Story

আপন-পর

October 6, 2026

45 views

সোলাইমান খানের মাটির ভিটেয় যেদিন শেষ নিঃশ্বাস স্তব্ধ হলো, সেদিন কার্তিক মাসের শেষ। উঠোনের এক কোণে রাখা বাঁশের খাটিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে গাঁয়ের মাতব্বর রমিজ শিকদার তামাকের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গম্ভীর গলায় বললেন, "সোলাইমানের খেল খতম। কপাল চাপড়ানি ছাড়া আর গতি নাই। গেলো, বউডা সহ অবুঝ তিনটা ছাওয়ালের জিন্দেগি একেবারে ধংস হইয়া গেলো।" চারপাশে ঘিরে দাঁড়ানো জ্ঞাতি-গুষ্টির চোখগুলোতে তখন সহানুভূতির চেয়েও বেশি ছিল হিসাব-নিকাশের চাতুর্য। কেউ ফিসফিস করল, "হুমায়ুনটার বয়স মোটে বারো, আলমগীর নয়, আর শাহজাহানটা তো কোলের শিশু, ছয় বছরও পার হয়নি। ঘরের ভিটা ছাড়া তো সোলাইমান এক কানাকড়িও রাইখা যায় নাই। কার খাইয়া কে বাঁচাইব?"

চাচার ঘরের জেঠাতো ভাই সামসুদ্দিন ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে মেঠো সুর তুলে বলল, "চাচী আর কী করব? পোলা তিনটারে এতিমখানায় দিয়া নিজে বাপের বাড়ি ফিরা যাক। নইলে না খাইয়া মরন ছাড়া গতি নাই।" উঠোনের মাঝখানে ঘোমটা টেনে বসে থাকা রহিমা খাতুনের কানে সব কথাই পৌঁছাচ্ছিল। একেকটা কথা যেন সীসার তপ্ত গুলির মতো তাঁর বুকে বিঁধছিল। কিন্তু তাঁর চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়ল না। সোলাইমান খান তাঁর দীর্ঘ রোগভোগের দিনগুলোতে রহিমার হাত ধরে প্রায়ই বলতেন, "রহিমা, আমি গেলে দুনিয়া তোমারে ছিঁড়া খাইতে চাইব। কিন্তু আমার পোলা তিনটা যেন কারো দয়ায় হাত না পাতে। ওদের মানুষ কইরো।"

সোলাইমানের সেই ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শ রহিমা বুকের গভীরে অনুভব করলেন। তিনি মুখ তুলে তাকালেন না, কারো কথায় কানও দিলেন না। বুকের সাথে জাপটে ধরে রাখলেন ছোট শাহজাহানকে, আর দুই হাত দিয়ে আগলে নিলেন ডুকরে কাঁদতে থাকা বড় ছেলে হুমায়ুন আর মেঝ ছেলে আলমগীরকে। তিনি মনে মনে বললেন, ‘মানুষের মুখের কথায় যদি জীবন চলত, তবে খোদা দুনিয়ায় মা বানাইতেন না।’ সোলাইমান খানকে দাফন করার তিন দিনের মাথায় আপন রক্তেরা তাঁদের আসল রূপ দেখাতে শুরু করল। সোলাইমানের ছোট ভাই জব্বার এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল, "ভাবী, ভাইজান মরার আগে আমার থেইকা বিশ হাজার টাকা ধার নিছিল। ঘরের পশ্চিমের তিন কাঠা জমিটা আমারে লেইখা না দিলে আমি তো বাঁচি না।"

রহিমা শান্ত অথচ শীতল চোখে দেওরের দিকে চাইলেন। কোনো দলিল নেই, প্রমাণ নেই, শুধু ভাইয়ের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে জমি দখলের পাঁয়তারা। রহিমা আঁচল শক্ত করে কোমরে বেঁধে বললেন, "কবির, তোমার ভাই কবরে শুইয়া আছে। খোদার ঘরে হিসাবের একটা খাতা আছে। সেই খাতার কথা মনে রাইখা যদি দাবি করোস, তবে ওই ভিটা তুই কাইটা নে। কিন্তু জাইনা রাখিস, আমার পোলাপানের হকের গ্রাসে যদি হাত দিস, ওই মাটি তোর কবরে বিষ হইব।"

জব্বার থমকে গেল ঠিকই, তবে গাঁয়ের মুরব্বিদের কাছে গিয়ে রহিমার নামে কুৎসা রটাতে কার্পণ্য করল না। সে বলে বেড়াল, "বউয়ের অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না, দেখবানি কেমন কইরা তিনডা পোলা ডাঙর করে!" আপনজনদের দরজাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেল। রহিমা বুঝলেন, রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়রা কেবল সুদিনের পাখি; দুর্যোগের দিনে তারা নিজেরাই একেকটি ঘূর্ণিবাতাস হয়ে আছড়ে পড়ে।

