ভোর পাঁচটায় টিনের দরজায় ধাক্কার আওয়াজে তন্দ্রা ভাবটা ছুটে গেল। বাথরুমের লাইন। তাহসান জেগেই ছিল। ঘুম তার আজকাল আসে না, শুধু চোখ বুজে থাকে। রাত কখন যে দিনের মতো ভারী হয়ে উঠেছে, টের পায়না সে। ইদানীং ঘুম আসে না। চারজনের ঘরে তার চৌকির পাশের দেয়ালে একটা বিসিএস সিলেবাস আঠা দিয়ে সাঁটা, কোণাগুলো উঠে এসেছে। তার ওপরে মাকড়সার জাল। এক বছরে জালটা সে নিজের হাতের রেখার মতোই চিনে গেছে। কত স্বপ্ন এই দেয়ালে সাঁটা ছিল, আজ শুধু কাগজটা টিকে আছে। স্বপ্নটা এখন স্রেফ দেয়ালে সাঁটা একটা কাগজ।
সকালে মেসের বুয়া ডাল আর আলুভর্তা দিয়ে ভাত দেয়। ডালে ডাল কম, পানিই বেশি। তবু সে চুপচাপ খায়, কারণ মাসের শেষ সপ্তাহে হিসাব বাকি পড়ে যায়। বাবা টাকা পাঠান পাঁচ তারিখে। সঙ্গে একটা ছোট মেসেজ, শরীরের যত্ন নিস। কোনো প্রশ্ন থাকে না। প্রশ্ন না থাকাটাই সবচেয়ে ভারী লাগে।
বাবা জানতে চান না, কারণ উত্তরটা দুজনেই জানে। মা ফোন করে জিজ্ঞেস করেন, খেয়েছিস?
সে বলে, হ্যাঁ, মা। ওপারে গ্রামের উঠানে মুরগির ডাক শোনা যায়। মিথ্যাটা বলার সময় গলাটা প্রতিবার একটু বেশি কাঁপে।
দশটার দিকে সে বেরোয়। হাতে ফাইল, তাতে সার্টিফিকেট, ছবি, সিভির কপি। এই ফাইল সে এতবার খুলেছে যে প্লাস্টিকের কভারে ভাঁজ পড়ে গেছে। একটা ফাইলে একটা মানুষের সব প্রমাণ, তবু কেউ বিশ্বাস করে না। আজ মতিঝিলের একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ইন্টারভিউ। ভেতরে এসি চলছে, সামনে বসা মানুষটির টাই একটু বাঁকা। তিনি সিভিতে চোখ বুলিয়ে বললেন,
অভিজ্ঞতা নেই?
তাহসান বলল, স্যার, সুযোগ পেলে...
মানুষটি মৃদু হাসলেন, যে হাসিতে সব উত্তর দেওয়া থাকে। আমরা জানাব।"কে
উ কখনো জানায় না। বুকের ভেতর কিছু একটা আবার একটু করে নিভে গেল।
সে অফিস থেকে বেরিয়ে তাহসান হাঁটতে থাকে। ঢাকার রোদ গায়ে লাগে না, শুধু কপালে সেঁটে যায়। কপালটা ঘামতে থাকে। মনে হয় জীবনের স্বপ্নগুলো ঘাম হয়ে ঢাকার রাজপথে পড়তে থাকে। বাসের জানালা দিয়ে হেলপারের চিৎকার আসে, গুলিস্তান, গুলিস্তান!
সে কোথাও যাচ্ছে না, তবু একটা বাসে উঠে পড়ে। ভাড়া দিতে গিয়ে বোঝে, এই দশ-বিশ টাকাও এখন তার কাছে হিসাবের জিনিস। এই শহরে সবাই কোথাও না কোথাও পৌঁছাচ্ছে, শুধু সে-ই ঘুরছে। সবার গন্তব্য আছে, তারই কিছু নেই।
বিকেলে মেসের কাছের একটা চায়ের দোকানে বসে। সেখানে আরও তিনজন বসে থাকে, সবাই ডিগ্রিধারী, সবার হাতে চায়ের কাপ আর চোখে একই ক্লান্তি। কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না। ঢাকার বেকারদের নিজস্ব একটা ভদ্রতা আছে। তারা একে অপরের লজ্জা ছুঁয়ে দেখে না। লজ্জাটা এখানে সবার, তবু প্রত্যেকে একা বহন করে।
সন্ধ্যায় ফোন আসে। ছবি।
ছবির সঙ্গে তার পরিচয় কার্জন হলের পেছনের সিঁড়িতে, একটা শীতের বিকেলে। ছবি বাদাম খাচ্ছিল, খোসা ফেলছিল সিঁড়ির কোণায়। তাহসান বলেছিল,
এটা তো আবর্জনা।
ছবি হেসে বলেছিল, তুমি সবকিছুতেই নিয়ম খোঁজো।
সেই হাসি সে আজও ভুলতে পারেনি। তিন বছরের প্রেম। কত রিকশায় চড়া, কত ফুচকার ঝাল, কত না-বলা স্বপ্ন। তখন ভবিষ্যৎটা ছিল হাতের মুঠোয়, এখন আঙুলের ফাঁক দিয়ে বালির মতো ঝরছে।
আজ ছবির গলা অন্যরকম। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলে না। তাহসানের মনে হলো, ছবি মনে মনে ঠিক করছে, কোন বাক্য দিয়ে কথা শুরু করবে। তারপর ছবি বলে,
বাসা থেকে ঠিক করেছে। ছেলে ব্যাংকার, তার বাবার গুলশানে ফ্ল্যাট আছে। একটু থেমে আবার বলে,
তুমি একবার বললে আমি...
