২০৮২ সাল।
কলকাতায় এসেছে সালমা। কিছুটা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে আছে সে গত কয়েক মাস ধরে। তার ইউনিভার্সিটির লেখাপড়ার খরচ সামাল দিতে পারছে না সে। বাংলাদেশের চাঁদপুরে তার বাবা মা থাকে। একটি স্বচ্ছল কৃষক পরিবারই ছিলো তারা। কিন্তু গত পনের ষোল বছরে চাঁদপুরের কৃষিজমিগুলোতে লবণাক্ততার হার ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। বঙ্গোপসাগর এখন তাদের বাড়ি থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে। পুরো এলাকার প্রায় সকল জমিই এখন বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এলাকার আর সকল মানুষের মতো তাদের পরিবারও দিনে দিনে দুঃস্থ পরিবারে পরিণত হয়েছে। পুরো এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলো স্থানীয় মেঘনা নদী। নদীর পানি এখন আর আগের মতো নেই। সেটিকে এখন নোনা পানির নদী বলা চলে। এতে মাছের আকাল পড়েছে। সামুদ্রিক মাছ পাওয়া গেলেও তেমন বাজার নেই। চোখের সামনে একটা সমৃদ্ধ ব্যবসা অঞ্চল শেষ হয়ে গেছে। নিজের শৈশব থেকে সালমা যা দেখে এসেছে, তাতে একটি সমৃদ্ধ জনপদের ধ্বংসের চিত্রই শুধু আছে।
কলকাতায় সল্টলেকে একটা বিশেষায়িত হাসপাতালে ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে আছে। এখনো যে তার সিরিয়াল আসতে সময় লাগবে। আরো দুজন রোগী আছে তার আগে।
কলকাতা আসার জন্য বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। এখনতো আগের যুগের মতো পাসপোর্ট লাগে না। এখন যে কেউ যে কোন দেশে মন চাইলেই যেতে পারে। এখন পৃথিবীর সকল মানুষের সকল তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে রাখা হয়। সেখানে সকল রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এক্সেস আছে। অন্য কোন দেশে যেতে চাইলে টিকেট কেনার সময় নিজের নাম আর ইউনিক আইডি নাম্বার দিলেই টিকেট করা হয়ে যায়। টিকেটের দাম কেটে রাখা হয় গ্লোবাল ব্যাংক হতে। এখন পুরো পৃথিবীতে মাত্র একটি ব্যাংক। সেটিই পৃথিবীর সকল মানুষের টাকা পয়সার হিসাব রাখে। দশ বছর আগে পৃথিবীর সকল ব্যাংক কিনে নিয়েছে একটি ব্যবসায়ী মহল। সেটিইই এখন পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক। এ ব্যাংকটি তৈরি হবার সাথে সাথে পৃথিবীব্যাপী কাগজের মুদ্রাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ডাক্তারের রুম হতে সালমার ডাক এসেছে। সালমা উঠে ডাক্তারের রুমের দরজায় তার আইডিটা ধরতেই একটা বিপ শব্দ হয়েই দরজা খুলে গেলো। রুমের ভেতরে ঢুকে সালমা খানিকটা অবাক হয়ে গেলো।
রুমের একটা বড়সড় টেবিলের পেছনে একজন লোক বসে আছে। গায়ে এপ্রন। লোকটি তাকে দেখেই বলল,
সালমা, আপনি বসুন। টেবিলের এপারে রাখা দুটো চেয়ারের একটিতে বসে পড়লো।
ভদ্রলোক সালমাকে বসতে বলেই তার বাঁ পাশে রাখা মনিটরের দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে কী যেন দেখতে লাগলো। স্ক্রিনের লেখাগুলো দূর্বোধ্য ধরণের। সালমা স্ক্রিনে একবার তাকিয়েই লোকটির দিকে তাকালো। লোকটার চোখের চশমার ফ্রেমের দুপাশে দুটো নজলের মতো। সালমা বুঝে ফেললো, চশমার ঐ দুটো নজল নয়, স্পেশালাইজড এনক্রিপ্টিং ক্যামেরা। স্ক্রিনের লেখাগুলো সে ক্যামেরার মাধ্যমে ডাক্তারের নিজস্ব ভাষায় তার চশমার গ্লাসে ডিসপ্লে হচ্ছে। এ ক্যামেরাগুলোর কয়েকটি এখন ঢাকাতে কিছু ডাক্তারও ব্যবহার করছে। মূলত পৃথিবীর সকল মানুষের সকল তথ্য উপাত্তের সেন্ট্রাল ডাটাবেস থেকে ডাক্তার এখন তার কেসহিস্ট্রি দেখছেন।
মিনিট দুয়েক পর ডাক্তার সালমার দিকে তাকিয়ে বলল,
এখন আপনি আমাকে বলুন, কেনো আপনার টাকা দরকার?
