Story

ভবঘুরের খোয়াবনামা

October 24, 2026

12 views

ভোরের কুয়াশা তখনও চিত্রা নদীর জলে ভাসমান কচুরিপানার জটগুলোকে পুরোপুরি দৃশ্যমান করতে পারেনি। চরের নরম পলিমাটিতে বকের একলা পায়ের ছাপ। নদীর বুক চিরে ভেসে আসা ঠান্ডা হাওয়া শিমুল আর পলাশের কচি ডালে কাঁপুনি ধরায়। শীত বিদায় নিচ্ছে, কিন্তু ফাল্গুনের আগুন এখনও পুরোপুরি জ্বলেনি; প্রকৃতি যেন এক গভীর দোলাচলে আটকে আছে। ঠিক তেমনই এক দোলাচলের নাম সিরাজ।

সিরাজ এখন আর কোনো ঘরের মানুষ নয়। কুসুমপুর গ্রামের লোকেরা তাকে চেনে ‘পাগলা সিরাজ’ নামে, কেউ বা ডাকে ‘খোয়াব সিরাজ’। তার গায়ের ময়লাটে খয়েরি রঙের আলখাল্লা, কাঁধে ঝুলানো একটা শতছিন্ন ঝোলা আর উসকোখুসকো লম্বা চুল-দাড়ি তাকে সাধারণ মানুষের সমাজ থেকে বহু যোজন দূরে সরিয়ে রেখেছে। তবে তার এই ভবঘুরে রূপের আড়ালে চাপা পড়ে আছে এক অন্য মানুষ,যে একসময় গোটা পরগনার সেরা বাঁশি বাজাত, যার হাতের মাটির প্রতিমায় প্রাণ পেত দেবীপ্রতিমা, আর যার চোখের তারা জুড়ে ছিল কেবল এক নারীর স্বপ্ন।

সেই নারীর নাম ছিল হাসনাহেনা, গ্রামের সবাই যাকে ডাকত হেনা বলে। সিরাজ ঘাটের ভাঙা সিঁড়িতে বসে ছিল। তার ঝোলা থেকে বের করল একটি পুরোনো, বিবর্ণ খাতা। মলাটটা উইপোকায় কাটা, পাতার কোণগুলো কুঁকড়ে গেছে। এটা সিরাজের ‘খোয়াবনামা’। সে যা স্বপ্ন দেখে, যা সে দেখতে চেয়েছিল, আর যা কোনোদিন সত্যি হয়নি,সব এই খাতায় লিখে বা এঁকে রাখে। গ্রামের লোকে ভাবে সে পাগলের প্রলাপ লেখে, কিন্তু সিরাজ জানে, এই খাতার প্রতিটি দাগ এক-একটি জীবন্ত দীর্ঘশ্বাস।

আজ সকালে খাতার পাতায় কাঠকয়লা দিয়ে আঁকা একজোড়া টানা টানা চোখ। সেই চোখের নিচে সিরাজ কাঁপা কাঁপা হাতে লিখল:

“খোয়াব দেখলাম, নদীতে অথই পানি, কিন্তু তৃষ্ণা মেটে না। লাল রঙের পাল তোলা নাও এসে ভিড়ল, অথচ মাঝি অচেনা। মাঝির হাতে রক্তজবা, আর ঘাটে পড়ে রইল একজোড়া ভাঙা কাচের চুড়ি।”

“কী রে সিরাজ, আজ আবার কার ফাঁসির খোয়াব দেখলি?”

হঠাৎ পেছনে কর্কশ গলার আওয়াজ পেয়ে সিরাজ খাতাটা চট করে লুকিয়ে ফেলল ঝোলার ভেতর। ঘাটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মাতব্বর বাড়ির চাকর রমিজ। হাতে বড় এক পিতলের কলসি।

সিরাজ হাসল। সেই হাসিতে না ছিল কোনো রাগ, না ছিল ক্ষোভ। কেবল অপার এক শূন্যতা। সে বলল, “ফাঁসি তো মানুষের একবারই হয় রে রমিজ ভাই। কিন্তু খোয়াবের মানুষরা বারবার মরে, আবার জন্মায়।”

রমিজ বিরক্ত হয়ে থুতু ফেলল মাটিতে। “তোর ওই প্যাঁচালো কথা গ্রামের মানুষ বোঝে না। সকাল সকাল ঘাটে এসে বসে থাকিস কেন? ওইদিকে শোন, মাতব্বরের বড় বিবি আজ ঘাটে নামবে না। তাঁর শরীর ভালো না। তুই তোর আস্তানা অন্য কোথাও নিয়ে যা।”

