প্রপোজ ডে তে ভালোবাসার কথা জানাতে গিয়ে শুনে এসেছিলাম, “আজ আপনি ভালোবাসলেন, আমার সাথে হাসলেন, হাটলেন, খেলেন, গল্প করলেন, তারপর বিয়েসাদি করলেন। এই আপনার উদ্দেশ্য? এরপর কী? এই তো সবাই করে!”
চিত্রনায়ক রিয়াজ আমার জায়গায় থাকলে হয়ত নিজের ডিফেন্ডে অনেক কথাই বলতে পারতো। আমি কিছুই বলতে পারিনি। আমি অতটা চালাক নই, আমার বুদ্ধি তেমন তীক্ষ্ণও নয়।
অনুপমার সেদিনের প্রশ্নগুলো আমাকে আবার ভাবতে বাধ্য করে- কেন আমি অনুপমাকে ভালোবাসি আর তাকে নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমি অনুভব করি, ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, বুদ্ধিমত্তা ও স্থিতিশীলতা দাবি করে। আমি এটাও ভাবার অবকাশ পাইনি যে, অনুপমা এভাবে বলার কারণ কি আমাকে অপছন্দ করা?
এরপর আমি শুধু ভালোবাসার বই পড়েছি। শরৎ পড়েছি, রবীন্দ্রনাথ পড়েছি, বুদ্ধদেব পড়েছি, হুয়ায়ুন, ফাল্গুনী, মুজতবা, মিলন কোনোটাই বাদ দেইনি। সবার মধ্যে আমি অনুপমার উত্তর খুঁজেছি আপন শিদ্দাত অনুযায়ী। কিন্তু কারো উত্তর অনুপমার প্রশ্নের সাথে মিলছে না!
আমার চলন্ত ট্রেন পছন্দ। ট্রেনে চড়ার চেয়ে চলন্ত ট্রেনের গতি আর চারপাশ রাঙিয়ে অবিরত ছুটে যাবার অভ্যাসটা ভীষণ টানে। ঝিক ঝিক শব্দটা অনেকক্ষণ ঘোর তোলে রাখে আমার ব্রেনে; এতে যা উপকার হয়- কিছুক্ষণ অনুপমার প্রশ্নটা থেকে মুক্তি পাই।
মাঘের শেষে মৃদু বাতাসের বিকেলে আঁকাবাঁকা রেলপথ ধরে হাটতে হাটতে স্টেশন পৌঁছে গেলাম। হাতে এক মুঠো বাদাম আর মুখে অবিরল মটমট শব্দ।
কখনও ভাবছি দেশ নিয়ে, কখনও নির্বাচন, কখনও অনুপমা, কখনও পরিবেশ, কখনও হলাম বিপ্লবী; এমন ভাবনার কোনো এক ফিতার কোণ ধরে চোখ পড়ল প্লাটফর্ম থেকে রেললাইন ধরে এগিয়ে যাওয়া, বগলে ক্রাচ ধরে খুঁড়িয়ে চলা এক বৃদ্ধের দিকে। ঘাড়ে তার তুলনামূলক ভারী ব্যাগ, অপরিচ্ছন্ন। রেললাইনের নিথর কোণাকার পাথর আর কংক্রিটের স্লিপার্সে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে উল্টানো গামলার মতো পড়ে গিয়ে বিব্রত।
শ-মিটার দূর থেকেও বৃদ্ধটি আমার কাছে দৃশ্যমান। তার পাশ ঘিরেই লোক আসছে, যাচ্ছে, কেউ হাঁটার ছন্দেই ফোন বের করে ক্যামেরায় গোটা দুয়েক ক্লিক করে এড়িয়ে চলে যাচ্ছে; সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে না।
আমার এই স্বল্প বুদ্ধিমত্তার চেতনাও এগিয়ে যেতে চায়নি, শুধু দূর থেকে তামাশা দেখেছে। স্টেশন মাস্টারের রুম থেকে ঘোষণা এলো, “অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকাগামী লালমনি এক্সপ্রেস ১-নং প্লাটফর্মে এসে পৌঁছুবে।”
আমি শুধু উল্টোভাবে তিন, দুই, এক করে গুনে দেখলাম বৃদ্ধটি কত নাম্বার লাইন থেকে ক্রাচে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে!
বাদাম হাতে দু-কদম এগোতেই তাড়াহুড়ারত এক মধ্যবয়সী মহিলা একটি ছেলে শিশুকে নিয়ে প্লাটফর্মের দিকে এগিয়ে আসছে। ছেলে শিশুটি কিছু না ভেবেই দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধটিকে লাইন থেকে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।
কিন্তু শিশুটির দেহে যে সেই বল নেই! মহিলাটি বার বার ঘড়ি দেখছে আর শিশুটিকে কিছু একটা বলছে যা এই দূরত্বে শ্রবণযোগ্য নয়। আমি আরেকটু এগোতেই দৃশ্য পরিষ্কার।
মহিলাটি বৃদ্ধকে তুলে আবারও দুই বগলের মধ্যে ক্রাচ দিয়ে দাঁড় করালেন এবং শিশুটির কাঁধে হাত রেখে হালকা চাপ প্রয়োগ করে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগলেন আর পেছনে ফিরে তাকালেন না।
শিশুটি পেছনে ফিরে তাকাতে চাইলে বাধা দিয়ে ট্রেনের জন্য তাগাদা দিলেন। মিনিট দুয়েক পরেই চৌদ্দটি বগির বহর নিয়ে বিশাল ট্রেনটি আমার দৃশ্যের মাঝে ঝিক ঝিক শব্দসমেত পর্দাসহ অবতারিত হলো।
সেদিনের মতো আজও আমি নীরব ছিলাম; নিস্ক্রিয়, অকর্মণ্য ও অপদার্থতার পরিচয় দিলাম; কিন্তু ঐন্দ্রজালিক দণ্ডের মতো পেয়ে গেলাম অনুপমার উত্তর।
বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই উত্তর পেয়ে যাবার পরেও অনুপমার কাছে ফিরে যাবার কোনো আসক্তিবোধ না থাকাটা বোধহয় এই আসন্ন ফাগুনের দিনে আমার জন্য প্রকৃষ্ট রায়।
#হাবিব_রহমান #অনু_গল্প