মুক্ত সভ্যতার বিকাশে ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিক মাধ্যমের কল্যাণে বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ সমাজের বহুবিধ সংস্কৃতি ও খেলাধুলা। নাম জানা অজানা অসংখ্য খেলা বিলীন হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। সেই খেলাগুলো লোকসমাজে ফিরিয়ে আনতে সরকার এবং যারা নিজেদের সংস্কৃতিপ্রিয় দাবী করে উভয়পক্ষের সদিচ্ছার বিস্তর ব্যবধান লক্ষণীয়। তবে কি একবিংশ শতাব্দীর সূচনাকালীন দৃশ্যপট এ দেশে আর দেখা মিলবেনা? হয়ত দেখা যেত কিন্তু এই সমস্যাটি নিয়ে খুব একটা আলোচনা, সমালোচনা, লেখালেখি কিংবা বিতর্ক টেলিভিশন শো এরও আয়োজন করা হয়নি। তাই নীরবে-নিভৃতে অতি অল্প সময়ের ফাঁকেই হারাতে হলো প্রাচীন সব সংস্কৃতি এবং খেলাধুলা। আজ এর বদলে সাধারণ মানুষের মানসপটে চেপে বসেছে অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক সব কায়দা কানুন সম্পন্ন হাইপার রিয়েলিস্টিক থ্রি-ডি গেম। সোজা বাংলায় বললে, ঘরে বসে বিদ্যুতায়িত যন্ত্রের সাহায্যে অতি বাস্তবভিত্তিক খেলাধুলা করা।
মানুষের এই হুট করে খেলাধুলার স্বাদ কিংবা রুচি পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য কিছু কারণও পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। আর এর জন্য শুধুমাত্র ডিজিটালাইজেশনই দায়ী নয়; অন্যান্য ফ্যাক্টরগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- স্যাটেলাইট যুগে অনুপ্রবেশ এবং এর ব্যবহারের আধিক্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা ও অসঙ্গতি-অশান্তি, দারিদ্র্য বিমোচনে আত্ম-কেন্দ্রিকতা ও সংগ্রামী জীবন, পিতামাতার দূরত্ব ও তালাক প্রবণতা, ইন্টারনেট ও যান্ত্রিকতার ক্রমবিকাশ ইত্যাদি।
আমাদের দেশের গ্রামীণ খেলা গুলোর ঐতিহ্য রয়েছে, ভিন্নধর্মী সংস্কৃতি রয়েছে, প্রতিটি খেলার পেছনে রয়েছে রঙ-বেরঙের গল্প, সহস্র বছরের চর্চা রয়েছে, বাঙালির জাতীয় চরিত্র ও কৃষ্টি, সৃজনশীলতা, সংরক্ষণশীলতা, ধর্ম পরায়ণতা এমনকি শিক্ষা লাভেরও ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েকবছর আগেই শহুরে সহ গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো; যেখানে দেশীয় খেলাগুলোর প্রতিই মনোযোগ দেওয়া হতো বেশি বিদেশি খেলা গুলোর চেয়ে, যা আর এখন সেভাবে চোখে পড়েনা।
বাঙালিরা শারীরিক সুস্থ্যতা ও খেলাধুলার যোগসূত্রকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। এই বিচ্ছেদ কখনও এই সমাজের মানুষের জন্য আশীর্বাদ বা সুখকর হতে পারে না। শহরাঞ্চলে তাক তাক করে দালান গড়ে স্কুল বানানো হচ্ছে, শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ নেই। সরকারের সম্মতি নিয়েই সেই স্কুল দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছে। কিন্তু খেলার মাঠহীন বদ্ধ পরিবেশের