তৃতীয় তলার করিডোরে দাঁড়িয়ে বনলতা এখনও সিল মারা দরজার দিকে তাকিয়ে।
তার মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
মোস্তাকিম কি সত্যিই মারা গেছে?
ছয় মাস আগে যে মানুষটার মৃত্যুর খবর সে নিজে শুনেছে, তার ছবি আজও কীভাবে জীবিত একজন মানুষের মতো তার সামনে আসছে?
আর ২টা ১৭ মিনিট—
সময়টার সঙ্গে তার অতীতের কী সম্পর্ক?
হঠাৎ সিঁড়ি দিয়ে কারও পায়ের শব্দ ভেসে এল।
বনলতা ঘুরে তাকাল।
একজন নারী ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন।
বনলতা তাকে দেখেই চিনতে পারল।
নীলা।
রাশেদের স্ত্রী।
আরমানের বড় বোন।
বহু বছর আগে রাশেদের সঙ্গে সম্পর্কের সময় বনলতা নীলাকে দেখেছে। দূর থেকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি অনুষ্ঠানে, কখনো রাশেদের সঙ্গে, কখনো আরমানের সঙ্গে।
নীলার সঙ্গে বনলতার কখনো ঘনিষ্ঠতা ছিল না।
কিন্তু অপরিচিত ও নয়।
নীলা সিঁড়ির শেষ ধাপে উঠে বনলতার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
কেউ কথা বলল না।
তারপর নীলা খুব শান্ত গলায় বললেন,
“তুমি।”
বনলতার গলা শুকিয়ে গেল।
“আপনি এখানে কেন?”
নীলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“আমার ভাই মারা গেছে।”
বনলতা চোখ নামিয়ে ফেলল।
“আমি জানি।”
“জানো?”
“হ্যাঁ।”
নীলার চোখে হঠাৎ একটা অদ্ভুত দৃষ্টি ফুটে উঠল।
“তাহলে তুমি এটাও জানো, আরমান তোমাকে কতটা বিশ্বাস করত।”
বনলতা ধীরে মাথা তুলল।
“আমাকে বিশ্বাস করত?”
নীলা বিকৃতভাবে হাসলেন।
“করত কি না, সেটা এখন আর জানি না।”
একটু থেমে বললেন,
“তবে শেষ কয়েকদিন সে শুধু তোমার কথাই বলত।”
বনলতার বুক কেঁপে উঠল।
“কী বলত?”
“বলত, বনলতা সত্যিটা জানে না।”
বনলতা থমকে গেল।
“কোন সত্যি?”
নীলা উত্তর দিলেন না।
বরং সিল মারা দরজার দিকে তাকালেন।
“তোমার ফ্ল্যাটের ভেতর আমার ভাইয়ের লাশ পাওয়া গেছে।”
বনলতা নিচু গলায় বলল,
“আমি তাকে খুন করিনি।”
“আমি সেটা বলিনি।”
“কিন্তু সবাই আমাকে সন্দেহ করছে।”
“কারণ তোমার হাতে তার রক্ত ছিল।”
বনলতার চোখে পানি এসে গেল।
“আমি যখন তাকে দেখেছি, তখন সে মারা গিয়েছিল।”
“তাহলে তোমার হাতে তার রক্ত এল কীভাবে?”
বনলতা কোনো উত্তর দিতে পারল না।
এই প্রশ্নটার উত্তর সে নিজেও জানে না।
নীলা ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এলেন।
“তুমি কি জানো, আরমান তোমার সম্পর্কে কী খুঁজছিল?”
“না।”
“রাশেদ জানে।”
রাশেদের নাম শুনেই বনলতার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“রাশেদ কোথায়?”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“তুমি এখনও ওকে খুঁজছ?”
বনলতা তীব্র গলায় বলল,
“না।”
“মিথ্যা।”
বনলতা চোখ তুলে তাকাল।
নীলার চোখে এবার রাগের সঙ্গে কষ্টও ছিল।
“তোমাদের সম্পর্কের কারণে আমার সংসার একবার ভেঙে যাওয়ার মুখে গিয়েছিল।”
বনলতা চোখ নামিয়ে ফেলল।
“আমি জানি।”
“না। তুমি জানো না।”
নীলার গলা কেঁপে উঠল।
“তুমি জানো না, একজন স্ত্রী হিসেবে প্রতিদিন সন্দেহ নিয়ে বেঁচে থাকা কেমন।”
বনলতার চোখ ভিজে উঠল।
“আমি কখনো আপনার সংসার ভাঙতে চাইনি।”
“কিন্তু ভেঙেছিল।”
দুজনেই চুপ।
কয়েক সেকেন্ড পর নীলা নিজেকে সামলে নিলেন।
“তবুও আজ আমি তোমাকে দোষ দিতে আসিনি।”
বনলতা অবাক হয়ে তাকাল।
“তাহলে?”
