Story

‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এবং আমি

October 4, 2026

8 views

বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল। শ্রাবণের শেষ বিকেলের এক চিলতে ভেজা আলো আমার পড়ার টেবিলের বাঁ কোণে এসে লুটিয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতরের পরিবেশটা শান্ত, স্তব্ধ। শুধু পুরনো সিলিং ফ্যানটার একটানা মৃদু গুঞ্জন ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। আমার কোলের ওপর রাখা আড়াই ইঞ্চি পুরু, প্রাচীন চামড়ায় বাঁধানো এক মহাকাব্য,লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’। পৃষ্ঠাগুলো ওল্টানোর সময় অদ্ভুত এক সোঁদা গন্ধ নাকে আসে। এ কেবল কাগজের গন্ধ নয়, এর ভেতরে মিশে আছে উনিশ শতকের শুরুর দিকের বরফাবৃত মস্কোর পোড়া গন্ধ, ঘোড়ার খুরের নিচে পিষ্ট হওয়া তুষারের শব্দ, আর বরোদিনোর প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বারুদের ঝাঁঝালো বাষ্প। বইটার চার খণ্ডের বিশাল কলেবর বহু পাঠকের কাছে ভয়ের কারণ হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এটি এক অনন্ত আশ্রয়। যখনই এই উপন্যাসের পাতা স্পর্শ করি, আমার আশপাশের ইট-কাঠ-কংক্রিটের ঢাকা শহর লহমায় মিলিয়ে যায়। আমি যেন দাঁড়িয়ে পড়ি অস্টেরলিতজের উন্মুক্ত ধূসর প্রান্তরে, কিংবা পিটার্সবার্গের কোনো রাজকীয় বলরুমে, যেখানে সুরের মূর্ছনায় ভেসে যাচ্ছে রেশমি গাউনের খসখস শব্দ।

আমি পড়ছিলাম প্রিন্স আন্দ্রেই বলকনস্কির কথা। অস্টেরলিতজের যুদ্ধের ময়দানে পতাকাদণ্ড হাতে নিয়ে বীরদর্পে সামনে এগিয়ে যাওয়া আন্দ্রেই আচমকা কামানের গোলায় আহত হয়ে মাটির ওপর আছড়ে পড়েছেন। চারপাশের গোলার গর্জন, সৈন্যদের আর্তনাদ আর মৃত্যুর তাণ্ডবের ভেতর তিনি চোখ মেলে তাকাচ্ছেন আকাশের দিকে। তলস্তয় লিখছেন, সেই অসীম, স্তব্ধ, মেঘলা ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে আন্দ্রেই ভাবছেন,এতদিন তিনি কিসের মোহে ছুটছিলেন? গৌরব? যশ? নেপোলিয়নের মতো সম্রাট হওয়ার আকাঙ্ক্ষা? এই সুবিশাল, শান্ত আকাশের নিচে মানুষের সেই অহংকার কত তুচ্ছ, কত অর্থহীন!

আমার চোখের পাতা ভিজে উঠল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর বেদনার আলোড়ন। মানুষ যুদ্ধ কেন করে? একদল মানুষ কেন আরেক দল মানুষকে ধ্বংস করতে বন্দুক, কামান হাতে রক্তগঙ্গার সৃষ্টি করে? শুধু কি সম্রাটের ভূখণ্ড বাড়ানোর জন্য? নাকি ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শনের জন্য? লিও তলস্তয় তো শুধু কোনো যুদ্ধের ইতিবৃত্ত লেখেননি; তিনি নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন যুদ্ধের ভেতরে মানুষের জীবন এবং সেই জীবনের গভীর গহ্বরে শান্তির এক নিরন্তর সন্ধান। দরজার পর্দায় মৃদু দোলা লাগল। আলতো পায়ের শব্দে ঘোর কাটল আমার। চটি জুতো জোড়া মেঝেতে ফেলে জেসমিন এসে আমার পাশে বসল। ওর হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। রান্নাঘর থেকে সবে কাজ সেরে এসেছে ও, ওর কপালের পাশে কয়েকটা ভেজা চুল লেপ্টে আছে, আঁচলে হলুদ কিংবা জিরের হালকা গন্ধ।

