দ্রোহের বহ্নিশিখা ও বাংলা সাহিত্যের নতুন দিগন্ত
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রবীন্দ্র-বলয়ের শান্ত, মার্জিত, আধ্যাত্মিক এবং সৌন্দর্যসন্ধানী ধারায় এক প্রবল ভূমিকম্পের মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। যেখানে ছন্দ ছিল লালিত্যময়, ভাষা ছিল পরিশীলিত এবং সুর ছিল আত্মমগ্ন, সেখানে নজরুলের আগমন ঘটেছিল প্রলয়ঙ্কর তূর্যবাদন নিয়ে। পরাধীন ভারতবাসীর বুকফাটা আর্তনাদ, সামাজিক বৈষম্যের তীব্র চাবুক এবং মানুষের ওপর মানুষের অবিরাম শোষণ-লাঞ্ছনা যখন নিয়তি বলে মেনে নেওয়া হচ্ছিল, ঠিক তখনই নজরুল গর্জে উঠেছিলেন:
"আমি চির-বিদ্রোহী বীর-
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!"
নজরুল কেবল একটি কবিতার শিরোনাম হিসেবে ‘বিদ্রোহী’ শব্দটি গ্রহণ করেননি; ‘বিদ্রোহ’ হয়ে উঠেছিল তাঁর সমগ্র জীবনদর্শন, অস্তিত্বের মূল সুর এবং সৃষ্টির চালিকাশক্তি। কিন্তু এই বিদ্রোহ কোনো অন্ধ ধ্বংসকামনা বা নৈরাজ্য ছিল না। এ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়, পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মানবতার এক অবিরাম সংগ্রাম। কোনো মানুষ একদিনে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে না। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা গড়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নিদারুণ দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্যের তিক্ত অভিজ্ঞতা, প্রথম মহাযুদ্ধের সৈনিক জীবন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের নির্মম নির্যাতন এবং তাঁর অন্তরের গভীর সাম্যবাদী চেতনা।
শৈশবের ‘দুখু মিয়া’: অভাব, অনিশ্চয়তা ও বাস্তবের কঠোর পাঠশালা
নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার বীজ রোপিত হয়েছিল তাঁর জন্মলগ্ন থেকেই। ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এক অতিদরিদ্র মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। জন্মের পর থেকেই চরম দারিদ্র্য ও পরিবারের বহু সন্তানের অকালমৃত্যুর শোকের কারণে তাঁর ডাকনাম রাখা হয়েছিল ‘দুখু মিয়া’। শৈশবেই তাঁর মাথার ওপর থেকে পিতার ছায়া সরে যায়। মাত্র নয় বছর বয়সে পিতা ফকির আহমদের মৃত্যুর পর পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। শৈশবের যে বয়সে একটি শিশুর হাতে বই আর খেলার পুতুল থাকার কথা, সেই বয়সে দুখু মিয়াকে রুজি-রোজগারের কঠোর লড়াইয়ে নামতে হয়। পরিবারের পেটের ভাত জোগাতে তিনি মক্তবের শিক্ষকতা, মুয়াজ্জিনির দায়িত্ব পালন এবং মাজারের খাদেম হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বাঁধনহারা নজরুলকে কোনো প্রথাগত ধর্মীয় গণ্ডি বা সামাজিক অনুশাসন আটকে রাখতে পারেনি।
এই চরম অর্থকষ্ট তাঁকে ভাগ্যবাদী বা নতজানু করেনি; বরং জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে শিখিয়েছিল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে। দারিদ্র্যকে তিনি অভিশাপ হিসেবে না দেখে নিজের ব্যক্তিত্বের শানিত তরবারি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর ‘দারিদ্র্য’ কবিতায় তিনি অকপটে লিখেছিলেন:
"হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান
কণ্টক-মুকুট শোভা-দিয়াছ, তাপস,
অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;"
দারিদ্র্যের কণ্টকাকীর্ণ পথই নজরুলকে ভণ্ডামিহীন, অসংকোচ সত্য বলার ‘দুরন্ত সাহস’ জুগিয়েছিল, যা তাঁর বিদ্রোহী চেতনার অন্যতম প্রধান উপাদান।