আমার ইউনিভার্সিটির এক্সপেন্স চালানোর জন্যে আমার টাকা দরকার।
ডাক্তার কথাটি শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
দেখুন, এটা আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, হিউম্যান মেমোরি বিক্রয় করার যে ব্যবসাটি এখন চলছে, সেটি একটি দারুণ ব্যবসা। আপনি আপনার লাইফের কোন সময়ের মেমোরি বিক্রি করতে চাচ্ছেন?
আমার শৈশবের। সালমা জবাব দিলো।
কেন আপনার মনে হয়েছে সেটি আপনি বিক্রি করতে পারবেন?
আমার চাইল্ডহুডটা একটা সুখী জীবন ছিলো। তখন আমাদের জীবনটা ছিলো হাসি আনন্দের। আমাদের কোন অভাব ছিলো না, আমাদের পরিবারের স্বচ্ছলতাও ছিলো।
কিন্তু আপনার চাইল্ডহুড যে অঞ্চলে কেটেছে, সার্বিক ভাবে গ্লোবাল পার্সপেক্টিভে সে এলাকা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ কোন এলাকা নয়। আপনার চাইল্ডহুড মেমোরি পৃথিবীর কোথাও কারো কাজে লাগবে না। এটি কেউ কিনবে না। ডাক্তার বললেন।
কিনবে স্যার। সালমা কেন যেন জোর গলায় বলল।
সালমার কোথায় ডাক্তার কিছুটা হচকচিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে কিনবে?
স্যার, যারা ক্লাসিক সিনেমা বানায়, তারা কিনবে। যারা ইতিহাস নিয়ে রিসার্চ করে, তারা কিনবে। যারা এনভায়রনমেন্ট নিয়ে কাজ করে, তারা আমাদের এলাকার পূর্ব ইতিহাস নিয়ে রিসার্চের সময় আমার চাইল্ডহুড মেমোরিকে কেইস স্টাডি হিসেবে নেবে।
কথাগুলো শুনে ডাক্তার মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন,
বুঝতে পেরেছি। আপনি সেলিং পয়েন্টগুলো ভেবেই এসেছেন।
কথাটির জবাবে সালমা কিছুই বললো না। ডাক্তার তার কিবোর্ড কাছে টেনে টাইপ করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ টাইপ করার পর ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
আপনার মেমোরি যা আছে, সব বাংলা ভাষায়। বাংলা ভাষা হতে গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ কোডিং এ কনভার্টের জন্য একটা ছোট সফটওয়ার লাগবে। আপনি যদি ইংরেজি ভাষাভাষি হতেন, তাহলে সেটা আপনার লাগতো না। সে সফটওয়ারের দামটা আপনার কাছ হতে দিতে হবে।
আমি জানি, স্যার।
ওকে। আমি আপনাকে এখন ওটিতে নিয়ে যাবো। আপনাকে কিছুক্ষণ অজ্ঞান করে রাখা হবে। তখন আপনার শরীরে কিছু যন্ত্রাংশ সেট করা হবে। সেগুলো আপনার মাথার স্কালে কিছু মাইক্রোপারফোরেশন করে বসানো হবে। আমরা আপনার চাইল্ডহুড মেমোরি স্ক্যান করবো। তারপর সেটা হতে আপনার কথানুযায়ী হ্যাপি টেনিউরগুলো দেখে সেটির একটি সামারি লিখবো। তারপর সে সামারিটা আমি কয়েকটি মেমোরি বায়ারকে পাঠাবো। তারপর বিডিং হবে এবং তখন প্রাইস ফিক্স করবো। এজন্যে ওটিতে যাবার আগেই আপনাকে কনসেন্ট দিতে হবে। মেমোরি বায়ার টাকা আপনার একাউন্টে দিলেই আমরা আপনার ঐ মেমোরিটুকু বায়ারকে দিয়ে দেবো এবং আপনার ব্রেন থেকে ইরেজ করে দেবো।
সালমা পুরো প্রসেসটা শুনে জিজ্ঞেস করলো, কতক্ষণ লাগবে পুরো প্রসেসটা?