নীলা ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করলেন।
“তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে এসেছি।”
ফাইলটা বনলতার হাতে দিয়ে বললেন,
“এটা আরমানের।”
বনলতা ফাইল খুলল।
প্রথম পাতায় তার নিজের ছবি।
দ্বিতীয় পাতায় রাশেদের ছবি।
তৃতীয় পাতায়—
মোস্তাকিম।
বনলতার আঙুল কেঁপে উঠল।
“এগুলো আরমানের কাছে কেন ছিল?”
“সেটাই আমিও জানতে চাই।”
বনলতা তাকাল।
“কীভাবে?”
নীলা বললেন,
“আরমানের সঙ্গে মোস্তাকিম এর সবসময় দেখা হতো। যেহেতু একই বিভাগের শিক্ষক। কিন্তু তাদের সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল, সেটা আমি জানতাম না।”
বনলতা ফাইলের একটা ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
ছবিতে আরমান এবং মোস্তাকিম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।
তারিখ—
মোস্তাকিম এর মৃত্যুর তিন দিন পর।
বনলতার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
“এটা কীভাবে সম্ভব?”
নীলা ধীরে বললেন,
“এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আরমানের মৃত্যুর কারণ।
অন্যদিকে
শহরের অন্য প্রান্তে একটা অন্ধকার ঘরে বসে ছিল রাশেদ।
তার সামনে একটা পুরোনো কালো ডায়েরি।
মোস্তাকিম এর ডায়েরি।
রাশেদ ধীরে ধীরে একটা পৃষ্ঠা খুলল।
সেখানে লেখা—
“বনলতা আমাকে ঘৃণা করলেও একদিন সত্যিটা তাকে জানতেই হবে।”
রাশেদ পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকে।
আরেকটি লাইন—
“রাশেদকে আমি বিশ্বাস করি না।”
রাশেদের চোখ স্থির হয়ে গেল।
তারপরের পাতায় লেখা—
“আরমান সব জেনে গেছে।”
রাশেদ ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।
তার মুখে অদ্ভুত যন্ত্রণা।
ছয় মাস ধরে সে একটা সত্যি লুকিয়ে রেখেছে।
এমন একটা সত্যি—
যেটা প্রকাশ পেলে শুধু বনলতার জীবন নয়, তার নিজের জীবনও শেষ হয়ে যেতে পারে।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে—
নীলা।
রাশেদ কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে কল ধরল।
“হ্যালো।”
ওপাশ থেকে নীলার কণ্ঠ।
“তুমি কোথায়?”
“বাইরে।”
“মিথ্যা বলো না।”
রাশেদ চুপ।
“আমি বনলতার কাছে আছি।”
রাশেদের মুখ বদলে গেল।
“তুমি ওর কাছে গিয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“ওকে কিছু বলো না।”
নীলার গলা ভারী হয়ে উঠল।
“কেন?”
“কারণ এখন ওকে সত্যিটা জানানো যাবে না।”
“কোন সত্যিটা?”
রাশেদ চুপ করে রইল।
নীলা এবার ধীরে বললেন,
“আরমান মৃত্যুর আগে তোমার নাম নিয়েছিল।”
রাশেদের চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
“কি বলেছিল?”
“বলেছিল—”
নীলা একটু থামলেন।
“‘রাশেদকে বিশ্বাস করো না।’”
রাশেদ নিঃশব্দে চোখ খুলল।
“আর কিছু?”
“হ্যাঁ।”
“কি?”
“বলেছিল, ‘বনলতাকে বাঁচাতে হলে মোস্তাকিমকে খুঁজে বের করতে হবে।’”
রাশেদের হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“তুমি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
রাশেদ কিছু বলল না।
নীলা আবার বললেন,
“রাশেদ, তুমি কি আমাকে কিছু লুকাচ্ছ?”
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর রাশেদ শুধু বলল,
“তুমি যত কম জানবে, তত ভালো থাকবে।”
“আমি তোমার স্ত্রী।”
“এই কারণেই বলছি।”
কল কেটে গেল।
রাশেদ মাথা নিচু করে বসে রইল।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছর আগের একটা রাত।
একটা নির্জন রাস্তা।
মোস্তাকিম দাঁড়িয়ে আছে।
রাশেদ তার সামনে।
মোস্তাকিম এর হাতে সেই কালো ডায়েরি।
“তুমি এটা কাউকে দেবে না?”
রাশেদ বলেছিল,
“না।”
“বনলতা কেও না?”
রাশেদ চুপ করেছিল।
মোস্তাকিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল,
“তাহলে একদিন তোমাকেই ওর সামনে দাঁড়াতে হবে।”
“আমি ওকে রক্ষা করছি।”
“না, রাশেদ।”
মোস্তাকিম এর চোখে ছিল অদ্ভুত এক দৃষ্টি।
“তুমি নিজেকে রক্ষা করছ।”
আবার বর্তমান
বনলতা ফাইলটা বন্ধ করল।
“নীলা আপু।”
“হুম?”