সিরাজ কথা বাড়াল না। তার লাঠিটা তুলে নিয়ে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। মাতব্বরের বড় বিবি,হ্যাঁ, হাসনাহেনাই এখন এই গ্রামের সবচেয়ে ধনী মানুষ রইস মাতব্বরের বড় বিবি। যে মাতব্বরের বয়স হাসনাহেনার বাবার চেয়েও বেশি, যার চাবুকের ভয়ে কুসুমপুর গ্রামের মানুষ তটস্থ থাকে, সেই মানুষের সোনার খাঁচায় এখন হেনার বাস।

 সিরাজের মনে পড়ে গেল সাত বছর আগের এক শ্রাবণ মাসের কথা।

সেদিনও চিত্রা নদী ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। সিরাজ ছিল এ তল্লাটের সবচেয়ে হাসিখুশি তরুণ। তার বাবা ছিলেন গ্রামের একমাত্র মৃৎশিল্পী। সিরাজ বাবার সাথে মাটির হাঁড়ি, পুতুল আর প্রতিমা বানাত। আর ছিল তার বাঁশি। অমাবস্যা কিংবা পূর্ণিমায় যখন নদীর চরে জ্যোৎস্না বা অন্ধকার নামত, সিরাজের বাঁশির সুরে নদীর জলও যেন থমকে যেত।

সেই সুরেই একদিন ধরা পড়েছিল হাসনাহেনা। হেনা ছিল গ্রামের পাঠশালার পণ্ডিত মশায়ের মেয়ে। রূপে যেন পদ্মফুল। কুসুমপুরের মেঠোপথ ধরে হেনা যখন কলসি কাঁখে ঘাটে যেত, তার রুপার নূপুরের শব্দে সিরাজের বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হতো। সিরাজ কাদামাটি মাখতে মাখতে আড়চোখে তাকাত। হেনা চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মুচকি হাসত। সেই হাসিতে ছিল কাঁচা ধানের সুবাস, রোদপোড়া মাটির ঘ্রাণ।

একদিন হেনা এসে দাঁড়িয়েছিল সিরাজদের উঠানে। সিরাজ তখন একটা মাটির পুতুলে লাল-নীল রং দিচ্ছিল।

“সিরাজ ভাই, আমার একটা পুতুল গড়ে দেবে?” হেনার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত এক আবদার।

সিরাজ থতমত খেয়ে তুলি নামিয়ে রেখেছিল। “কেমন পুতুল চাও?”

“এমন এক পুতুল, যে কখনো কাঁদবে না। যার চোখে কোনোদিন জল আসবে না।” হেনা একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল তার দিকে। সিরাজ সেদিন সারা রাত জেগে এক অপূর্ব মাটির কন্যা গড়েছিল। তার মুখশ্রী ছিল হুবহু হেনার মতো। পরদিন গোপনে ঘাটের কদমগাছের তলায় হেনার হাতে সেই পুতুল তুলে দিতে গিয়ে সিরাজের হাত ছুঁয়ে গিয়েছিল হেনার আঙুল।

হেনা কেঁপে উঠেছিল। তারপর ফিসফিস করে বলেছিল, “সিরাজ, তুমি এত সুন্দর জিনিস বানাও, আমাদের ভাগ্যটাকেও একটু সুন্দর করে বানিয়ে দিতে পারো না?”

সিরাজ সেদিন উত্তর দিতে পারেনি। কারণ সে জানত, সে কেবল এক দরিদ্রর ছেলে। আর হেনার বাবা পণ্ডিত মশাই যদিও গরিব, কিন্তু তার জাত্যাভিমান পাহাড়ের মতো উঁচু। তবুও প্রেম জাত মানে না, দারিদ্র্য মানে না। নদীর নির্জন চরে, শর্ষেখেতের আল ধরে দুজনের কত দুপুর, কত গোধূলি কেটেছে। সিরাজ হেনার চুলে গুঁজে দিত বুনো জারুল ফুল। হেনা আঁচল থেকে বের করে দিত গুড়ের নাড়ু।

“সিরাজ, আমি কোনো ধনদৌলত চাই না। তোমার ওই ভাঙা কুঁড়েঘরে আমি একবেলা খেয়েও সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারব। তুমি শুধু আমাকে ছেড়ে যেও না।” হেনা জড়িয়ে ধরেছিল সিরাজের হাত।

সিরাজ কথা দিয়েছিল। সে বলেছিল, “চিত্রা নদী শুকিয়ে যেতে পারে হেনা, কিন্তু তোমার প্রতি আমার এই টান কোনোদিন শুকাবে না। আমি শহরের মেলায় গিয়ে আমার মাটির কাজ বিক্রি করে অনেক টাকা জমাব। তারপর পণ্ডিত মশায়ের পায়ে গিয়ে পড়ব। তিনি না করবেন না।”