লেটো দলের জীবন: মুক্ত বাতাসের ডাক ও গণমানুষের সংযোগ
মক্তব ছেড়ে কিশোর নজরুল যোগ দিয়েছিলেন বর্ধমানের বিখ্যাত লোকনাট্য দল বা ‘লেটো দল’-এ। তাঁর চাচা বজলে করিম ছিলেন লেটো গানের ওস্তাদ। নজরুলের বিদ্রোহী মানসিকতা এবং লোকায়ত চেতনার বিকাশে এই লেটো দলের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
লেটো দলের সাথে যুক্ত হয়ে নজরুল পালাগান রচনা করতেন, সুর দিতেন এবং অভিনয় করতেন। ‘চাষার সঙ’, ‘আকবর বাদশাহ’, ‘রাজপুত্র’, ‘মেঘনাদ বধ’ ইত্যাদি লোকনাট্যে তিনি শুধু ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনী নয়, সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের কথাও তুলে ধরতেন। লেটো দলের জীবন ছিল নিয়ম ভাঙার জীবন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বন্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে মুক্ত প্রান্তরে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানো, সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ কৃষক, মজুর, জেলেদের সাথে মিশে যাওয়া নজরুলকে এক অবারিত স্বাধীনতা উপহার দিয়েছিল। এই ভবঘুরে জীবন নজরুলের মন থেকে সমস্ত সামাজিক পদমর্যাদা ও কৃত্রিম আভিজাত্যের মোহ মুছে দিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন, সমাজের তথাকথিত উচ্চবর্গের চেয়ে মাঠের প্রান্তিক মানুষগুলোর হৃদয় কতখানি উন্মুক্ত। সাধারণ মানুষের এই শক্তির সাথে একাত্ম হওয়াই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকে আপসহীন গণমুখী রূপ দিয়েছিল।
সৈনিক জীবন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং সামরিক শৃঙ্খলার মাঝে দ্রোহের দীক্ষা
১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নজরুলের জীবনে নিয়ে আসে এক বিরাট পটপরিবর্তন। ১৯১৭ সালে আসানসোলের সিয়ারসোল রাজ হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় প্রি-টেস্ট পরীক্ষা না দিয়েই নজরুল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্ট’-এ যোগ দেন। সৈনিক হিসেবে তিনি তৎকালীন মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) করাচি ব্যারাকে অবস্থান করেন এবং সাধারণ সৈনিক থেকে হাবিলদার পদে উন্নীত হন।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, যিনি ব্রিটিশবিরোধী, তিনি কেন ব্রিটিশ আর্মিতে যোগ দিয়েছিলেন? এর পেছনে ছিল এক গভীর কৌশল ও অন্তর্দাহ। তৎকালীন ভারতীয় যুবকদের মধ্যে এক ধরনের সশস্ত্র বিপ্লবী চেতনা কাজ করছিল। নজরুল অস্ত্র চালনা শিখতে চেয়েছিলেন, সামরিক শৃঙ্খলা ও রণকৌশল আয়ত্ত করতে চেয়েছিলেন, যাতে ভবিষ্যতে দেশের মুক্তির লড়াইয়ে তা কাজে লাগানো যায়। করাচি ব্যারাকে বসে নজরুল কেবল বন্দুক চালাতে শেখেননি, তিনি সামরিক কুচকাওয়াজের ছন্দকে নিজের লেখনীর ভেতর ধারণ করেছিলেন। সামরিক ট্রাম্পেট, ড্রামের ছন্দ আর গোলার আওয়াজ তাঁর রক্তের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। এক হাতে রাইফেল আর অন্য হাতে কলম নিয়ে তিনি সেখানে শুরু করেন তাঁর সাহিত্যচর্চা। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’, ‘হেনা’, এবং কবিতা ‘মুক্তি’ এই সময়কালেই রচিত। সৈনিক জীবনের এই তেজ, শক্তিমত্তা এবং আত্মমর্যাদাবোধই পরবর্তীতে নজরুলের কবিতার ছন্দে এনে দিয়েছিল সামরিক অভিঘাত।