সব মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫ মিনিট।
ওকে। আমি রেডি।
২
আধঘণ্টা পর। সালমা হাসপাতাল হতে বেরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো। তার মনে হলো, কিছু খাওয়া দরকার। কাছেই একটা দোকান দেখে সেখানে গিয়ে বলল,
লো ক্যালরি, নো ফ্যাট জেনারেটিং উইথ ফুল প্রোটিন দুটো বক্স দিন। লোকটি ছোট দুটি প্লাস্টিক কন্টেনার দিয়ে দিলো। একটি খুলে সেখানেই খেয়ে নিলো সালমা। আরেকটা রাতে খেয়ে নেবে।
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে এগোতেই হাতের ব্যাগে রাখা ফোনটি বেজে উঠলো।
ফোনটি সামনে নিয়ে খুব অবাক হয়ে ডিসপ্লেতে লেখা নামটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর কলটি রিসিভ করতেই অন্য পাশ হতে একটি পুরুষালী কণ্ঠ শোনা গেলো।
মা, কেমন আছিস?
স্যরি, আপনাকে তো চিনতে পারছি না।
কি বলছিস সালমা? আমি তোর বাবা বলছি।
সালমা অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো, এ মানুষটা তার নাম জানে কীভাবে? কিছু না ভেবেই লাইনটা কেটে দিলো সে।
বেশ হালকা হালকা লাগছে তার। হাসপাতালে বসেই মোবাইলে নিজের ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখে নিয়েছে সে। সেখান থেকে ইউনিভার্সিটির ফিও দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন এ লোকটা কে? আবার বলল, তার বাবা। খানিকটা চিন্তায় পড়েছে সে।
সালমা ট্যাক্সি নেয়ার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো, কলকাতায় আজ আর থাকবে না। এখন প্রতি এক ঘণ্টা পরপর ঢাকায় ফ্লাইট আছে। আজই ঢাকায় ফিরে যাবে। সামনে একটা ট্যাক্সি দেখেই ইশারা করলো। ট্যাক্সিটা সামনে এসে দাঁড়াতেই বলল,
এয়ারপোর্ট চলুন।
ট্যাক্সিতে বসে হাতের মোবাইলটা মুখের সামনে নিয়ে বলল,
পার্সোনাল মেডিক্যাল রিপোর্ট – সালমা, আইডি কিউ ফোর টু টু পি এস থ্রি নাইন ফোর এন...।
ভয়েস অপারেটেড প্রোগ্রামটা চালু হয়ে গেলো। হাতের সেটের স্ক্রিনে তার মেমোরি ট্রেডিং ডিলের রিপোর্টটা ভেসে উঠলো। যে কোম্পানি তার মেমোরি কিনেছে, তাদের নাম ঠিকানা দেখতে পেলো। সেই সাথে তার মেমোরির ডিটেইল স্ট্যাটাসটাও দেখে নিলো। তার চাইল্ডহুড মেমোরি। কোনো ফিডব্যাক এখনো আসেনি। হয়তো দুই তিন দিনের মধ্যেই আসবে। ট্যাক্সিতে হেলান দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সালমা। জীবন একেক সময়ে একেক দিকে নিয়ে যায়। জীবনে কোন কিছুই নিজের পরিকল্পনা অনুসারে ঘটে না। অন্য কেউ বা অন্য কিছু জীবনকে চালায়। কে চালায় তা নিয়ে কিছু ভাবে না সে। ধর্ম এখানে একটা ইস্যু বটে। বর্তমান পৃথিবীতে ধর্মের চর্চা অনেকাংশেই কমে গেছে। সে নিজে মুসলিম। মুসলিম হিসেবে নিয়মিত ধর্মচর্চার ব্যাপারে সমাজ আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। সে নিজে দেখেছে তার সাথের অন্যান্য স্টুডেন্টদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ এখন ধর্ম এবং ধর্মচর্চা নিয়ে একটি নিঃস্পৃহ মনোভাব পোষণ করে। অথচ আত্মা এবং মনের শান্তি বজায় রাখার