জেসমিন চা-টা টেবিলের ওপর সাবধানে নামিয়ে রেখে আমার মুখের দিকে তাকাল। ওর চোখে কৌতূহল আর কিঞ্চিৎ মায়া মেশানো ক্লান্তি।-"কী ব্যাপার? সন্ধ্যা হয়ে এলো, ঘরের আলোটাও জ্বালাওনি! অন্ধকারে এমন অন্ধের মতো মাথা গুঁজে কী পড়ছ?" জেসমিন নরম গলায় বলল।

আমি যেন বহু দূর থেকে এক নিঃশ্বাসে এই ঘরে ফিরে এলাম। আমার ভেতরে তলস্তয়ের দর্শন তখন টগবগ করে ফুটছে। আমার মনে হলো, এই যে পরম সত্য, এই যে মানবজীবনের অন্তর্নিহিত কান্না,এটা কাউকে বলা দরকার। জেসমিন আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ, ওকেই বলি। আমি বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে ওর হাতটা ছুঁয়ে বললাম, "জেসমিন, একটু বোসো তো। শোনো না, কী অসাধারণ একটা জিনিস পড়ছি!"

জেসমিন একটু অবাক হয়ে সোফায় হেলান দিল। "কী এমন জিনিস? আবার কোনো ইতিহাসের মোটা বই?" "ইতিহাস, কিন্তু নিছক দিনক্ষণের ইতিহাস নয়," আমি উৎসাহে চকচক করে উঠলাম। "এটা লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’। তুমি ভাবতেও পারবে না জেসমিন, ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি কেন বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে গণ্য হয়। এর ক্যানভাস এত বিশাল যে ভাবলে মাথা ঘুরে যায়। পটভূমিটা মূলত নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান এবং ১৮১২ সালের ফরাসি-রুশ যুদ্ধ। কিন্তু তলস্তয় এখানে শুধু রণক্ষেত্রের গল্প বলেননি। এর মধ্যে রয়েছে প্রেম, বিরহ, পরিবার, বন্ধুত্ব, মৃত্যু, কূটনীতি, সমাজ, মানুষের আত্মঅন্বেষণ, নিয়তি এবং সবচেয়ে বড় কথা,জীবনের গভীর অর্থের সন্ধান।"

জেসমিন সামান্য নড়েচড়ে বসল। মুখে এক চিলতে কৃত্রিম আগ্রহ ফুটিয়ে বলল, "আচ্ছা... যুদ্ধ নিয়ে এত বড় বই?" "এটাই তো আসল কথা!" আমি এক নিঃশ্বাসে বলতে লাগলাম, "উপন্যাসের একটা প্রকাণ্ড অংশ জুড়ে রয়েছে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ। তলস্তয় যেন হাত ধরে আমাদের নিয়ে যান সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে। কিন্তু অন্যান্য লেখকদের মতো তিনি যুদ্ধকে কোনো রোমান্টিক বা বীরত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখাননি। আমরা সিনেমায় যেমন দেখি না,বীরপুরুষ তরবারি উঁচিয়ে রণহুংকার দিচ্ছে আর সবাই বাহবা দিচ্ছে? তলস্তয়ের চোখে যুদ্ধ তা নয়। তাঁর চোখে যুদ্ধ হলো ভয়, মৃত্যু, পৈশাচিক বিশৃঙ্খলা, বিচ্ছেদ এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগের এক নারকীয় অধ্যায়।"

আমি একটু দম নিলাম। জেসমিনের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও চায়ের কাপে এক চুমুক দিচ্ছে। ও শুনছে কি না বুঝতে না পেরে আমি আরও আবেগে বলতে লাগলাম:

"১৮১২ সালের কথা ভাবো তো জেসমিন! নেপোলিয়ন তাঁর ‘গ্র্যান্ডে আরমি’ বা বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করলেন। এক প্রচণ্ড ঝড় আছড়ে পড়ল রুশ জাতির ওপর। সাধারণ মানুষ, কৃষক, অভিজাত,সবাই এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হলো। নেপোলিয়নের বাহিনী একের পর এক শহর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে একদম মস্কো পর্যন্ত পৌঁছে গেল। রাশিয়ার আত্মা যেন কেঁপে উঠল। কিন্তু তারপর কী হলো জানো? কোনো একক সেনাপতি বা সম্রাটের রণকৌশলে নয়, রাশিয়ার অদম্য সাধারণ মানুষের একতাবদ্ধ প্রতিরোধ, নির্মম শীত আর খাদ্যসংকটের সামনে দাঁড়িয়ে নেপোলিয়নের অপরাজেয় সৈন্যবাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। নেপোলিয়নকে লেজ গুটিয়ে মস্কো ছেড়ে পালাতে হয়েছিল বরফের মধ্যে নিজের হাজার হাজার সৈন্যের লাশ ফেলে রেখে।"

আমি জেসমিনের চোখে চোখ রাখলাম। ভেবেছিলাম ও হয়তো শিউরে উঠবে, হয়তো জিজ্ঞেস করবে,তারপর কী হলো? কিন্তু জেসমিন কেবল একটা মৃদু হাই তুলল। চোখের কোণটা একটু ডলে নিয়ে বলল, "হুঁ... খুব খারাপ অবস্থা হয়েছিল তাহলে।"

ওর এই নির্লিপ্ত ‘হুঁ’ শব্দটা আমার তপ্ত উৎসাহের ওপর যেন এক ঘটি ঠান্ডা জল ঢেলে দিল। তবু আমি হাল ছাড়লাম না। যুদ্ধ হয়তো ওকে টানছে না, কিন্তু উপন্যাসের মানবিক টানাপোড়েন তো টানবেই! আমি ওর হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরে বললাম, "যুদ্ধের চেয়েও বড় হলো মানুষের হৃদয়, জেসমিন। তলস্তয় যেন বলতে চেয়েছেন ইতিহাসের পাতায় হয়তো বড় বড় হরফে রাজা-বাদশাহ আর সম্রাটদের নাম লেখা থাকে, কিন্তু ইতিহাসের প্রকৃত অর্থ তাঁদের যুদ্ধজয়ে নয়, লুকিয়ে থাকে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, তাদের ভেতরের কান্না, ত্যাগ আর প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যে।" জেসমিন আমার দিকে একপলক তাকাল। ওর দৃষ্টি বিভ্রান্ত, যেন ও ভাবছে এই সন্ধ্যায় বাজার থেকে কাঁচামরিচ আনতে পাঠানো মানুষটা হঠাৎ নেপোলিয়ন আর সাধারণ মানুষ নিয়ে এত উত্তেজিত কেন। ও শুকনো গলায় বলল, "হাঁ... তা তো বটেই।"

"তুমি নাতাশা রস্তোভার নাম শুনেছ?" আমি বললাম। "আহা, নাতাশা! কী প্রাণবন্ত, চঞ্চল একটি মেয়ে। ঠিক যেন এক পশলা বসন্তের বাতাস। উপন্যাসের পাতায় নাতাশা, প্রিন্স আন্দ্রেই আর পিয়ের বেজুখভের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তলস্তয় এঁকেছেন, তা পড়লে মন কেমন করে ওঠে। মানুষ প্রেমে যেমন জীবনের সর্বোচ্চ আনন্দ পায়, তেমনি প্রেমের কারণে সে কত বড় ভুল করতে পারে, কত অনুশোচনা আর নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে পারে,তা নাতাশার চরিত্র না দেখলে বোঝা যায় না। আন্দ্রেই নাতাশাকে ভালোবাসতেন গভীর আত্মমর্যাদা দিয়ে, কিন্তু আন্দ্রেই দূরে থাকার সময় আনাতোল কুরগিন নামের এক অসৎ যুবকের মোহে পড়ে নাতাশা সর্বনাশের মুখে দাঁড়িয়েছিল। ভুল মানুষের ভালোবাসায় পড়ে মানুষ কীভাবে নিজেকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে যায়, আর তারপর সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে করতে কীভাবে পরিণত হয়,তা নাতাশার কান্নার মধ্যে তলস্তয় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।"

