হেমন্তের কুয়াশায় ঢাকা ভোরগুলোতে ধানমন্ডি লেকের পাড়টা অদ্ভুত এক নিস্তব্ধ রূপ ধারণ করে। শহরের বাকি অংশ যখন গভীর ঘুমে অচেতন, কিংবা প্রথম অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে কেবল পাশ ফিরে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন লেকের এই শান্ত বাঁকটিতে কেবল বুনো ঘাসের ওপর শিশির ঝরে পড়ার টুপটাপ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। প্রীতম ঠিক এই সময়টাতেই তার পুরোনো সাইকেলটা নিয়ে লেকের ব্রিজের কাছে এসে দাঁড়ায়। সে পেশায় একজন হেরিটেজ আর্কিটেক্ট,পুরোনো জরাজীর্ণ রাজপ্রাসাদ, ব্রিটিশ আমলের ভঙ্গুর অট্টালিকা আর প্রাচীন মসজিদের ধূলিধূসর ইতিহাসকে নতুন করে আঁকা এবং রক্ষা করাই তার কাজ। পাথর, সুরকি আর প্রাচীন কাঠের নিরেট কাঠামোর মাঝে বাস করতে করতে প্রীতমের নিজের জীবনটাও যেন এক শান্ত, নির্লিপ্ত কাঠামোর ভেতর বন্দি হয়ে পড়েছিল। সে কোনোদিন কারও জন্য অপেক্ষা করেনি, কোনোদিন কোনো নির্দিষ্ট কারণে বিচলিত হয়নি।
কিন্তু গত এক মাস ধরে তার জীবনের এই অবিচল ছন্দে এক ব্যাখ্যাতীত পরিবর্তন এসেছে। প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায়, লেকের ওপারের রক্তকরবী গাছটার নিচের কাঠের বেঞ্চিতে এসে বসে একটি মেয়ে। গায়ে জড়ানো থাকে একরঙা কোনো খাদির চাদর, হাতে থাকে একটি পুরোনো বাঁধাই করা ডায়েরি, আর চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকে লেকের কালচে জলের ওপর। মেয়েটির নাম প্রীতম জানে না। সে কেবল জানে, মেয়েটির চোখের ভেতর এক অদ্ভুত মায়া আছে,যে মায়া কোনো জাদুকরের সম্মোহন নয়, বরং শ্রাবণের শেষ বিকেলের মেঘলা আকাশের মতো এক গভীর, নিঃশব্দ আর বিষণ্ণ প্রশান্তি।
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের এক কনকনে ভোরে লেকের চারপাশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘন কুয়াশা নেমেছিল। প্রীতম ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থার্মোফ্লাস্ক থেকে গরম কফি কাপে ঢালছিল। দৃষ্টি বরাবরের মতোই রক্তকরবীর বেঞ্চটির দিকে। মেয়েটি আজ চাদর জড়ায়নি; তার পরনে ছিল ছাইরঙা সুতির কুর্তা, কাঁধের একপাশে খামচে রাখা একগোছা চুল বাতাসে সামান্য উড়ছিল। সে লিখছিল না, শুধু ডায়েরিটা কোলের ওপর চেপে ধরে পাথরের মূর্তির মতো বসেছিল।
হঠাৎই প্রীতম লক্ষ্য করল, মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। তার পা ফেলার মধ্যে কোনো জড়তা ছিল না, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল কেমন যেন ভারহীন, এক বিভ্রান্ত পথিকের মতো। সে সোজা এগিয়ে গেল লেকের বাঁধানো ঘাটের শেষ সিঁড়িটির দিকে। জল আর ডাঙার সীমানায় যেখানে শেওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে আছে, মেয়েটি সেখানেই গিয়ে এক পা জলের ওপর শূন্যে ঝুলিয়ে দিল। প্রীতমের হাত থেকে কফির কাপটা মাটিতে পড়ে গেল। গরম তরল তার জুতোর ওপর ছিটকে পড়লেও সে কোনো ব্যথা অনুভব করল না। বুকের ভেতর এক অচেনা ভয় বিদ্যুতের মতো চমকে উঠল। সে কোনো কিছু ভাবার সময় পেল না; সাইকেলটা একপাশে ফেলে দিয়ে এক ছুটে ব্রিজের ঢাল বেয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড়ালো।
"শুনছেন!"
