ভেতরে একটি পুরোনো ঘর আছে—
দরজায় কোনো তালা নেই,
তবু কেউ সেখানে ঢোকে না।
ঘরটির মেঝেতে
ছড়িয়ে আছে কয়েকটি শুকনো বীজ,
কিছু অর্ধেক লেখা চিঠি,
আর জানালার ধারে
একটি পিঁপড়ে প্রতিদিন
অদৃশ্য কোনো দেশের দিকে যায়।
সেই ঘরেই
আরেকটি আমি বসে থাকে।
তার মুখ নেই,
কণ্ঠ নেই,
শুধু বুকের ভেতর
একটি ছোট্ট কুয়োর মতো শব্দ—
যেখানে জল তুলতে গেলে
নিজেকেই দেখা যায়।
সকালে বেরিয়ে পড়ি।
শার্টের পকেটে রাখি
কয়েকটি প্রয়োজনীয় হাসি,
দু-একটি ভদ্র উত্তর,
আর এমন কিছু নীরবতা
যার কোনো ব্যবহার নেই,
তবু ফেলে আসা যায় না।
মানুষের ভিড়ে
নিজের নাম শুনি—
কিন্তু নামটি আমার কাছে
অপরিচিত লাগে।
মনে হয়,
কেউ আমার ছায়াকে ডাকছে।
ফিরে তাকাই।
ছায়াটি তখনও
পায়ের কাছে পড়ে আছে,
শুধু তার মুখে
আমার চেয়ে বেশি ক্লান্তি।
বিকেলের দিকে
রাস্তার ধুলোয় সূর্যের আলো
ভাঙা কাঁচের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
তার মধ্যে দিয়ে হাঁটি,
আর আমার ভেতরের মানুষটি
একটি পুরোনো কম্পাস খুলে বসে।
তার কাঁটা
উত্তর দেখায় না।
ঘুরতে ঘুরতে
শুধু বুকের দিকেই
ফিরে আসে।
তখন বুঝি—
পৃথিবীর সব দিক হারিয়ে গেলেও
নিজের ভেতরে যাওয়ার
একটি পথ থেকেই যায়।
সেই পথে
কোনো সাইনবোর্ড নেই।
আছে শুধু
ফেলে আসা পায়ের ছাপ,
যেগুলো বৃষ্টির পর
মাটির নিচে গিয়ে
আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভেতরের মানুষটি
সন্ধ্যায় জানালা খোলে।
বাইরে তখন
একটি কাক শুকনো ডালে বসে
অন্ধকারের সঙ্গে কথা বলছে।
সে বলে—
“তুমি এতদিন
কার জীবন বেঁচেছ?”
উত্তর খুঁজি।
শব্দ পাই না।
শুধু বুকের মধ্যে
একটি বন্ধ দরজা
ধীরে ধীরে খুলে যায়।
তার ওপারে
কোনো স্বর্গ নেই,
কোনো বিজয়ের পতাকাও নেই।
আছে একটি খালি মাঠ,
মাঠের মাঝখানে
বৃষ্টিতে ভিজে থাকা
একটি একলা জুতো।
কাছে যাই।
জুতোটির ভেতর
কাদামাটি জমে আছে।
কাদার মধ্যে
একটি ছোট্ট ঘাসের চারা
মাথা তুলেছে।
তাকে ছুঁই না।
শুধু দাঁড়িয়ে থাকি।
কারণ বুঝতে পারি—
আমার ভেতরেও
এতদিন ধরে
কিছু একটা জন্ম নিচ্ছিল।
আমি তাকে
নাম দিতে পারিনি।
সাফল্য নয়,
পরাজয়ও নয়—
হয়তো সেটাই
আমার আসল আমি।
যে ভিড়ের মধ্যে
চিৎকার করে না,
শুধু নিজের দিকে
এক পা করে ফিরে আসে।
রাত গভীর হলে
পুরোনো ঘরটিতে আবার যাই।
দেখি,
মেঝের শুকনো বীজগুলোর পাশে
একটি সবুজ রেখা উঠেছে।
দরজা বন্ধ করি না।
আজ প্রথমবার
ঘরটিকে ঘরই মনে হয়।
আর নিজেকে—
অতিথি নয়।