শুরু হলো এক নারীর নিঃশব্দ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। রহিমা খাতুনের বাপের বাড়ি থেকেও তেমন কোনো বড় আশ্রয় ছিল না। এক বৃদ্ধ বিধবা মা আর দিনমজুর ভাই,তাঁদের নিজেদের পেট চালানোই দায়। রহিমা কারো কাছে হাত পাতলেন না। ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি ঘুম থেকে উঠতেন। ফজরের নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে শুধু একটিই মোনাজাত করতেন,"হে দয়াময়, আমারে শক্তি দাও। পোলা তিনটারে যেন সৎ পথে মানুষ করতে পারি।" সকাল হতেই তিনি লেগে পড়তেন কাজে। বাড়ির পেছনে এক টুকরো পতিত জমিতে শাকসবজির চাষ শুরু করলেন। পুঁইশাক, লালশাক, লাউ, আর কাঁচামরিচ। এছাড়া গ্রামের অবস্থাপন্ন গৃহস্থদের বাড়ি থেকে ধান ভানার কাজ নিলেন। ঢেঁকির ভারী শব্দে যখন নিশুতি রাত ভেঙে পড়ত, তখন রহিমার শরীরে ঘামের ধারা নামত। পায়ের গোড়ালি ফেটে রক্ত বের হতো, হাতের তালুতে পড়ে যেত শক্ত কড়া। কিন্তু ক্লান্তি বলে কোনো শব্দ তাঁর অভিধানে ছিল না।

সবচেয়ে বড় বোঝা ছিল তিন ছেলের পড়াশোনা। গাঁয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার মোজাম্মেল সাহেব একদিন বাজারে হুমায়ুনকে দেখে ডেকে বললেন, "কীরে হুমায়ুন, স্কুলে আসিস না ক্যান? বাপে নাই বইলা কি পড়াশোনা ছেড়ে দিবি?" হুমায়ুন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। পরদিনই রহিমা মাস্টার সাহেবের বাড়ি গিয়ে হাজির হলেন। আঁচলের খুঁট থেকে জমানো কয়েকটা ময়লা টাকার নোট বের করে সামনে রেখে বললেন, "মাস্টার সাব, আমার পোলাগো স্কুলে নেন। ওদের বাপের স্বপ্ন আছিল পোলাপান লেখাপড়া শিখব। আমি দিনে একবেলা খামু, তবু স্কুলের বেতন দিমু।"

মোজাম্মেল মাস্টার রহিমার মুখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তিনি টাকাটা ফেরত দিয়ে বললেন, "রহিমা, তুমি মা নও, তুমি এক জীবন্ত বটগাছ। তোমার ছেলেদের বেতন লাগবে না। ওরা স্কুলে আসবে, আমি নিজে ওদের পড়াব।" মায়ের এই অক্লান্ত পরিশ্রম ছেলেদের চোখের আড়ালে রইল না। হুমায়ুন ছিল শান্ত ও গভীর প্রকৃতির। সে বুঝত, মায়ের এক একটি ঘামের ফোঁটা তাঁদের বেঁচে থাকার অক্সিজেন। স্কুল থেকে ফিরেই সে আর খেলতে যেত না; মায়ের সাথে জমিতে নিড়ানি দিত, দূর বিল থেকে শাপলা আর কলমি শাক তুলে বাজারে নিয়ে বিক্রি করত।

আলমগীর ছিল একটু চঞ্চল, কিন্তু পড়াশোনায় তুখোড়। লণ্ঠনের টিমটিমে আলোয় বসে সে যখন সুর করে নামতা কিংবা ইংরেজি রিডিং পড়ত, রহিমা রান্নাঘরের ধোঁয়ার ভেতর থেকে চোখ মুছে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন। আর ছোট শাহজাহান মায়ের আঁচল ধরে ঘুরঘুর করত, মাঝেমধ্যে বলত, "মা, আমি বড় হইয়া তোমারে একটা বড় পাকা ঘর বানাইয়া দিমু, তোমারে আর ঢেঁকি পার দিতে দিমু না।" রহিমা ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলতেন, "আমার ঘর লাগবে না বাপ, তোরা শুধু মানুষ হ। মানুষের মতো মানুষ।"

অনাহার ছিল তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। অনেক রাতে হাঁড়িতে চাল থাকত না। রহিমা মাঠ থেকে বথুয়া শাক তুলে সামান্য লবণ দিয়ে সিদ্ধ করতেন। ছেলেদের পাতে তুলে দিয়ে বলতেন, "আজ শাক দিয়া ভাত খা বাবা, কাল তোদের জন্য চাল আনব।" ছেলেরা বুঝত, পাতে যে ভাতটুকু আছে, তা কেবল তাদের জন্যই; মায়ের জন্য হাঁড়ির তলায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। হুমায়ুন নিজের থালা থেকে অর্ধেক ভাত মায়ের পাতে তুলে দিয়ে বলত, "মা, আমার পেট ভইরা গেছে, তুমি খাও।" রহিমা মুখ ফিরিয়ে চোখের পানি লুকাতেন। এভাবেই দিন কাটতে লাগল। দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কষাঘাত তাঁদের শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করলেও আত্মার তেজকে নিভিয়ে দিতে পারল না।

সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। রহিমার ত্যাগের জমিনে একটু একটু করে ফল ধরতে শুরু করল। হুমায়ুন এসএসসি পরীক্ষায় পুরো উপজেলায় সেরা ফলাফল করল। গাঁয়ের যে রমিজ মাতব্বর একদিন বলেছিলেন "পোলাগুলার জিন্দেগি শেষ", তিনিই একদিন বাজারে দাঁড়িয়ে বললেন, "সোলাইমানের বড় পোলাডা তো জিনিয়াস! বাপের নাম রাখল।" রহিমা এসব শুনে শুধু আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানালেন। হুমায়ুন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হলো। সে বুঝতে পেরেছিল, মায়ের ওপর আর চাপ দেওয়া যাবে না। তাই সে শহরে মেসে থেকে তিন-চারটি টিউশনি শুরু করল। টিউশনির টাকা দিয়ে নিজের খরচ চালাত, আর প্রতি মাসের শুরুতে কিছু টাকা বাঁচিয়ে গোপনে মায়ের হাতে গুঁজে দিত। রহিমা সেই টাকা নিজের পেছনে এক পয়সাও খরচ করতেন না; আলমগীর আর শাহজাহানের বই-খাতা কেনার জন্য সিন্দুকে তুলে রাখতেন।

কয়েক বছর পর আলমগীরও ঢাকার নটর ডেম কলেজে সুযোগ পেল। মেধার জোরে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ভর্তি হলো। আর ছোট শাহজাহান ততদিনে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে প্রকৌশল পড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। গ্রামের মানুষ এখন আর রহিমাকে অবহেলা করতে পারে না। যে রহিমার ভিটায় ছনের ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ত, সেই ভিটায় আজ তিন দিক থেকে প্রতিভার আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তবে মানুষের ঈর্ষা বড় অদ্ভুত জিনিস। আত্মীয়রা যখন দেখল রহিমা ডুবে যায়নি, বরং তাঁর সন্তানরা মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে, তখন তাদের মনে তৈরি হলো এক গোপন বিষাদ। জব্বার চাচা এখন আর আগের মতো হাঁকডাক দেয় না, তবে সুযোগ পেলেই বিষোদ্গার করে, "শহরে গিয়া পোলাপান যদি বাপের ভিটা ভুইলা যায়, তখন বুঝব ঠেলা!"

কিন্তু রহিমার শিক্ষায় কোনো ফাঁক ছিল না। তিনি ছেলেদের কেবল পড়ালেখা শেখাননি, শিখিয়েছেন শিকড়ের টান। ছুটির দিনে ছেলেরা যখন বাড়ি আসত, মাটির ঘরে যেন ঈদের আনন্দ নেমে আসত। তিন ভাই একসাথে পুকুরে গোসল করত, মায়ের হাতের সামান্য ডাল-ভাত অমৃতের মতো খেত। হুমায়ুন ততদিনে বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছে। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে সে সোজা বাড়ি চলে এলো। মায়ের পায়ের কাছে বসে বেতনের পুরো টাকাটা তুলে দিয়ে বলল, "মা, তোমার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নাই। এইটা আমার প্রথম রোজগার।"

রহিমা কেঁদে ফেললেন। এই কান্না দুঃখের নয়, এ কান্না এক মহীয়সী মায়ের দীর্ঘ যুদ্ধের বিজয়ের আনন্দাশ্রু। এর কয়েক বছর পর আলমগীর একটি বহুজাতিক ব্যাংকে বড় পদে যোগ দিল। শাহজাহান বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করল।

সোলাইমান খানের সেই ভাঙা মাটির ভিটায় তখন পাকা দালান উঠেছে। গ্রামের মানুষ এখন এক নামে চেনে ‘খান বাড়ি’। রমিজ মাতব্বর থেকে শুরু করে গাঁয়ের চেয়ারম্যান পর্যন্ত যেকোনো সামাজিক সালিশে রহিমার ছেলেদের পরামর্শ নিতে আসে। সোলাইমান খান যেখানে নিঃস্ব হয়ে মরেছিলেন, সেখানেই তাঁর ছেলেরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করল। রহিমা খাতুন এখন আর আগের মতো কাজ করেন না। তাঁর বয়স হয়েছে, চুলে পাক ধরেছে, কপালে বয়সের রেখা। কিন্তু তাঁর চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আভিজাত্য আর শান্তির দীপ্তি। তিনি এখন আর একা নন, তিন প্রতিষ্ঠিত পুত্রের গর্বিত মা।  কিন্তু জীবনের আসল পরীক্ষা তখনও বাকি ছিল।

সংসারের নিয়ম অনুযায়ী একে একে তিন ছেলেরই বিয়ে হলো। বড় ছেলে হুমায়ুনের বিয়ে হলো এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মার্জিত মেয়ে শিরিনের সাথে। মেঝ ছেলে আলমগীর বিয়ে করল তার সহকর্মী, উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিক মানসিকতার নিপা-কে। আর ছোট ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী হলো তানিয়া, বাবার একমাত্র আদুরে কন্যা। শুরুতে সবকিছু বেশ সুন্দরই ছিল। বিয়ের পর ছেলেরা সবাই কর্মসূত্রে ঢাকায় আলাদা আলাদা ফ্ল্যাটে থাকত। গ্রামে মা একা থাকতেন। রহিমা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে চাইতেন না। তিনি বলতেন, "এই ভিটায় তোদের বাপের স্মৃতি আছে। এই মাটির সোঁদা গন্ধে আমি আমার সোলাইমানের নিঃশ্বাস পাই। তোরা শহরে ভালো থাক, আমি এইখানেই ভালো আছি।"