জন্য, জীবন পরিচালনার ধারাকে শান্তিপূর্ণ রাখার জন্যে ধর্মের প্রয়োজন অস্বীকার করাটা একটি ভুল। মানুষ যান্ত্রিক হয়ে হয়তো আপেক্ষিকভাবে ভালো থাকে। কিন্তু এতে মনের অস্থিরতা, মানসিক অসুস্থতা এসবই বেড়ে যায়। সালমা ট্যাক্সিতে বসে মনে করার চেষ্টা করলো, ঠিক কবে থেকে সে নামাজ পড়ছে, মনে করতে পারলো না। নামাজের নিয়ত মনে করার চেষ্টা করলো, কলেমা তৈয়ব মনে করার চেষ্টা করলো- আশ্চর্য! কিছুই সে মনে করতে পারছে না। নিজে এক মনে ভেবে স্মরণ করার চেষ্টা করলো। কিছুই মনে করতে পারছে না। ঠাণ্ডা মাথায় মনে করার চেষ্টা করলো, কলেমাগুলো সে কবে মুখস্থ করেছিলো। সেটিও মনে করতে পারলো না। নিজের সাথে একটি দ্বদ্বে পড়ে গেলো।
এয়ারপোর্টে পৌঁছে প্লেনে উঠতে উঠতেও সে একই জিনিস মনে করার চেষ্টা করলো। মোবাইল সেটটা নিয়ে নিজের বুকে ঠেকিয়ে রাখল এক মিনিট, তারপর স্ক্রিনে নিজের হেলথ স্ট্যাটাসটা দেখলো। পালস, বিপি, ব্লাডের সকল রিপোর্ট - এসবের পাশাপাশি আরও কয়েকটা স্ট্যাটাস দেখে নিলো। সালমা অবাক হয়ে দেখলো, স্ট্যাটাসের শেষে কমেন্টে এমনেশিয়া হয়েছে তার, লেখা আছে। ষেটই দেখেই সালমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। এটি তার ক্যারিয়ারকে এফেক্ট করবে। অবশ্য এতে কিছু করার নেই। তার জন্য এখন সবচেয়ে বেশি দরকার ইউনিভার্সিটির লেখাপড়া শেষ করা। এমনেশিয়ার জন্যে গ্রেড ওয়ান থেকে গ্রেড ফাইভ পর্যন্ত কোনো জব সে পাবে না। সালমা ভেবে দেখলো, এতে তার তেমন সমস্যা হবে না। গ্রেড সিক্স হতে লোয়ার গ্রেডের জবগুলোর কোনো একটি পেলেই তার চলবে। তবুও মনটা খারাপ হয়ে গেলো। নিজের নামের সাথে এমনেশিয়া লেবেলিং হওয়াটা সে মেনে নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। ঢাকায় পৌছার পর অনেক কাজ আছে। সেলিমের সাথে কিছু বিষয়ে আলোচনা করা দরকার। সেলিম একটি ইন্টারন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের ঢাকার অফিসে কাজ করে। ওর সাথে কথা বলে এমনেশিয়া লেবেলিংটা রিমুভ করবে কীভাবে বা অদৌ সম্ভব কীনা, জানতে হবে।
৩
কলকাতা হতে ফেরার পর তিন দিন পেরিয়ে গেছে। ভার্সিটিতে যাওয়া শুরু করেছে সে। সবই ঠিক ছিলো, কিন্তু অন্য একটা সমস্যা শুরু হয়েছে। তার ফোন সেটে লাগাতার ফোন আসছে। যে দুজন লাগাতার ফোন করছে, তারা তাদেরকে পরিচয় দিচ্ছে তার বাবা এবং মা হিসেবে। তার নিজের ফোনে তারা কল দিলে এ দুটো শব্দই ডিসপ্লে হচ্ছে। সালমা এখন বিরক্তিবোধ করছে। অচেনা দুজন মানুষ এভাবে ফোন করবে কেনো? দুটো নাম্বারই সে ব্লক করে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর সেলিম আসবে। সেলিমের সাথে জরুরী কথা বলা দরকার।
সেলিম যখন এলো, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। সেলিমকে দেখেই কেন যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল সালমা। কলকাতা হতে আসার পর সেলিমের সাথে কিছু ইস্যু নিয়ে ডিসকাসের দরকার ছিলো।
সেলিম রুমে ঢুকেই জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছো সালমা?