প্রীতমের ভারী চিৎকারে ভোরের নিস্তব্ধতা কাচের মতো ভেঙে গেল।
মেয়েটি চমকে পেছন ফিরে তাকাল। তার পা ফসকে গেল শেওলাধরা পাথরে। মুহূর্তের মধ্যে সে জলে পড়ে যেতে নিচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই ক্ষণেই প্রীতম তার হাত বাড়িয়ে শক্ত করে মেয়েটির কবজি চেপে ধরল। তীব্র টানে মেয়েটিকে টেনে তুলে এনে পাড়ের শুকনা ঘাসের ওপর ফেলল সে।
দুজনেই হাঁপাচ্ছিল। প্রীতমের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ছিল কুয়াশার মধ্যেও। তার হাত তখনও মেয়েটির নরম, বরফের মতো ঠান্ডা কবজি ধরে রাখা।
"আপনি কি পাগল?" প্রীতম রাগে ও আতঙ্কে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, "এভাবে কেউ পা পিছলে জলে পড়তে যায়?"
মেয়েটি কোনো আর্তনাদ করল না, প্রীতমের দিকে তাকিয়ে ভয়ও পেল না। সে ধীরে ধীরে তার হাতটা প্রীতমের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর অত্যন্ত শান্ত, ধীরলয়ে বলল, "আমি জলে পড়তাম না। শুধু পদ্মের শুকনো ডাঁটাটায় একটা নীল ফড়িং বসেছিল, ওটা ছুঁতে যাচ্ছিলাম।"
প্রীতম স্তব্ধ হয়ে গেল। এত বড় এক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে কেউ এত নিস্তরঙ্গ গলায় নীল ফড়িংয়ের কথা বলতে পারে?
মেয়েটির চোখদুটো তখন সরাসরি প্রীতমের মুখের ওপর নিবদ্ধ। বড় বড়, কাজহীন, অতল চোখের মণি। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে প্রীতমের ভেতরের সমস্ত ক্রোধ যেন বালুর বাঁধের মতো ধসে গেল। সে দেখল, সেই চোখে কোনো মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা নেই, কিন্তু জীবনের প্রতিও যেন কোনো বিশেষ অনুরাগ নেই। এক সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত অস্তিত্ব।
"আপনার ডায়েরিটা ভিজে গেছে," প্রীতম নিচু গলায় বলল, মাটির দিকে তাকিয়ে।
মেয়েটি ডায়েরিটা কুড়িয়ে নিল। পাতার কোণা একটু ভিজে গেছে। সে আঁচল দিয়ে তা আলতো করে মুছল, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "ধন্যবাদ। আমি খেয়াল করিনি।"
সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ধীরপায়ে মেঠোপথ ধরে হেঁটে লেকের পার্কিং গেটের দিকে চলে গেল। প্রীতম সেই কুয়াশায় মিলিয়ে যাওয়া অবয়বটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকটা তখনো দ্রুত ওঠানামা করছে, আর হাতের তালুতে লেগে রয়েছে মেয়েটির কবজির সেই বরফশীতল স্পর্শের অনুভূতি।
পুরোনো ঢাকার রূপলাল হাউসের সংস্কারকাজ নিয়ে প্রীতমকে প্রায়ই বড়কাটরার আশপাশের সরু গলিতে ঘুরতে হতো। কিন্তু সারাদিনের নকশা আঁকা, চুন-সুরকির অনুপাত নির্ধারণ কিংবা ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে তর্কের মাঝেও তার মন বারবার ফিরে যাচ্ছিল সেই লেকের ঘাটে।
পরদিন ভোরে প্রীতম যথারীতি সাইকেল নিয়ে হাজির হলো। রক্তকরবীর তলার বেঞ্চটা খালি। তার পরের দিনও খালি। তৃতীয় দিন ভোরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। অসময়ের এই বৃষ্টিতে লেক প্রাঙ্গণ পুরোপুরি জনমানবহীন। প্রীতম ছাতা মাথায় ব্রিজের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক এমন সময় সে দেখল লেকের বাঁধানো হাঁটাপথ দিয়ে একটি ছাতা এগিয়ে আসছে। হালকা গোলাপি রঙের ছাতার নিচে ছাইরঙা পরিচিত চাদর।
মেয়েটি বেঞ্চের দিকে গেল না, কারণ বেঞ্চ বৃষ্টির জলে ভিজে একাকার। সে সোজা চলে এলো ব্রিজের ছাউনির নিচে, যেখানে প্রীতম দাঁড়িয়ে ছিল।
ছাতা বন্ধ করে একপাশে রেখে মেয়েটি প্রীতমের দিকে তাকাল। তার মুখে কোনো দ্বিধা ছিল না, যেন তারা বহু বছরের চেনা প্রতিবেশী।
"আজও কি সাইকেল নিয়ে পাহারা দিতে এসেছেন, যেন কেউ ফড়িং ধরতে গিয়ে জলে না পড়ে?" মেয়েটির ঠোঁটের কোণে অত্যন্ত ক্ষীণ এক চিলতে রহস্যময় হাসির রেখা ফুটে উঠল।
প্রীতম একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল, "পাহারা দেওয়ার মতো সময় আমার খুব একটা থাকে না। তবে সেদিন যেভাবে পা পিছলেছিলেন, তাতে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভয় পাওয়াটা অন্যায় ছিল না।"
"আমি তিথি," মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিল না, শুধু নামটুকু বলল।
"প্রীতম। আর্কিটেক্ট।"
"জানি। আপনার ব্যাগের সাইড পকেটে যে স্কেল আর চারকোল পেনসিল গোঁজা থাকে, তা রোজ দেখি।"
প্রীতম অবাক হলো, "আপনি আমাকে খেয়াল করতেন?"