ছেলেরা পালা করে প্রতি মাসে গ্রামে আসত, মায়ের খোঁজখবর নিত। কিন্তু ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কের সমীকরণ জটিল হতে শুরু করল। বছর তিনেক পর রহিমার শরীরটা হঠাৎ ভেঙে পড়ল। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত পরিশ্রম আর অপুষ্টির পুরনো ছাপ এখন বার্ধক্যে এসে নানা রোগের রূপ নিল। উচ্চ রক্তচাপ, বাতের ব্যথা আর শ্বাসকষ্টে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন।

হুমায়ুন মাকে একা গ্রামে রাখা নিরাপদ মনে করল না। সে নিজে গিয়ে মাকে ঢাকায় নিজের বাসায় নিয়ে এলো। মোহাম্মদপুরের এক সুন্দর, সাজানো ফ্ল্যাটে রহিমার ঠাঁই হলো। প্রথম কয়েকটা দিন বেশ ভালোই কাটল। কিন্তু কিছুদিন যেতেই রহিমার বুঝতে বাকি রইল না যে, এই চার দেয়ালের সুরম্য খাঁচায় তিনি বড্ড বেমানান। বড় বউ শিরিন খারাপ মানুষ নয়, তবে সে অতিরিক্ত পরিপাটি আর নিজের নিয়মকানুনে অভ্যস্ত। রহিমার পানের পিক ফেলার অভ্যাস বা নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসে তসবিহ জপার সময় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলার শব্দেও সে বিরক্ত হতো। ড্রয়িংরুমে কোনো অতিথি এলে শিরিন যেন একটু ইতস্তত করত,গ্রাম্য, নিরক্ষর শাশুড়িকে আধুনিক বন্ধুদের সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে তার দ্বিধা হতো।

একদিন টেবিলে খেতে বসে শিরিন হুমায়ুনকে উদ্দেশ্য করে নিচু গলায় বলল, "শোনো, মা তো সারাটাদিন কাশতেই থাকে। বাচ্চাদের পড়াশোনায় সমস্যা হয়। তাছাড়া আলমগীর আর শাহজাহানও তো আছে। দায়িত্বটা কি শুধু একার আমাদের? মায়ের তো উচিত সবার বাসায় কিছুদিন করে থাকা।" দরজার ওপাশ থেকে কথাগুলো রহিমার কানে পৌঁছাল। বহু বছর আগে দেওর কবিরের বলা কথাগুলোর মতোই এগুলো তাঁর বুকে এসে বিঁধল। তবে এই আঘাতের তীব্রতা অনেক বেশি; কারণ এবার তীরটি এসেছে তাঁর নিজের সন্তানের ঘরের ভেতর থেকে।

হুমায়ুন প্রতিবাদ করেছিল, "শিরিন, মা কোনো বোঝা নয়। আমার যা কিছু অর্জন, সব মায়ের ত্যাগের ফল।" কিন্তু রহিমা অশান্তি চাইলেন না। পরদিনই তিনি আলমগীরের বাসায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আলমগীরের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটটি আরও বিলাসবহুল। কিন্তু সেখানে গিয়ে রহিমার নিঃশ্বাস যেন আরও বন্ধ হয়ে এলো। আলমগীর আর নিপা দুজনেই চাকরি করে। সকাল আটটায় বের হয়ে রাত নয়টায় ফেরে। একটা কাজের মেয়ে সারাদিন রহিমার দেখাশোনা করত। খাবার টেবিলে রাখা থাকত বরফশীতল খাবার। নিপা বাড়ি ফিরে ক্লান্ত থাকত, শাশুড়ির সাথে দুটো কথা বলার সময় বা ইচ্ছা তার ছিল না। উপরন্তু, নিপার মা প্রায়ই এ বাসায় এসে থাকতেন। নিজের মায়ের জন্য নিপা যে ফলমূল আর যত্নআত্তির ব্যবস্থা করত, রহিমার ক্ষেত্রে তা ছিল নিছক দায়সারা।

একদিন রাতে আলমগীর আর নিপার শোবার ঘর থেকে ঝগড়ার আওয়াজ এলো। নিপা তীব্র গলায় বলছিল, "তোমার মা তেল ছাড়া তরকারি খেতে পারে না, ঝাল হলে সমস্যা। এই বয়সে এতো বায়নাক্কা আমি সামলাতে পারব না। আমার অফিস আছে, কেরিয়ার আছে। তোমার ছোট ভাই শাহজাহান তো কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে না! মা'কে ওর বাসায় পাঠিয়ে দাও।"

