জাবিরের ঘরের দক্ষিণ দিকের জানালার পাশটা সবসময়ই একটু অন্যরকম। সেই টেবিলে পদার্থবিজ্ঞান আর ভূগোলের মোটা বইগুলোর ভিড়ে রাখা থাকে পুরনো একখানা পিতলের গোলক, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় বলে সেলেস্টিয়াল গ্লোব। আর তার পাশেই রাখা বাবার পুরনো আমলের লাল মলাটের একটা ডায়েরি। সেই ডায়েরির পাতায় পাতায় আঁকা আছে বারোটি রাশির সংকেত-মেষ থেকে মীন, আর গ্রহদের অদ্ভুত সব গাণিতিক হিসাব।
জাবির পড়ে ক্লাস নাইনে। বয়স পনেরো পেরিয়েছে কিছুদিন হলো। স্কুলের বন্ধুরা যখন বিকেলে মাঠে ফুটবল নিয়ে কাড়াকাড়ি করে, জাবির তখন প্রায়ই বসে থাকে বইয়ের পাতার আঁকিবুঁকি নিয়ে। ওর মাথায় ঘুরপাক খায় সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্র, লগ্ন আর রাশিপথের জটিল সব জাল। প্রাচীন বৈদিক জ্যোতিষ থেকে শুরু করে গ্রিক অ্যাস্ট্রোলজির ইতিহাস কোনো কিছুই ওর চোখ এড়ায় না। জাবিরের কাছে এটা কোনো অলৌকিক ভেলকিবাজি নয়, বরং মহাবিশ্বের আলো আর সময়ের অদ্ভুত এক ছন্দ। তবে সমস্যা হলো, কেউ ওর এই শখকে সহজভাবে নিতে চায় না। ওর প্রিয় বন্ধু রাতুল প্রায়ই হাসাহাসি করে বলে, "দোস্ত, তুই কি শেষমেশ ফুটপাতে টিয়া পাখি নিয়ে বসবি নাকি? হাত দেখে বলবি বাবাজি, আপনার শনির দশা চলছে!" জাবির শান্ত গলায় উত্তর দিত, "জ্যোতিষ মানে কুসংস্কার নয় রে রাতুল। প্রাচীনকালে মানুষ আকাশ দেখেই ঋতু বদল বুঝত, বীজ বোনার সময় ঠিক করত। আকাশ আর মাটির সম্পর্কটা অনেক গভীর। আমি ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার দাবি করি না, আমি শুধু বোঝার চেষ্টা করি সময় আর মানুষের মেজাজের কোনো যোগসূত্র আছে কি না।"
রাতুল হাত নাড়িয়ে বলত, "থাক তোর দর্শন! তুই বরং অঙ্ক ক্লাসের হোমওয়ার্কটা বের কর।"জাবিরের শখটা আরও গাঢ় হয়েছিল ওর দাদু অধ্যাপক এনামুল হকের কারণে। দাদু ছিলেন একাধারে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক এবং প্রাচীন পাণ্ডুলিপির সংগ্রাহক। গত বছর মারা যাওয়ার আগে তিনি জাবিরকে একটি পুরনো চার্ট আর ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে বলেছিলেন, "দাদুভাই, নক্ষত্র কাউকে ভাগ্য লিখে দেয় না, কিন্তু নক্ষত্রের অবস্থান মানুষকে বুঝতে শেখায় যে আমরা এই অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের কত ক্ষুদ্র এক কণা। চোখ খুলে দেখতে জানলে আকাশের প্রতিটি বিন্দুতেই একটা করে গল্প খুঁজে পাবি।" সেই থেকে জাবির প্রতিদিনকার ঘটনা, বন্ধুদের স্বভাব আর গ্রহের গতিবিধির মধ্যে একটা যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করে। তবে ওর এই শখটা এত দিন সীমাবদ্ধ ছিল কেবল নোটবুকের পাতাতেই। স্কুলের কেউ সেটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাত না।