একটি স্কুলে শিশুদের মানসিক বিকাশের চেয়ে যে মানসিক হতাশা ও অনাস্থার জন্ম নিবে তা কেউ ভেবে দেখেনি। অনেক স্কুলে খেলার জন্য স্পোর্টস রুম ও শরীর চর্চার জন্য জিমনেশিয়াম থাকলেও তাতে যেতে দেওয়া হয় খুব নগণ্য সংখ্যককে। যারা যেতে পারে তাদেরকেও মেনে চলতে হয় কড়া নিয়ম। বাসায়, ক্লাসে এবং অনুষ্ঠানে এ দেশের শিশু-কিশোরকে সবসময় ম্যানার নিয়ে কিংবা নিয়মে বেঁধে রাখা হয়; শিশুদের নিজেকে উন্মোচন করতে পারার ক্ষমতা, নিজের মতামত ও নিজের চ্যালেঞ্জ নিজে নিতে পারা, কিছুটা নিয়মের বাইরে থাকা, মুক্ত পরিবেশের আস্বাদন এসব চার দেয়ালের ভেতরে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ ও সুস্থ্যতায় উন্মুক্ত পরিবেশ তথা খেলার মাঠের কোনো বিকল্প নেই। অবশ্যই আমাদের প্রাচীন খেলাগুলোর অকাল প্রয়াত ঘটার আরেকটি বিশেষ কারণ হতে পারে খেলার মাঠের সংকট; সামান্য খালি জমি পেলেই মানুষ বসতবাড়ি বানানোর পরিকল্পনা করে করে; ফলে শহরে মাটির দেখা পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখ জুড়ে শুধু কংক্রিট নির্মিত সুউচ্চ দালানের চূড়া দেখা যায়। সবুজ নেই, শুধু ধূসর আর ধূসর।
আবহমানকালজুড়ে বাংলার গ্রামগঞ্জে বিচিত্র সব খেলা মানুষের মন মনোরঞ্জন করে রাখত। খেলা জুড়ে চলত উৎসব, চারিদিকে অসংখ্য মানুষের ভিড়; খেলার মূল আকর্ষণ ছিল সেসব উৎসুক জনতা। যারা দাড়িয়ে কিংবা বসে খেলায় উৎসাহ দিতো, বিপরীত পক্ষের সাপোর্টাররা নিজের দলকে উৎসাহ দিতে নানান শ্লোক গাইতো, সেখানেও ছিল এক ধরণের সৃজনশীলতা, অদ্ভুত এক শিল্প। গ্রামীণ খেলাগুলো তখনকার মানুষের জন্য শরীরচর্চা ও চিত্তবিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় একটি মাধ্যম ছিল।
ক্যামিকেলযুক্ত ঔষধের মতো দেহ ও মনের শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে এমন কিছু গ্রামীণ খেলার নাম না বললেই নয়- বউচি, কানামাছি, গোল্লাছুট, ওপেন্টি বায়োস্কোপ, কিতকিত, এলাডিং বেলাডিং, লুডু খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, মার্বেল খেলা, মোরগ যুদ্ধ, বালিশ বদল, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, লাটিম ঘোরানো, হা-ডু-ডু, পুতুল খেলা, কড়ি খেলা, টোপা ভাতি, ডাংগুলি, দাড়িয়াবান্ধা, বাঘ-ছাগল খেলা, পুকুরে সাঁতার প্রতিযোগিতা, ষোল গুটি, এক্কাদোক্কা, রুমাল চুরি ইত্যাদি। ভিন্ন ভিন্ন খেলায় রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নিয়মের বাহার যা ব্যক্তিত্বভেদেও ভিন্নরকম; যেমন- কিছু খেলা ডানপিটে, চঞ্চল কিশোরদের জন্য; কিছু কিছু মেয়েদের, কিছু খেলা ডাঙ্গায় তো কিছু পানিতে, কোনটায় ছেলে মেয়ে উভয় খেলতে পারে, কিছু খেলা যুবকদের; স্তরে স্তরে গচ্ছিত এই খেলাগুলোর উপকরণও বেশ সহজলভ্য।