তিথি চোখ ফিরিয়ে লেকের বৃষ্টিভেজা জলের দিকে তাকাল, যেখানে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো পড়ে গোল গোল বৃত্ত তৈরি করছিল। "যে মানুষটা রোজ একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে খেয়াল না করাটা কঠিন। আপনি পুরোনো বাড়ি ঠিক করেন, তাই না?"
"হ্যাঁ। ভাঙাচোরা, ক্ষয়ে যাওয়া ইট-পাথরের দেয়ালকে বাঁচানোর চেষ্টা করি। তাদের ভেতরকার গল্পগুলোকে মানুষ যাতে ভুলে না যায়, সেই চেষ্টা।"
তিথি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কণ্ঠস্বর বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে এক অদ্ভুত বিষাদ ছড়িয়ে দিল, "ভাঙা ইট তো চুন আর সুরকি দিয়ে জোড়া লাগানো যায় প্রীতম সাহেব। কিন্তু মানুষের মনের যে প্রাচীন প্রাসাদগুলো প্রতিদিন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, সেগুলোকে ঠিক করার মতো কোনো আর্কিটেক্ট কি এই পৃথিবীতে আছে?"
প্রীতম কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। সে লক্ষ করল, তিথির প্রতিটি কথার গভীরে যেন শত বছরের জমাট বাঁধা কোনো গোপন পাথর চাপা পড়ে আছে। সে প্রশ্ন করতে চাইল, কিন্তু তিথির মুখের শান্ত কাঠিন্য তাকে থামিয়ে দিল।
সেদিন তারা আর কোনো কথা বলল না। শুধু পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ধারা দেখল। বৃষ্টি থামতেই তিথি ছাতা মেলে চলে গেল, কিন্তু প্রীতমের মনের ভেতর রেখে গেল এক অদ্ভুত মায়ার কুয়াশা।
নভেম্বর মাসের শুরুতে শহরের আবহাওয়া পুরোপুরি শুষ্ক ও শীতল হয়ে এলো। তিথি আর প্রীতমের এই ভোরের দেখা হওয়াটা কোনো অলিখিত নিয়মের মতো দাঁড়িয়ে গেল। তারা কখনো লেকের বাঁধানো রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটত, কখনো বা রোদ ওঠার পর কোনো এক চায়ের টঙে বসে মাটির ভাঁড়ে লিকার চা খেত।
প্রীতম জানতে পারল, তিথি একটি বেসরকারি লাইব্রেরিতে পুরোনো নথিপত্র সংরক্ষণের কাজ করে। সে একা থাকে লালমাটিয়ার একটি ফ্ল্যাটে। তার বাবা-মা বহু বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, আর তার একমাত্র ভাই থাকে সুদূর কানাডায়। কিন্তু এই বাহ্যিক তথ্যগুলোর বাইরে তিথির ভেতরের মানুষটি ছিল এক দুর্ভেদ্য রহস্য।
একদিন বিকেলে প্রীতম লালমাটিয়ার সেই লাইব্রেরিতে গিয়ে উপস্থিত হলো। প্রাচীন বইয়ের গন্ধ আর হলুদ বাতির নরম আলোয় লাইব্রেরিটা ছিল এক অন্য জগৎ। এক কোণার টেবিলে বসে তিথি খুব সাবধানে একটি শতবর্ষী ফার্সি পাণ্ডুলিপির ছেঁড়া পাতা স্পেশাল টিস্যু দিয়ে মেরামত করছিল।
প্রীতমকে দেখে তিথি একটুও অবাক হলো না। সে শুধু ইশারায় উল্টোদিকের চেয়ারে বসতে বলল।
কাজ শেষ করে তিথি মুখ তুলল, "আজ অসময়ে যে?"