আমি লক্ষ্য করলাম জেসমিনের চোখ তখন আমার ওপর নয়, ঘরের দেয়াল ঘড়ির দিকে। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে সাতটা ছুঁইছুঁই।

"আর পিয়েরের কথা যদি বলি," আমি জেসমিনের মনোযোগ ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করলাম, "বিশাল ধনসম্পদের উত্তরাধিকারী হয়েও যে মানুষটা সারা জীবন জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়াল। সে বিভ্রান্ত হয়েছে, বিপথে গেছে, ভুল বিয়ে করে যন্ত্রণা পেয়েছে। শেষ পর্যন্ত ফরাসিদের হাতে বন্দি হয়ে, চরম দারিদ্র্য ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পিয়ের বুঝতে পারল জীবনের আসল আনন্দ কোথায়। রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্যে নয়, অহংকারে নয়,জীবনের আনন্দ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ায়, মানুষের কল্যাণে আর প্রেমের আত্মনিবেদনে।"

আমি থামলাম। বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললাম, "সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের চিন্তা ও মূল্যবোধ আমূল বদলে যায় জেসমিন। আন্দ্রেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার আগে বুঝতে পারেন প্রকৃত ক্ষমা আর নিঃশর্ত ভালোবাসার অর্থ। আর শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিধ্বস্ত ছাইয়ের ওপর দাঁড়িয়েও নাতাশা আর পিয়েরের নতুন সংসার শুরু হয়। পরিবার, ভালোবাসা ও মানবিক সম্পর্কই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গভীর অর্থ বহন করে,এটাই তলস্তয়ের চূড়ান্ত বার্তা। যুদ্ধ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, আর প্রেম ও পরিবার মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে।" আমার কথা শেষ হলো। আমি এক অপার্থিব তৃপ্তি নিয়ে জেসমিনের মুখের দিকে তাকালাম। আশা করেছিলাম ও হয়তো আমার এই কথার গভীরতা অনুভব করবে, হয়তো বলবে, "সত্যিই তো, জীবন তো এমনই!"

কিন্তু জেসমিন সোফা থেকে আলতো করে উঠে দাঁড়াল। আঁচলটা কোমরে ভালো করে গুঁজে নিয়ে একটা ক্লান্ত হাসি দিল।

"হাঁ, বুঝলাম। বেশ ভালো গল্প। কিন্তু এদিকে তো রাত পৌনে আটটা বেজে গেল! ফ্রিজে কালকের মুরগির মাংসটা বের করে গরম করতে হবে। আর তুমি কাল সকালে কী দিয়ে রুটি খাবে? ডাল তো শেষ। যাই, একবারে প্রেসার কুকারে ডালটা বসিয়ে দিয়ে আসি। তুমি চা-টা ঠান্ডা হওয়ার আগেই খেয়ে নাও তো, ঠান্ডা চা খেলে পেটে গ্যাস হবে।"

কথাগুলো বলেই জেসমিন এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে তরতর করে হেঁটে চলে গেল। একটু পরেই রান্নাঘর থেকে প্রেশার কুকারের সিটি বাজার ধারালো শব্দ আর খুন্তি নাড়ার পরিচিত আওয়াজ ভেসে আসতে লাগল।

আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। আমার হাতে ধরা শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য, যার প্রতিটি লাইনে মানুষের অস্তিত্বের সংকট, ঈশ্বরপ্রেম, আর জীবনের পরম সত্যের সন্ধান লেখা রয়েছে। আর আমার ঠিক পাশের ঘরেই প্রাত্যহিক জীবনের এক তুচ্ছ কিন্তু অনস্বীকার্য বাস্তবতায় মশলা কষানোর শব্দ হচ্ছে। প্রথমে এক অদ্ভুত হতাশায় মনটা ভারী হয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, জেসমিন কেন বুঝল না? কেন ও আন্দ্রেইয়ের বেদনায় একটুও আর্দ্র হলো না, কেন পিয়েরের আত্মঅন্বেষণের গভীরতা ওকে স্পর্শ করল না? তলস্তয় তো মানুষের আত্মাকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো করে লিখেছেন, তবে ও কেন শুধু ‘হাঁ, হুঁ’ করে ডাল রান্নার চিন্তায় উঠে গেল?

