Story

মি টাইম

October 8, 2026

19 views

সারাদিনের ব্যস্ততার শেষে একটা সময় আসে, যখন চারপাশের সব শব্দ ধীরে ধীরে থেমে যায়। ফোনের নোটিফিকেশন কমে আসে, মানুষের ডাক শোনা যায় না, কাজের তালিকাটাও যেন কিছুক্ষণের জন্য চোখের আড়ালে চলে যায়।

সেই সময়টুকু শুধু নিজের।

জীবনে আমরা কত মানুষের জন্য সময় রাখি। পরিবারের জন্য, বন্ধুদের জন্য, প্রিয় মানুষের জন্য, কাজের জন্য, দায়িত্বের জন্য। কারও ফোনের উত্তর দিতে দেরি হলে অপরাধবোধ হয়, কারও মন খারাপ হলে পাশে দাঁড়াই, কারও প্রয়োজন হলে নিজের ব্যস্ততা ভুলে ছুটে যাই।

অথচ দিনের শেষে নিজের কাছে ফিরে আসার জন্য কয়েকটা মুহূর্তও কি আমরা রাখি?

একদিন সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে এক কাপ চা হাতে মনে হলো, এতদিন ধরে সবাইকে ভালো রাখার চেষ্টা করতে করতে নিজের খবরটাই নেওয়া হয়নি।

চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছিল। আকাশে তখন দিনের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছে। দূরের গাছগুলো অন্ধকারে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসছে।

কোনো বিশেষ কাজ ছিল না।

কাউকে ফোন করারও ছিল না।

শুধু চুপচাপ বসে থাকা।

অদ্ভুতভাবে মনে হলো, এই চুপ করে থাকাটাও একটা কাজ। বরং খুব দরকারি একটা কাজ।

মি টাইম মানে সবসময় কোথাও ঘুরতে যাওয়া নয়। দামি কোনো রেস্টুরেন্টে বসে নিজের জন্য সময় কাটানোও নয়। মি টাইম খুব সাধারণ হতে পারে।

এক কাপ চা নিয়ে জানালার পাশে বসে থাকা।

পুরোনো কোনো গান শুনতে শুনতে হারিয়ে যাওয়া।

ডায়েরির পাতায় মনের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো লিখে ফেলা।

কোনো বইয়ের কয়েক পাতা পড়া।

অথবা কোনো কারণ ছাড়াই কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা।

কখনো কখনো মি টাইম মানে শুধু নিজেকে জিজ্ঞেস করা—

“আমি কেমন আছি?”

প্রশ্নটা খুব ছোট।

কিন্তু উত্তরটা সবসময় সহজ নয়।

আমরা প্রায়ই বলি, “ভালো আছি।”

কিন্তু সত্যিই কি ভালো থাকি?

নাকি শুধু ভালো থাকার অভিনয় করি?

নিজের সঙ্গে একা বসলে সেই অভিনয়টা আর করা যায় না। তখন নিজের ক্লান্তি, অভিমান, কষ্ট, অপূর্ণতা—সবকিছু ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়ায়।

আর তখনই হয়তো নিজেকে একটু জড়িয়ে ধরতে হয়।

নিজেকে বলতে হয়—

“সবকিছু ঠিকঠাক না থাকলেও তুমি ঠিক আছো।”

“সব প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজে পেতে হবে না।”

“কিছু মানুষ চলে গেছে বলে তোমার জীবন থেমে যায়নি।”

“কিছু স্বপ্ন পূরণ হয়নি বলে তোমার জীবন ব্যর্থ নয়।”

মি টাইম আসলে নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্কটা আবার একটু ঠিক করে নেওয়া।

কারণ পৃথিবীর সবাই যদি একদিন দূরে সরে যায়, শেষ পর্যন্ত যে মানুষটির সঙ্গে তোমাকে সারাজীবন থাকতে হবে, সে তুমি নিজেই।

তাই নিজের জন্য সময় রাখা স্বার্থপরতা নয়।

বরং নিজের প্রতি দায়িত্ব।

দিনের ব্যস্ততায় হয়তো এক ঘণ্টা পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু দশ মিনিট তো সম্ভব। পাঁচ মিনিটও সম্ভব।

সেই কয়েক মিনিটে ফোনটা এক পাশে রেখে, পৃথিবীর সব চিন্তা থেকে একটু দূরে সরে, নিজের পাশে বসা যায়।

এক কাপ চা হাতে।

পছন্দের একটা গান কানে।

সামনে খোলা একটা ডায়েরি।

আর মনে জমে থাকা কথাগুলোকে একটু বেরিয়ে আসার সুযোগ দেওয়া যায়।

হয়তো সেই মুহূর্তে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না।

কিন্তু মনটা একটু হালকা হবে।

আর কখনো কখনো বেঁচে থাকার জন্য সমস্যার সমাধানের চেয়েও বেশি দরকার হয়—একটু হালকা মন।

জীবন খুব দ্রুত চলে যায়।

এই ছুটে চলার মাঝে তাই মাঝে মাঝে থামতে হয়।

সবাইকে একটু পাশে রেখে নিজের পাশে বসতে হয়।

নিজের কথা শুনতে হয়।

নিজেকে ভালোবাসতে হয়।

কারণ জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সম্পর্কটা অন্য কারও সঙ্গে নয়—

নিজের সঙ্গে।

তাই প্রতিদিন একটু মি টাইম থাকুক।

হয়তো এক কাপ চায়ের সঙ্গে।

হয়তো দু’পাতা ডায়েরির সঙ্গে।

হয়তো প্রিয় কোনো গানের সঙ্গে।

অথবা নিছক নীরবতার সঙ্গে।

শুধু কিছুটা সময়—

নিজের জন্য।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login