Article

ভাষার জীবনরেখা: উদার গ্রহণ বনাম শৃঙ্খলা

October 8, 2026

13 views

ভাষা কোনো স্থির বা কৃত্রিম কাঠামো নয়; এটি মানুষ ও সমাজের মতোই এক জীবন্ত ব্যবস্থা। মানুষের চিন্তা, জ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক শক্তির পরিবর্তনের সাথে সাথে ভাষার রূপান্তর ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত। ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যেকোনো ভাষার টিকে থাকা ও সমৃদ্ধি মূলত তিনটি আপাত-বিরোধী উপাদানের ওপর নির্ভর করে—প্রবহমানতা, উদার গ্রহণ এবং রক্ষণশীলতা। এর সাথে যখন ভাষা-পরিকল্পনা, করপাস উন্নয়ন (প্রযুক্তি ও গবেষণার স্বার্থে বাংলা ভাষার হাজার হাজার লেখা ও কথ্য ভাষাকে কম্পিউটারে পড়ার উপযোগী করে একটি সুসংগঠিত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার হিসেবে গড়ে তোলা), সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও আইনি নীতির প্রশ্ন যুক্ত হয়, তখন এই রূপান্তর একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়।

ভাষার প্রবহমানতা প্রমাণ করে যে পরিবর্তনই ভাষার একমাত্র স্থায়ী নিয়ম। ধ্বনি, রূপ, শব্দভাণ্ডার ও ব্যবহারের ক্ষেত্র পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই ভাষা যুগোপযোগী থাকে। সমাজভাষাবিদ উইলিয়াম ল্যাভব দেখিয়েছেন, ভাষাগত পরিবর্তন কোনো আইনি আদেশে বা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়মে হয় না; বরং তা সমাজের ভেতর থেকে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ওল্ড ও মিডল ইংলিশ অতিক্রম করে আধুনিক ইংরেজিতে রূপান্তর কিংবা স্প্যানিশ ভাষার আমেরিকান উপভাষাগুলো থেকে শব্দ গ্রহণ—এ সবই প্রবহমানতার নজির। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও চর্যাপদের প্রাচীন রূপ থেকে আজকের প্রমিত ও ডিজিটাল যুগের সংক্ষিপ্ত শব্দ ব্যবহারের অভিযোজন একই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

অপরদিকে, উদার গ্রহণের মাধ্যমে ভাষার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়। অন্য ভাষা থেকে শব্দ বা ভাব গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান তিনটি শর্ত হলো ধ্বনিগত অভিযোজন, রূপগত একীভবন এবং অর্থগত সামঞ্জস্য। যেমন, জাপানিরা বিদেশি শব্দকে নিজস্ব উচ্চারণে ঢেলে গ্রহণ করে, আবার জার্মানরা অন্ধভাবে ঋণশব্দ না নিয়ে নিজস্ব উপাদানে নতুন শব্দ গড়ে তোলে। বাংলা ভাষাও যুগে যুগে সংস্কৃত, আরবি-ফারসি ও ইংরেজি থেকে প্রচুর শব্দ গ্রহণ করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমৃদ্ধির জন্য কেবল ঋণশব্দ গ্রহণই যথেষ্ট নয়; উপসর্গ, প্রত্যয় ও সমাসের মাধ্যমে নতুন শব্দ তৈরির নিজস্ব ব্যাকরণিক ক্ষমতাকেও সক্রিয় রাখা প্রয়োজন।

রক্ষণশীলতা মানে স্থবিরতা নয়, বরং তা ভাষার মূল ব্যাকরণগত কঙ্কাল ও মানরূপকে ধরে রাখার এক প্রতিরক্ষাব্যূহ। ফরাসি ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক পরিভাষা নীতি কিংবা আইসল্যান্ডিক ভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ব্যাকুলতা মূলত কাঠামোগত স্থিতিশীলতারই অংশ। ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে রক্ষণশীলতা সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে ব্যাকরণ, মান-বানান ও রেজিস্টার বিভাজনের ক্ষেত্রে; তবে লেক্সিকাল বা শব্দভাণ্ডারের স্তরে কিছুটা নমনীয়তা থাকা জরুরি। অতিরিক্ত শুদ্ধতাবাদ ব্যবহারকারীর স্বাভাবিক ভাষা-অভ্যাসের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি করে ভাষাকে সংকুচিত করে ফেলতে পারে।