আমি বইটা আলতো করে বন্ধ করলাম। জানালার বাইরে তাকালাম। বৃষ্টি থেমে গেছে। জানালার ওপারে শহরের ব্যস্ত রাজপথে হেডলাইটের আলোয় ভেসে যাচ্ছে যানবাহন। কোনো এক অফিসের কেরানি হয়তো পকেট সামলে বাসে ওঠার জন্য ধস্তাধস্তি করছে; কোনো এক রিকশাচালক ভেজা জামা গায়ে প্যাডেল মেরে ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে চলেছে; আর আমারই রান্নাঘরে আমার স্ত্রী ডাল বাগার দেওয়ার জন্য পেঁয়াজ কুচিয়ে চলেছে। ঠিক এই মুহূর্তে, একটা তীব্র বিদ্যুচ্চমকের মতো আমার মাথার ভেতর তলস্তয়ের মূল দর্শনটা নতুন করে ধরা দিল। আমি নিজের মনেই এক অস্ফুট হাসি হাসলাম। আরে, আমি জেসমিনকে দোষ দিচ্ছি কেন? তলস্তয় তো তাঁর সারা উপন্যাস জুড়ে ঠিক এই কথাটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন!

ইতিহাস কোনো রোমান্টিক কল্পনার রাজ্য নয়, আর জীবনও কোনো দার্শনিক তাত্ত্বিক আলোচনার বন্দিশালা নয়। জীবন হলো প্রতিদিনের এই ডাল-ভাতের সংস্থান, প্রিয়জনের জন্য এক কাপ গরম চা এগিয়ে দেওয়া, রাতে সে কী খাবে সেই সাধারণ কিন্তু পরম মমতাময় ভাবনা। প্রিন্স আন্দ্রেই যখন নিজের সমস্ত অহংকার আর মেকি দর্শন হারিয়ে অন্তিম শয্যায় শুয়ে ছিলেন, তখন তিনি দার্শনিক বই পড়ে শান্তি পাননি; পেয়েছিলেন নাতাশার নিঃশব্দ, মমতাময়ী সেবার স্পর্শে। পিয়ের যখন প্রিজনার অফ ওয়ার হিসেবে কাদামাটি আর বরফের ওপর খালি পায়ে হেঁটে চলেছিল, তখন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল প্লাতোন কারাতায়েভ নামের এক অত্যন্ত সাধারণ, নিরক্ষর রুশ কৃষকের সহজ-সরল জীবনবোধ,যে মানুষটি দর্শন জানত না, কিন্তু জানত প্রতিবেশীকে এক টুকরো রুটি ভাগ করে কীভাবে হাসিমুখে বাঁচতে হয়।