পরাধীন ভারতের ক্রন্দন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন রূপ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯২০ সালে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দিলে নজরুল কলকাতায় ফিরে আসেন এবং পূর্ণকালীন সাহিত্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তাল।
ব্রিটিশ রাজের নির্মম শোষণ, জালিয়ানওয়ালাবাগের নারকীয় হত্যাকাণ্ড (১৯১৯), রাওলাট অ্যাক্টের কালো আইন, অর্থনৈতিক লুটের কারণে দেশের মানুষের চরম দারিদ্র্য এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন নজরুলকে গভীরভাবে আলোড়িত ও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। নজরুল দেখতে পান, ভারতের কোটি কোটি মানুষ ব্রিটিশদের পায়ের তলায় পিষ্ট হচ্ছে, অথচ সমাজের একদল সুযোগসন্ধানী চাটুকার ব্রিটিশ প্রভুদের পদলেহন করে খেতাব ও জমিদারি অর্জন করছে। এই জাতীয় অপমান ও অধীনতা নজরুলের স্বাধীনচেতা মন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তিনি কেবল শান্ত কাব্যচর্চায় সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি; তাঁর কলম হয়ে ওঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক একটি কামান। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ঐতিহাসিক কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’। এই কাব্যের ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তাম্বর-ধারিণী মা’, ‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি কবিতা পরাধীন জাতির ধমনীতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
নজরুল কোনো রাখঢাক না রেখে সরাসরি ব্রিটিশ রাজশক্তির পতনের ডাক দেন:
"ধ্বংস-যুগান্তের ওই কি বাজে ঘণ্টা?
প্রলয় বয়ে আসছে কি হাসিতে পাচ্ছে শঙ্কা?
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন,
আসছে নবীন-জীবন-হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!"
পরাধীনতার অন্ধকার ভেঙে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে আনার এই যে উদাত্ত আহ্বান, তা নজরুলকে অনিবার্যভাবেই করে তুলেছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রধান বিদ্রোহী কবি।
সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে চাবুক
নজরুল কেবল রাজনৈতিক পরাধীনতার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করেননি; তিনি সমান শক্তিতে আঘাত হেনেছিলেন সমাজের অভ্যন্তরীণ ব্যাধিগুলোর ওপর। সনাতন হিন্দু সমাজের বর্ণবাদ, জাতপাত, অস্পৃশ্যতার নির্মম নিয়ম এবং রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডূকতা ও ফতোয়াবাজির বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন খড়্গহস্ত। তিনি দেখেছিলেন, ধর্মের নামে মানুষ কীভাবে মানুষকে ঘৃণা করে, কীভাবে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা হয়। ধর্মের যে মূল শিক্ষা—প্রেম ও মানবতা—তা হারিয়ে গিয়ে আচারসর্বস্বতা ও ধর্মীয় ব্যবসা প্রাধান্য পেয়েছে। এই ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাঁর গর্জন উচ্চারিত হয়েছিল ‘মানুষ’ কবিতায়:
"হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কারে কোলে তুলে লয় দেবতা তোমার ঘরের দুয়ার ধরি’?"
কিংবা ‘জাতের বজ্জাতি’ গানে জাতপাতের অহংকারকে তিনি চরম ব্যঙ্গে বিদ্ধ করেছেন:
"জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া।
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়কো মোয়া!"