ভালো আছি। তবে আমি কিছু সমস্যায় পড়েছি।
আমি কিছু কিছু জিনিস মনে করার চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না।
তুমি এ কাজটি না করলে পারতে। আমি তোমাকে অনেকবার বারণ করেছিলাম।
কিন্তু আমার পড়ালেখাতো বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছিলো। সেদিকটাও তো গুরুত্বপূর্ণ।
সেটি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। লেখাপড়া এখন এ যুগে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।
সেলিমের এ কথায় চুপ করে রইলো সালমা। সেলিম এবার জিজ্ঞেস করলো,
আমাকে বলো তোমার কী কী সমস্যা হচ্ছে?
দুটো ফোন নাম্বার থেকে কল এসেছে অনেকবার। পরিচয় দিচ্ছে আমার বাবা এবং মা। অথচ আমি তাদের কোনো কিছুই মনে করতে পারছি না। আমি এদেরকে চিনিও না বা চিনতে পারছিনা।
আর কি সমস্যা?
ধর্মীয় রীতিগুলো, নামাজ পড়ার পদ্ধতি, নামাজের নিয়ত, কলেমা এবং সুরা কেরাত কিছুই মনে করতে পারছি না। আমি কলকাতা হতে ফেরার পর এখন আবার বই কিনে সেগুলো পড়া শুরু করেছি।
আচ্ছা। বলে সেলিম মুচকি হাসল।
তুমি হাসছো কেন?
না, তেমন কিছু না। আমি নিশ্চিত তুমি আরও অনেক কিছুই এখন জানোনা।
আর কী কী পারবো না? সালমার চোখে মুখে উদ্বেগ।
তুমি জানো, নামতা কি? সেলিম জিজ্ঞেস করলো।
নামতা কী? সালমা জিজ্ঞেস করলো।
ওকে। তুমি কোন স্কুলে পড়ালেখা করেছ, সেটার নাম কী?
চোখ বড় বড় করে সালমা তাকিয়ে থাকলো সেলিমের দিকে কিছুক্ষণ। তারপর বললো, নাহ। আমি মনে করতে পারছি না। ভুলে গেছি।
ওকে। এগুলো নিয়ে ভাবার দরকার নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিছুই ঠিক হবে না, আমার মনে হয়। আমার মনে হচ্ছে কাজটা ঠিক হয়নি আমার।
কথাটি শুনে সেলিম চুপ করে রইলো।
কিছু বলো সেলিম?
