Story

শংকর

October 8, 2026

57 views

১
শংকরের চোখ লেগে এসেছিলো। বোধহয় ঘুমই এসে গিয়েছিলো। ঘুমের ভেতর ডুবে যেতেই সে আবার স্বপ্নটা দেখলো। স্বপ্ন দেখতে দেখতে সে বুঝে গিয়েছিলো, সে স্বপ্ন দেখছে। তবুও এই স্বপ্নটা দেখার সময়ের আতংকটা ঠিকই তার উপর ভর করলো। স্বপ্নের একটা পর্যায়ে তার আতঙ্কটা চরমে উঠে। সে দেখতে পায়, তিনজন লোক তাকে জোর করে মাটিতে চেপে ধরে আছে। আরেকজন লোক কোত্থেকে যেনো একটা বড়ো চাকু বের করে আনলো। অন্ধকারে লোকগুলোর চেহারা ঠিকমতো দেখা যায় না। লোকটা চাকুটা হাতে নিয়ে তার গলার উপর ধরলো। শংকর আতংকে চোখ বন্ধ করে ফেলে। কেনো যেনো সে কোন চিৎকার না করে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। লোকগুলো তাকে জবাই করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শংকর মনে মনে ভাবে, অনেক হয়েছে, আর না। সে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসে। সারা শরীর ঘামে ভিজে একাকার। এ স্বপ্নটা সে দেখতে চায় না। তবুও কয়েকদিন পরপর সে এই স্বপ্নটা দেখে। বিছানা হতে উঠে শংকর ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। হালকা বাতাস বইছে উত্তর দিক থেকে। সারা উঠোনে চাঁদের আলো। শংকর উঠোনে হাঁটাহাঁটি করতে লাগলো।
যেদিন রাতেই এ স্বপ্নটা দেখে শংকর, সেদিন রাতে আর ঘুমুতে পারে না। তার কেবল মনে হয়, ঘুমালেই সেই স্বপ্নটা আবার ফিরে আসবে। সে স্বপ্নের ভেতরেই বোঝে, এটা স্রেফ একটা স্বপ্ন। তবুও আতংকের ব্যাপারটাতো মিথ্যে নয়। তার ভয় লাগে। খুব ভয় লাগে।
বাড়িতে আর কেউ থাকে না। শংকরের বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেছে। বিয়ে থা করেনি। বাবা মা মারা যাবার পর শংকর সত্যিকারের একা হয়ে গেলো। এ গ্রামে তার আর কোন জ্ঞাতিগোষ্ঠী নাই। পাশের গ্রামে তার এক জ্যাঠাতো ভাই থাকে। মাঝে মাঝে সেখানে যায় সে। তবে সেই বাড়িতে যেতে তার ইচ্ছে করে না। সে ভাইটার গঞ্জে বড়ো দোকান আছে। দেশ স্বাধীন হবার পর পর ভালো পয়সা কামিয়েছে। সে বাড়িতে গেলে ভাইটা তাকে বসতেও বলে না। কেমন একটা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলে। ভাইয়ের বউটাতো কখনো কথাই বলে না। নতুন পয়সাওয়ালা লোকেরা গরীব আত্মীয়স্বজনদের কখনোই গ্রাহ্য করে না। দুই তিন পুরুষের পয়সাওয়ালা লোকেরা এরকম হয়না, তারা সবার সাথে কথা বলে, সবার সাথে আদব লেহাজ বজায় রাখে।
চাঁদের আলোতে উঠোনে হাঁটতে হাঁটতে শংকর এসব কথাই ভাবছিলো। এ গ্রামে তার কোন কাজ নাই। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কিছু জমিজিরাত আর এই ভিটেটা আছে। একা মানুষ, তার চলে যায়। বিয়ে থা না করে বরং ভালো করেছে, তার মনে হলো। একা একা থাকার মধ্যে যে স্বাধীনতাটা থাকে, সেটার লেশমাত্রও থাকে না সংসারী মানুষদের। অবশ্য এসব ভাবছে কেনো সে- এ কথাটাও তার মনে হলো। সে তো ভালোই আছে। মানুষ পার্থিবে যা করে সবই নিজে ভালো থাকার জন্যে, নিজে শান্তিতে থাকার জন্যে। সে একা একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বিয়ে থা করবে না। এভাবে একা একা থাকার জীবনটা তার খুব পছন্দ হয়েছে। কোনো আত্মীয় সজন না থাকায় কেউ তাকে বিয়ে করার জন্যে জোরাজুরি করে না। এভাবে থাকাটার আলাদা একটা মজা আছে।