নজরুল বিশ্বাস করতেন, মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই। তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী অবস্থান তথাকথিত মৌলবাদী ও পণ্ডিতদের ক্ষিপ্ত করে তুলেছিল। রক্ষণশীল মুসলিমরা তাঁকে ‘কাফের’ আখ্যা দিয়েছিল, আবার কট্টর হিন্দুরা তাঁকে আক্রমণ করেছিল। কিন্তু নজরুল কোনো রক্তচক্ষুকে পরোয়া করেননি। তাঁর বিদ্রোহ ছিল মানুষের মুক্তির স্বার্থে, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কৃত্রিম সীমানায় আবদ্ধ ছিল না।
শ্রেণীভেদ ও মেহনতি মানুষের পক্ষে সাম্যবাদী দ্রোহ
নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাম্যবাদী কবি। রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব (১৯১৭) এবং বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন নজরুলের চিন্তায় গভীর রেখাপাত করেছিল। ১৯২৫ সালে তিনি কমরেড মুজফফর আহমদের সাথে মিলে ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দল’ গঠন করেন এবং দলের মুখপত্র হিসেবে ‘লাঙল’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
নজরুল সমাজের সেই নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সভ্যতাকে গড়ে তোলে অথচ সভ্যতার সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকে। কৃষক, মজুর, কুলি, দিনমজুর, রিকশাওয়ালা,এই খেটে খাওয়া মানুষদের অবমাননা নজরুলকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি শোষক পুঁজিবাদী শ্রেণির মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে বলেন:
"দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সাবে তারে ঠেলে দিলে নিচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ওই বাষ্প-শকট চলে,
বাবু চড়ে তাহে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ? চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল?"
পুঁজিবাদ এবং সামন্তবাদের বিরুদ্ধে এই যে শ্রেণিসংগ্রামের ডাক, তা বাংলা কবিতায় নজরুলের হাত ধরেই প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহিমায় প্রকাশিত হয়। তাঁর এই শ্রেণিচেতনা ও শ্রমিকের অধিকারের দাবি তাঁর বিদ্রোহকে এক স্থায়ী দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করে।
নারীমুক্তির অগ্রদূত: চিরন্তন সাম্যের ঘোষণা
বিদ্রোহী নজরুল পুরুষের পাশাপাশি নারীর সম-অধিকার ও মুক্তির প্রশ্নে ছিলেন যুগান্তকারী এক বিপ্লবীর ভূমিকায়। তৎকালীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীরা ছিল অন্তঃপুরবাসিনী, ভোগের সামগ্রী এবং পুরুষের দাসী মাত্র। সভ্যতার অগ্রগতিতে নারীর যে সমান অবদান রয়েছে, তা সমাজ স্বীকার করত না।
নজরুল এই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার মূলে কুঠারাঘাত করেন। তাঁর ‘নারী’ কবিতায় তিনি বিশ্বসাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় সাম্যবাদী সত্য উচ্চারণ করেন:
"সাম্যের গান গাই,
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।"
তিনি পুরুষকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, নারীকে বন্দি রেখে কোনো সমাজের বা জাতির সামগ্রিক মুক্তি আসতে পারে না:
"সেদিন সুদূর নয়-
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!"
নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষে এমন আপসহীন অবস্থান নজরুলের সার্বিক বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে অগ্নিক্ষরণ: ‘ধূমকেতু’র কালজয়ী গর্জন
নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর সম্পাদিত পত্রিকাগুলো ছিল একেকটি অগ্নিকুণ্ড। ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট তাঁর সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ করে অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার আশীর্বাণী লিখে পাঠিয়েছিলেন:
"আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয়-কেতন!"
‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় নজরুল পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলেন। এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ যখন স্বায়ত্তশাসন বা ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের মতো মধ্যপন্থী দাবিতে আপস করছিল, নজরুল তখন দ্বিধাহীন চিত্তে লিখেছিলেন:
“স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও-কথাটার মানে এক-এক মহারথী এক-এক রকম ক’রে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে।”
১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ধূমকেতু’র পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত রূপকধর্মী রাজনৈতিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। এই কবিতায় ব্রিটিশদের ভারতে শাসনের নগ্ন চিত্র এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের ডাক দেওয়া হয়েছিল:
"আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাড়াল।
দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবে কি চণ্ডী সর্বনাশী?"