আমি এখনই কিছু বলতে পারছি না। আমি দেখি, এ নিয়ে কী করা যায়। যা যা মনে করতে পারছ না, সেগুলো নিয়ে ভেবো না। কফি খাবো। কফি বানাও।
সালমা উঠে কফি বানাতে চলে গেলো।
সেলিম সালমার ইউনিক আইডি নাম্বারটি জানে। সে যে কোম্পানিতে কাজ করে, তারাও মেমোরি পারচেজ করে। পকেট থেকে হ্যান্ডসেটটা বের করে তার কোম্পানির একাউন্টে গিয়ে সালমার মেডিক্যাল স্ট্যাটাসটা চেক করতে গেলো। অবাক হয়ে দেখতে পেলো, সালমা যে কোম্পানির কাছে তার মেমোরি শ্যাল করেছে, সে কোম্পানিটি কোন অথরাইজড বায়ার নয়। অবাক হয়ে সে কোম্পানির নাম লিখে তার নিজের কোম্পানির আই চ্যাট বক্সে জিজ্ঞেস করতেই আই চ্যাট জবাব দিলো, সালমার মেমোরি বায়ারের নামে অনেকগুলো এলিগেশন আসার পর তাদের গ্লোবাল রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হয়েছে। এরা ফর্মাল বায়ারদের ডিজগাইজে এখনো মার্কেটে অবৈধভাবে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সেলিম রিপ্লাইটা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সালমা একটা আনঅথরাইজড মেমোরি বায়িং গ্রুপের পাল্লায় পড়েছিলো। এরা টাকা দেয় ঠিকই, কিন্তু এ প্রোডাক্ট তারা তাদের ইচ্ছে মতো ইউজ করে ফেলবে। ক্রয় করা মেমোরি কোথায় কীভাবে ইউজ হবে সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট গাইডলাইন দেয়া আছে। এসব কোম্পানি সেগুলো মানে না।
সালমা এতে ভবিষ্যতে নিজের ক্যারিয়ার এবং লাইফ স্টাইলে বিপদে পড়বে। নিষিদ্ধ হওয়া স্বত্বেও কিছু মিসগাইডেড ফার্ম হিউম্যান ক্লোনিং করছে। এসকল ফার্মের কাছে এসব মেমরি বায়াররা মেমোরি সেল করে। দেখা যায়, একই মেমোরি কয়েকশ হিউম্যান ক্লোন ইউজ করছে। ঢাকাতেও কিছু কিছু ক্লোন করা হিউম্যান এখন আছে। যাদের টাকা আছে, তাদের জন্য সব বৈধ। কিছু ধনী লোক তাদের পরিবারের সদস্যের ক্লোন বানিয়ে এনেছে। বিশেষ করে যারা মারা গিয়েছে, তাদেরকেই করা হয়েছে। এটি করা হচ্ছে অন্য উদ্যেশ্যে। সম্পত্তির উত্তরাধিকার যেন বেহাত না হয় সে জন্যে। কিছু ক্রিমিনালেরও ক্লোন বাংলাদেশে ঢুকেছে। মূল ক্রিমিনাল আড়ালে থেকে ডুপ্লিকেট ক্লোন দিয়ে ক্রাইম করে যাচ্ছে।
সালমা কফি নিয়ে এলো। কফিতে চুমুক দিয়েই সেলিম বললো,
তুমি খুব বেশি চিন্তা করো না। সবকিছু আস্তে আস্তে সয়ে যাবে। যা যা তুমি এখন মনে করতে পারছো না, সেগুলো আমি ঠিক করে দেয়ার আয়োজন করে দেবো। আমি মাঝে মাঝেই আসবো। তোমাকে কিছু পড়ালেখা করতে হবে। যা যা তুমি মনে করতে পারছো না, সেসবের অধিকাংশই পড়ালেখা করে রিট্রিভ করা সম্ভব। টেনশন করো না।
সালমা কিছু না বলে গম্ভীর মুখে কফি খেতে লাগলো।
৪
ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস শেষ করে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে সালমা। আস্তে আস্তে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে সে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে। যখনই দেখে, কোন কিছু মনে করতে পারছে না, সাথে সাথে সেটি নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা বন্ধ করে দিচ্ছে সে। সেলিম এর মধ্যে কিছু কাজ করেছে। তাকে নিয়ে