কিন্তু ঘটনাটা মোড় নিল ঠিক পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে। স্কুলের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ। নবম শ্রেণি খেলবে দশম শ্রেণির সঙ্গে। নবম শ্রেণির অধিনায়ক সানি ভীষণ খিটখিটে মেজাজের ছেলে। টস করার ঠিক আগের দিন সে এসে জাবিরের টেবিলে ধপাস করে বসল। "শোন জাবির, তুই তো রাশি-নক্ষত্র নিয়ে গবেষণা করিস। দশম শ্রেণির কাপ্তান ফারহানের জন্মতারিখ আর সময় আমি জোগাড় করেছি। তুই একটু দেখে বল তো, কালকে ওদের দুর্বলতা কী হতে পারে? আর কালকের দিনটা আমাদের কেমন যাবে?" জাবির চমকে উঠল। ও একটু ইতস্তত করে বলল, "সানি, অ্যাস্ট্রোলজি কোনো ক্রিকেট ম্যাচের স্কোরবোর্ড নয় যে আমি বলে দেব কে কত রান করবে। এটা কেবল একটা সম্ভাব্য পরিবেশের ইঙ্গিত দিতে পারে।"
"তুই অত পকপক করিস না! কাল ম্যাচ জিতলে তোকে নতুন একটা দূরবীন কিনে দেব। বল, ফারহানের কী হতে পারে?" সানি তাড়া দিল। জাবির নিজের লাল খাতাটা খুলল। ফারহানের জন্মছকটা ও আগেই এক কৌতূহলী মুহূর্তে খসড়া করে রেখেছিল। গ্রহের ট্রানজিট মেলাতে গিয়ে ও দেখল, পরদিন মঙ্গলের অবস্থানে ফারহানের মানসিক অস্থিরতা খুব বেশি থাকার কথা। ও খুব দ্রুত ধৈর্য হারাবে, বিশেষ করে যদি ওকে কেউ একটানা অফ-স্টাম্পের বাইরে বল করে। জাবির সানিকে বলল, "ফারহান কাল প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী থাকবে, কিন্তু ওই আত্মবিশ্বাসটাই ওর কাল হতে পারে। ওকে যদি শুরুতেই বাউন্সার বা বিভ্রান্তিকর বল না দিয়ে আস্তে আস্তে ধৈর্য পরীক্ষা নেওয়া যায়, ও নিজেই ভুল শট খেলে আউট হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, আমাদের উইকেটকিপার শুভর কাল মনঃসংযোগ খুব কম থাকবে, ওর হাত থেকে ক্যাচ ফসকাতে পারে।"
পরদিন মাঠে সত্যি সত্যিই অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। দশম শ্রেণি দারুণ ব্যাট করছিল। ফারহান ক্রিজে এসে প্রথম দুই ওভারে তিনটে বাউন্ডারি হাঁকাল। সানি তখন বোলারকে ইশারা করল জাবিরের কথা অনুযায়ী ফিল্ডিং সাজিয়ে অফ-স্টাম্পের বাইরে ধীরগতির বল ফেলতে। চতুর্থ ওভারে ফারহান ধৈর্য হারিয়ে কভার ড্রাইভ করতে গিয়ে সোজা ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ তুলে দিল। সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ল। কিন্তু খেলা যখন একেবারে শেষ প্রান্তে, তখন দশম শ্রেণির শেষ উইকেট পতনের মুখে শুভর হাত থেকে সত্যি সত্যিই একটা সহজ ক্যাচ ফস্কে গেল! যদিও শেষ পর্যন্ত নবম শ্রেণি তিন রানে জিতেছিল, কিন্তু ক্লাসের ছেলেদের নজর পড়ল জাবিরের ওপর। রাতুল হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বলল, "তুই তো জাদু জানিস রে জাবির! ফারহানের আউট আর শুভর ক্যাচ ড্রপ—দুটোই মিলে গেল কীভাবে?"
