বাংলাদেশের একক অনন্য ও ব্যতিক্রমী লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে ছোট্ট কাজের পরিসরের অন্যতম ও অত্যন্ত ভারী কাজ “দুধভাতে উৎপাত” গ্রন্থটি। তিনি ১৯৮৫ সালে এই গল্পগ্রন্থটি লিখেছিলেন। গল্পগ্রন্থের চারটি প্রশস্ত গল্প তিনি লিখেছেন ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট নিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী নানান জটিলতা, গ্রামীণ জনসমাজ, অভাব অনটন, নদীপাড়ের মানুষ ও কুসংস্কৃতি, ধর্মকে ব্যবহার করে এক শ্রেণীর মানুষের মোড়ল হয়ে উঠা, রাজনৈতিক চালচিত্র ইত্যাদি যেন গলার মালার মতো একের পর এক গেঁথে গেঁথে সাজিয়েছেন পুরো বই জুড়ে।
“দুধভাতে উৎপাত” গল্পে লেখক নিম্নশ্রেণীর অর্থনৈতিক জটিলতায় ভোগা, আশা আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণতায় জর্জরিত যন্ত্রণাদায়ক এক মুসলিম জনগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে এক স্বপ্নদ্রষ্টা কায়ক্লিষ্টতা ভেঙ্গে চুরমার করে তার সন্তানদের মৃত্যুঅব্দি ‘দুধেভাতে’ রাখার স্বপ্ন দেখেন।
তৎকালীন মুসলিম অবহেলিত, বঞ্চিত, শোষিত, প্রলেতারিয়াৎ মানুষের পুনরায় সিঁড়ি বেয়ে উঠার সংকল্পটি তীক্ষ্ণ সূচের ন্যায় গল্পের মাঝে নিহিত রাখতে সফল হয়েছেন। তার এই সংলাপে ব্যবহৃত ইউনিক সব ভাষাশৈলী আরও এক ধাপ বাড়তি তার সত্ত্বার অনন্য ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র প্রকাশ করেছে।
চারটি গল্পের মধ্যে আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্প “দখল” গল্পটি। এটি বইয়ের শেষ গল্প। গল্পটি স্বাধীনতার নিকট পরবর্তী ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত। অত্যন্ত সাহসী ও অপ্রতিম এক ফুটস্টেপ আই গেস।
সমাজতান্ত্রিকে বিশ্বাসী এক ছেলের সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠায় প্রাণনাশের পরে যে ফেম তার পিতার জিহ্বায় লেগেছিল তার এক ভিন্নধর্মী দৃষ্টিকোণ উক্ত গল্পে চিত্রায়ণ হয়েছে। তার চিন্তার পরিধি সত্যিই অপরিমাপযোগ্য। যুগে যুগে কেবল একটিই আখতারুজ্জামান পাওয়া যায় প্রতি সমাজে।
এই গল্পে তিনি রক্ষীবাহিনীকে নেতিবাচকভাবে এঁকেছেন তার শব্দের স্রোতে। কখনও হয়ত কেউ চিন্তাও করবে না যে একজন পিতা তার সন্তানের পপ্যুলারিটি পাবার তাড়নায় সন্তানের মৃত্যুকেও হাতছাড়া করতে চায় না, বেঁচে থাকাকালীন তো নয়-ই, ইভেন কবরস্ত ছেলের পাশে নিজের কবর খুঁড়ে মৃত্যুর পরেও সেই পিতার অবিনশ্বর যশ ও বৈভব লাভের লালসা, লিস্পা তা লেখকের অভিনবত্বের পাশাপাশি লেখকের আদর্শকেও ইঙ্গিত করে। এই গল্পের প্লট ও বাস্তবতা লেখককে বিয়ন্ড দ্যা আর্থ মাত্রায় বিশেষায়িত করেছে।
একটি সিরিয়াস ঘরানার লেখার মাঝে তিনি যে স্যাটায়ার ঢুকিয়েছেন যা আমরা “পায়ের নিচে জল” গল্পেও স্বাধীনভাবে লক্ষ্য করি তা পড়তে পারা একজন পাঠকের জন্যও বিশেষ ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা বলে মনে করি।
সামগ্রিকভাবে বললে, লেখক তার গদ্যতে একটা অনন্য সাধারণ দৃষ্টিকোণ প্রোথিত করার চেষ্টা করেছেন। আঞ্চলিক ভাষার সহজ-সদ্ভাব-সঠিক ব্যবহার গল্পের মধ্যে পাঠকের চিত্তে কোনো ধরনের কাঠিন্যতা তৈরি করেনি। বরং গল্পটিকে বানিয়েছে অতীব প্রাঞ্জল, বাস্তবধর্মী ও অসম্ভব সচেতন।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখা শুধু বিনোদনের অংশ নয়, এটি সমাজের প্রতিফলক, জাতীয় ও প্রান্তিক সমস্যাচিহ্নিত মানুষের জন্য মুখপত্র, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিতিশীলতার পর্যবেক্ষণ। যা গল্পগ্রন্থ কিংবা উপন্যাস থেকে পাঠ্যপুস্তকে পরিণত হয়। একজন পাঠক কিংবা লেখক উভয় শ্রেণীর মানুষের নিজস্ব সত্তা, দর্শন, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতি-বাহু বিক্ষেপণ জানতে ও গঠনে “দুধভাতে উৎপাত” পরিধানযোগ্য ও অসন্দিগ্ধ।
গল্পগ্রন্থটি বেরিয়েছে মাওলা ব্রাদার্স থেকে। চারটি গল্প ৯৪ পৃষ্ঠায় বিন্যস্ত এই ছোট্ট পুস্তকটির মুদ্রিত মূল্য রাখা হয়েছে দুই'শ টাকা। এর প্রচ্ছদটাও কম আকর্ষণীয় নয়; প্রচ্ছদ করেছেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী "কামরুল হাসান"।
#হাবিব_রহমান