ইভান: “ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ নিয়ে একটা রিপোর্ট পড়লাম। অনেকটা রাগ হচ্ছিল। কিন্তু রাগের নিচে একটা অসহায়ত্বও আছে।”
এস্তেজা: “সার্ভিস চার্জ? মানে?”
ইভান: “আসলে ব্যাপারটা শুধু সার্ভিস চার্জ না। এটা পুরো এক ধরনের রাজনৈতিক অর্থনীতি। যেখানে ক্ষমতাবানরা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়, আর সেই ঋণের গর্ত ভরে সাধারণ মানুষ—তুমি-আমি—নগদ টাকায়।”
এস্তেজা: “শুরু থেকে বলো। আমি শুনছি।”
ইভান: “বাংলাদেশে ব্যবসা করতে করতে কেউ রাজনীতিতে ঢোকে না; বরং রাজনীতিতে ঢুকেই ব্যবসা শুরু করে। কারণ রাজনীতি এখানে লাইসেন্স আর ব্যাংক তার মূলধন।”
এস্তেজা: “মানে রাজনীতি হলো প্রবেশদ্বার, ব্যবসা হলো ভিতরের ঘর।”
ইভান: “ঠিক তাই। আর ব্যাংক হলো সেই ঘরের ভল্ট।” “ধরো, একজন রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ব্যক্তি ধরলো ব্যাংককে। বলল— একটি বিশেষ প্রকল্প আছে’। সে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিলো। দেখাতে হলো—কারখানা বানাবে, কর্মসংস্থান করবে, রপ্তানি বাড়াবে।”
এস্তেজা: “কিন্তু বাস্তবে?”
ইভান: “বাস্তবে সেই টাকার— কিছু যায় জমিতে, কিছু বাড়িতে, কিছু বিদেশে, আর কিছু দিয়ে ‘ব্যবস্থা’ হয়”। “বাংলাদেশে ঋণখেলাপি হওয়া অনেক সময় লাভজনক। কারণ—
→ ঋণখেলাপি হলেই সুদ কমে
→ তারপর ব্যাংক সময় বাড়ায়
→ তারপর পুনঃতফসিল দেয়
→ এরপর আবার নতুন ঋণও দেয়”
এস্তেজা: “কিন্তু বিদেশে তো ঋণখেলাপি হলে কর্কশ ব্যবস্থা। এখানে উল্টো?”
ইভান: “কারণ বিদেশে রাজনীতি ব্যাংকের কাছে যায় না। এখানে ব্যাংক যায় রাজনীতির কাছে।”
এস্তেজা: “আচ্ছা ইভান, তাহলে যারা টাকা নেয় তারা তো ফেরায় না। কিন্তু গর্ত ভরছে কে?”
ইভান: “আমরা। যারা ব্যাংকে টাকা রাখি। যারা লেনদেন করি। যারা সার্ভিস চার্জ দিই।”
এস্তেজা: “আমি কি একটু স্পষ্টভাবে শুনতে পারি?”
ইভান: “ধরো দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে ৬ কোটি। এখন যদি প্রতিটি অ্যাকাউন্ট থেকে— ২০ টাকা সার্ভিস চার্জ, ১০ টাকা কার্ড চার্জ, ৫ টাকা স্লিপ চার্জ, ১০ টাকা এসএমএস চার্জ, এভাবে কেটে নেয়া হলো। তখন মাসে দাঁড়াবে— (২০+১০+৫+১০) = ৪৫ টাকা × ৬ কোটি = ২৭০ কোটি টাকা প্রতি মাসে। বছরে = ৩২৪০ কোটি টাকা। এই টাকা কি ব্যাংকের লাভ? না। এই টাকা সেই গর্ত ভরছে যেটা তৈরি করেছে ঋণ খেলাপীরা।
এস্তেজা: “মানে ১০ টাকা ২০ টাকা করে সাধারণ মানুষ শোধ দিচ্ছে অন্য কারো ৫০০-১০০০ কোটি টাকার ঋণ।”
ইভান: “আমরা অর্থনৈতিকভাবে শোষিত হচ্ছি, কিন্তু কেউ আক্রমণ টেরও পাচ্ছে না।”
এস্তেজা: “বাংলাদেশের মানুষ তো খুব বাস্তববাদী। তাহলে এটা তারা টের পায় না কেন?”
ইভান: “দুটি কারণে— এক: টাকাটা ছোট। ৫ টাকা, ১০ টাকা। মানুষ ভাবে—‘ঠিক আছে’। দুই: মানুষ ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখে না। ব্যাংক জানে—মানুষ ছোট টাকায় রাগ করবে না। কিন্তু ছোট টাকা মিলেই হয়ে যায় বড় অর্থনৈতিক শোষণ।”
এস্তেজা: “সবাই তো শুধু সঞ্চয় করে না। কেউ কেউ ব্যবসাও করে। সেখানে প্রভাব?”
ইভান: “ব্যবসাতেও একই। ধরো তুমি উদ্যোক্তা হতে চাও। ব্যাংকে গেলে বলবে—
→ জমানত দাও
→ গ্যারান্টি দাও
→ হাই ডিপোজিট রাখো
→ কাগজ দেখাও
আর রাজনৈতিক ব্যবসায়ী গেলেই বলবে—
→ ‘সময় নষ্ট করবেন না, ওনার টাকা ছাড়ুন।’
তারপর যখন একই ব্যাংক ক্ষতি সামলাতে চায়, তখন তারা সুদ বাড়ায়, ফি বাড়ায়, সেবা কমায়—যেটা উদ্যোক্তার ওপর চাপ।”
এস্তেজা: “মানে নতুন ব্যবসা জন্মানোর আগেই মারা যায়।”
ইভান: “হ্যাঁ। দেশে ব্যবসা করতে গেলে পুঁজি নয়, সম্পর্ক লাগে। পুঁজি পরে আসে।”
এস্তেজা: “ইভান, ব্যাংক কি ভয় পায় না? এই সব ঋণ তো ব্যাংককেই ডুবাবে।”
ইভান: “না, কারণ ব্যাংক জানে—রাষ্ট্র তাদের বেইল-আউট করবে।”
এস্তেজা: “বেইল-আউট মানে সরকার টাকা দেবে?”
ইভান: “হ্যাঁ। আর সরকারের টাকা মানে—
→ করদাতাদের টাকা
→ জনগণের টাকা
→ হিসাবের বাইরে টাকাও”
এস্তেজা: “মানে রাষ্ট্র ঋণখেলাপিদের ভুল ঢাকতে জনগণের টাকা ব্যবহার করে।”
ইভান: “হ্যাঁ।”
এস্তেজা: “রাজনীতি নিয়ে মানুষ চিৎকার করে, ধর্ম নিয়ে ঝগড়া করে কিন্তু অর্থনীতির কথা খুব কম বলে। কেন?”
ইভান: “কারণ অর্থনীতি চোখে দেখা যায় না। এটা রক্তচাপের মতো—চাপ বাড়ে, মানুষ টেরও পায় না।”
এস্তেজা: “তোমার এসব ব্যাখ্যা শুনলে মনে হয় তুমি শুধু দেশের জন্যই কষ্ট পাও না। মানুষের জন্যও পাও।”
ইভান: “আমি শুধু চাই, আমার দেশের মানুষ যেন অযথা টাকা না দেয় এমন ঋণের জন্য যা তারা নেয়নি।”
এস্তেজা: “ইভান, তুমি যখন এসব বলো, তখন আমার মনে হয় তোমার কথা কেউ না কেউ শোনার প্রয়োজন আছে।”
ইভান: “তুমি আছো।”