কিন্তু ভাগ্য কোনোদিন মানুষের সাজানো ছকে চলে না। সেই বছরই কুসুমপুর পরগনায় নামল ভয়াল বন্যা। ভেসে গেল মাঠের ফসল, তলিয়ে গেল শত শত বসতভিটা। হেনার বাবার পাঠশালা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। আর সেই সুযোগে ত্রাতা হয়ে হাজির হলো রইস মাতব্বর। চড়া সুদে ঋণ দিল সবাইকে। পণ্ডিত মশাই নিজের ভিটে বাঁচাতে মাতব্বরের কাছ থেকে একশো রৌপ্যমুদ্রা ধার নিলেন।

বন্যার জল নামল, কিন্তু রেখে গেল মহামারীর ক্ষত। সিরাজের বাবা কলেরায় মারা গেলেন মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে। সিরাজ যখন পিতার চিতায় বা কবরে মাটি দেওয়ার সামর্থ্যটুকুও হারিয়ে প্রায় দিশেহারা, তখনই গ্রামে রটে গেল অশনিসংকেত।

রইস মাতব্বরের নজর পড়েছে পণ্ডিতের রূপবতী মেয়ের ওপর। ঋণের দায়ে জর্জরিত পণ্ডিতের সামনে মাতব্বর প্রস্তাব রাখল,হয় ঋণের টাকা সুদসহ এই মুহূর্তে ফেরত দাও, নয়তো হেনার সাথে তার বিয়ে দাও। তাহলে শুধু ঋণ মাফই হবে না, পণ্ডিতের বাকি জীবনের ভাত-কাপড়ের দায়িত্বও নেবে মাতব্বর। পণ্ডিত মশাই মাতব্বরের পায়ে পড়ে কেঁদেছিলেন, কিন্তু মাতব্বরের হৃদয় ছিল পাথরের চেয়েও শক্ত।

খবর পেয়ে সিরাজ ছুটে গিয়েছিল পণ্ডিতের বাড়ি। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে পণ্ডিত তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। “দূর হ হতভাগা কুমোরের বাচ্চা! তোর ঘরে খোরপোশের চাল নেই, তুই এসেছিস আমার মেয়েকে উদ্ধার করতে? মাতব্বর সাহেব ওকে রানির হালে রাখবে। তুই কী দিবি ওকে? কাদা আর মাটি?”

সেদিন রাতে হেনা এসেছিল সিরাজের ভাঙা ভিটায়। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি। হেনার সারা শরীর ভিজছিল, চোখে ছিল পাগলের মতো আকুলতা।

“সিরাজ, আমাকে নিয়ে পালিয়ে চলো। বহু দূর দেশে চলে যাব আমরা। যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না। চলো সিরাজ!”

সিরাজ হেনার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। বাইরে বজ্রপাতের আলোয় সে দেখেছিল হেনার সেই নিষ্পাপ মুখ। সিরাজের পকেটে তখন একটা ফুটো পয়সাও নেই। চাল কেনার টাকা পর্যন্ত নেই। এই মেয়েটাকে নিয়ে সে কোথায় যাবে? কী খাওয়াবে? কোন অন্ধকারে তাকে ভাসিয়ে দেবে?

সিরাজের পুরুষালি অহংকার আর গভীর ভালোবাসাই সেদিন তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে ভেবেছিল, সে যদি হেনাকে ভালোবাসে, তবে হেনাকে এমন অনিশ্চিত নরকে ঠেলে দিতে পারে না। মাতব্বরের বাড়িতে হেনা অন্তত অনাহারে মরবে না।

সিরাজ নিজের বুক চিরে রক্তক্ষরণ সহ্য করে হেনাকে বলেছিল, “না হেনা, তুমি ফিরে যাও। মাতব্বরের ঘরেই তোমার ভালো হবে। আমি ভিখারি, আমার সাথে থাকলে তুমি না খেয়ে মরবে।”

হেনা যেন আকাশ থেকে পড়েছিল। তার চোখের তারাগুলো মুহূর্তে নিভে গিয়েছিল। “তুমি এই কথা বললে সিরাজ? তুমি আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিলে?”