বাক্যটা অসমাপ্ত থেকে যায়। তাহসান জানে বাকিটা কী। সে এও জানে, সে কিছু বললেও আসলে কিছুই বদলাবে না। ভালোবাসা ঠিকই ছিল, শুধু পকেটটা খালি ছিল। কী বলবে সে? অপেক্ষা করো? কতদিন? কীসের জন্য? তার পকেটে আছে ছত্রিশ টাকা আর একটা ব্যর্থ ইন্টারভিউয়ের কাগজ।
সে শুধু বলে, ভালো থেকো, ছবি।
ওপাশে নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর লাইন কেটে যায়। ওই নিঃশ্বাসটাই ছিল ছবির শেষ কথা, আর সে সেটা বুঝেও চুপ করে রইল।
সেই রাতে মেসে লোডশেডিং ছিল। রাশেদ ভাই মোমবাতি জ্বালালেন। কল সেন্টারের নাইট শিফটে যাওয়ার আগে সাধারণত তিনি কথা বলেন না, আজ বললেন,
খেয়েছিস?
তাহসান মাথা নাড়ল। মোমের আলোয় দেয়ালে তাদের ছায়া কাঁপছিল, দুটো ছায়া, একটু বাঁকা, একটু ছোট। কিছু দুঃখ এমন, ভাষা ছাড়াই মানুষ টের পায়।
তিন সপ্তাহ পর একটা লাল কার্ড এল। খামের ওপর ছবির হাতের লেখা, যে হাতের লেখা সে চিনত হাজার চিঠির ভিড়েও। ভেতরে সোনালি কালিতে ছাপা: ছবি ও ফাহিম। নিচে ছবির হাতে লেখা একটা ছোট লাইন,
এসো। না এলে আমি কষ্ট পাব। এলে আরও বেশি।
এই একটা লাইনে ছবি নিজের সবটুকু হার মেনে নিয়েছিল।
বিয়ের দিন সে গিয়েছিল। সবচেয়ে পেছনের সারিতে, একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে। স্টেজের আলোয় ছবিকে লাগছিল অন্য কারও মতো, লাল বেনারসিতে, গয়নার ভারে। একবার তাদের চোখ মিলেছিল। ছবি তাকিয়েছিল এক সেকেন্ড, তারপর চোখ নামিয়ে নিয়েছিল। ওই এক সেকেন্ডেই তিন বছর শেষ হয়ে গেল। চারপাশে এত হাসি, এত আলো, শুধু তার ভেতরটা নিঃশব্দ অন্ধকার।
সে না খেয়েই উঠে এল। বাইরে রাত, রাস্তায় হর্নের শব্দ, কোথাও একটা গাড়ির ভেতরে বিয়ের গান বাজছে। সে হাঁটতে হাঁটতে মেসে ফিরল। সিঁড়ি বেয়ে উঠে, অন্ধকার ঘরে চৌকিতে বসে রইল।
মেসের রুমটাতে টিউবলাইটটা জ্বলছিল আর নিভছিল, জ্বলছিল আর নিভছিল। ঠিক যেন তার আশা, একবার আসে, আবার চলে যায়। দেয়ালের সিলেবাসটা তখনও সেখানে, কোণা উঠে আসা। সে ফোনটা বের করল। ছবির নম্বরটা খুলল। নামের জায়গায় এখনও লেখা, ছবি।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর সেভ করা নামটা মুছে দিল না। শুধু ফোনটা বালিশের নিচে রেখে চোখ বুজল। যাকে হারিয়েছে, তার নামটুকুও হারাতে পারল না।
টিউবলাইটটা আবার জ্বলে উঠল, আবার নিভে গেল। লাইটটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল তাহসান।
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.