এই কবিতা প্রকাশের অপরাধে ব্রিটিশ সরকার ধূমকেতুর ওই সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করে এবং কবির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
কারাবরণ, ঐতিহাসিক জবানবন্দি ও অনশন: আত্মাহুতির প্রস্তুতি
১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর কুমিল্লা থেকে নজরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে বিচার চলাকালীন নজরুল চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে যে ঐতিহাসিক লিখিত বক্তব্য পেশ করেন, তা বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে অমর হয়ে রয়েছে।
এই জবানবন্দি কোনো সাধারণ আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না; এ ছিল এক শাসিত কবির পক্ষ থেকে শোষক রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র। আদালতে দাঁড়িয়ে নজরুল বলেছিলেন:
“আমার ওপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। সুতরাং আমি আজ রাজদরবারে আসামী। কিন্তু বিচারক মহাশয় মনে রাখবেন, রাজার পেছনে থাকেন ভগবান, আর সত্যের পেছনে থাকেন স্বয়ং ঈশ্বর। আজ ভারত পরাধীন। তার অধিবাসীবৃন্দ দাস। এটা নির্জলা সত্য। কিন্তু দাসকে দাস বললে, অন্যায়কে অন্যায় বললে যদি রাজদ্রোহ হয়, তবে সে রাজদ্রোহের অপরাধে আমি চিরকাল অপরাধী।”
তিনি আরও বলেন: “রাজার হাতে দণ্ড, ঈশ্বরের হাতে সত্যের দীপশিখা। রাজা দণ্ড দিতে পারেন, কিন্তু সত্যকে বিনাশ করতে পারেন না।”
নজরুলকে এক বছরের সশ্রম করাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল এবং পরে হুগলি জেলে তাঁকে স্থানান্তর করা হয়। হুগলি জেলে রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর ইংরেজ জেলার আর্টসটেনের অমানবিক অত্যাচারের প্রতিবাদে নজরুল সহবন্দীদের নিয়ে ঐতিহাসিক অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। টানা ৩৯ দিন তিনি জলস্পর্শ না করে অনশন চালিয়ে যান। কবির অবস্থা এমন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল যে সারা দেশ তাঁর জীবনের জন্য শঙ্কিত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে টেলিগ্রাম পাঠান: "Give up hunger strike, our literature claims you." (অনশন ভঙ্গ করো, আমাদের সাহিত্য তোমাকে চায়)। যদিও কুচক্রী ব্রিটিশ জেল কর্তৃপক্ষ সেই টেলিগ্রাম কবির হাতে পৌঁছাতে দেয়নি। অবশেষে দেশনেত্রী বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে এবং দেশবাসীর উদ্বেগে ৩৯ দিন পর কবি অনশন ভঙ্গ করেন।
কারাগারের এই বন্দিদশা নজরুলের বিদ্রোহকে নিভিয়ে দিতে পারেনি, বরং কারাগারই হয়ে উঠেছিল তাঁর নতুন রণক্ষেত্র। সেখানে বসেই তিনি রচনা করেছিলেন শিকল ভাঙার অমর গান:
"এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।
এই শিকল প’রেই শিকল তোদের করব রে বিকল।"
নিষিদ্ধের মহিমা: ব্রিটিশের আতঙ্ক ‘নজরুল’
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার পুরো শাসনামলে কোনো একক বাঙালি সাহিত্যিককে এতটা ভয় পায়নি, যতটা পেয়েছিল কাজী নজরুল ইসলামকে। তাঁর সৃষ্টির প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে থাকা বিদ্রোহের দাবানল ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ব্রিটিশ সিআইডি ও গোয়েন্দা বিভাগ নজরুলকে চিহ্নিত করেছিল ‘মোস্ট ডেঞ্জারাস পার্সন’ হিসেবে। নজরুলের একে একে পাঁচটি গ্রন্থ ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে:
১. যুগবাণী (১৯২২) - প্রবন্ধ সংকলন
২. বিষের বাঁশী (১৯২৪) - কাব্যগ্রন্থ
৩. ভাঙার গান (১৯২৪) - কাব্য ও সংগীত সংকলন
৪. প্রলয়শিখা (১৯৩০) - কাব্যগ্রন্থ
৫. চন্দ্রবিন্দু (১৯৩১) - সংগীত সংকলন