"একটা পুরোনো বই খুঁজছিলাম," প্রীতম মিথ্যে বলল।
"মিথ্যে বলতে পারেন না আপনি," তিথি মৃদু হেসে বলল, "আপনার চোখের তারায় সত্যটা বড্ড বেশি স্পষ্ট থাকে।"
প্রীতম আর ভণিতা করল না। সে টেবিলের ওপর রাখা তিথির সেই পরিচিত ডায়েরিটার দিকে ইশারা করে বলল, "রোজ সকালে আপনি এই ডায়েরিটা কোলে নিয়ে বসে থাকেন। কিন্তু আমি কোনোদিন আপনাকে এর ভেতর এক লাইনও লিখতে দেখিনি। কেন?"
তিথির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তার চোখের মায়াবী দীপ্তি যেন এক মুহূর্তে নিভে গিয়ে সেখানে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার। সে ডায়েরিটা আলতো করে ছুঁল।
"এই ডায়েরিটা আমার নয় প্রীতম সাহেব। এটা শাফিনের ছিল।"
"শাফিন?"
তিথি উঠে দাঁড়াল। জানালার ভারী পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরের গোধূলির আলোর দিকে তাকিয়ে বলল, "শাফিন ছিল আমার ভালোবাসার মানুষ। আমরা একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম। ও কবিতা লিখত, আর স্বপ্ন দেখত একদিন পুরো দেশের পথশিশুদের জন্য একটা নিজস্ব স্কুল করবে। চার বছর আগে, ঠিক এই হেমন্তের এক সন্ধ্যায়, সে আমাকে ফোন করে বলেছিল,'তিথি, আমি ডায়েরির শেষ পাতাটা তোমার জন্য ফাঁকা রেখেছি। সেখানে আমাদের বিয়ের তারিখটা তুমি নিজের হাতে লিখবে।' কিন্তু সেই পাতা আর লেখা হয়নি। ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে এক মাতাল ট্রাক চালক ওর বাইকটাকে পিষে দিয়ে চলে যায়।"
লাইব্রেরির ভেতরটা হঠাৎ করেই খুব ভারী হয়ে উঠল। একটা প্রাচীন ঘড়ির টিকটিক শব্দ যেন প্রীতমের বুকের ভেতর হাতুড়ির মতো বাজতে লাগল।
তিথি ফিরে তাকাল। তার চোখে এক ফোঁটাও জল ছিল না। কিন্তু সেই চোখের দিকে তাকালে বুক চিরে কান্না বেরিয়ে আসে।
"আমি চার বছর ধরে এই শূন্য ডায়েরিটা নিয়ে বেঁচে আছি প্রীতম," তিথির কণ্ঠ শান্ত কিন্তু কাঁপছিল, "আমার মনটা চার বছর আগের সেই হেমন্তের রাত্রেই মরে গেছে। আমি রোজ সকালে লেকের পাড়ে যাই এই আশায়, হয়তো বাতাস এসে আমাকে বলে দেবে কীভাবে বাঁচতে হয়, কিংবা কীভাবে সমস্ত অনুভূতি মুছে ফেলে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাওয়া যায়। আপনি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন সেদিন, কিন্তু প্রীতম, যে মানুষটা ভেতর থেকে লাশ হয়ে গেছে, তাকে কীভাবে বাঁচাবেন?"