জাবির মুচকি হেসে বলল, "জাদু না রে, এটা জাস্ট প্রোবাবিলিটি বা সম্ভাব্যতা আর মানুষের স্বভাবের বিশ্লেষণ। তুই গ্রহ ভাবছিস, আমি ভাবছি মানুষের সাইকোলজি।" কিন্তু স্কুলপড়ুয়া কিশোরদের মন কি আর অত জটিল বিজ্ঞান বোঝে? দেখতে দেখতে স্কুলে খবর রটে গেল, নবম শ্রেণির জাবির এক অদ্ভুত গণক, সে হাত না দেখেই বলে দিতে পারে কার ভাগ্যে কী আছে! পরের কয়েকটা দিন জাবিরের জন্য এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। টিফিনের সময় ওর টেবিলের সামনে ভিড় জমতে লাগল। কেউ এসে বলছে, "জাবির, পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় স্যার কি কঠিন প্রশ্ন করবেন?"
কেউ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে দশ টাকার নোট এগিয়ে দিয়ে বলছে, "ভাই, আমার বাড়ি থেকে কি আমাকে নতুন সাইকেলটা কিনে দেবে? একটু নক্ষত্র দেখে বলে দে না!" এমনকি ক্লাসের সবচেয়ে শান্ত মেয়ে অনুসূয়া এসে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করল, "আমার হারিয়ে যাওয়া রূপার আংটিটা কি আর পাওয়া যাবে?" জাবির হাতজোড় করে বোঝানোর চেষ্টা করল, "তোমরা ভুল বুঝছ! আমি কোনো জ্যোতিষী নই, ভবিষ্যৎ বলতে পারি না। এগুলো সাধারণ ঘটনা, এর সাথে গ্রহের সম্পর্ক তোমরা যেভাবে ভাবছ সেভাবে নেই।" কিন্তু কে শোনে কার কথা! গুজব বাতাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। আর এই গুজবের বাতাস গিয়ে লাগল প্রধান শিক্ষক মোতাহের হোসেন স্যারের কানে।মোতাহের স্যার স্কুলের সবচেয়ে কড়া মানুষ। বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তিনি কুসংস্কারকে একদম সহ্য করতে পারেন না। জাবিরের এই "গণকগিরি"-র খবর পেয়ে তিনি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। টিফিন পিরিয়ড শেষ হতেই বেয়ারার মাধ্যমে ডাক পড়ল জাবিরের। হেডস্যারের ঘরে যখন জাবির ঢুকল, ওর বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছিল। ঘরের ভেতর মোতাহের স্যার চশমার ফাঁক দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালেন। টেবিলের ওপর রাখা জাবিরের লাল ডায়েরিটা, যেটা একটু আগেই কোনো এক অতি-উৎসাহী সহপাঠী স্যারের কাছে জমা দিয়ে এসেছে।
"তোমার নাম জাবির বিন ইকবাল?" স্যারের গম্ভীর কণ্ঠস্বর কাঁপন ধরাল।
"জি, স্যার।"
"তুমি এই স্কুলে পড়তে এসেছ, নাকি তুকতাক আর কুসংস্কারের ব্যবসা খুলতে এসেছ? আমি শুনলাম তুমি নাকি ক্লাসের ছেলেদের ভাগ্য বলে দিচ্ছ? আর কয়েকদিন পর কি তাবিজ-কবচ বিক্রি শুরু করবে?"