এ ছাড়া তাঁর ‘অগ্নি-বীণা’ ও ‘সঞ্চিতা’ বাজেয়াপ্ত করার একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অন্য কোনো কবির এতগুলো বই ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়নি। বই নিষিদ্ধ করে, কবিকে কারাগারে আটকে রেখেও নজরুলের কণ্ঠকে রোধ করা যায়নি। তাঁর গান ও কবিতা নিষিদ্ধ হলেও মুখে মুখে সারা ভারতের মুক্তিকামী জনতার মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার স্বরূপ: আত্মমুক্তির চূড়ান্ত দর্শন
নজরুলকে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে তাঁর কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটির ভূমিকা চূড়ান্ত। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের এক শেষ রাতে কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে বসে পেন্সিল দিয়ে এক নিঃশ্বাসে তিনি এই দীর্ঘ কবিতাটি লিখেছিলেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ছিল বিশ্বসাহিত্যের এক অভূতপূর্ব সৃষ্টি। এখানে কবির ‘আমি’ কেবল কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তি-সত্তা নয়; এই ‘আমি’ বিশ্বের সমস্ত নিপীড়িত, বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত মানবতার সম্মিলিত মহাজাগতিক রূপ। কবি এখানে সৃষ্টি ও ধ্বংসের এক যুগল রূপ তুলে ধরেছেন। তিনি একাধারে প্রলয়ঙ্কর শিব, আবার অন্যদিকে প্রেমের বাঁশরিধারী কৃষ্ণ:
"আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে,
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।"
নজরুলের এই বিদ্রোহের শেষ লক্ষ্য কী ছিল? তিনি কি কেবল ধ্বংসের জন্যই বিদ্রোহী হয়েছিলেন? না। কবিতার অন্তিম চরণে নজরুল তাঁর বিদ্রোহের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা ‘এন্ড গেম’ ঘোষণা করেছেন:
"মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।"
যতদিন পৃথিবীতে একজন মানুষও উৎপীড়িত থাকবে, একজন অত্যাচারীও শাসনদণ্ড ঘোরাবে, ততদিন নজরুলের বিদ্রোহ থামবে না। এই শর্তহীন মানবপ্রেমই তাঁর বিদ্রোহের পরম সার্থকতা।
উপসংহার: চিরকালের বিদ্রোহী, চিরকালের প্রাসঙ্গিক
কাজী নজরুল ইসলাম কেন বিদ্রোহী কবি হয়েছিলেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তাঁর এই বিদ্রোহ কোনো বিলাসিতা ছিল না, কোনো আরোপিত ভাবালুতা ছিল না। এটি ছিল সময়ের এক ঐতিহাসিক অনিবার্য দাবি। যে সমাজে অন্যায়, পরাধীনতা, কুসংস্কার আর শোষণ চেপে বসেছিল, সেই সমাজে একজন সৎ, সংবেদনশীল এবং প্রকৃত প্রেমিক কবির পক্ষে বিদ্রোহী না হয়ে অন্য কিছু হওয়ার কোনো উপায় ছিল না।
তিনি নিজেই তাঁর ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় স্পষ্ট করে বলে গেছেন কেন তাঁর হাতে বাঁশির বদলে রণতূর্য উঠেছিল:
"রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা নহে মুখে যা আসে তা কহি নির্ভয়,
আমার এ গান নহে তাহাদের যারা আজো বাঁচে মরে রয়।"
নজরুলের বিদ্রোহ ছিল ধ্বংসের ভেতর দিয়ে সুন্দরের পুনর্জন্ম ঘটানোর অঙ্গীকার। তিনি যা কিছু পচা, গলিত, জীর্ণ এবং অমানবিকতাকে উপড়ে ফেলে সাম্য ও ভালোবাসার এক নতুন পৃথিবী গড়তে চেয়েছিলেন।
আজ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পৃথিবীর বুকে মানুষে মানুষে বৈষম্য, ধর্মীয় হানাহানি, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং মানবতার অবমাননা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আর তাই, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিংশ শতাব্দীর পরাধীন ভারতের এক ঐতিহাসিক ক্ষণজন্মা বিদ্রোহী কবি নন; অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে পৃথিবীর যে প্রান্তেই মুক্তির লড়াই চলবে, সেখানেই কাজী নজরুল ইসলাম থাকবেন এক অবিনাশী প্রেরণা হয়ে—চির-উন্নত শিরে, চির-বিদ্রোহী বেশে।
তথ্যসূত্রঃ
১। wikipidia
২। Online different sources