আধুনিক খেলনা গুলোর মতো দুর্বোধ্য, ব্যয়সাধ্য ও দুর্লভ নয়। কাদা, মাটি, লাঠি, বাঁশ, ইট, কড়ি, গাছের পাতা, ফলের বীজ, ফুল, কাঠ, পাথর, পোড়া মাটির ভাঙ্গা অংশ আর গোলাকৃতির বল থাকলেই অধিকাংশ খেলায় অংশ নেওয়া সম্ভব। চিলেকোঠা হতে উঁচুতে বাসের অভ্যেস মানুষের সংস্কৃতিপনায় আড়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু গ্রামীণ জীবন সংস্কৃতির সঙ্কোচনের পরও শৈশব ও কৈশোরের অবিবেচ্য স্মৃতি মস্তিষ্কে আঘাত করলে এখনও স্বদেশে ফেরার আকুলতা কাজ করে। এই আকুলতা সুখ-সমৃদ্ধি, বিত্তবৈভব কিংবা অখণ্ড অবসর প্রাপ্তির সন্ধানে নয়। গ্রামীণ জীবনের স্মৃতিগুলো বাঁচিয়ে রাখার আকুলতা।
গ্রামীণ খেলা ও সংস্কৃতি বাঙালির গৌরব ও ঐতিহ্যের বিষয়। প্রত্যেক প্রজন্মের কাছে এই আচার-বিচার-সংস্কৃতির বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। শরীরচর্চায় সহায়ক এই গ্রামীণ খেলাগুলোর চর্চা এবং অভ্যাসে পরিণত করতে শিশু-কিশোরদের চেয়ে মুরব্বিদের এগিয়ে আসতে হবে। আজকাল শরীর সুস্থ রাখার জন্য হাজার হাজার টাকা খরচ করে যেটুকু সময় ব্যায়ামাগারে দিতে হয়, সেটুকু সময় এবং চেষ্টা আমাদের ঐতিহ্য রক্ষায় কাজে লাগালে একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নের দৃশ্য শুধুমাত্র বই কিংবা টেলিভিশনে দেখতে হবেনা, খোলা চোখেই তা দেখা সম্ভব।
শিশুর প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাকে গর্বের বিষয় না ভেবে তা নির্দিষ্ট বয়সে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা উচিত। সময় টিভির এক প্রতিবেদনে, ওয়াশিংটন পোস্ট হতে সংগৃহীত তথ্যানুসারে, চীনে বাচ্চাদের গেমের আসক্তি রোধকল্পে- শুক্র, শনি ও রোববার রাত ৮টা থেকে ৯টা একঘণ্টা গেম খেলতে পারবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন আর ছুটির দিনে ঘণ্টাখানেক খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পিতামাতাদের উচিত অপ্রয়োজনে বাচ্চাদের প্রযুক্তির দিকে না ঠেলে হাতে বই ধরিয়ে দেওয়া এবং নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়া। এতে অন্তত বই হতে জেনে জেনেও গ্রামীণ খেলাগুলো দেখার এবং শেখার আগ্রহ তাদের মনে জন্মাবে; এছাড়া বইয়ের মতো উত্তম সঙ্গী আর কে বা আছে!
একটি সমস্যা যেমন দ্রুত ঘটেনা, তেমনি সমস্যার সমাধানও দ্রুত সম্পন্ন করার চেয়ে সিস্টেমেটিক ওয়ে অবলম্বন করেই আগানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমাদের শিশুদের ডিজিটাল পর্দার আসক্তি থেকে মুক্তি দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করাই। তারা একদিন ফিরিয়ে আনবে বাংলার প্রাচীন এই উৎসবগুলোকে।
#হাবিব_রহমান #মতামত #প্রবন্ধ
দৈনিক ইত্তেফাকের “তরুণ প্রজন্মের ভাবনা” পাতায় নিম্নোক্ত লেখাটি প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশিত লেখার সাথে মূল লেখার কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।