আলমগীর চুপ করে ছিল। সে স্ত্রীকে তেমন কিছুই বলতে পারল না। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রহিমার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি ভাবলেন, এই আলমগীর যখন ছোটবেলায় টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিল, তখন তিনি টানা সাত দিন চোখের পাতা এক করেননি। নিজের আঁচল ভিজিয়ে ছেলের কপালে জলপট্টি দিয়েছিলেন, আর আজ সেই ছেলের ঘরে তাঁর সামান্য পথ্য আর সেবা ভারী হয়ে উঠেছে! পরের সপ্তাহে রহিমা ছোট ছেলে শাহজাহানের উত্তরায় ফ্ল্যাটে গেলেন। শাহজাহান ছিল তাঁর সবচেয়ে আদরের। ছোটবেলা থেকেই সে মায়ের ন্যাওটা ছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে রহিমা দেখলেন আরেক চিত্র। শাহজাহানের স্ত্রী তানিয়া স্পষ্টভাষী এবং কিছুটা উদ্ধত। সে সরাসরি রহিমার মুখের ওপরই বলে দিল, "মা, আমাদের ফ্ল্যাটটা ছোট। দুইটা বেডরুম। একটাতে আমরা থাকি, অন্যটাতে আমার ভাই এসে থাকে, ও ভার্সিটিতে পড়ে। আপনার এখানে থাকতে কষ্ট হবে। তাছাড়া আপনার ছেলেরা মিলে আপনাকে গ্রামে একটা কাজের মানুষ রেখে দিলেই তো পারে! শহরে বুড়ো মানুষদের রাখা খুবই ঝামেলার।"

শাহজাহান স্ত্রীর কথার কোনো জোরালো প্রতিবাদ করল না। সে শুধু মৃদু গলায় বলল, "তানিয়া, একটু আস্তে কথা বলো।" সেদিন রাতে রহিমা আর চোখের জল ফেললেন না। তাঁর কান্নার উৎস যেন শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে শহরের আকাশ দেখতে লাগলেন। নিয়ন আলোর ঝলকানি, উঁচু উঁচু অট্টালিকা, ব্যস্ত রাজপথ।

এই সেই তিন সন্তান, যাদের জন্য তিনি নিজের যৌবন বিসর্জন দিয়েছেন। যাদের মুখে একমুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য তিনি নিজে অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছেন। যাদের গায়ের কাঁপুনি থামাতে তিনি নিজের একমাত্র ভালো শাড়িটা ছিঁড়ে কাঁথা বানিয়ে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজ তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, বিত্তশালী, উচ্চশিক্ষিত। তাদের ড্রয়িংরুমে দামি সোফা আছে, দেয়ালে ঝোলানো বিদেশি পেইন্টিং আছে, কিন্তু যে মায়ের গর্ভে তাদের জন্ম, সেই মায়ের জন্য ঘরে একটুকরো জায়গার বড় অভাব। রহিমা এক গভীর সত্য উপলব্ধি করলেন। শৈশবে রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়রা তাঁকে পর করেছিল তাঁর দারিদ্র্যের কারণে। আর বার্ধক্যে নিজের পেটের সন্তানেরা তাঁকে পর করে দিচ্ছে তাঁর অসহায়ত্বের কারণে। সংসারে আসলে কেউ কারো আপন নয়; স্বার্থের টান ফুরিয়ে গেলেই মানুষ অচেনা হয়ে যায়।

পরদিন সকালে তিন ভাইকেই শাহজাহানের বাসায় ডাকা হলো। রহিমা নিজেই তাঁদের ডাকতে বলেছিলেন।ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় তিন ভাই এবং তাঁদের স্ত্রীরা বসেছে। পরিবেশটা বেশ থমথমে। সবাই বুঝতে পারছে কিছু একটা নিয়ে কথা হবে, এবং প্রত্যেকেই মনে মনে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার আর অন্য ভাইয়ের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপানোর যুক্তি তৈরি করে রেখেছে।

হুমায়ুন আমতা আমতা করে বলল, "মা, তুমি নাকি কী কথা বলবে সবাইকে?"

রহিমা বিছানা ছেড়ে উঠে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর পরনে একটি সাধারণ সুতির থান কাপড়। পিঠটা কিছুটা ঝুঁকে গেছে, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টিতে ফিরে এসেছে বহু বছর আগের সেই তেজ,যে তেজ দেখে একদিন দেওর জব্বার পিছু হটেছিল।

রহিমা শান্ত গলায় বললেন, "তোমাদের সবাইকে একসাথে বসাইছি একটা কথা বলার জন্য। আমি বুঝতে পারছি, আমি বুড়ি মানুষ তোমাদের এই সুন্দর, সাজানো সংসারে একটা মস্ত বড় আপদ হইয়া দাঁড়াইছি। কার ঘরে আমি কয়দিন থাকুম, কার ঘাড়ে আমার দায়িত্ব কতটুকু,এই নিয়া তোদের মনে মনে যে অশান্তি, সেইটা আমার চোখ এড়ায় নাই।" তিন ভাই লজ্জায় মাথা নিচু করল। শাহজাহান একটু মিনমিন করে বলল, "না মা, মানে তানিয়া আসলে ওইভাবে বলে নাই..."