উঠোনে পায়চারী করতে করতে তার হঠাৎ মনে হলো, সে কেনো এ গ্রামে পড়ে আছে? এখানে শুধু শুধু পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না। তার বরং উচিত ছিলো ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু ঘুরে বেড়ালে কি মানুষ সত্যিই শান্তি পায়? হয়তো পায়। সেজন্যে সে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতেই পারে। কিন্তু সেখানেও যদি শান্তি না পায়, তখন কী হবে? বরং এখানেই থাকি। নিজের মতো একা একা জীবন, নিজের মতো করে থাকা। নিজে নিজে একা একা মাথা নাড়লো। নাহ, এখানেই থাকবে। কোথাও যাবে না। পৃথিবীতে তার তো কিছুই নাই। এ গ্রামের মানুষেরা খারাপ না। সবার সাথেই তার ভালো সম্পর্ক। তাকে দেখলে বরং গ্রামের লোকেরা হাসিমুখে কথা বলে। এটা ওটা জিজ্ঞেস করে। কদিন আগে ইদ গেলো। তখন পাশের বাড়ির মনসুর চাচা তাকে ডেকে নিয়ে বাড়িতে পাশে বসিয়ে সেমাই খাওয়ালো। এ গ্রাম ছেড়ে যাবার দরকার নাই। বৈরাগ্যের জীবনে যাবার দরকার কী?
পায়চারি করতে করতে হঠাৎ লক্ষ্য করলো শংকর, পূর্বাকাশ আলোময় হয়ে এসেছে। দিনের আলো দেখেই শংকরের মাথা থেকে ঘর দুয়ার ছেড়ে যাবার ভাবনা, বৈরাগ্যের ভাবনা, এমনকী স্বপ্নে ভয় পাবার ব্যাপারটা সবকিছু মাথা থেকে চলে গেলো। শংকরের মনে হলো, রাতভর উঠোনে হেঁটে হেঁটে সে বরং ক্লান্ত হয়ে গেছে। তার এখন ঘুমানো দরকার। ঘুমের কথাটা মাথায় আসতেই ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো শংকর।
ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বেলা দশটা বেজে গেলো। শংকর ঘুম হতে উঠে মনে করার চেষ্টা করলো, কাল রাতেও সে স্বপ্নটা দেখে রাতভর উঠানে হাঁটাহাঁটি করেছে। পরক্ষণেই তার মনে হলো, না সে উঠোনে হাঁটাহাঁটি করেনি। পুরো ব্যাপারটাই তার স্বপ্ন ছিলো। বিছানায় বসে বসে ভাবতে লাগলো, সে নিজে ঠিক আছে কী না, নাকি তার মাথায় গণ্ডগোল শুরু হয়েছে? মাঝেই মাঝেই আজকাল তার এমন হচ্ছে। ডাক্তারের কাছে যাবে কিনা, ভাবলো একবার। তারপরই ভাবলো, ডাক্তারের কাছে গিয়ে কী বলবে? ডাক্তারকে এসব বললে ডাক্তার তাঁকে নির্ঘাত পাগল ঠাউরাবে। তারচেয়ে বরং পাশের গ্রামে একজন সাধুবাবা থাকেন। তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করা যায়। সাধুবাবার কাছে অন্তত সবকিছু নিঃসংকোচে বলা যায়।
একা একা মানুষ, শংকর। কোনো পিছুটান নাই। নিজেই রান্না করে খায়, আবার কোনোদিন রান্নাও করে না। বাজারে হোটেলে গিয়ে খাওয়া দাওয়া সেরে নেয়। চুলায় ভাত চড়িয়ে দিয়ে তাতে দুটো আলু দিয়ে দিলো। ভাত হতে হতে আলুসেদ্ধ হয়ে গেলে, আলুভর্তা করে ভাতের সাথে খেয়ে নেয়া যাবে। চুলায় রান্না চড়িয়ে শংকর বিছানার পাশের রশিতে ঝোলানো গামছাটা কাঁধে নিয়ে পুকুরের দিকে চলে গেলো।