ভাষাবিদ চার্লস ফার্গুসনের 'ডিগ্লসিয়া' ধারণায় দেখা যায়, একটি ভাষাতেই উচ্চরূপ ও কথ্যরূপের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহারক্ষেত্র থাকতে পারে। আরবিতে প্রমিত ও কথ্য উপভাষার সহাবস্থান কিংবা বাংলায় প্রমিত ও আঞ্চলিক রূপের উপস্থিতি ভাষাকে দুর্বল করে না, বরং এর কার্যগত বিস্তার ঘটায়। নীতিগতভাবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত উচ্চশিক্ষা, আইন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে প্রমিত রূপকে সক্ষম করে তোলা এবং একই সাথে কথ্যরূপের অনাবিল সৃজনশীল শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া।

পরিকল্পিত ভাষা-সমৃদ্ধির জন্য আইনার হাউগেনের প্রস্তাবিত চার ধাপ—নির্বাচন, বিধিবদ্ধকরণ, কার্যবিস্তার ও সামাজিক গ্রহণ—বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর মধ্যে কার্যবিস্তার নিশ্চিত করে যেন ভাষাটি কেবল দৈনন্দিন সংলাপেই সীমাবদ্ধ না থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আইন ও অর্থনীতির প্রধান বাহক হয়ে উঠতে পারে, যার সফল উদাহরণ আধুনিক হিব্রু ভাষার রূপান্তর।

বিদেশি শব্দে আইনি নিষেধাজ্ঞা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অকার্যকর। নীতিগতভাবে তিনটি মডেল বিবেচ্য—নিষেধাজ্ঞা, বিকল্প পরিভাষা নির্মাণ এবং অভিযোজন। ঢালাও নিষেধাজ্ঞার চেয়ে সহজ ও বাস্তবসম্মত বাংলা বিকল্প তৈরি এবং গ্রহণযোগ্য বিদেশি শব্দকে বাংলা ধ্বনি ও বানানের সাথে একীভূত করে নেওয়ার নীতিই বেশি ফলপ্রসূ। আইন হয়তো প্রতীকী মানরক্ষা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, গবেষণা ও বাজার-বাস্তবতাই ভাষার গতিপথ নির্ধারণ করে।

বিশ্বমঞ্চে ভাষার প্রভাব কেবল তার শব্দসংখ্যার ওপর নয়, বরং তার ব্যবহারের পরিধি ও কার্যক্ষেত্রের ওপর নির্ভর করে। চীনা ভাষার গুরুত্ব বেড়েছে তাদের অর্থনৈতিক শক্তির কারণে, আর ইংরেজি প্রভাব বিস্তার করেছে প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বাহক হিসেবে। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতাই ভাষার আন্তর্জাতিক মর্যাদা নিশ্চিত করে।

বাংলা ভাষার বৈশ্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে একটি স্পষ্ট রূপরেখা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় মানসম্মত বাংলা পরিভাষা নিশ্চিত করা, টার্মিনোলজি ব্যাংক ও ডিজিটাল করপাস গড়ে তোলা, কৃত্রিম প্রতিশব্দের বদলে ব্যবহারযোগ্য শব্দ নির্মাণ এবং কথ্যভাষার সৃজনশীলতাকে দমন না করে মানরূপকে জ্ঞান-উৎপাদনের প্রধান বাহক করা অত্যন্ত জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, রক্ষণশীলতা ও উদার গ্রহণ পরস্পরবিরোধী নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন স্তরে কর্মরত দুই পরিপূরক শক্তি। ব্যাকরণিক কাঠামোর স্থিতি ভাষাকে দেয় স্বাতন্ত্র্য ও স্থিতিশীলতা, আর শব্দভাণ্ডারের নমনীয়তা তাকে করে তোলে চিরপ্রবহমান। আইনি কড়াকড়িতে ভাষা বাঁচে না; ভাষা টিকে থাকে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তিগত অভিযোজন ও সামাজিক মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে। ব্যাকরণগত ভিত্তি দৃঢ় রেখে শব্দ গ্রহণের দরজা খোলা রাখলেই এই তিনের সমন্বয়ে বাংলা ভাষার প্রকৃত বিকাশ সম্ভব।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login