"থাম শাহজাহান," রহিমা হাত তুলে ছেলেকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না, ছিল এক মহাসমুদ্রের মতো গভীর বিষাদ। তিনি বলতে লাগলেন, "তোমাদের বাবার মৃত্যুর পর যেদিন পুরো দুনিয়া আমাকে আর তোদের নিঃস্ব ভাইবা দূরে ঠেইলা দিছিল, সেদিন আমি কারো দিকে হাত বাড়াই নাই। মানুষের বাড়ি ধান ভাইনা, নিজের রক্ত পানি কইরা তোদের মানুষ করছি। তখন আমি ভাবছিলাম, আমার এই পোলা তিনটাই আমার আসল আপন। দুনিয়ার সবাই পর হইলেও আমার পেটের সন্তানেরা কখনো পর হইব না।" রহিমা একটু থামলেন। ঘরের ভেতরে পিনপতন নীরবতা। কারো মুখে কোনো রা নেই।

রহিমা আবার বললেন, "কিন্তু আজ আমি বুঝলাম, মানুষ জন্ম দিলেই আপন হয় না। রক্তের সম্পর্ক দিয়া মানুষ চেনা যায় না। তোদের দোষ নাই রে বাপ। তোরা বড় হইছিস, তোদের আলাদা পরিবার হইছে, সমাজ হইছে। সেই সমাজে ছেঁড়া কাপড় পরা, কাশতে থাকা এই বুড়ি মা একটা লজ্জা ছাড়া আর কিছুই না।" হুমায়ুন উঠে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "মা! তুমি এমন কথা বোলো না। আমার ভুল হইয়া গেছে মা। তুমি আমার কাছেই থাকবে, সারাজীবন থাকবে।"

আলমগীরও এগিয়ে এলো, "মা, আমাকে ক্ষমা করো। নিপার কথায় আমি তোমাকে ভুল বুঝি নাই..."রহিমা দুই পা পিছিয়ে গেলেন। ছেলেদের কোনো স্পর্শ তিনি নিলেন না। তিনি দৃঢ় গলায় বললেন, "না। আমি কারো দয়া নিতে দুনিয়ায় আসি নাই। তোদের বাপে মরার আগেও আমারে এই শিক্ষাই দিয়া গেছে। আমি তোদের কারও ঘরে এক মুহূর্তের জন্যও থাকব না। আমি আজই গ্রামে ফিরা যামু।"

তানিয়া অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "মা, একা একা গ্রামে গিয়ে আপনি এই অসুস্থ শরীরে কীভাবে থাকবেন?"  রহিমা তানিয়ার দিকে ফিরে তাকালেন। এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল তাঁর ঠোঁটে। তিনি বললেন, "কে বলছে আমি একা? যে খোদা সোলাইমান মরার পরে এই অকুল পাথারে আমারে ডুবতে দেয় নাই, সেই খোদা এখনও আসমানে আছেন। তোদের এই খাঁচায় থাকার চেয়ে আমার ভিটার মাটির সাথে কথা কওয়া অনেক শান্তির। সেই মাটি আমারে পর করব না।" ছেলেরা অনেক অনুনয়-বিনয় করল, হাত ধরে আটকাতে চাইল। কিন্তু যে রহিমা খাতুন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মাথা নোয়াননি, অপমানের কাছে তিনি কীভাবে মাথা নোয়াবেন? তিনি কারো কোনো কথাই শুনলেন না। নিজের কাপড়ের ছোট পোঁটলাটা হাতে নিয়ে তিনি সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

হুমায়ুন গাড়ি বের করতে চাইল, কিন্তু রহিমা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি কারও গাড়িতে চড়বেন না। তিনি বাসে করেই গ্রামে ফিরবেন। অগত্যা তিন ভাই নিরুপায় হয়ে, অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে মায়ের পিছু পিছু গাবতলী বাস টার্মিনাল পর্যন্ত গেল। পুরো পথ রহিমা একটি কথাও বললেন না। বাসের জানালায় মুখ রেখে তিনি কেবল চেয়ে রইলেন দূরের আকাশের দিকে।

গ্রামে ফিরে আসার পর রহিমার জীবন যেন নতুন করে এক শান্ত মোহনায় এসে ঠেকল। সোলাইমান খানের পুরনো ভিটায় সেই চুনকাম করা একতলা দালানটি দাঁড়িয়ে আছে। উঠোনে সেই পুরনো নিমগাছ, পেছনে বাঁশঝাড়। ঘরের তালা খুলে রহিমা যখন ভেতরে ঢুকলেন, তখন মেঝের ওপর এক আস্তরণ ধুলো জমে ছিল। তিনি নিজের হাতেই সেই ধুলো ঝাড়ু দিলেন। ঘরে আবার ধূপ জ্বালালেন। গ্রামের মানুষ খবর পেয়ে ছুটে এলো। স্কুলের সেই মোজাম্মেল মাস্টার, যিনি এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ, লাঠিতে ভর দিয়ে এসে উঠোনে দাঁড়ালেন।

"কী রহিমা? ঢাকা শহর কেমন দেখলা? পোলাপান তো তোমারে সোনার থালায় বসাইয়া রাখার কথা। গ্রামে ফিরা আসলা যে বড়?" মোজাম্মেল মাস্টার জিজ্ঞেস করলেন। রহিমা উঠোনে দাঁড়িয়ে এক চিলতে মিষ্টি হাসলেন। বললেন, "মাস্টার সাব, সোনার খাঁচায় তো পাখি পোষা যায়, বুনো পাখিরে কি খাঁচায় আটকানো যায়? আমার শিকড় এইখানে। আমার সোলাইমানের কবর এইখানে। এই মাটি ছাইড়া আমি ওখানের দালানে দম বন্ধ হইয়া মরতে পারুম না।"