“হ্যাঁ, দিলাম। চলে যাও তুমি।” সিরাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, যাতে অন্ধকারে হেনা তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর ধারা দেখতে না পায়।

হেনা আর একটি কথাও বলেনি। নিঃশব্দে বৃষ্টির ভেতর হারিয়ে গিয়েছিল। তার তিন দিন পর কুসুমপুর কাঁপিয়ে রইস মাতব্বরের সানাই বেজেছিল। দশটা খাসি জবাই হয়েছিল, গ্রামের মানুষ পোলাও-মাংস খেয়ে মাতব্বরের জয়গান গেয়েছিল। আর সেই রাতেই সিরাজ তার বাড়ি-ঘর, ভিটেমাটি সবকিছুতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল কুমোরের চাকা, মাটির পুতুল, আর এক বুক ভালোবাসার কঙ্কাল।

তারপর সিরাজ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তিন বছর পর যখন সে ফিরে আসে, তখন সে আর সেই সিরাজ নেই। তার চোখে-মুখে কোনো চেনা ভাব নেই, মুখে কোনো কথা নেই। শুধু হাতে একটি বাঁশের লাঠি আর কাঁধে সেই শতছিন্ন ঝোলা। লোকে দেখল সিরাজ পাগল হয়ে গেছে। সে আর মাটির কাজ করে না, বাঁশি বাজায় না। সারাদিন গ্রামের বনে-জঙ্গলে ঘোরে, নদীর চরে একা একা বসে থাকে, আর খাতায় হিজিবিজি খোয়াবের কথা লেখে। স্মৃতির অতল থেকে বাস্তবে ফিরে এল সিরাজ।

দুপুরের চড়া রোদ এখন মাথার ওপর। গ্রামের মেঠোপথে ধুলো উড়ছে। সিরাজ বটগাছের ছায়ায় এসে বসল। এই বটগাছটার পাশ দিয়েই মাতব্বরের বিশাল অট্টালিকার সীমানা। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সেই প্রাসাদপুরী। প্রাচীরের ওপারে বড় বড় মেহগনি আর কামিনী ফুলের গাছ। সিরাজ ঝোলা থেকে তার ছেঁড়া খাতাটা আবার বের করল। পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে এসে থামল চার বছর আগের এক পাতায়। সেখানে লেখা ছিল:

“খোয়াব দেখলাম, খাঁচার ভেতর একটা নীলকণ্ঠ পাখি বসে আছে। পাখিটার গলায় সোনার শিকল। সে গান গায় না, শুধু ডানা ঝাপটায়। তার ডানার ঝাপটানি দেখে বাইরের মানুষ হাততালি দেয়, তারা ভাবে পাখিটা নাচছে। কিন্তু আমি দেখলাম, পাখিটার বুক দিয়ে রক্ত ঝরছে।”

সিরাজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হেনা কি সত্যিই ভালো আছে? গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরে, মাতব্বর হেনাকে সোনার গয়নায় মুড়িয়ে রেখেছে। তার পরনে সবসময় দামি ঢাকাই শাড়ি। কিন্তু হেনার কোনো সন্তান হয়নি। আর সেই অপবাদ দিয়ে মাতব্বর বছর দুয়েক আগে আরও একটি বিয়ে করেছে,এক কমবয়সী মেয়েকে। এখন হেনার জায়গা হয়েছে পেছনের মহলে। সেখানে সে একপ্রকার বন্দিদশায় দিন কাটায়।

হঠাৎ প্রাচীরের পেছনের বাগান থেকে একটা চাপা কান্নার শব্দ ভেসে এল। সিরাজ কান খাড়া করল। শব্দটা খুব ক্ষীণ, কিন্তু সিরাজের হৃদয় সেই সুর চেনে। সহস্র মানুষের ভিড়েও যে সুর সে আলাদা করতে পারে, এ সেই সুর। সিরাজ উঠে দাঁড়াল। সন্তর্পণে প্রাচীরের ভাঙা এক অংশের কাছে গেল। সেখানে বুনো লতাপাতা জমে একটা প্রাকৃতিক পর্দার মতো তৈরি হয়েছে। পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল সে।

বাগানের এক কোণে শিউলি গাছের তলায় বসে আছে এক নারী। পরনে সাদা জমিনের ওপর হালকা নীল পাড়ের শাড়ি। গায়ে কোনো গয়না নেই। সেই উচ্ছ্বল, চঞ্চলা হেনা আর নেই। গাল দুটো ভেঙে গেছে, চোখের নিচে গভীর কালির দাগ। সে একমনে একটা শুকনো পাতার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।

সিরাজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার ইচ্ছে হলো প্রাচীর টপকে ভেতরে যায়, হেনার হাত দুটো ধরে বলে, “হেনা, আমি ভুল করেছিলাম। চরম ভুল করেছিলাম। দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাকে ত্যাগ করে আমি তোমাকে নরকে ঠেলে দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করো।”

কিন্তু সিরাজ পা বাড়াতে পারল না। সে এখন একজন ভবঘুরে, সমাজচ্যুত এক উন্মাদ। তার এই নোংরা হাত দিয়ে কি ওই প্রাসাদের বন্দিনীকে স্পর্শ করা যায়?

