায় ফিসফিস করে বললো, মনে হয় বড় মাছ।
বারীণও ফিসফিস করে বললো, নেমে ধরা যাবে না।
বারীন আরও কিছু কথা হয়তো বলতো। থমকে গিয়ে পানির দিকে তাকিয়ে রইলো। রফিকও তার সাথে সাথে পানির দিকে তাকালো।
একটা বড়সড়ো মাছ। মাছটা তাদের পায়ের সামনে। চুপ করে রয়েছে। রফিক উবু হয়ে মাছটার দিকে হাত বাড়ালো। খুব ধীরে ধীরে বারীণও উবু হয়ে মাছটার দিকে হাত বাড়ালো।
এদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। চারদিকে আবছা সুরমা রঙয়ের আলো। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে। দুই কিশোর তাদের স্বল্প জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মাছটা দুজনের হাতের ছোঁয়া পেয়েও সেখানে স্থির হয়ে রইলো, যেন সে এই স্পর্শের অপেক্ষা করছিলো। দুজনের দুয়ে দুয়ে চার হাত মাছটাকে ছুঁয়ে আছে। বারীণ খুব ধীরে ধীরে তার এক হাত দিয়ে মাছটার গায়ে হাত বুলাতে লাগলো। রফিকের দুই চোখে বিস্ময়, চারদিকে সন্ধ্যার নিস্তবদ্ধতাকে সাক্ষী রেখে এক আশ্চর্য মাছ এসে তাদের দুজনকে ছুঁয়ে রয়েছে।
দুজনেই ভুলে গেছে, তাদের হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসার কথা। বারীনের ঠিক এখন কোনো ক্ষুধা অনুভব হচ্ছে না। তার বরং ঠিক এখনই মনে হলো, মাছটা আসলে মাছতো! তবু সে মাছটার গা থেকে হাত সরালো না।
রফিকেরও মনে হলো, মাছটা এভাবেই আরও কিছুক্ষণ থাকুক।
বাড়ির ভেতর হতে রফিকের মায়ের কণ্ঠ শোনা গেলো। মা ডাকছে দুজনকেই। শব্দ শুনেই মাছটা আস্তে আস্তে উল্টো ঘুরে পুকুরের মাঝ বরাবর চলে গেলো।
হতবাক দুই কিশোর কেমন ঘোরের মধ্যেই ধীর পায়ে ঘাট থেকে উঠে বাড়ির ভেতর চলে গেলো।
৩
মাঝ রাতে কিছু মানুষের গলার আওয়াজ কানে যেতেই রফিক বিছানা থেকে উঠে বসলো। তাদের ঘরে অনেক লোক। তার বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন। পাশেই কবিরাজ কাকা বসে আছেন। দুই চোখ বন্ধ করে কেমন যেন ধ্যানমগ্ন সাধুর মতো স্থির হয়ে আছেন। কবিরাজের এক হাতে তার বাবার হাত।
রফিক খানিকটা অবাক হয়ে গেলো, এতো লোক এসেছে কেন? এখনতো অনেক রাত। চারপাশে তাকিয়ে বারীণকে খুঁজল। বারীণকে কোথাও দেখা গেলো না।
ঘরের দরজা দিয়ে একজন লোক ঢুকলো তখনই। লম্বা মানুষ, তার মাথা যেন ঘরের চাল ছুঁই ছুঁই করছে। রফিক অবাক হয়ে দেখলো, এই লম্বা লোকটা বারীণ। চোখ বড় বড় করে সেদিকে তাকিয়ে রফিকের কেন যেন খুব ভয় ভয় করতে লাগলো। সে এখনো সেই স্কুলের বয়সেই আছে। বারীণের বাবাও সেই আগের বয়সেই। বারীণ কখন কীভাবে এরকম বড়ো হলো!
বারীণ তার সামনে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো,
কীরে, তুই আর বড় হবি না?
রফিকের মনে হলো, মা কই? মাকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। মাকে এখন দরকার। খুব দরকার।
ঘরে এতো লোক কেন এলো? বারীণ বড় হয়ে গেলো কেমন করে? তীব্র আতংকে রফিকের শীত শীত লাগছে এখন।
বারীণের বাবা এবার উঠে দাঁড়ালেন। রফিকের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
ঠিক হয়ে যাবে খানিক পরেই। কথাটা বলে ঘরের ভেতর উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
আপনাদের আর প্রয়োজন নাই আর । আপনার সবাই চলে যান। কথাটা বলতেই উপস্থিত সবগুলো মানুষ যেন ভোজবাজীর মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। বারীণের বাবার খানিক দূরেই বারীণ দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,
যা, চলে যা। আমি যতক্ষণ আছি, তোকে কিছুই করতে দেব না।
বারীণ কথাটার জবাবে বললো,
আজ বেঁচে গেলো। মনে হয় এ লোকের আগে তুই’ই যাবি।
রফিক কথাগুলো শুনে চমকে গেলো। এটা আসলে কে? বারীণ নাকি আজরাইল? কাকে নেয়ার জন্যে এসেছে?
৪
আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে রফিক। তার একবার মনে হলো, না, আসলে সে ঘুমাচ্ছে না। সে স্বপ্ন দেখছে। একসাথে অনেকগুলো স্বপ্ন। বাবার অসুখটা স্বপ্ন। বারীনদের বাড়ি যাওয়াটাও স্বপ্ন। পুকুর ঘাটে মাছটা অন্য একটা স্বপ্ন। সে স্বপ্নগুলোর মধ্যেই সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নে দেখেছে, আজরাইল এসেছে।
খুব ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো রফিক। চোখ মেলেই দেখলো, মা তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। পাশের জানালার বাইরে উজ্জ্বল আলোময় একটা দিন। তাকে চোখ মেলতে দেখেই মা বললেন,
রফিক, এখন উঠে উত্তরপাড়ার মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে যাবি। আগামীকাল তোর বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। কাল বাড়িতে মিলাদ পড়াবো আমরা।
বিছানায় উঠে বসতে বসতেই তার হঠাৎ মনে হলো, কোথাও কি যেন ভুল হচ্ছে! বারীণের মা তো বেঁচে আছেন আর বারীণের বাবাওতো কবিরাজ নন। নিজেকে নিজের কাছেই গোলমেলে ঠেকছে তার।
(এ গল্পটি আমার 'এবং নিরঞ্জন' গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল)