Article

দানবের ভেতর মানুষ: অ্যান কারসন, মধুসূদন ও নোবেল

October 9, 2026

3 views

অ্যান কারসনের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার খবরটি পড়তে গিয়ে আমার বারবার মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা মনে পড়ছে। দুজনের ভাষা, সময়, সংস্কৃতি, সাহিত্যরীতি—সবই আলাদা। তবু তাঁদের কল্পনার একটি গভীর জায়গায় যেন আশ্চর্য মিল আছে: তাঁরা পুরাণের তৈরি ‘অন্য’ মানুষটির দিকে তাকিয়েছেন এবং তার ভিতরে খুঁজে পেয়েছেন মানুষকে।

২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ক্লাসিসিস্ট অ্যান কারসন। সুইডিশ অ্যাকাডেমি তাঁকে পুরস্কৃত করেছে তাঁর “bold and inventive oeuvre”-এর জন্য—যে-রচনায় ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে খেলাচ্ছলে সংলাপ করতে করতে তিনি সমকালীন সাহিত্যের নতুন নতুন রূপ নির্মাণ করেছেন। খবরটি ঘোষণার সময় কারসন আইসল্যান্ডের রেইকিয়াভিকে নিজের বাড়িতে রান্নাঘরের মেঝে পরিষ্কার করছিলেন; নোবেল কমিটির ফোন পেয়ে তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়াও ছিল তাঁর লেখার মতোই অপ্রথাগত—ঘটনাটিকে তাঁর কাছে “a little insane” মনে হয়েছিল।

কারসনের বই পড়ার অভিজ্ঞতা একটু অদ্ভুত। প্রথমে মনে হয়, তিনি বুঝি প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে একজন অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ কবি। একটু পরে বোঝা যায়, পাণ্ডিত্য তাঁর গন্তব্য নয়—পাণ্ডিত্য তাঁর দরজা। সেই দরজা দিয়ে তিনি ঢুকে পড়েন মানুষের আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, বিচ্ছেদ, শরীর, একাকিত্ব, পরিচয় ও স্মৃতির জগতে। Eros the Bittersweet, Men in the Off Hours, The Beauty of the Husband, Nox, If Not, Winter—প্রতিটি বইতেই যেন পুরোনো কোনো টেক্সটকে তিনি বর্তমানের আলোয় আবার দেখতে শেখান। তাঁর লেখা কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, প্রবন্ধ—এই পরিচিত বাক্সগুলোর কোনোটির মধ্যেই পুরোপুরি ঢোকে না।

কিন্তু কারসনকে বোঝার জন্য আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বই Autobiography of Red।

গ্রিক পুরাণে Geryon একজন দানব। Herakles-এর হাতে যার মৃত্যু নির্ধারিত। কারসন সেই দানবকে মেরে ফেলেননি—বরং তাঁকে কথা বলার অধিকার দিয়েছেন। ১৯৯৮ সালের এই verse novel-এ Geryon হয়ে ওঠে এক লাল, ডানাওয়ালা কিশোর; তার আছে লজ্জা, নিঃসঙ্গতা, ভালোবাসা, নির্যাতনের স্মৃতি, শিল্পবোধ এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে অস্বস্তি। সে ক্যামেরায় পৃথিবীকে দেখতে শেখে, প্রেমে পড়ে, আঘাত পায় এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরের জগতকে শিল্পে রূপান্তর করে।

এখানেই আমার মধুসূদনের কথা মনে হয়।

মেঘনাদবধ কাব্য-এ মধুসূদনও তো রামায়ণের প্রচলিত নৈতিক মানচিত্রটি উল্টে দিয়েছিলেন। রাবণ ও মেঘনাদ—যাঁরা প্রচলিত কাহিনিতে ‘রাক্ষস’, অর্থাৎ অন্য পক্ষ, তাঁরা মধুসূদনের হাতে শুধু অশুভের প্রতীক হয়ে থাকেননি। রাবণ হয়ে উঠেছেন পিতা, স্বামী, রাজা, শোকাহত মানুষ; মেঘনাদ হয়ে উঠেছেন বীর, স্বামী, পুত্র এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো এক ট্র্যাজিক মানুষ। ফলে পাঠকের সহানুভূতির দিকটিও বদলে যায়। মধুসূদনের রাবণকে নিয়ে আলোচনায় বারবার যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো—তিনি রামায়ণের চরিত্রকে মানবতার আলোয় পুনর্নির্মাণ করেছেন; কাব্যের বীরত্বের চেয়ে করুণার সুর সেখানে শেষ পর্যন্ত বেশি গভীর হয়ে ওঠে।

কারসনের Geryon এবং মধুসূদনের রাবণ-মেঘনাদ তাই আমার কাছে একই সাহিত্যিক কৌশলের দুই দূরবর্তী আত্মীয়। একজন গ্রিক পুরাণের ‘monster’-কে তার নিজের কণ্ঠ দিয়েছেন, অন্যজন ভারতীয় মহাকাব্যের ‘রাক্ষস’-কে দিয়েছেন মানুষের হৃদয়। দুজনেই যেন প্রশ্ন করেছেন—কোনো চরিত্রকে আমরা দানব বলি কেন? কে তাকে দানব বলে? বিজয়ীর কাহিনি কি পরাজিতের ভিতরের মানুষটিকে মুছে দিতে পারে?

এখানেই কারসনের সাহিত্যিক শক্তি। তিনি পুরাণকে আধুনিক করে তোলেন শুধু পোশাক বদলে নয়; দৃষ্টিকোণ বদলে। Autobiography of Red-এ Herakles-এর হাতে নিহত হওয়ার কথা ছিল যে Geryon-এর, তাকে তিনি বেঁচে থাকার, স্মরণ করার এবং নিজের গল্প বলার সুযোগ দেন। মূল পুরাণের Geryon যেখানে এক ‘পরাজিত দানব’, কারসনের Geryon সেখানে নিজের জীবন নিয়ে লেখা একজন শিল্পী। এই পরিবর্তনটি শুধু কাহিনির পরিবর্তন নয়—এটি নৈতিক দৃষ্টির পরিবর্তন।

মধুসূদনও একইরকম একটি দৃষ্টির বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। মেঘনাদবধ কাব্য ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল; রামায়ণের পরিচিত ঘটনাকে তিনি এমনভাবে পুনর্গঠন করেন যে পাঠক রামের বিজয়ের আনন্দের বদলে লঙ্কার পতন, মেঘনাদের মৃত্যু এবং রাবণের পুত্রশোকের দিকে তাকাতে বাধ্য হন। মধুসূদনের রাক্ষসেরা তখন আর শুধু ‘অন্য’ নয়—তারা আমাদের মতোই ভালোবাসে, শোক করে, অহংকার করে, ভুল করে, মৃত্যুকে ভয় পায়।

এই কারণেই কারসনের নোবেল পাওয়ার মুহূর্তে মধুসূদনকে মনে পড়া আমার কাছে নিছক তুলনা নয়। দুজনের মধ্যে প্রত্যক্ষ প্রভাবের কোনো দাবি এখানে নেই; বরং আছে এক ধরনের সাহিত্যিক আত্মীয়তা। একজন গ্রিক পুরাণকে সমকালীন করে তোলেন, অন্যজন রামায়ণকে উনিশ শতকের আধুনিক মানবতাবাদী দৃষ্টিতে নতুন করে পড়েন। দুজনেই প্রতিষ্ঠিত কাহিনির ভিতরে এমন একটি কণ্ঠ খুঁজে নেন, যাকে মূল কাহিনি সহজেই ‘অন্য’ বলে সরিয়ে রেখেছিল।

কারসনের নোবেল নিয়ে আলোচনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। অন্তত ২০১৯ সাল থেকেই তাঁকে সম্ভাব্য নোবেলজয়ীদের তালিকায় দেখা গেছে; ২০২০ সালে তাঁকে সম্ভাব্য বিজয়ীদের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল, ২০২২ সালেও তিনি ‘perennial favourite’ বা দীর্ঘদিনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের একজন ছিলেন। ২০২৬ সালের পুরস্কার ঘোষণার ঠিক আগের দিনও তিনি বুকমেকারদের হিসাবে অন্যতম ফেভারিট ছিলেন। অর্থাৎ এবারের পুরস্কারটি হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি—বহু বছর ধরে সাহিত্যবিশ্বে কারসনের নাম নোবেল-আলোচনার পরিসরে ঘুরছিল। তবে নোবেলের আনুষ্ঠানিক মনোনয়নের নাম ৫০ বছর পর্যন্ত প্রকাশ করা হয় না, তাই ‘কোন সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল’—এ কথা এখন নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

২০২০ সালে কারসন সাহিত্যে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস পুরস্কারও পান। সেই পুরস্কারের জুরি তাঁর গ্রিক-লাতিন জগতের অধ্যয়ন থেকে নির্মিত উদ্ভাবনী কাব্যভাষা, আবেগ ও চিন্তার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার এবং ধ্রুপদি ঐতিহ্যকে বর্তমানকে বোঝার মানচিত্রে পরিণত করার ক্ষমতার কথা বলেছিল। নোবেল ঘোষণার পর যেন সেই পুরনো মূল্যায়নেরই আরও বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এল।

কারসনের নোবেল তাই শুধু একজন কবির পুরস্কার নয়; এটি পুরাণকে নতুন করে পড়ারও এক ধরনের স্বীকৃতি। আর সেই জায়গাতেই মধুসূদনকে পাশাপাশি বসালে আমাদের নিজেদের সাহিত্য-ইতিহাসও নতুন আলোয় দেখা যায়।

মধুসূদন রাবণকে সম্পূর্ণ নির্দোষ করেননি, কারসনও Geryon-কে নিষ্পাপ দেবতা বানাননি। তাঁদের কৃতিত্ব অন্যত্র। তাঁরা দেখিয়েছেন, মানবিকতা আর নৈতিক নির্দোষতা এক জিনিস নয়। যে চরিত্র ভুল করে, যে চরিত্র আকাঙ্ক্ষায় ভোগে, যে চরিত্র হিংস্র বা অদ্ভুত বা পরাজিত—তারও একটি ভিতরের পৃথিবী আছে। সাহিত্য সেই ভিতরের পৃথিবীটিই আমাদের দেখতে শেখায়।

সম্ভবত বড় সাহিত্য ঠিক এখানেই আমাদের দৃষ্টিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। সে বলে—যাকে এতদিন ‘দানব’ বলে দূরে রেখেছিলে, তার চোখের ভিতর একবার তাকাও। সেখানে হয়তো তোমার নিজেরই কোনো ভয়, কোনো প্রেম, কোনো পরাজয়, কোনো একাকিত্ব বসে আছে।

কারসনের Geryon এবং মধুসূদনের রাবণ-মেঘনাদ—দুই ভিন্ন মহাকাব্যিক জগতের দুই ‘অন্য’ চরিত্র—শেষ পর্যন্ত তাই আমাদের কাছে এসে মানুষ হয়ে ওঠে। আর সেই মানুষটিকে দেখতে পারার মধ্যেই হয়তো সাহিত্যের সবচেয়ে বড় মানবিকতা।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login