হঠাৎ হেনা চমকে মুখ তুলল। যেন বাতাসের ঘ্রাণে সে কারো উপস্থিতি টের পেয়েছে। সে প্রাচীরের সেই লতাগুল্মের দিকে তাকাল। সিরাজ নিজেকে আড়াল করতে পারল না। চার চোখের মিলন হলো।

কয়েক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থমকে গেল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ থেমে গেল, পাতার দোলাচলা বন্ধ হয়ে গেল। হেনার চোখ দুটো বিস্ফারিত হলো। সেই চোখে প্রথমে অবিশ্বাস, তারপর চরম যন্ত্রণা, আর সবশেষে ফুটে উঠল এক অবর্ণনীয় করুণা। সে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। প্রাচীরের দিকে দু-পা এগিয়ে এল।

 “সিরাজ...?” অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে উচ্চারণ করল হেনা।

সিরাজ আর সেখানে দাঁড়াতে পারল না। সে উল্টো ঘুরে দৌড় দিল। উন্মত্তের মতো ছুটতে লাগল মেঠোপথ ধরে। তার ছেঁড়া চটি ছিঁড়ে গেল, কাঁটা ফুটে গেল পায়ে, কিন্তু সে থামল না। সে ছুটতে লাগল নদীর দিকে।

গ্রামের মানুষ দেখল পাগলা সিরাজ পাগলের মতো হাসতে হাসতে আর কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াচ্ছে। রাখাল বালকেরা তাকে দেখে হাসল, ঢিল ছুড়ল। সিরাজের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।

নদীর নির্জন শ্মশানঘাটের পাশে এসে সে আছড়ে পড়ল চরের বালিতে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বুকের ওপর হাত রাখল। হৃদপিণ্ডটা যেন ফেটে যাবে। কেন সে আজ হেনার সামনে গেল? কেন সেই নিভে যাওয়া ছাইয়ের ভেতর আবার আগুন জ্বালাতে গেল? হেনা কি তাকে এখনও ঘৃণা করে? নাকি হেনা বুঝেছে, সিরাজের এই ভবঘুরে জীবন আসলে তারই ভালোবাসার কাফন?

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। আকাশে একফালি বাঁকা চাঁদ উঠল, যেন এক নিঃসঙ্গ চিল আকাশে ডানা মেলে ভেসে আছে। চরাচরে কুয়াশার চাদর বিছিয়ে গেল। সিরাজ তার খাতাটা বের করল। চাঁদের আলোয় সে লিখতে শুরু করল:

“আজকের খোয়াব বড় অদ্ভুত। দেখলাম, যাকে আমি মৃত ভেবে কবর দিয়েছিলাম নিজের বুকের ভেতর, সে এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু সে বেঁচে আছে এক জীবন্ত লাশ হয়ে। তার চোখের জল নদীর স্রোতের চেয়েও ভারি। আমি তাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি তাকে দিয়েছি এক অনন্ত কারাগার। এই পাপের কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই। খোয়াবনামার শেষ পাতাটি আজ ভরে গেল।”

সিরাজ খাতাটা বন্ধ করল। নদীর ঠান্ডা হাওয়া তার শরীরে বিঁধছে। হঠাৎ তার কানে এল নুপূরের নিক্কণ। সিরাজ চমকে উঠল। এই শ্মশানঘাটে এত রাতে কার নূপুর বাজবে? সে কি সত্যিই পাগল হয়ে গেল? নাকি হেনার স্মৃতি এখন তার কানেও ভ্রম তৈরি করছে? “সিরাজ...”

একটি পরিচিত কণ্ঠ। কোনো অলীক কল্পনা নয়, রক্তমাংসের মানুষের ডাক।

সিরাজ পেছনে ফিরে তাকাল। কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে এক মানবী। গায়ে একটা কালো চাদর জড়ানো, কিন্তু মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাসনাহেনা। সিরাজ হতবাক হয়ে বসে রইল। সে উঠতে পারল না, কথা বলতে পারল না।

হেনা এগিয়ে এল। ধীরপায়ে সে সিরাজের সামনে এসে বসল বালির ওপর। রাজরানির মতো যার প্রাসাদে থাকার কথা, সে আজ এই শ্মশানের ধুলোয় এসে বসল এক ভবঘুরের মুখোমুখি।

“তুমি আমাকে দেখে পালিয়ে এলে কেন?” হেনার গলায় কোনো অনুযোগ ছিল না, ছিল গভীর এক ক্লান্তি।

সিরাজ মুখ নিচু করে রইল। ভাঙা গলায় বলল, “তুমি এখানে কেন এসেছ মাতব্বরের বিবি? কেউ দেখলে তোমার রক্ষা থাকবে না। মাতব্বর তোমাকে মেরে ফেলবে।”

হেনা এক অদ্ভুত শুকনো হাসি হাসল। “মারবে? যে মানুষটা সাত বছর ধরে তিলে তিলে মরছে, তাকে আর নতুন করে কীভাবে মারবে সিরাজ? মাতব্বর আজ শহরে গেছে তার নতুন বিবিকে নিয়ে। বাড়িতে পাহারাদাররা ঘুমিয়ে আছে। আমি পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছি।”

“কেন এসেছ?”