প্রীতম চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার হৃদপিণ্ড তখন তীব্র যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠছে। সে তিথির আরও কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাত দুটো তিথির কাঁধ স্পর্শ করতে গিয়েও থমকে গেল।
"তিথি," প্রীতম গভীর আবেগে বলল, "ভেঙে যাওয়া পুরোনো অট্টালিকাগুলো যখন আমি দেখি, সেগুলোর দেয়াল জুড়ে কেবল ধ্বংসস্তূপ আর চামচিকার বাসা থাকে। মানুষ ভাবে ওগুলো শেষ হয়ে গেছে, ওগুলোকে ভেঙে নতুন বহুতল ভবন বানানো উচিত। কিন্তু আমি ওদের ভেতরে জীবনের স্পন্দন খুঁজি। আমি জানি, পাথর ক্ষয়ে গেলেও তার আত্মা বেঁচে থাকে। মানুষ যদি পুরোনো ইটকে ভালোবেসে আবার দাঁড় করাতে পারে, তবে নিজের হৃদয়কে কেন পারবে না? তুমি লাশ নও তিথি, তুমি শুধু এক ভীষণ ঝড়ে সব হারিয়ে একা হয়ে যাওয়া এক ক্লান্ত পাখি।"
তিথি চমকে প্রীতমের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো কৃত্রিম সান্ত্বনা ছিল না, ছিল নিখাদ, নিঃশর্ত আত্মনিবেদনের আলো। তিথি দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল।
"আপনি ভুল জায়গায় মায়া জড়াচ্ছেন প্রীতম," তিথি অস্ফুটে বলল, "আমার কাছে দেওয়ার মতো কিছু নেই। আমি এক অভিশপ্ত শূন্যতা।"
"আমি তোমার কাছে কিছু চাইনি তিথি," প্রীতমের কণ্ঠ ছিল বজ্রের মতো দৃঢ়, "আমি শুধু তোমার সেই শূন্যতার পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই।"
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে প্রীতমকে অফিসের কাজে সাত দিনের জন্য রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ির সাইটে যেতে হলো। যাওয়ার আগে সে তিথির সাথে দেখা করতে চেয়েছিল, কিন্তু তিথি লাইব্রেরিতে আসেনি, তার ফোনও বন্ধ ছিল। পুঠিয়ার টেরাকোটা মন্দিরের নকশা মাপার সময় প্রীতমের হাত কাঁপছিল। প্রতিদিন ভোরবেলা সে পুঠিয়ার দিঘির পাড়ে একা দাঁড়িয়ে থাকত, আর তার চোখের সামনে ভেসে উঠত ধানমন্ডির রক্তকরবী তলার সেই নিঃসঙ্গ মেয়েটির মুখ। সে বুঝতে পারল, তিথির প্রতি তার অনুভূতি কোনো ক্ষণিকের করুণা নয়, কোনো সৌন্দর্যের মোহ নয়। এ এমন এক বাঁধন, যা তার গোটা অস্তিত্বকে এক অচেনা জাদুতে বেঁধে ফেলেছে। সে ভালোবেসে ফেলেছে তিথিকে,তার সমস্ত ক্ষত, সমস্ত বিষাদ আর সমস্ত নিস্তব্ধতা সমেত।
কাজ শেষ হওয়ার এক দিন আগেই প্রীতম ঢাকার বাসে উঠে পড়ল। সেদিন ঢাকায় পৌঁছে যখন সে লালমাটিয়ায় তিথির বাসার সামনে দাঁড়াল, তখন রাত নয়টা। সারা আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। পৌষের শুরুতে এমন হঠাৎ কালবৈশাখীর মতো ঝড় ও বজ্রপাত শহরে বিরল।
তিথির ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলল। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তিথিকে দেখে প্রীতমের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।
তিথির শরীর কাঁপছে, চোখের চারপাশ রক্তজবার মতো লাল। কপালে হাত দিয়ে প্রীতম বুঝল, মেয়েটি তীব্র জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ফ্ল্যাটের ভেতরটা পুরোপুরি অন্ধকার, মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বইপত্র আর ওষুধের পাতা।
"তিথি! তোমার এই অবস্থা?" প্রীতম তাকে ধরে ভেতরে নিয়ে এলো।
তিথি কোনো প্রতিরোধ করল না। সে যেন এতটাই দুর্বল যে নিজের ভারও রাখতে পারছিল না। প্রীতম তাকে সাবধানে সোফায় বসাল। রান্নাঘরে গিয়ে গরম জল তৈরি করল, নিজের রুমাল ভিজিয়ে তিথির কপালে জলপট্টি দিতে শুরু করল।
ঘরের বাইরে তখন তীব্র গতিতে ঝড় শুরু হয়েছে। জানালার কাঁচগুলো বাতাসের ধাক্কায় আর্তনাদ করে উঠছে, আর বিদ্যুৎ চমকালে ঘরের দেওয়ালগুলো নীলচে আলোয় কেঁপে উঠছে।