তলস্তয়ের সেই অমর সত্য তো জেসমিন ওর অবচেতন অস্তিত্ব দিয়েই ধারণ করছে! ও হয়তো আঠারো শতকের ফরাসি আক্রমণ বোঝে না, ও হয়তো তলস্তয়ের নামও ভালো করে উচ্চারণ করতে পারবে না; কিন্তু ও বোঝে বাস্তব জীবনের যুদ্ধটা। ওর যুদ্ধটা কোনো তরবারি বা কামান দিয়ে নয়; ওর যুদ্ধ প্রতিদিনের অভাব, ক্লান্তি, অসুস্থতা আর সংসারের টানাপোড়েনের বিরুদ্ধে এক নিঃশব্দ লড়াই। আর এই লড়াইয়ের ভেতরেই ও খুঁজে নিচ্ছে ওর শান্তি,পরিবারকে খাইয়ে, ঘরটা পরিপাটি রেখে, আমার পাশে বসে চা এগিয়ে দিয়ে। ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ উপন্যাসটি পড়ার আগে আমিও হয়তো জীবনের অর্থ খুঁজতাম বড় বড় সাফল্যের মধ্যে, খ্যাতির চূড়ায়, কিংবা ভারী ভারী দার্শনিক তত্ত্বের অরণ্যে। ভাবতাম, অসাধারণ কিছু না করতে পারলে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো সার্থকতা নেই। কিন্তু তলস্তয় আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, সম্রাট নেপোলিয়ন বিশ্বজয় করতে গিয়ে ইতিহাসের এক করুণ ও হাস্যকর পুতুলে পরিণত হয়েছিলেন, আর নিজের ক্ষুদ্র পরিবারের ভেতর সাধারণ ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা পিয়ের বেজুখভ জীবনের পরম সার্থকতা খুঁজে পেয়েছিলেন। শান্তি বাইরে কোথাও নেই। শান্তি কোনো চুক্তিনামায় নেই, যুদ্ধজয়ের পতাকায় নেই। শান্তি রয়েছে জীবনের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোর ভেতরে। যুদ্ধের ময়দানে যেমন বেঁচে থাকাটাই এক অলৌকিক শান্তি, তেমনি প্রাত্যহিক জীবনের হাজারো উদ্বেগ আর ক্লান্তির মাঝে নিজের আপন মানুষের সান্নিধ্যই হলো জীবনের পরম অর্থ।

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। টেবিলের ওপর রাখা ঠাণ্ডা হয়ে আসা চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে শেষ করলাম। বইটা পরম যত্নে টেবিলের মাঝখানে তুলে রাখলাম। চামড়ার মলাটে হাত বুলিয়ে মনে মনে বললাম, "ধন্যবাদ তলস্তয়। আপনার বই আজ আমাকে শুধু উনিশ শতকের রাশিয়া দেখায়নি, আমার এই সাধারণ এক চিলতে ঘরের অসাধারণত্বকেও চিনিয়ে দিয়েছে।"

আমি ধীরপায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। রান্নাঘরে তখন তেলের ঝাঁঝালো সুবাস। জেসমিন গ্যাসের চুলার সামনে দাঁড়িয়ে কাঠের খুন্তি দিয়ে মনোযোগ সহকারে ডাল নাড়ছিল। চুলার উত্তাপে ওর মুখটা লাল হয়ে উঠেছে, কপালে চিকচিক করছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমি নিঃশব্দে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

জেসমিন চমকে আমার দিকে তাকাল। একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "তুমি এখানে এলে কেন? ধোঁয়া লাগছে তো চোখে। যাও, ওঘরে গিয়ে বসো, আর দশটা মিনিট লাগবে।"

আমি কোনো কথা বললাম না। ওর হাত থেকে খুন্তিটা আলতো করে নিজের হাতে নিলাম। তারপর আমার অন্য হাত দিয়ে ওর কপালের ভেজা চুলগুলো পরম মমতায় সরিয়ে দিলাম। জেসমিন অবাক চোখে আমার দিকে চাইল। ওর সেই অবাক চোখের গভীরে আমি তলস্তয়ের সেই অসীম আকাশের চেয়েও গভীর, শান্ত এক প্রসন্নতা দেখতে পেলাম।

"ডালটা কি আমি একটু নেড়ে দেব?" মৃদু হেসে আমি জিজ্ঞেস করলাম। জেসমিনের ঠোঁটের কোণে একরাশ ক্লান্তি মুছে গিয়ে ফুটে উঠল এক অপার্থিব, নিখাদ হাসি।

বাইরে হয়তো পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে মানুষ ক্ষমতার লোভে একে অপরকে হত্যা করছে, যুদ্ধের দামামা বাজছে, ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে রক্ত আর অশ্রু দিয়ে। কিন্তু এই ক্ষুদ্র রান্নাঘরের হলুদ আলোর নিচে, এই এক চিলতে ভালোবাসার আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো,আমি আমার জীবনের ‘ওয়ার’ পেরিয়ে এক অনন্ত ‘পিস’ বা শান্তির উপকূলে এসে পৌঁছেছি। তলস্তয়ের মহাকাব্য আর আমার জীবন যেন এক বিন্দুতে এসে মিলে গেছে।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login