চাঁদপুর গিয়েছিলো। যারা তাকে ফোন করতো তাদের সাথে দেখা করিয়ে ওকে ভালোভাবে শিখিয়ে দিয়েছে, তাঁরা তার বাবা মা। সালমা মেনে নিয়েছে। সেলিম তাকে বুঝিয়ে বলেছে অনেকবার, এ অবস্থায় অনেক কিছুর সাথে তাকে নতুন করে অরিয়েন্টেড হতে হবে। মনের ভেতর তখন কিছু এন্টি লজিক তৈরি হবে। এক্সেপ্টেন্সে রেজিস্ট্যান্স তৈরি হবে। সেগুলোকে এভয়েড করে মেনে নিতে হবে। বছর খানেকের মাথায় সব ঠিক হয়ে যাবে। সালমা এখন অনেকাংশেই ভালো আছে।
কলকাতা হতে আসার পর এর মধ্যে দুই মাস পেরিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, সেলিমের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থেকে যাবে সে। সেলিমের সাথে পরিচয় হয়েছে বছর দুয়েক হলো। সালমা সেলিমকে পছন্দ করে, হয়তো ভালোওবাসে। সে কখনো তার নিজের এ অনুভূতি সেলিমকে মুখ ফুটে বলেনি। তবে সেলিম কখনো নিজেও কিছু বলেনি। তার হাবেভাবেও সে কখনো প্রকাশ করেনি। ইদানীং তার মনে হচ্ছে, সেলিমকে একদিন সব বলবে। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, বলে দেয়া উচিত। পরক্ষণেই তার নিজের কাছে মনে হয়েছে, এখনো সেটি বলার উপযুক্ত সময় আসেনি।
তবে আজ এখন কেনো যেনো মনে হচ্ছে, আজ সেলিমকে বলবে। মাথায় ভাবনাটা আসতেই হ্যান্ডসেটটা বের করে সেলিমকে কল দিয়ে বলল,
আজ আসতে পারবে তুমি?
সেলিম বলল, আসবো। তবে আজ অফিসে খুব ব্যাস্ত আছি। আসতে আসতে রাত আটটা নয়টা বেজে যাবে।
কেনো যেন সময়টা শুনে ভেতরে ভেতরে খুব আনন্দ অনুভব করলো সালমা। আজ যে কোনো ভাবে সেলিমকে রাতে ওর কাছে থেকে যেতে বলবে। ভাবনাটা হয়তো ঠিক নয়, তার মনের মধ্যে একটা সংকোচ এসে হাজির হয়েছে ঠিক এখনই। ঠিক হবে কি কাজটা? তারপরেই মনে হলো, এটি এখন একটি সাধারণ ঘটনা। এ ধরণের ব্যাপার এখন সমাজে সবচেয়ে সাধারণ ঘটনা। এখন এই দুই হাজার বিরাশিতে বিয়ে নামক ব্যাপারটি মোটামুটি অবসলিট হয়ে গেছে। পরিবারপ্রথা এখন সুন্দর স্মৃতিময় গল্প এ সমাজে। শুধু লিটারেচার ওয়ার্ক এবং সোশ্যাল হিস্ট্রিতে এটি নিয়ে সুন্দর বর্ণণা রয়েছে।
৪
সালমা সেলিমের দিকে তাকিয়ে আছে। সেলিম তাকে বললো,
আমাদের কি এখনই এসব নিয়ে ভাবা উচিত?
আমি সেসব কিছুই বুঝতে চাই না। আমি আমার কথা তোমাকে বলে দিয়েছি। তোমারটা আমি শুনতে চাই।
সেলিম খানিকটা ভেবে কিছুটা ভারী গলায় বললো,
আমিও তোমাকে ভালোবাসি।
তাহলে এ কথাটি এতদিন বলোনি কেনো?
আমার ভয় ছিলো, যদি দেখি, আমি একপেশে অনুভূতি নিয়ে ঘুরছি। বলেই চুপ করে রইলো সেলিম।
সালমা সেলিমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অল্প একটু দূরত্বে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পরমূহুর্তে সেলিমকে জড়িয়ে ধরলো। সেলিম হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
৫
সালমার ঘুম ভেঙ্গেছে। ঘুম ভাঙতেই তার মনে হলো, সে অচেনা কোনো জায়গায় আছে। চারপাশে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভয়ে ভয়ে সে বলল,
সেলিম, সেলিম।
কোথা থেকে যেন সেলিমের কণ্ঠ শোনা গেলো।
বলো, সালমা।
আমি এখন কোথায়? তুমি কোথায়? তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেনো?