মাস্টার মশাই দীর্ঘক্ষণ রহিমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রাজ্ঞ এই মানুষটির বুঝতে বাকি রইল না ভেতরের আসল সত্যটা কী। তিনি শুধু বললেন, "তুমি ধন্য রহিমা। তোমার আত্মা কারও দাসত্ব মেনে নেওয়ার মতো নয়।"

গ্রামে ফিরে আসার পর রহিমা আর হাত গুটিয়ে বসে রইলেন না। তাঁর শরীরের রোগব্যাধি যেন এই মুক্ত বাতাসে এসে অনেকটাই হালকা হয়ে গেল। ছেলেরা প্রতি মাসে ডাকযোগে এবং ব্যাংকের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাতে লাগল। অপরাধবোধ থেকে তারা মায়ের অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনের চেয়েও বেশি অর্থ জমা দিতে শুরু করল। প্রতি সপ্তাহে ফোন করে কান্নাকাটি করত, গ্রামে ছুটে আসতে চাইত। কিন্তু রহিমা তাদের আসতে বারণ করে দিলেন। বললেন, "তোরা তোদের সংসার নিয়া ভালো থাক। আমার খোঁজ নিয়া সময় নষ্ট করিস না। আমি ভালো আছি।"

ছেলেরা যে টাকা পাঠাত, রহিমা সেই টাকার এক আনাও নিজের ভোগবিলাসে খরচ করলেন না। তিনি গ্রামের এক কোণে একটি এতিমখানা এবং বালিকা বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করলেন। নিজের জমানো এবং ছেলেদের পাঠানো টাকা দিয়ে সেই এতিমখানার বাচ্চাদের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। যে রহিমার তিন ছেলে আজ তাঁকে পর করে দিয়েছে, সেই রহিমা গ্রামের শত শত এতিম ও দরিদ্র শিশুর মাঝে নিজের মাতৃত্বকে বিলিয়ে দিলেন।

প্রতিদিন বিকেলে সোলাইমান খানের ভিটার উঠোনে পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এসে জটলা পাকাত। রহিমা তাদের নকশী কাঁথা সেলাই শেখাতেন, কোরআন পড়া শেখাতেন, আর নিজের হাতে পিঠাপুলি বানিয়ে খাওয়াতেন। বাচ্চারা তাঁকে ডাকত ‘বড় আম্মা’। একদিন সকালে রহিমা দাওয়ায় বসে মুড়ি ভাজছিলেন। এমন সময় উঠোনে এসে ঢুকলেন এক অচেনা বৃদ্ধা। বয়সের ভারে শরীর বেঁকে গেছে, পরনে তালি দেওয়া শাড়ি। কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "আমারে একটু খাইতে দিবা মা? তিন দিন ধইরা পেটে দানা পড়ে নাই।"

রহিমা দ্রুত নেমে এসে বৃদ্ধার হাত ধরলেন। তাঁকে দাওয়ায় বসিয়ে গরম দুধ আর মুড়ি খেতে দিলেন। খেতে খেতে বৃদ্ধা বললেন, "আমার চারটা পোলা আছিল গো মা। সবাই বড় চাকরি করে। কিন্তু বুড়া বয়সে আমারে বাড়ি থেইকা বের কইরা দিছে। এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরি।" রহিমা বৃদ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তাঁর নিজের চোখ দুটো আবার ভিজে এলো। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, "খোদা, এই তোমার দুনিয়া! যে রক্তরে মানুষ আপন ভাবে, সেই রক্তই সবার আগে পর হইয়া যায়।" রহিমা সেই বৃদ্ধাকে নিজের ঘরে রেখে দিলেন। বললেন, "খালা, যতদিন আমি বাইচা আছি, এই ঘর তোমারও। আমরা দুই পর মিলাইয়া এইখানে আপন সংসার বানামু।"

হুমায়ুন, আলমগীর আর শাহজাহান একদিন হঠাৎ করেই গ্রামে হাজির হলো। এবার তারা কোনো স্ত্রী বা সন্তানকে সাথে আনেনি। তিন ভাই একাকী এসেছে মায়ের পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইতে। গাড়ি থেকে নেমে তারা যখন উঠোনে ঢুকল, তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াল।

উঠোনের নিমগাছের ছায়ায় মাদুর পাতা। সেখানে বসে আছেন তাদের মা রহিমা খাতুন। তাঁর কোলে গ্রামের এক এতিম রুগ্ন শিশু, যাকে তিনি চামচ দিয়ে পরম মমতায় দুধ খাওয়াচ্ছেন। পাশে বসে সেই গৃহহীন বৃদ্ধা তরকারি কুটছেন, আর উঠোনের একপাশে গোটা দশেক বাচ্চা সুর করে নামতা পড়ছে। পুরো বাড়িটা যেন এক স্বর্গীয় আলোয় ভরে আছে। সেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো হিসেব-নিকাশ নেই, আছে কেবল নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক পরম প্রবাহ। তিন ভাই অপরাধীর মতো গুটিগুটি পায়ে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াল।