“আরমানের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা চলছিল।”
“আমি জানি।”
“কিন্তু আপনি জানেন না, শেষ কয়েকদিন ওর আচরণ কেমন বদলে গিয়েছিল।”
নীলা তাকালেন।
“কী হয়েছিল?”
“ও বারবার আমাকে বলছিল, ‘তুমি যার ওপর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো, তার কাছ থেকেই সাবধান থেকো।’”
নীলার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“আর কিছু?”
বনলতা ধীরে বলল,
“একদিন ও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল—মোস্তাকিম এর মৃত্যুর আগের রাতের কথা আমার মনে আছে কি না।”
নীলা চুপ করে গেলেন।
বনলতা বলল,
“কিন্তু আমার কিছুই মনে নেই।”
“কিছুই?”
“শুধু ২টা ১৭ মিনিট।”
নীলা ধীরে ধীরে বললেন,
“কী?”
“আমি জানি না কেন, কিন্তু ওই সময়টা দেখলেই আমার মনে হয় আমি কোনো একটা ঘটনা ভুলে গেছি।”
নীলার চোখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই বনলতার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
এবার বনলতা কল ধরল।
কিছুক্ষণ ওপাশ থেকে কোনো শব্দ নেই।
তারপর—
“বনলতা।”
বনলতার শরীর কেঁপে উঠল।
কণ্ঠটা সে চিনতে পারল।
“রাশেদ?”
ওপাশে নীরবতা।
তারপর রাশেদ বলল,
“তুমি নীলার সঙ্গে আছ?”
“হ্যাঁ।”
“ওকে বিশ্বাস কোরো না।”
বনলতা হতভম্ব হয়ে গেল।
“কেন?”
“কারণ আরমানের মৃত্যুর রাতে—”
রাশেদ থেমে গেল।
“কি হয়েছিল?”
“আমি তোমাকে সব বলব।”
“কোথায়?”
“যেখানে প্রথমবার তোমার সঙ্গে মোস্তাকিম এর দেখা হয়েছিল।”
বনলতা কিছু বলতে যাচ্ছিল।
তার আগেই কল কেটে গেল।
নীলা তার দিকে তাকিয়ে।
“রাশেদ?”
বনলতা মাথা নাড়ল।
হঠাৎ সিল মারা ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে আবার সেই ফোনের শব্দ ভেসে এল।
ক্রিং... ক্রিং...
বনলতা ও নীলা দুজনেই দরজার দিকে তাকাল।
নীলা ফিসফিস করে বললেন,
“এটা অসম্ভব।”
“কী?”
“পুলিশ বলেছিল, আরমানের ফোন তারা নিয়ে গেছে।”
বনলতা ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগিয়ে গেল।
সিলের নিচে আবার একটা সাদা কাগজ বেরিয়ে এল।
বনলতা কাগজটা তুলে নিল।
তাতে লেখা—
“আরমানের খুনি বনলতা নয়।”
বনলতা নিঃশ্বাস ফেলল।
তারপর নিচের লাইনটা পড়ল।
“কিন্তু খুনের সময় সে ঘটনাস্থলে ছিল।”
বনলতার হাত কাঁপতে শুরু করল।
আর তার নিচে—
“কারণ ১৭ ই জৈষ্ঠ্য রাত ২টা ১৭ মিনিটে যা ঘটেছিল, সেটা বনলতা ভুলে গেছে।”
বনলতা হঠাৎ মাথা চেপে ধরল।
তার চোখের সামনে আবার সেই দৃশ্য।
বৃষ্টি।
গাড়ির আলো।
মোস্তাকিম এর কণ্ঠ।
আর একজন নারীর কান্না।
তারপর—
একটা গুলির শব্দ।
বনলতা চিৎকার করে উঠল।
“আমি দেখেছি!”
নীলা তাকে ধরে ফেললেন।
“কী দেখেছ?”
বনলতা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“সেদিন রাতে…”
সে থেমে গেল।
তার চোখ ধীরে ধীরে নীলার দিকে উঠল।
“আপনি সেখানে ছিলেন।”
নীলার মুখের রং মুহূর্তে বদলে গেল।
“তুমি কী বলছ?”
বনলতা কাঁপা গলায় বলল,
“আমি মনে করতে পারছি…”
তারপর হঠাৎ—
করিডোরের আলো নিভে গেল।
চারপাশ অন্ধকার।
অন্ধকারের মধ্যে খুব কাছে থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
“এবার মনে পড়ছে, বনলতা?”
আর সেই কণ্ঠ—
মোস্তাকিমের।