জাবিরের আত্মসম্মানে ঘা লাগল। ও মাথা নিচু করে বলল, "না স্যার, আমি কোনো ব্যবসা করছি না। আর আমি তাবিজ বা অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাসও করি না।" "তাহলে এই খাতায় এসব কী?" স্যার ডায়েরির পাতা ওল্টালেন। সেখানে গ্রহের কোণ, অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ আর লগ্নের হিসাব কষা ছিল জাবির সাহস সঞ্চয় করে বলল, "স্যার, এটা জ্যোতির্বিজ্ঞান আর প্রাচীন ভারতীয় ও ব্যবিলনীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের তুলনামূলক অধ্যয়ন। আমি শুধু বুঝতে চাইছিলাম প্রাচীন মানুষ কীভাবে মহাজাগতিক বস্তুর গতিবিধির সাথে পৃথিবীর আবহাওয়া এবং মানুষের জৈব-ছন্দের তুলনা করত। যাকে আমরা সারকাডিয়ান রিদম বলি, তার ওপর কি চাঁদের কোনো প্রভাব আছে? আমি শুধু ডেটা অ্যানালাইসিস করছিলাম। কিন্তু ক্লাসের ছেলেরা ভুল বুঝে আমাকে ভবিষ্যৎবক্তা বানিয়ে দিয়েছে।" মোতাহের স্যার ভুরু কুঁচকে তাকালেন। তিনি আশা করেছিলেন ছেলেটি কান্নাকাটি করবে অথবা ক্ষমা চাইবে। কিন্তু জাবিরের মুখে ‘সারকাডিয়ান রিদম’ আর ‘ডেটা অ্যানালাইসিস’ শুনে তিনি একটু থমকালেন। স্যার খাতাটা বন্ধ করে বললেন, "তুমি বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে কুসংস্কার ঢাকতে পারো না। তোমার এই শখ যদি বিজ্ঞানই হয়, তবে কাল সায়েন্স ক্লাবের সেমিনারে পুরো স্কুলের সামনে তোমাকে প্রমাণ করতে হবে। তোমাকে দশ মিনিট সময় দেওয়া হবে। তুমি বলবে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষের মধ্যে সীমারেখা কোথায়। যদি প্রমাণ করতে পারো তোমার উদ্দেশ্য খাঁটি বিজ্ঞানচর্চা, তবে ঠিক আছে। আর যদি দেখি তুমি কুসংস্কার ছড়াচ্ছ, তবে তোমার অভিভাবককে ডেকে টিসি দিয়ে স্কুল থেকে বের করে দেব। মনে থাকবে?"
"জি স্যার। আমি বলব।" জাবির দৃঢ় গলায় উত্তর দিল, যদিও ওর ভেতরে তখন ঝড় বইছিল।
সেই রাতে জাবির এক ফোঁটাও ঘুমাল না। ওর পুরো শখ, ওর পড়াশোনা আর ওর সম্মান এখন এক সুতোয় ঝুলছে। ও বাবার আলমারি থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্লাসিক বইগুলো নামাল-কার্ল সাগানের বই, আর্যভট্টের সিদ্ধান্ত আর আধুনিক ক্রোনোবায়োলজির কিছু গবেষণাপত্র। ও একটা চার্ট তৈরি করল। পরদিন স্কুলের অডিটোরিয়ামে তিল ধারণের জায়গা নেই। সব ক্লাসের ছাত্রছাত্রী উপস্থিত, সামনে বসে আছেন শিক্ষকরা। প্রধান শিক্ষক মোতাহের স্যার মঞ্চে উঠে বললেন, "আমাদের স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র জাবির নাকি গ্রহ-নক্ষত্র দেখে মানুষের ভাগ্য বলে দিতে পারে। বিজ্ঞানের যুগে এই ধরণের চর্চা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা আজ জাবির নিজেই আমাদের সামনে ব্যাখ্যা করবে।" মাইকের সামনে এসে দাঁড়াল জাবির। ওর হাত একটু কাঁপছিল, কিন্তু বন্ধুদের মুখের কৌতূহল আর মোতাহের স্যারের চ্যালেঞ্জিং দৃষ্টি দেখে ও নিজেকে সামলে নিল।