"মা..." হুমায়ুন ভাঙা গলায় ডাকল। রহিমা মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর চোখে কোনো ঘৃণা নেই, কোনো অভিযোগ নেই; আছে কেবল এক নির্লিপ্ত প্রশান্তি। "তোরা আসছিস? বোস।" রহিমা খুব সাধারণ গলায় বললেন। আলমগীর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হাঁটু গেড়ে বসে রহিমার পা দুটো জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল, "মা, আমাদের ক্ষমা করে দাও। আমরা কৃতঘ্ন, আমরা স্বার্থপর। তোমার মতো মাকে আমরা চিনতে পারি নাই। তুমি আমাদের সাথে চলো মা, এবার আর কোনো অভিযোগ থাকবে না। আমরা সবাই তোমার সেবা করব।"

শাহজাহান আর হুমায়ুনও চোখের জলে বুক ভাসিয়ে মায়ের কাছে মিনতি করতে লাগল। রহিমা আলতো করে আলমগীরের মাথাটা নিজের পা থেকে তুলে দিলেন। তারপর তিন ছেলের মুখের দিকে একে একে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে এক গভীর মাতৃস্নেহ ছিল, কিন্তু ফিরে যাওয়ার কোনো দুর্বলতা ছিল না। রহিমা বললেন, "তোরা কাঁদিস না বাবা। তোদের ওপর আমার কোনো রাগ নাই, কোনো ক্ষোভ নাই। মা কখনো সন্তানের ওপর রাগ কইরা থাকতে পারে না। তোরা সমাজে বড় হইছিস, মানুষ তোদের সম্মান করে,এইটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমার লড়াই সার্থক হইছে।"

"তবে কেন আমাদের সাথে যাবে না মা?" শাহজাহান কেঁদে বলল।

রহিমা চারপাশের শিশুদের দিকে একবার তাকালেন, তারপর উঠোনের মাটির দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন, "কারণ তোরা আমাকে রক্তের বন্ধনে বাঁধতে চাইছিলি, কিন্তু হৃদয়ের বন্ধনে বাঁধতে পারিস নাই। যে সংসারে থাকতে গেলে অন্যের বিরক্তির কারণ হইতে হয়, সেই সংসার আমার না। আমি এইখানে আমার শান্তির ঠিকানা পাইয়া গেছি। তোরা ভাবিস আমি একা? না রে বাপ, এই গাঁয়ের প্রতিটি নিঃস্ব মানুষ আজ আমার সন্তান। আমি এখন আর শুধু তিন ছেলের মা না, আমি এই মাটির মা।" রহিমা উঠে দাঁড়িয়ে ঘরে চলে গেলেন এবং এক বাটি মুড়ি আর গুড় নিয়ে এসে ছেলেদের সামনে রাখলেন। বললেন, "তোরা অনেক দূর থেইকা আসছিস, মুখ ধুইয়া এইটুকু মুখে দে। তোদের জন্য আমার ঘরের দরজা মেহমান হিসেবে সবসময় খোলা। কিন্তু আমারে আর তোদের ওই শহরে ডাইকো না।"

তিন ভাই কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল। যে প্রাসাদতুল্য জীবনের অহংকার তারা করত, মায়ের এই মাটির উঠোনে দাঁড়িয়ে তা এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেল। তারা বুঝতে পারল, অর্থ, বিত্ত আর ডিগ্রি দিয়ে মানুষকে বড় করা যায়, কিন্তু হৃদয়ের উদারতা না থাকলে সেই মানুষ সবচেয়ে বড় কাঙাল। তারা আজ সমাজের চোখে সফল, কিন্তু মায়ের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তারা চরমভাবে পরাজিত। বিকালে যখন তিন ভাই গাড়িতে উঠে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল, তখন তারা গাড়ির কাঁচ দিয়ে দেখল,রহিমা খাতুন পশ্চিমের লাল হয়ে আসা সূর্যের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর এক হাত সেই এতিম শিশুটির কাঁধে, অন্য হাত দোলাচ্ছেন চলে যাওয়া গাড়ির দিকে।

গাড়ির পেছনের সিটে বসে হুমায়ুন নিঃশব্দে চোখ মুছল। আলমগীর জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আর শাহজাহান স্তব্ধ হয়ে ভাবল,রক্তের সম্পর্কে জন্ম নিলেই কেউ আপন হয় না। যে ভালোবাসায় কোনো ত্যাগ নেই, তা পরম মুহূর্তে ‘পর’ হয়ে যায়; আর যে ত্যাগে কোনো স্বার্থ নেই, তা দূর থেকেও চিরকালের ‘আপন’ হয়ে বাঁচে। সোলাইমান খানের মাটির ভিটায় দাঁড়িয়ে থাকা রহিমা খাতুন তখন শুধু একজন সাধারণ মা নন; তিনি হয়ে উঠেছেন স্বার্থপর পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক চিরন্তন, অপরাজিত ভালোবাসার প্রতীক।

 

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login