জ্বরের ঘোরে তিথি প্রীতমের হাতটা চেপে ধরল। তার হাতের নখগুলো প্রীতমের চামড়ায় বসে যাচ্ছিল।
"শাফিন... আমাকে ফেলে যেও না... আমি একা থাকতে পারি না শাফিন..." তিথি প্রলাপ বকতে লাগল।
প্রীতমের বুকের ভেতর একটা তীক্ষ্ণ ছুরি যেন বিঁধে গেল। কিন্তু সে হাত সরিয়ে নিল না। সে আরও শক্ত করে তিথির কাঁপা হাতদুটো নিজের দুই হাতের তালুর মাঝে ধরে রাখল। আলতো করে তিথির কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে দিল।
"ভয় নেই তিথি," প্রীতম ফিসফিস করে বলল, তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল তিথির হাতের ওপর, "আমি কোথাও যাচ্ছি না। তুমি শাফিনকে ভালোবাসো, তুমি ওকে কোনোদিন ভুলতে পারবে না, আমি জানি। আমি তোমার সেই স্মৃতি কেড়ে নিতে আসিনি। আমি শুধু তোমার এই যন্ত্রণার ভাগ নিতে এসেছি।"
সারা রাত ধরে চলল প্রকৃতির তাণ্ডব। আর সেই অন্ধকারের ভেতর বসে এক অতন্দ্র প্রহরী হয়ে রইল প্রীতম। সে প্রতিটি মুহূর্তে জলপট্টি বদলাল, ওষুধ খাইয়ে দিল, আর তিথির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সে কোনো প্রতিদানের আশা করেনি, কোনো অধিকার দাবি করেনি। এ যেন এক পবিত্র উপাসনা,এক ভাঙা মনকে স্রেফ একটু শান্তির পরশ দেওয়ার আরাধনা।
ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরের মেঝের ওপর এসে পড়ল, তখন ঝড় পুরোপুরি থেমে গেছে। আকাশ একদম পরিষ্কার, কাঁচের মতো স্বচ্ছ নীল। তিথির জ্বর নেমে গেছে। সে ধীরে ধীরে চোখ মেলল।
চোখ খুলেই সে দেখল, সোফার একপাশে কার্পেটের ওপর বসে প্রীতম ঘুমাচ্ছে। তার মাথাটা এলিয়ে পড়েছে সোফার কিনারায়। প্রীতমের মুখে গভীর ক্লান্তির ছাপ, চোখের নিচে কালি, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তিতে এক অদ্ভুত দেবদূতের মতো স্নিগ্ধতা। তার একটি হাত তখনো শক্ত করে ধরে রেখেছে তিথির চাদরের কোণা।
তিথি নিথর হয়ে তাকিয়ে রইল প্রীতমের মুখের দিকে। চারটি বছর ধরে সে যে পাথরের প্রাচীর নিজের চারপাশে গড়ে তুলেছিল, যে প্রাচীরে কোনো মানুষের ছোঁয়া সে লাগতে দেয়নি,সেই প্রাচীরটা যেন আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সে ভেবেছিল পৃথিবীতে ভালোবাসা মানে কেবল একজনের জন্য চিরকাল বিলাপ করে যাওয়া। কিন্তু সে জানত না, ভালোবাসা মানে অন্য একজনের এমন নিঃস্বার্থ, নিঃশব্দ আত্মবলিদানও হতে পারে। যে মানুষটা তার অতীতকে ঘৃণা করেনি, তার পাগলামিকে অবহেলা করেনি, বরং নিজের সমস্ত অহংকার বিসর্জন দিয়ে সারারাত তার শিয়রে জেগে বসে রইল,সে ভালোবাসার চেয়েও বড় কিছু।
তিথির চোখ থেকে এত বছর পর এক ফোঁটা সত্যিকারের কান্নার জল গড়িয়ে পড়ল। সেই কান্না কোনো শোকের নয়, সেই কান্না মুক্তির। সে খুব সাবধানে হাত বাড়িয়ে প্রীতমের উসকোখুসকো চুলে আঙুল ছোঁয়াল।
স্পর্শ পেতেই প্রীতম চমকে চোখ মেলে তাকাল। তিথিকে জেগে থাকতে দেখে এবং তার স্বাভাবিক দৃষ্টি দেখে প্রীতম ব্যস্ত হয়ে উঠল, "তিথি? জ্বর কেমন এখন? জল খাবে? আমি চা বানিয়ে আনি,"
কথা শেষ করতে পারল না প্রীতম।
তিথি এক ঝটকায় প্রীতমের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুই হাতে প্রীতমের পিঠ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে কান্নায় ভেঙে পড়ল। চার বছরের সমস্ত রুদ্ধ কান্না, সমস্ত জমানো হাহাকার বাঁধভাঙা নদীর মতো উপচে পড়ল প্রীতমের বুকের ওপর।
"কেন এলে তুমি?" তিথি ডুকরে কেঁদে উঠল, "কেন আমাকে নিজের বিষাদে মরতে দিলে না? আমি তো বাঁচতে চাইনি প্রীতম! কেন আমাকে আবার বাঁচার এই তীব্র যন্ত্রণা দিলে? কেন এত মায়া জড়ালে আমার সাথে?"