জাবির শুরু করল শান্ত কিন্তু স্পষ্ট গলায়। "উপস্থিত শিক্ষক এবং আমার সহপাঠী বন্ধুরা, প্রথমেই আমি একটা বিভ্রান্তি দূর করতে চাই। আমি কোনো জ্যোতিষী নই, এবং আমি বিশ্বাস করি মানুষের ভবিষ্যৎ আগে থেকে কোনো পাথরে খোদাই করা থাকে না। মানুষের কর্ম, চেষ্টা আর ইচ্ছাশক্তিই তার ভবিষ্যৎ গড়ে।" পুরো অডিটোরিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সানি আর রাতুল পেছন থেকে অবাক হয়ে শুনছিল। জাবির বোর্ডে দুটো বৃত্ত আঁকল। একটাতে লিখল 'অ্যাস্ট্রোনমি' বা জ্যোতির্বিজ্ঞান, আরেকটাতে লিখল 'অ্যাস্ট্রোলজি' বা জ্যোতিষ। "প্রাচীনকালে," জাবির বলতে লাগল, "এই দুটো বিষয়ের জন্ম হয়েছিল একই সাথে। প্রাচীন মানুষ যখন আকাশের দিকে তাকাত, তারা দেখত সূর্যের উদয়-অস্ত, চাঁদের হ্রাস-বৃদ্ধি আর ঋতু পরিবর্তন। তারা বুঝতে পারল আকাশের নিয়মের সাথে পৃথিবীর জীবনের একটা ছন্দ জড়িয়ে আছে। পূর্ণিমায় সমুদ্রে জোয়ার আসে, আবার অমাবস্যায় ভাটার টান বাড়ে। যদি চাঁদ এত বিশাল সমুদ্রকে নাড়িয়ে দিতে পারে, তবে আমাদের শরীর—যা সত্তুর শতাংশ জলে তৈরি—তার ওপরও কি কোনো সূক্ষ্ম প্রভাব পড়ে না? আধুনিক বায়োলজিও এখন স্বীকার করে যে বহু প্রাণীর প্রজনন ও আচরণ চাঁদের চক্রের সাথে যুক্ত।"
শিক্ষকদের মুখমণ্ডলে আগ্রহের ছাপ ফুটে উঠল। জাবির এগিয়ে গিয়ে বলল, "কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হলো তখন, যখন মানুষ পর্যবেক্ষণ ছেড়ে অলৌকিক বিশ্বাসে গা ভাসিয়ে দিল। জ্যোতিষশাস্ত্রের মূল ভিত্তি ছিল মহাজাগতিক সময়ের হিসাব। কিন্তু কিছু মানুষ একে বানিয়ে ফেলল ভাগ্যের খেলা। পাথর পরলে ভাগ্য বদলায়, হাত দেখালে লটারি জেতা যায়—এগুলো সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং কুসংস্কার। নক্ষত্ররা আমাদের থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে। তাদের গ্র্যাভিটেশনাল টান আমাদের ওপর এতই ক্ষীণ যে একজন ডাক্তারের টেবিলের টানও তার চেয়ে বেশি হতে পারে।"
"তাহলে তুমি কেন এটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করো?" পেছনের সারি থেকে এক সিনিয়র ছাত্র প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। জাবির হাসল। "আমি এটা নিয়ে কাজ করি কারণ এটা ইতিহাসের এক বিশাল দলিল। মানুষ কীভাবে মহাবিশ্বকে বুঝতে চেয়েছিল, তার গল্প লুকিয়ে আছে এই রাশিপথ আর সংকেতের মধ্যে। আমার কাছে এটা একটা প্যাটার্ন স্টাডি। মানুষের স্বভাব, সাইকোলজি আর সময়ের সম্পর্কের এক ধরনের তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ। ফারহানের আউট হওয়া বা শুভর ক্যাচ মিস করা কোনোটাই কোনো নক্ষত্রের অভিশাপ ছিল না। ওটা ছিল স্রেফ মানুষের স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক চাপের সময়টাকে আন্দাজ করার একটা চেষ্টা। আমি গণক নই, আমি একজন কৌতূহলী শিক্ষার্থী যে আকাশের ভাষাটাকে বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে পড়তে চায়, অন্ধবিশ্বাসের চোখ দিয়ে নয়।"