২
পাশের গ্রামে একটা পুরোনো কালীমন্দির আছে। সেখানেই সাধুবাবা থাকেন। এ মানুষটার বয়েস আন্দাজ করা যায় না। শংকর যখনি এ গ্রামে আসে, একবার এসে সাধুবাবার সাথে দেখা করে যায়। বুড়ো হয়ে গেছেন সাধুবাবা। শংকর যতবার এখানে আসে, ততবারই তার মনে হয়, এ মানুষটাকে সেই ছোটবেলায় যেমন বৃদ্ধ দেখেছে, এখনো সাধুবাবা ঠিক তেমনি আছে। মানুষটার বয়েস আর বাড়ে নাই অথবা এই মানুষটা কোনোভাবে নিজেকে সময়ের বলয় থেকে মুক্ত করে রেখেছেন। জীবনভর একই চেহারায়, একই বয়সে কীভাবে যে রয়েছেন, সেটা সে বোঝে না। এই সাধুবাবার প্রতি তার অপরিসীম শ্রদ্ধার এটাও একটা বড়ো কারণ। সাধুবাবা নিজেও জানেন, শংকর তাঁকে খুব ভক্তি করে, মান্যি করে।
শংকর কিছুক্ষণ আগেই কালীমন্দিরে এসেছে। মন্দিরের বাইরে কিছুক্ষণ বসে রইলো চুপচাপ। ভাবছে সাধুবাবা মন্দিরের ভেতর হতে বেরিয়ে এলেই তার সাথে কথা বলবে। ঠিক কী কী বলবে, তা নিয়েও খানিকটা চিন্তা করলো।
আধঘণ্টা হয়ে গেলো, সাধুবাবা মন্দির হতে বের হলেন না। শংকর ভাবলো, আজ বরং চলে যাই। অন্য একদিন আসা যাবে। আবার মনে হলো, আজ যখন এদিকে এসেছেই, আজই বরং কথা সেরে নেয়াই ভালো হবে। পরে আসা মানেই কয়েকদিন পর আসা। এর মধ্যে রাতের বেলা ঐ স্বপ্ন দেখার কোনো মানে হয় না। মনের শান্তি নষ্ট, ঘুম নষ্ট। একা একা বসে এসব ভাবতে ভাবতে তার মনে হলো, সাধু বাবা বুঝি আজ মন্দির হতে বেরই হবেন না, ঠিক সে সময়েই শংকর দেখতে পেলো, সাধু বাবা বেরিয়ে আসছেন। সাধুবাবাকে দেখেই শংকর উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করতেই সাধুবাবা বললেন,
কিরে শংকর, কেমন আছিস?
জ্বি বাবা, আমি ভালো আছি।
তুইতো ভালো নাই। সাধুবাবা বললেন।
কথাটা শুনেই একটু চমকে গেলো শংকর। সাধুবাবা তাকে চুপ থাকতে দেখে বললেন,
ঘুমাতে পারছিস না অনেকদিন। না ঘুমিয়ে রাতভর হাঁটাহাঁটি করিস। তোর চোখ দুটো বসে গেছে। দুই চোখে রাজ্যের ঘুম।
শংকর ভেতরে ভেতরে চমকে গিয়েও নিজের কণ্ঠটা স্বাভাবিক রেখে বললো,
আমি কীইবা করতে পারি, বাবা? নিজেতো কোনো কূলকিনারা করতে পারছি না। এদিকে চোখ বন্ধ করলেই দুঃস্বপ্নটা দেখি। আপনিতো সবই জানেন।
সাধুবাবা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
তোর ভেতর গোপন একটা পাপ আছে। সেটা তো তুই জানিস।
চমকে গেলো শংকর। তারপর খানিকটা আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,
আমি আবার কী করলাম, বাবা?
তুই নিজেই জানিস, কী করেছিলি।
শংকর চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলো।
সাধু বাবা এবার বললেন, আমি ভেবেছিলাম তোকে এসব নিয়ে আরো পরে বলবো। কিন্তু এখন সময় এসে গেছে, তোকে বলার। তোর উপর তোর পাপের প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে।
শংকর মনে মনে ভাবলো, তার একটা গোপন পাপ আছে। সেটা সত্যি। কিন্তু সাধুবাবা সেটা জানলেন কীভাবে? আর সেই ঘটনাওতো আজ হতে সাত আট বছর আগের ঘটনা।
এখন আমি কী করবো, বাবা? শংকরের কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়লো।
এখন কিছুই করার নেই। তবে আপাতত তুই তোর ঘরটাকে ঠিক কর। ঘরে যাতে কোনো অপশক্তি না থাকে, সেজন্যে নুনপানি ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে দিবি। ঘরের এক কোণে একটা বাটিতে কিছু লবণ রেখে দে। এতে হয়তো কিছুটা ভালো থাকবি। আর তোর ঘরের সামনে কি কোনো কাঁটাওয়ালা গাছ আছে?
জ্বী বাবা, ঘরের দরজার সামনেই একটা বড়ো কাঁটাওয়ালা ফণীমনসা গাছ আছে। সঙ্কর বললো।
কাঁটাওয়ালা গাছ বিবাদ, অশান্তি নিয়ে আসে। তুইতো একা মানুষ, তোর সাথে আর কেইবা বিবাদ করতে আসবে? থাকুক, ঐ গাছ থাকুক।
আমি এখন কী করবো, তাহলে বাবা?
তুই যে কী করবি, সেটা আমি কী করে বলবো? দেখি, তোর জন্যে কিছু করা যায় কীনা।
আমি কি এখন চলে যাবো?
যা, আজ চলে যা। আমি বরং একদিন তোর বাড়িতে আসবো। তোর বাড়ি, ঘর এগুলো দেখতে হবে।
খুব তাড়াতাড়ি আসেন, বাবা।

৩
সাধুবাবার সাথে দেখা করে আসার পর চারদিন পেরিয়ে গেছে। প্রতিদিন শংকর ভাবে আজই বুঝি সাধুবাবা আসবেন। এর মধ্যে সাধুবাবা আসলেন না। শংকরের মাথায় অন্য একটা ভাবনা এসে হাজির হয়েছে। সাধুবাবা কীভাবে জানলেন, তার গোপন পাপের কথা!
তার সত্যিই একটা গোপন পাপ আছে। সাত আট বছর আগে একদিন রাতে গঞ্জ হতে ফেরার সময় পথে একা একটা মেয়েকে পেয়ে তার মুখ চেপে পাশে ঝোপের পেছনে নিয়ে গিয়েছিলো। কিছুক্ষণ পর তার মনে হয়েছিলো, এই মেয়ে বেঁচে থাকলে তার বিপদ হতে পারে। এজন্যে মেয়েটাকে ধরে পাশের খালে কিছুক্ষণ চুবিয়ে ধরে রাখার পর মেয়েটা মারা যায়। কিন্তু এ ঘটনার সময়তো আশেপাশে কেউই ছিলো না। সাধুবাবা জানলেন কীভাবে? সাধুবাবা তাকে ইংগিতটা দিলেন ঠিকই। এটাতো উনার জানার কথা না। শংকর শুধু ভাবছে, সাধুবাবা এরপর আবার তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে সে কী জবাব দেবে?
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। শংকরের মনে হলো, আজ সাধুবাবা আসবেন। ঘরের সামনে উঠোনের একপাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে রইলো। চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। কৃষ্ণপক্ষ বোধহয়। আজকের অন্ধকারটা যেন অন্যরকম। শংকরের কেমন যেনো ভয় ভয় লাগছে। বহুদিন আগের সেই মেয়েটার কথা মনে পড়ছে। সেদিনও এরকম অন্ধকার ছিলো, ভালোভাবে তার চেহারাটাও দেখতে পায়নি সে। কিন্তু আজ কেনো যেনো সে রাতের কথাই বারবার মনে পড়ছে, শংকরের। বাড়ির বাইরে লোকজনের কথাবার্তা শুনে তার ভাবনায় ছেদ পড়লো।
এই অন্ধকারে আবার কে এলো? শংকর গলা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
কে?
শংকর, বাড়ি আছিস? সাধুবাবার গলা শুনেই শংকর তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো। সাথে সাথে যেন সে মনের ভেতর একটা স্বস্তির আভাষ পেলো সে।
শংকর চেয়ার ছেড়ে সামনে এগিয়ে যেতেই সাধুবাবা উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। তার সাথে আরো তিনজন লোক এসেছে। শংকর বুঝতে পারলো, সাধুবাবা এই বয়সে এতোদূরে একা একা কীভাবেইবা আসবেন, তাই হয়তো লোকজনসহ এসেছেন।
অন্ধকারে সাধুবাবা এসে শংকরের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন।
কেমন আছেন, বাবা? শংকর জিজ্ঞেস করলো।
শংকরের কথার জবাব না দিয়ে সাধুবাবা সরাসরি বললেন,
সেই রাতে মেয়েটাকে না মারলে পারতি।
আমাকে এখন বাঁচান, বাবা। শংকর মাটিতে বসে সাধুবাবার দুই পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।
তোর আত্মার মুক্তি দরকার। শুধু মুক্তি হলেই হবে না। এই আত্মাকে এখন আরেকটা আত্মার সাথে মিলিয়ে দিতে হবে। নইলে তোর পাপবোধ যাবে না। তোর মুক্তি ঘটবে না। সাধুবাবা বললেন।
শংকর কথাটার কিছুই বুঝতে পারলো না। সে শুধু বললো,
বাবা, সেটা কীভাবে সম্ভব?