ওহ সালমা, শোনো। তুমি এখন আছো এবং তুমি এখন কোথাও নাই।
মানে কী এসবের?
তোমাকে চাঁদপুরে নেয়া হয়নি, তোমার বাবা মায়ের সাথে দেখা করানো হয়নি। সেগুলো সব ছিলো সুপার ইন্টেলিজেন্স কিছু হলোগ্রামিক রোবট। সেগুলো সব প্রোগ্রামড ইভেন্ট ছিলো।
মানে কী এসবের?
মানে কিছুই না। তুমি একজন ওভার এম্বিশাস মেয়ে। নিজের ক্যারিয়ার বিল্ড আপের জন্য নিজের মেমোরি সেল করেছিলে। তখনই বোঝা গিয়েছিলো, তুমি নিজের ভালোর জন্য যে কোন কিছু করতে পারো। খুব বেশি নিজেকে নিয়ে কনসার্ণ থাকলে যা যা হতে পারে, সবই তোমার হয়েছে।
সত্যি করে বলো, তুমি কে? কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে সালমা চেঁচিয়ে উঠলো।
আমি কেউ না। আমি সেলিমের ক্লোন। তুমি কলকাতা হতে আসার এক সপ্তাহ পরই আমি সেলিমকে রিপ্লেস করেছি।
সেলিম কোথায়?
তা আমি জানি না। হিউম্যান অরগ্যানের বিজনেস, হিউম্যান মেমোরির বিজনেস- কতো কিছুই তো আছে। কে জানে সে এখন কোথায় কীভাবে আছে।
আমি এখন কোথায়?
তুমি এখন আসলে কোথাও নেই। তোমার কিছু কিছু অরগ্যান নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তোমার ম্যাক্সিমাম মেমোরি নিয়ে নেয়া হয়েছে। তোমার মেমোরিতে আমরা শুধু সেলিমের মেমোরি রেখে দিয়েছি।
আমি নিজেকে দেখতে চাই। আলো জ্বালিয়ে দাও এখানে।
লাভ নেই। এখন আসলে তোমার কোনো অস্তিত্বই নেই। তোমার মেমোরিতে একটা প্রিসেট প্রোগ্রাম করা আছে। সেটি ইন্সটল করা হয়েছিলো কলকাতাতেই। সেটাই গতকাল তোমার ভার্সিটির ক্লাস শেষে এক্টিভেটেড হয়েছে, তখনই তুমি ঐ প্রোগ্রামের কমান্ড অনুযায়ীই সেলিমকে আসতে বলেছিলে।
আমার এখন কি হবে? সালমার কণ্ঠ ভয়ার্ত শোনাচ্ছে।
কিছুই হবে না। এমনই থাকবে তুমি।
মানে কী?
মানে কিছুই না। তুমি এতক্ষণ যা যা বলেছো সবই প্রোগ্রামড কনভার্সেশন।
আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা, সেলিম।
আগেই বলেছি, আমি সেলিম নই। এখন তোমার সাথে কথা শেষ। আর শোনো, এরপর যখনই তোমার সাথে কথা হবে, এতক্ষণ যা যা কথা হলো, ঠিক এগুলোই হবে। প্রতিবারের কনভার্সেশনের শেষে আমি তোমাকে এখন বলা এ কথাগুলোই বলবো। ঠিক এই অর্ডারেই, এই সিকোয়েন্সেই কথা হবে। ওকে, বাই।
সেলিম, সেলিম, সেলিম। সালমা ডাকতে লাগলো।
কেউ জবাব দিচ্ছে না। একটা ভয়াবহ নিস্তব্ধতা চারপাশে।
( এ আই যুগ আসার আগের লেখা। গল্পটি আমার 'এবং নিরঞ্জন' গল্প গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল।)