জাবির ওর বক্তব্য শেষ করল কার্ল সাগানের একটা বিখ্যাত উদ্ধৃতি দিয়ে-"আমরা সবাই আসলে নক্ষত্রের ধূলিকণা দিয়ে তৈরি। তাই আকাশের দিকে তাকানো মানে নিজের উৎসের দিকেই ফিরে তাকানো।"
বক্তব্য শেষ হতেই পুরো অডিটোরিয়ামে কয়েক মুহূর্তের পিনপতন নীরবতা। তারপর হঠাৎ করেই সামনের সারি থেকে একজন উঠে দাঁড়িয়ে তালি বাজাতে শুরু করলেন। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং মোতাহের স্যার। স্যারের তালির শব্দে পুরো হলরুম ফেটে পড়ল করতালিতে। সানি আর রাতুল পিছন থেকে চিৎকার করে সিটি বাজিয়ে উঠল। মোতাহের স্যার মঞ্চে উঠে এসে জাবিরের পিঠে হাত রাখলেন। মাইক্রোফোন নিয়ে বললেন, "আমি ভেবেছিলাম আমাদের স্কুলে কোনো ভণ্ড জ্যোতিষীর জন্ম হচ্ছে। কিন্তু আজ আমি দেখলাম, আমাদের স্কুলে একজন তরুণ গবেষক তৈরি হচ্ছে। যে ছেলে অন্ধবিশ্বাসকে প্রশ্রয় না দিয়ে প্রাচীন ধারণাকে আধুনিক বিজ্ঞানের নিক্তিতে মাপতে জানে, তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। জাবির, তোমার ডায়েরিটা আমি কাল রাতে পড়েছি। তোমার গাণিতিক হিসাবগুলো নির্ভুল। তুমি বরং আমাদের স্কুলের সায়েন্স ক্লাবের অ্যাস্ট্রোনমি উইংয়ের দায়িত্ব নাও। আগামী মাসে আমরা একটা টেলিস্কোপ কিনব, সেটার দেখভালের ভার তোমার।" জাবিরের চোখে জল এসে গেল। ও মাথা নিচু করে স্যারকে সালাম করল। সেদিন বিকেলে যখন স্কুল ছুটি হলো, সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। স্কুল মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল জাবির, রাতুল আর সানি রাতুল জাবিরের কাঁধে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, "দোস্ত, তুই তো পুরো হিরো হয়ে গেলি রে! হেডস্যার তোকে টেলিস্কোপের দায়িত্ব দিয়ে দিল!"
সানি একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, "তার মানে তুই আর আমাদের হাত দেখে দিবি না?"
জাবির খিলখিল করে হেসে উঠল। ও পশ্চিমের রক্তিম আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, "হাতে কোনো ভাগ্য লেখা থাকে না রে সানি। ভাগ্য থাকে আমাদের মাথায় আর পরিশ্রমে। তবে হ্যাঁ, আজ রাতে আকাশ একদম পরিষ্কার থাকবে। বৃহস্পতি গ্রহ আর তার চারটে চাঁদ আজ খুব স্পষ্ট দেখা যাবে। তোরা যদি দেখতে চাস, আমার ছাদে আসতে পারিস।"
"অবশ্যই যাব!" রাতুল আর সানি একসাথে বলে উঠল।বিকেলের মিঠে বাতাসে দাঁড়িয়ে জাবির আকাশের দিকে তাকাল। যে আকাশকে এতদিন ও দূর থেকে দেখেছে, আজ যেন সেই আকাশ ওর আরও অনেক কাছে নেমে এসেছে। কোনো ভয় নেই, কোনো ভণ্ডামি নেই, সেখানে শুধু জ্বলজ্বল করছে অনন্ত জ্ঞান আর সত্যের আলো।