সে ব্যবস্থা আমি করবো। তুই ভাবিস না। সাধুবাবার গলাটা যেনো অন্যরকম শোনালো। তুই মাটিতে শুয়ে পড়। আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি।
শংকর কোনো কিছু না ভেবেই মাটিতে শুয়ে পড়লো। শংকর উঠোনে মাটিতে শুয়ে পড়তেই সাধুবাবার সাথের বাকী তিনজন লোক তার হাত পা মাটিতে শক্ত করে চেপে ধরলো। সাথে সাথেই শংকরের মনে হলো, ঠিক এরকম একটা স্বপ্নই সে এতদিন ধরে দেখে আসছিলো। তাহলে কি সাধুবাবাকেই সে স্বপ্নে দেখছিল। সাধুবাবা তার গলার কাছটায় বসলেন। সাথের ঝোলা থেকে বড়ো একটা চাকু বের করলেন সাধুবাবা। অন্ধকারে চাকুটার অবয়ব সে ঠিকই বুঝতে পারছে। চাকুটা তার গলার কাছে আনতেই ভয়ে আতংকে ফ্যাসফ্যাসে গলায় শংকর বললো,
বাবা, আমাকে মেরে ফেলবেন?
নাহ, তোর আত্মাকে মুক্তি দিচ্ছি। তোর আত্মাটাকে আমি আমার শরীরে নিয়ে নেবো। আমি বুড়ো হয়ে গেছি। আমাকে তো আরো অনেকদিন বেঁচে থাকতে হবে। আমার ভেতরেই তুই বেঁচে থাকবি।
আতংকে জমে গেলো শংকর। ওদিকে সাধুবাবা বলেই যাচ্ছেন, বিশ পঁচিশ বছর পর পর আমাকে একটা করে মানুষ মেরে তার আত্মাকে আমার শরীরে ধারণ না করলে তো আমি মরে যাবোরে, শংকর।
শংকরের ঠিক তখনই মনে পড়লো, ছোটবেলায় তাদের গ্রামের একজন লোককে কারা যেন জবাই করে মেরে ফেলেছিলো।
আমাকে ছেড়ে দিলে হয় না, বাবা?
সাধুবাবা কথাটার জবাব না দিয়ে চাকুটা দিয়ে ততোক্ষণে শংকরের গলায় পোচ দেয়া শুরু করলেন।
পুনশ্চ
বিশ বছর পর, একদিন, দুপুরবেলা।
বৃদ্ধ সাধুবাবা মন্দির হতে বাইরে বেরিয়ে এলেন। মন্দিরের সামনে একজন মাঝবয়েসী লোক বসে আছেন । সাধুবাবা তাকে দেখেই বললেন,
তোর উপর শনির প্রভাব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। তুই এখন বাড়ি যা। আমি একদিন তোর বাড়িতে আসবো।
লোকটা কথাটা শুনে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিলো। সাধুবাবার মাথার ভেতর কে যেনো বলে বসলো,
আবার মানুষ মারবেন, বাবা?
সাধুবাবা মনে মনেই জবাব দিলেন,
শংকর, তুই খুব বেশী কথা বলিস। তুইতো জানিস, আমাকে আরো হাজার বছর বেঁচে থাকতে হবে।মনে মনে কথাটা বলেই সাধুবাবা একা একা হাসতে লাগলেন।

(গল্পটি আমার ওঝা গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া)

Picked up where you left off

Comments

protivu publications was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • raisa 2 weeks ago

    একটু অন্যরকম। গল্পের প্লটটা কেমন যেন ভয়ধরানো। শুভেচ্ছা জানবেন।

  • sayed mahmud 2 weeks ago

    এ গল্পটাও ভিন্ন ধাঁচের প্লটে। ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ।

  • protivu publications 2 weeks ago First reader

    ভালো লিখেছেন। মিস্টিক। একটা রহস্য রেখেই দিলেন আল্টিমেটলি, সাধুর জীবদ্দশা নিয়ে। কনসেপ্টটা আপনার মাথায় এলো কীভাবে?

  • অদ্ভুত দেহান্তরের গল্প। রহস্যতো বটেই। ভালো লিখেছেন। সাধু লোকটার চরিত্রটা এ গল্পের কেন্দ্র। এভাবে কতো বছর সে লোকটা বেঁচে থাকবে?