প্রীতম প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেল। তারপর তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক স্বর্গীয় প্রশান্তির হাসি। সে দুই হাত বাড়িয়ে তিথিকে পরম মমতায় জড়িয়ে নিল নিজের বুকের ভেতর।
"কারণ আমি তোমার এই অদ্ভুত মায়ায় হারিয়ে গেছি তিথি। যে মায়ায় কোনো শর্ত নেই, কোনো ভয় নেই। আমি তোমাকে অতীত ভুলে যেতে বলব না। শাফিন তোমার স্মৃতির মন্দিরে থাকবে, আর আমি তোমার এই বর্তমানে তোমার ছায়া হয়ে থাকব।"
বসন্তের আগমন ঘটেছে তখন প্রকৃতিতে। ধানমন্ডি লেকের রক্তকরবী গাছে লাল ফুলের মেলা বসেছে। ভোরের বাতাসে ভেসে আসছে শিউলি আর বুনোফুলের মৃদু গন্ধ। লেকের জল রৌদ্রের স্পর্শে ঝিকমিক করছে।
লেকের কাঠের বেঞ্চটিতে পাশাপাশি বসে আছে প্রীতম আর তিথি। তিথির পরনে আজ গাঢ় লাল রঙের একটি সুতির শাড়ি, চুলে একটি রক্তকরবী গোঁজা। তার মুখ আর ফ্যাকাশে নয়, এক অদ্ভুত লাবণ্যে ভরা।
তিথি তার ব্যাগ থেকে বের করল সেই পুরোনো ডায়েরিটা। চার বছর ধরে যে ডায়েরির পাতাগুলো ছিল সম্পূর্ণ সাদা, সম্পূর্ণ অর্থহীন।
সে কলমটা প্রীতমের হাতে তুলে দিল।
প্রীতম অবাক হয়ে তাকাল, "কী করব?"
তিথি প্রীতমের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আর কোনো অতল বিষাদ নেই, সেখানে এখন জ্বলছে হাজারটা প্রদীপের আলো।
"শাফিন বলেছিল এই শেষ পাতাটাতে বিয়ের তারিখ লিখতে। ও নেই, কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না প্রীতম। তুমি বলেছিলে না, পুরোনো ভাঙা অট্টালিকাকে বাঁচিয়ে তোলা যায়? তুমি আমার মরে যাওয়া হৃদয়টাকে নতুন করে জীবন দিয়েছ। এই ডায়েরির শেষ পাতাটা কেবল তোমার অধিকারেই পূর্ণ হতে পারে।"
প্রীতম কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তিথির দিকে চেয়ে রইল। তার চোখ ভিজে উঠল পরম আনন্দে। সে আর দ্বিধা করল না। ডায়েরির সেই সাদা, নিষ্পাপ পাতার ওপর কাঁপাকাঁপা হাতে সে লিখে দিল একটি তারিখ,আগামী পহেলা ফাল্গুন।
বাতাস এসে ডায়েরির পাতাগুলোকে উল্টে দিল। লেকের জলে একটা রঙিন প্রজাপতি উড়ে এসে বসল রক্তকরবীর ডালে। আর সকালের সোনালী রোদে ঢাকা পড়ে গেল দুটি মানুষের হাত, যারা প্রমাণ করেছে,ভালোবাসা শুধু পাওয়ার নাম নয়, ভালোবাসা হলো এক অদ্ভুত মায়া, যা ভাঙা হৃদয়কেও নতুন করে সৃষ্টির গান শোনাতে পারে।