আমার কাছে চা মানে শুধু একটি পানীয় নয়। চা মানে একটুখানি প্রশান্তি, এক চিলতে ভালো থাকার চেষ্টা। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কখনো কখনো ভুলে থাকা যায় শত শত বেদনা, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা, কিংবা বুকের ভেতর জমে থাকা এক আকাশ দীর্ঘশ্বাস। চায়ের উষ্ণতা যখন ঠোঁট ছুঁয়ে যায়, তখন মনে হয়, পৃথিবীটা বোধহয় এখনো খুব বেশি নিষ্ঠুর হয়ে ওঠেনি।
আর সেই চা খেতে খেতে যদি চোখের সামনে দেখতে পাই একটি নদী, তবে তো কথাই নেই!
আমি বরিশালের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই নদীর সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত আত্মিক সম্পর্ক। বরিশালের প্রকৃতি, সবুজের বুক চিরে বয়ে চলা নদী আর নদীর বুকে ভেসে বেড়ানো নৌকাগুলো আমার ভীষণ প্রিয়। হয়তো এ কারণেই বরিশালকে বলা হয় বাংলার ভেনিস। এ শহরের সৌন্দর্য শুধু তার রাস্তাঘাট কিংবা মানুষের আন্তরিকতায় নয়, বরং নদীর স্রোতে, বাতাসের কোমলতায় আর বিকেলের আকাশে ছড়িয়ে থাকা মায়াবী আলোয়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে আমার সেই নদীপ্রেম আরও গভীর হয়েছে। ক্যাম্পাসের কাছেই যে আমার এক অপরূপ সুন্দরী নদী অপেক্ষা করে থাকে! তার নাম কীর্তনখোলা।
কীর্তনখোলা যেন আমার এক নীরব বন্ধু। যার কাছে মনের সব কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, অথচ কোনো উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা রাখতে হয় না। সে আমার আনন্দের গল্প শোনে, দুঃখের গল্প শোনে, শোনে এমন সব না-বলা কথা, যা কাউকে কোনো দিন বলা হয়ে ওঠেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে যখন মনটা খুব খারাপ থাকে, তখন আমি এক কাপ চা নিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে বসি। চারপাশে তখন কত ব্যস্ততা! কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউবা নদীর দিকে তাকিয়ে নিজের মতো করে সময় কাটাচ্ছে। অথচ আমার পৃথিবীটা তখন সীমাবদ্ধ হয়ে আসে একটি চায়ের কাপ আর বিশাল নদীটির মধ্যে।
সেদিনও তেমনই এক বিকেল ছিল।
আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা। পশ্চিম দিগন্তে সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নদীর বুকে ছোট ছোট ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে তীরে। দূরে একটি নৌকা আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে। মাঝির বৈঠার ছন্দে পানির বুকে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য বৃত্ত। মনে হচ্ছিল, নদীটি যেন নিজের ভাষায় কোনো বিষণ্ন কবিতা লিখছে।
হাতে আমার এক কাপ চা।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। আমি ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছি আর নদীর দিকে তাকিয়ে আছি।
হঠাৎ মনে হলো, নদীকে কখনো থেমে থাকতে দেখি না কেন?
তারও তো কত হারানোর গল্প আছে! কত নৌকা তার বুকের ওপর দিয়ে চলে গেছে, কত মানুষ তার তীরে দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের অপেক্ষা করেছে, কত চোখের জল তার পানিতে মিশে গেছে। কত বিচ্ছেদের সাক্ষী হয়েছে সে, কত ভালোবাসার স্মৃতি বয়ে নিয়ে গেছে দূর থেকে দূরে।
তবু নদী থেমে থাকেনি।
কোনো অভিমান বুকে জমিয়ে সে তার স্রোত বন্ধ করেনি। কোনো হারানোর বেদনায় নিজের গতিপথ ভুলে যায়নি। বরং সবকিছুকে সঙ্গে নিয়েই সে বয়ে চলেছে আপন গতিতে।
নদীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নিজের জীবনের সঙ্গে তার একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলাম।
আমিও তো কত কিছু হারিয়েছি! কত স্বপ্ন ভেঙেছে, কত প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে গেছে। যাদের একসময় নিজের পৃথিবী ভেবেছিলাম, সময়ের ব্যবধানে তারাই হয়ে গেছে দূর আকাশের নক্ষত্র। কাছে থেকেও যাদের ধরে রাখা যায়নি, তাদের স্মৃতি আজও কখনো কখনো বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথা হয়ে জেগে ওঠে।