 “তোমাকে দেখতে। এই সাত বছর ধরে আমি প্রতিদিন শুনেছি, তুমি পাগল হয়ে গেছ। তুমি নাকি পথে পথে ঘোরো আর খোয়াব দেখো। আমি নিজের চোখে দেখতে এসেছিলাম, আমার সেই অহংকারী প্রেমিক কেমন আছে।”

সিরাজ চোখ তুলে তাকাল। তার কোটরগত চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল শ্মশানের বালিতে। “আমি ভুল করেছিলাম হেনা। আমি ভেবেছিলাম তুমি সুখে থাকবে। রাজার হালে থাকবে। আমি নিঃস্ব ছিলাম, আমার কিছু দেওয়ার ছিল না।”

হেনা আকাশের চাঁদের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল। “সুখ? সিরাজ, মেয়েরা কি সোনা-দানা খেয়ে বাঁচে? ভালোবাসার মানুষের একবেলার শাক-ভাত যে হাজার মণ সোনার চেয়েও দামি, এই সহজ কথাটা তুমি সেদিন বুঝতে পারলে না? তুমি পুরুষ মানুষ, তোমার অহংকার বড় ছিল। তুমি ভাবলে, আমাকে ত্যাগ করে তুমি ত্যাগী সাজবে। কিন্তু তুমি একবারও ভাবলে না, আমার মনটা কী চায়?”

সিরাজ কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে নতমুখে বসে রইল এক অপরাধীর মতো। হেনা তার চাদরের ভেতর থেকে কিছু একটা বের করল। সেটা সিরাজের সামনে রাখল। চাঁদের আলোয় সিরাজ দেখল, সেটা সেই সাত বছর আগের মাটির পুতুলটা। হুবহু হেনার আদলে গড়া সেই পুতুল। পুতুলের গায়ে রঙ চটে গেছে, কিন্তু এক বিন্দু ধুলো জমেনি তাতে। হেনা পরম যত্নে সেটা এতদিন আগলে রেখেছে।

“এটা মনে আছে?” হেনা জিজ্ঞেস করল।

সিরাজ পুতুলটার দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও হাত গুটিয়ে নিল। “তুমি এখনও এটা রেখে দিয়েছ?”

“রেখে দিয়েছি আমার বোকামির সাক্ষী হিসেবে। এই পুতুলের মতোই আমার জীবনটা জড়বস্তু হয়ে গেছে সিরাজ। মাতব্বরের ঘরে আমার কোনো অভাব নেই, শুধু প্রাণের অভাব। মাতব্বর আমাকে মানুষ মনে করে না, মনে করে তার অহংকারের একটা অলঙ্কার। যখন শুনল আমার কোনো সন্তান হবে না, তখন সে আরেকটা বিয়ে করে আমাকে ছুড়ে ফেলে দিল পেছনের ঘরে। আজ আমার মনে হয়, তোমার ওই কুঁড়েঘরের মাটি হয়ে থাকাও এর চেয়ে হাজার গুণ ভালো ছিল।”

সিরাজ হেনার পায়ের কাছে বসে পড়ল। “আমাকে মাফ করে দাও হেনা। আমাকে শাস্তি দাও। তোমার এই দুর্গতির জন্য একমাত্র আমি দায়ী।”

হেনা সিরাজের মাথায় হাত রাখল। সেই স্পর্শে কোনো কামনার ছোঁয়া ছিল না, ছিল এক স্বর্গীয় সান্ত্বনা। সিরাজের উসকোখুসকো জটপড়া চুলে হেনার কোমল আঙুলগুলো বিলি কেটে দিল।

“তোমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তো আমি আসিনি সিরাজ। আমি এসেছি মুক্তি নিতে।”

সিরাজ চমকে তাকাল। “মুক্তি?”

