❑
প্রমেনাদে হাঁটবা। হাঁটবা। তাড়াহুড়া কইরো না। সন্ধ্যা নামার একটা নিজস্ব গতি আছে। মানুষের ঘড়ি আর শহরের ঘড়ি এক জিনিস না। নদীর ধার দিয়া যে প্রমেনাদটা গেছে, সেখানে দাঁড়াইলে প্রথমে মনে হবে বাতাস বইতেছে। পরে বুঝবা-বাতাস না, মানুষের জীবন তোমার গায়ে আইসা লাগতেছে। মানুষ নিজের চিন্তার মাধ্যমেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায়।
গ্যাসল্যাম্পগুলা একে একে জ্বইলা ওঠে। আলো বেশি দেয় না, তবে যতটুকু দেয়, ততটুকুতেই পুরোনো কোবলস্টোনের গায়ে শত বছরের পদচিহ্ন দেখা যায়। বালাস্ট্রেডে কনুই রাখলে নিচে কালচে পানি ধীরে ধীরে বইতে থাকে। ওপাশে অপেরা হাউসের ফ্যাসাডে শেষ রোদের রঙ লেগে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর সবকিছু ধূসর হয়ে যায়। বেলফ্রির ঘণ্টা বাজে। টাউনহলের ক্লক টাওয়ার সময় বলে দেয়। অথচ তুমি হাঁটতেছো। কিন্তু সত্যি কথা হইল, তুমি কারও খোঁজ করতেছো।
মেয়েটারে।
যারে এত ভালোবাসছো যে নামটা মনে আনলেই বুকের ভেতর অকারণে একটা সুখন জন্ম নেয়। সে তোমার পাশে নাই। হয়তো এই শহরেই আছে। হয়তো এই বুলেভার্ড দিয়া কোনোদিন হাঁটছে। কোনো ক্যাফের জানালার পাশে বসে কফির কাপ ধইরা বাইরের বৃষ্টি দেখছে। কোনো আর্কেডের নিচে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছে। কোনো পিয়াজার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ায়া কবুতর উড়া দেখছে। কিন্তু তোমার সাথে তার দেখা হয় না। শহর কখনো নিষ্ঠুর হইয়া চিৎকার করে না। শহর আস্তে আস্তে মানুষরে হারায়।
ফিউনিকুলার পাহাড় বেয়ে উঠে যায়। ট্রামলাইন কাঁপে। স্টেশনে নতুন মানুষ নামে। আন্ডারপাস দিয়া ভিড় গিলে ফেলে আবার উগরে দেয়। ফোয়ারার পানিতে আলো ভাঙে। ব্রোঞ্জের মূর্তিগুলা একই ভঙ্গিতে দাঁড়ায়া থাকে। আইভি পুরোনো দেয়াল জড়ায়া ধরে। চেইনের গায়ে মরিচা জমে। অ্যাশট্রেতে আধপোড়া সিগারেট নিভে যায়। পৃথিবীর সবকিছু বদলায়, শুধু অপেক্ষার রংটা বদলায় না।
তবুও তুমি মাঝে মাঝে ভাবো, যদি এই মুহূর্তে সে বিপরীত দিক থেইকা হাঁটতে হাঁটতে আসে? তারপরই নিজেরে ধমক দাও। যেহেতু আশা মানুষরে যতবার বাঁচায়, তার চেয়ে বেশি বার ভাঙে। মানুষ ভাবে ভালোবাসা মানে কাছে থাকা। পরে বুঝে, অনেক ভালোবাসার ঠিকানা দূরত্ব। এমন দূরত্ব, যেটা কিলোমিটারে মাপা যায় না। একই শহরে থেকেও দুইজন দুইটা আলাদা-আলাদা মহাদেশের মানুষ হইয়া যায়।
শুনছো?
পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ আছে যারা সারাদিন নিজের মাথার ভেতরের মনোলগ থামাইতে পারে না। একই দরজা বারবার দেখে, একই চিন্তা বারবার আসে, একই ভয় বারবার বুকের মধ্যে উঠে। কেউ অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডারের সাথে যুদ্ধ করে, কেউ সামাজিক উদ্বেগে মানুষের চোখের দৃষ্টি পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না। বাইরে দিয়া তাদের স্বাভাবিক লাগে। ভিতরে তারা প্রতিদিন ভেঙে পড়ে। শহর এইসব কান্নার কোনো কালিমা রাখে না। শুধু পেভমেন্টের উপর হাঁটার আওয়াজ রাখে।
তুমিও ভাঙো।
তবে অন্য কারণে। তোমার রোগের নাম চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইতে লেখা নাই। তোমার রোগের নাম, যারে একবার নিজের ভবিষ্যৎ ভাবছো, তারে আর নিজের বর্তমানেও পাও না।
রাত আরও নামে। নদীর কালো জলে আলো লম্বা হয়ে ভাঙে। বাতাস ঠান্ডা হয়। মানুষ কমে আসে। প্রমেনাদ ফাঁকা হয়। তুমি তখনও হাঁটতেছো। কারণ বাড়ি ফিরলে তাকে আরও বেশি মনে পড়ে।
এই জন্যই হাঁটো।
রাস্তা মানুষরে শুধু এক জায়গা থেইকা আরেক জায়গায় নেয় না। রাস্তা মানুষরে তার নিজের ভিতরেও নামায়। আর সেই ভিতরে একবার নামলে বোঝা যায়, কিছু মানুষকে হারানো যায়, কিন্তু কিছু মানুষের জন্য অপেক্ষা করা কখনো শেষ হয় না। তাই সন্ধ্যায় নদীর প্রমেনাদে হাঁটবা। হয়তো সে কোনোদিন আসবে না।
তবু হাঁটবা।
ভালোবাসা অনেক সময় মানুষরে এক করে না, শুধু মানুষ বানায়।