কবিতা ভালো লাগে
কারণ পৃথিবীর সব কথা
মানুষকে বলা যায় না।
কিছু কথা
জিভের কাছে এসে
লজ্জা পেয়ে ফিরে যায়,
কিছু কথা
বুকের ভেতর এতদিন পড়ে থাকে
যে একসময়
তাদের ওপর শ্যাওলা জন্মায়।
কবিতা এসে
সেই শ্যাওলা সরিয়ে দেয়।
কবিতা ভালো লাগে
কারণ একটি শব্দও কখনো কখনো
একটি দরজার মতো—
খুললেই দেখা যায়
ভেতরে পড়ে আছে
শৈশবের একটি বিকেল,
ভাঙা ঘুড়ির সুতো,
মায়ের ডাকে ঘরে ফেরার তাড়া,
আর দূরের মাঠে
শেষ হয়ে যাওয়া রোদের গন্ধ।
কবিতা ভালো লাগে
কারণ সে জিজ্ঞেস করে না—
“তোমার কষ্টের প্রমাণ কোথায়?”
সে শুধু পাশে বসে থাকে।
যেমন নদীর পাড়ে
একটি পুরোনো গাছ বসে থাকে
শত বর্ষা পেরিয়ে—
কেউ তার কাছে
নিজের দুঃখের হিসাব দিতে আসে না,
তবু তার ছায়ায়
কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই
মন হালকা হয়ে যায়।
কবিতা ভালো লাগে
কারণ সে আমাদের
আমাদেরই অচেনা মুখ দেখায়।
যে কান্নাকে আমরা
দুর্বলতা ভেবেছিলাম,
কবিতা তাকে
জলের স্বচ্ছতা বলে।
যে একাকিত্বকে
আমরা শাস্তি ভেবেছিলাম,
কবিতা তার ভেতর
একটি জানালা খুলে দেয়।
যে মানুষটিকে
আমরা হারিয়ে ফেলেছি,
কবিতা তাকে ফিরিয়ে আনে না—
শুধু তার জন্য
মনের ভেতর একটি চেয়ার
খালি রেখে দেয়।
কবিতা ভালো লাগে
কারণ তার কাছে
সময় সরলরেখা নয়।
একটি শব্দের ভেতর
দশ বছর আগের দুপুর
হঠাৎ আজকের বিকেলে
এসে বসতে পারে।
একটি গন্ধ
বন্ধ দরজার নিচ দিয়ে
পুরোনো কোনো শহরকে
ঘরে ঢুকিয়ে দিতে পারে।
একটি পঙ্ক্তি
হঠাৎ এমন একটি নাম উচ্চারণ করতে পারে
যে নামটি আমরা
বহুদিন ধরে মনে মনে
ডাকিনি।
কবিতা ভালো লাগে
কারণ সে সব প্রশ্নের
উত্তর দেয় না।
কিছু প্রশ্নকে
সে নদীর হাতে তুলে দেয়,
কিছু প্রশ্নকে
রাখে জানালার ধারে,
আর কিছু প্রশ্ন
রাতের আকাশে ঝুলিয়ে রাখে—
যেন উত্তর না পাওয়াও
জীবনের একটি উত্তর।
কবিতা ভালো লাগে
কারণ পৃথিবী যখন
সবকিছুর দাম জানতে চায়,
কবিতা তখনও
মূল্যহীন জিনিসগুলোর পাশে দাঁড়ায়—
এক মুঠো বাতাস,
বৃষ্টির পর মাটির গন্ধ,
কারও চুপ করে থাকা,
স্টেশনে বিদায়ের আগে
শেষবার ফিরে তাকানো—
এসবের কোনো বাজারদর নেই।
তবু মানুষ
এসব নিয়েই তো বেঁচে থাকে।
কবিতা ভালো লাগে
কারণ সে আমাকে
আমার কাছেই ফিরিয়ে দেয়।
অনেক মানুষের ভিড় পেরিয়ে,
অনেক পরিচয়ের ভেতর দিয়ে,
অনেক প্রয়োজনের মুখোশ খুলে
শেষে এসে বলে—
“তুমি যে মানুষটি
সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছ,
তাকে একটু বাইরে আসতে দাও।”
তখন বুঝি,
কবিতা আসলে
শুধু কাগজে লেখা কয়েকটি পঙ্ক্তি নয়।
কবিতা হলো
নিজের ভেতর দীর্ঘদিন
বন্ধ পড়ে থাকা একটি জানালা।
খুলে দিলে
দেখা যায়—
বাইরে পৃথিবী আগের মতোই আছে,
শুধু
আমাদের দেখার চোখটি
একটু বদলে গেছে।