হেনা উঠে দাঁড়াল। নদীর দিকে তাকাল। চিত্রা নদীর জল চাঁদের আলোয় রূপার মতো জ্বলছে। বাতাস ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে।

“আমি এতদিন বেঁচে ছিলাম এই আশায়, কোনোদিন হয়তো তোমার সাথে দেখা হবে। তোমাকে জিজ্ঞেস করব, কেন তুমি এমন করলে? আজ উত্তর পেয়ে গেছি। তুমি কোনো খারাপ মানুষ নও সিরাজ, তুমি শুধু এক দুর্বল মানুষ। যে ভাগ্যের সাথে লড়াই করতে ভয় পেয়েছিল।”

হেনা চাদরটা খুলে ফেলে দিল বালির ওপর। তার পরনের নীল শাড়িটা রাতের বাতাসে উড়তে লাগল।

“আমি আর ওই নরকে ফিরে যাব না সিরাজ।” হেনার কণ্ঠস্বর ছিল অদ্ভুত শান্ত।

“তাহলে কোথায় যাবে তুমি? চলো, আমরা দুজনে আজই এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাই। বহুদূর চলে যাব, যেখানে মাতব্বরের হাত পৌঁছাবে না। আমি আবার মাটির কাজ করব, আমি দিনমজুরি করব, তোমাকে আমি সুখে রাখব হেনা!” সিরাজের কণ্ঠে ফিরে এল সেই সাত বছর আগের যুবকের আর্তি। সে হেনার হাত ধরতে গেল।

কিন্তু হেনা এক পা পিছিয়ে গেল। সে এক মায়াবী হাসি হাসল। সেই হাসিতে কোনো পার্থিব বাঁধন ছিল না।

“অনেক দেরি হয়ে গেছে সিরাজ। সাত বছর অনেক দীর্ঘ সময়। এই সাত বছরে আমার শরীর, আমার আত্মা সব অপবিত্র হয়ে গেছে। সেই মাতব্বরের পাপের স্পর্শ আমার সারা অঙ্গে। সেই হেনা আর নেই সিরাজ, যে তোমার সাথে কুঁড়েঘরে সংসার করতে পারত। সে মরে গেছে যেদিন সানাই বেজেছিল।”

“হেনা! কী বলছ তুমি?” সিরাজের বুকের ভেতর এক অজানা আতঙ্কে হিম হয়ে এল।

“তোমার খোয়াবনামা আমাকে দেখাবে?” হেনা হাত বাড়াল।

সিরাজ কাঁপতে কাঁপতে ঝোলা থেকে খাতাটা বের করে দিল। হেনা পাতাগুলো ওল্টাল। চাঁদের আলোয় সে সিরাজের আঁকা ছবিগুলো দেখল, তার অশ্রু দিয়ে লেখা লাইনগুলো পড়ল। হেনার চোখ দিয়ে জল টপ টপ করে পড়ল খাতার পাতার ওপর।

“তুমি তো ভালোই খোয়াব দেখতে পারো সিরাজ,” হেনা খাতাটা বুকে জড়িয়ে ধরল। “আমার জীবনের শেষ খোয়াবটা তুমি তোমার খাতায় লিখে রেখো।”

“হেনা, থামো! তুমি কী করতে যাচ্ছ?” সিরাজ চিৎকার করে উঠল।

কিন্তু হেনা আর থামল না। সে ক্ষিপ্র পায়ে হেঁটে গেল নদীর ঘাটের দিকে। যেখান থেকে নদীর জল গভীর, যেখানে ঘূর্ণিস্রোত চরের পলিমাটিকে গ্রাস করে অতলে নিয়ে যায়।

“সিরাজ, পরের জন্মে যেন আমি কোনো ধনীর ঘরে না জন্মাই। পরের জন্মে যেন আমি এক গরিব কুমোরের ঘরের মেয়ে হয়ে জন্মাই, আর তুমি যেন শুধু আমার জন্যই মাটির পুতুল বানাও।”

কথাগুলো শেষ হতে না হতেই হেনা ঝাঁপিয়ে পড়ল চিত্রা নদীর কালো জলে। “হেনা!”

সিরাজের আর্তনাদে রাতের নিস্তব্ধ শ্মশান প্রকম্পিত হয়ে উঠল। সে ছুটে গেল জলের কিনারে। সে সাঁতার জানত, সে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। কিন্তু নিয়তি যেন তাকে পাথর বানিয়ে দিল। ঘাটের পিচ্ছিল শ্যাওলায় পা পিছলে সিরাজ আছড়ে পড়ল এক বড় পাথরের ওপর। তার মাথাটা সজোরে আঘাত খেল পাথরে। চোখের সামনে হাজারটা তারা জ্বলে উঠল সিরাজের। রক্তে ভেসে গেল তার কপাল, তার চোখ। ঝাপসা দৃষ্টিতে সে দেখল, নদীর রূপালী জলে একটা নীল শাড়ির আঁচল একবার ভেসে উঠল, তারপর ঘূর্ণির টানে তলিয়ে গেল চিরতরে।

