এককালে আব্বা আম্মার সাথে বেড়াইতে যাইতাম বাসে করে। লম্বা জার্নি। মাঝপথে বাস যখন বিরতি নিত, আব্বায় নাইমা যাইতো। ফেরি পারাপার গাড়িতে এডা বেশি হইতো। আমি আম্মার সাথে বইসা থাকতাম, ফেরির ঝালমুড়ি খাইতাম, ঘুঘনি ছাড়া শুকনা ঝালমুড়ি। বাস ছাড়ার সময় চিন্তা শুরু হইয়া যাইতো। "আম্মু, আব্বু কোথায়? আব্বু আসে না কেন? আব্বুকে একটা কল দাও" বলে আম্মুর মাথা খাইয়া ফেলতাম। আম্মু মাঝে মাঝে কল দিত, মাঝে মাঝে বিরক্তির সাথে ঝাড়ি দিত। যেটাই দিক, আমার বুকের ভেতর ছটফট করতে থাকতো। এরপরে দেখতাম শেষ মুহুর্তে প্রায় কাইন্দা দিসি এমন পর্যায়ে আব্বা উইঠা গেছে বাসে।
বাস ছুইটা যাওয়ার যে ভয়, সেইডা সবার ই কমবেশি থাকে। এজন্যেই স্টেশনে ত্রিশ মিনিট, এক ঘণ্টা আগে যাইয়া বইসা থাকি। সবাই শুধু টাকা লস হবার কথা কইলেও, এর সাথে এমন একটা ভয়ও কাজ করে যেন বাস-ট্রেইন মিস করলে গন্তব্যে আর পৌছাবো না। এই ভীতি কেউ স্বীকার করেনা।
একা একা যাতায়াত করি কতো বছর হইলো, আস্তে আস্তে এই ভীতি কমাইতে পারসি। বাস ছাড়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত নিচে দাড়াইয়া চা বিস্কুট খাই। ট্রেইন ছাইড়া দেবার পরে ট্রেনে উঠি। ভয় লাগে না খুব একটা। কারন জানি যে এসব আসবে যাবে, অভাব নাই। জীবনে তো এমন ই হয়, কোনো কিছুর ই অভাব হয় না, পুজিবাদী সমাজে হুবহু সেইম জিনিসপাতি চাইলেই ম্যানেজ দেওয়া যায়; শুধু টাকা লাগে।
মানুষ ও অমন এক যন্ত্র। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ হোক আর যে সমাজ ই হোক, মানুষের রেপ্লিকা হয়না। জীবনের স্টেশন থেইকা যখন কোনো মানুষ যায়গা, তারে আর ধরা যায়না। ফ্যাক্টোরি থেইকা হুবোহু মানুষ কোটি কোটি টাকা দিয়াও বানান যায়না। ট্রেইন ছাইড়া যাওয়ার সময় হর্ণ দিতে দিতে যায়, মানুষ ও এমন ধামাকা বাধাইয়া যায়গা। কিন্তু সে শব্দ অন্য কেউ শোনেনা। এই শব্দ একান্তই আমাদের, এর তীব্রতা বড়ই মারাত্মক। অথচ পৃথিবীর কাছে এই চলে যাওয়া ঘটে নিঃশব্দে, যেমনে আলো বিদায় নেয় সন্ধ্যার সময়, অমনে।
পৃথিবীর এক পাশ থেইকা বিদায় নিয়া অন্য কোথাও সূর্য আলো ছড়ায়। মানুষ ও একই ভাবে বিদায় নিয়ে অন্য কোথাও ভিড় জমায়। এই যন্ত্র আমি, আপনি, সে, সবাই! আমরা এই চইলা যাওয়া দেখি, বুকের ভেতর ছটফট করে। ছোটোবেলায় কয়েকবার লংজার্নি করলে আমাগো ছটফটানি কইমা যাইতো, কারন বিশ্বাস থাকতো, জানতাম যে আব্বা আইবো এক্ষুনি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে আর তা হয়না। এই ছটফটানি কমা বড়ই কঠিন। তারপর আমাগো ভিত্রে যারা প্রশ্ন করে না, সত্য খোজে না, আমরা যারা ভাগ্যবান, তারা ভিড়ি অন্য কোথাও, নতুন কোনো গন্তব্যে।
আর কেউ কেউ চাতক পাখির মতো চাইয়া থাকে মেঘের দিকে বৃষ্টির আশায়। বৃষ্টি আসেনা। আমরা সকলেই চাতক পাখি; আমরা সবাই ই কারো না কারো জীবনের বৃষ্টি।