কিছু কষ্ট আছে, যেগুলো কাউকে বোঝানো যায় না। কিছু অভিমান আছে, যেগুলোর কোনো ভাষা হয় না। রাতের গভীরে কিংবা বিকেলের নিস্তব্ধতায় সেই কষ্টগুলো হঠাৎ ফিরে আসে। তখন মনে হয়, বুকের ভেতর বুঝি একটা নদী জমে আছে, অথচ তার কোনো মোহনা নেই।
কিন্তু কীর্তনখোলার দিকে তাকিয়ে সেদিন মনে হলো, হয়তো জীবনও নদীর মতো হওয়া উচিত।
যা হারিয়ে গেছে, তাকে স্মৃতির তীরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া। যে মানুষগুলো থাকার ছিল না, তাদের চলে যাওয়াকে মেনে নেওয়া। আর যে স্বপ্নগুলো পূরণ হয়নি, সেগুলোর জন্য নিজের পুরো জীবনটাকে বিষণ্ন করে না রাখা।
আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিলাম।
চা ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে এসেছে। অথচ আমার ভেতরটা যেন একটু একটু করে শান্ত হয়ে উঠছে। নদীর বুক থেকে আসা বাতাস আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার মুখ। মনে হচ্ছে, কীর্তনখোলা তার অদৃশ্য হাত দিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে, 'মন খারাপ করিস না। সবকিছু হারিয়ে যায় না। কিছু হারানোর মধ্য দিয়েই মানুষ নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায়।'
আমি মৃদু হাসলাম।
পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক সহপাঠী জিজ্ঞেস করল, 'একা একা বসে আছিস কেন? মন খারাপ?'
আমি নদীর দিকে তাকিয়ে বললাম, 'না রে, মন খারাপ ছিল। এখন আর নেই।'
সে অবাক হয়ে জানতে চাইল, 'এত তাড়াতাড়ি মন ভালো হয়ে গেল কীভাবে?'
আমি হাতে থাকা খালি চায়ের কাপটা দেখিয়ে বললাম, 'এই যে, ওষুধ খেয়েছি!'
সে হেসে ফেলল। আমিও হাসলাম।
কিন্তু আমার হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর উপলব্ধি।
জীবনে সব দুঃখের সমাধান হয় না। সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। সব হারানোর ক্ষত সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি মুছেও যায় না। তবু বেঁচে থাকতে হয়, হাসতে হয়, নতুন করে স্বপ্ন দেখতে হয়। কারণ জীবন কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না।
আর মন খারাপের দিনগুলোতে আমাদের প্রত্যেকেরই এমন কিছু আশ্রয় থাকা দরকার, যেখানে গেলে নিজেকে আবার একটু ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।
কারও কাছে সেই আশ্রয় প্রিয় কোনো গান, কারও কাছে প্রিয় মানুষের কাঁধ, কারও কাছে এক টুকরো আকাশ। আর আমার কাছে সেই আশ্রয় এক কাপ চা আর কীর্তনখোলা নদী।
আমি জানি, প্রতিদিন সবকিছু সুন্দর হবে না। কোনো কোনো দিন বুকের ভেতর জমে উঠবে অজস্র মেঘ। কোনো কোনো রাতে পুরোনো স্মৃতিরা এসে দরজায় কড়া নাড়বে। হয়তো আবারও চোখ ভিজে উঠবে অকারণেই।
তবু আমি ভয় পাব না।
কারণ আমি জানি, আমার জন্য কোথাও না কোথাও এক কাপ চা অপেক্ষা করে আছে। অপেক্ষা করে আছে কীর্তনখোলা, তার অনন্ত স্রোত আর বুকভরা বাতাস নিয়ে।
আমি আবারও নদীর পাড়ে গিয়ে বসব। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দেখব, নদী কীভাবে তার সমস্ত দুঃখ, সমস্ত স্মৃতি আর সমস্ত না-পাওয়াকে সঙ্গে নিয়ে বয়ে চলেছে।
হয়তো সেদিন আমিও একটু একটু করে শিখে যাব বয়ে চলতে।
অতীতকে পেছনে ফেলে, অভিমানকে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে, নিজের জন্য নতুন করে বাঁচতে।
দিনের শেষে আমার কাছে সুখ মানে খুব বেশি কিছু নয়।
এক কাপ গরম চা, চোখের সামনে একটি নদী, মনের ভেতর একটুখানি শান্তি আর নিজের কাছে ফিরে আসার একটুকরো অবসর।
কারণ আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীর সব বিষণ্নতার ওষুধ হয়তো মানুষের কাছে নেই। কিন্তু কিছু বিষণ্নতার জন্য প্রকৃতি তার নিজস্ব ওষুধ ঠিকই রেখে দিয়েছে।
আর আমার মন খারাপের সেই অমৃত ওষুধ হলো—
এক কাপ চা এবং একটি নদী।