সিরাজের চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। নদীর কলকল শব্দ যেন এক করুণ বিদায়-রাগিণী হয়ে বাজতে লাগল তার কানে। পরদিন সকালে কুসুমপুর গ্রামে এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্য দেখা গেল।চিত্রা নদীর চরে ভেসে উঠেছে রইস মাতব্বরের বড় বিবির লাশ। সারা গায়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, শুধু মুখখানা যেন এক শান্ত নিদ্রায় নিমগ্ন। আর নদীর পাড়ে পাথরের ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে পাগলা সিরাজ। তার মাথা ফেটে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে গেছে।

মাতব্বরের লোকেরা এসে হেনার লাশ নিয়ে গেল। গ্রামের মানুষ ভিড় জমাল। কেউ বলল হেনা পা পিছলে পড়ে গেছে, কেউ বা ফিসফিস করে মাতব্বরের অত্যাচারের কথা বলল। কিন্তু সত্যটা নদীর অতলেই রয়ে গেল।

সিরাজের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন সূর্য মধ্যগগনে। তার মাথার ক্ষতটা টনটন করছে, কিন্তু তার চেয়ে সহস্র গুণ বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে তার বুকের ভেতর। সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। চারপাশ ফাঁকা। নদীর জল আগের মতোই বয়ে চলেছে, যেন কিছুই ঘটেনি। মানুষের শোক, কান্না, পাপ,কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করে না এই চিরন্তন নদী। সিরাজের চোখ গেল বালির ওপর। সেখানে পড়ে আছে তার সেই খোয়াবনামার খাতাটি। আর তার পাশেই অক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে সেই পুরোনো মাটির পুতুলটি।

সিরাজ টলমল পায়ে হেঁটে গেল সেখানে। পুতুলটাকে তুলে নিয়ে বুকে জড়াল। তারপর খাতাটা হাতে নিল। খাতার শেষ পাতায়, যেখানে সে আগের রাতে লিখেছিল, তার ঠিক নিচে জলের দাগে কালি ছড়িয়ে এক অস্পষ্ট নকশা তৈরি হয়েছে। আর তার পাশে হেনার হাতের চুড়ির ভাঙা এক টুকরো কাচ পড়ে আছে।

সিরাজ আর কাঁদল না। তার চোখের জল শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। সে তার ঝোলা থেকে কাঠকয়লা বের করল। ভাঙা কাচের টুকরোটি দিয়ে নিজের আঙুলের ডগায় সামান্য খোঁচা দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হলো। সেই রক্ত আর কাঠকয়লা মিশিয়ে সিরাজ তার খোয়াবনামার একেবারে শেষ পৃষ্ঠায় বড় বড় অক্ষরে লিখল: “আজকের খোয়াব আর কোনো কল্পনা নয়। আজ খোয়াব এবং সত্য একাকার হয়ে গেছে। এক অভাগী নদী হয়ে বয়ে গেল সাগরের পানে, আর এক হতভাগা তীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অনন্তকালের জন্য। এই খাতার নাম ছিল ভবঘুরের খোয়াবনামা। আজ থেকে এর নাম হলো,হেনার সমাধি।”

সিরাজ খাতাটি পরম যত্নে পুতুলটির সাথে বেঁধে ফেলল তার আলখাল্লার ভেতরে। তারপর সে উঠে দাঁড়াল। চিত্রা নদীর দিকে শেষবারের মতো তাকাল। বাতাসে তখন হেনার চাদর থেকে ভেসে আসা কামিনী ফুলের মৃদু গন্ধ। সিরাজের মুখে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, পার্থিব মোহমুক্ত হাসি। সে আর কোনোদিন এই গ্রামে ফিরবে না। সে এখন মুক্ত। তার আর হারানোর কিছু নেই, পাওয়ারও কিছু নেই।

মেঠোপথ ধরে সিরাজ হাঁটতে শুরু করল। এবার আর কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো গন্তব্য নেই। দিগন্ত বিস্তৃত মেঠোপথ যেখানে গিয়ে আকাশ ছুঁয়েছে, সেই অজানার উদ্দেশ্যে ধীরপায়ে এগিয়ে চলল এক চিরন্তন ভবঘুরে। বাতাসে তখন শুধু তার পায়ের ধুলো উড়ছিল, আর দূর থেকে যেন ভেসে আসছিল এক অদৃশ্য বাঁশির সুর,যা কোনো মিলনের নয়, কেবলই এক অনন্ত বিরহের।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login